ইমাম আল-গাজ্জালী: এক ক্রান্তদর্শী বুদ্ধিজীবী ও আত্মার মনস্তাত্ত্বিক

আজ থেকে প্রায় হাজার বছর আগে, ১০৫৮ খ্রিষ্টাব্দে পারস্যের (আজকের ইরান) তুস নামের একটা ছোট্ট এলাকায় গাজ্জালীর জন্ম হয়। ওনার আব্বা ছিলেন চরম গরিব, কিন্তু দিলখোলা একজন মানুষ। উনি সুতা কাইটা বাজারে বিক্রি করতেন। ফারসি ভাষায় সুতা কাটুনিদের বলা হয় ‘গাজ্জাল’, সেখান থেকেই ওনার বংশের নাম হয়া যায় গাজ্জালী(দ্বিমত থাকতে পারে)।

উনার আব্বা মারা যাওয়ার আগে উনার এক সুফী বন্ধুকে ডাইকা বললেন, ‘ভাই, আমি তো দুনিয়া থেকে বিদায় নিতেছি। এই আমার দুই ছেলে (আবু হামিদ আর আহমদ), এদের একটু মানুষ করো আর আমার জমানো এই সামান্য কয়টা টাকা এদের পড়াশোনার পেছনে খরচ কইরেন।’

টাকা তো অল্প কয়দিনেই শেষ! তখন সেই সুফী দরবেশ বললেন, ‘বাবাজিরা, আমার পকেটেও তো আর টাকা নাই। এক কাজ করো, তোমরা শহরের মাদ্রাসায় ভর্তি হয়া যাও। সেখানে অন্তত ফ্রি থাকা-খাওয়া আর পড়াশোনার ব্যবস্থা আছে।’ লজিং আর ফ্রি খাওয়ার জন্য যে ছেলে মাদ্রাসায় ভর্তি হইছিল, সে-ই পরে দুনিয়ার বুকে ইসলামের সবচেয়ে বড় স্কলার হয়া উঠছিল!

তুমি কেমন পণ্ডিত?

গাজ্জালী তখন তরুণ যুবক। নিজের শহর ছাইড়া নিশাপুর শহরে গেছেন ওনার উস্তাদ ইমামুল হারামাইন আল-জুয়াইনির কাছে পড়তে। সেখানে উনি দিনরাত এক করে পড়াশোনা করলেন, উস্তাদের মুখ থেইকা যা শুনতেন সব কাগজে নোট কইরা রাখতেন। কয়েক বছর পর পড়াশোনা শেষ কইরা উনি ওনার জীবনের সব কামাই মানে ওই নোট খাতা আর কিতাবপত্রের একটা বিশাল গাট্টি ঘোড়ার পিঠে বাইন্দা নিজের শহরের দিকে রওনা দিলেন।

পথের মধ্যে ঘটলো সেই অঘটন! একদল দুর্ধর্ষ ডাকাত ওনার কাফেলা আক্রমণ করলো। ওনার যা কিছু টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় ছিল সব তো নিলই, সাথে ওনার ওই কিতাবের গাট্টিটাও ওনার চোখের সামনে নিয়া যাইতে লাগলো।

গাজ্জালী তো পুরাই দিশেহারা! উনি টাকা-পয়সার মায়ায় না, ওনার কিতাবগুলোর মায়ায় কান্নাকাটি শুরু করলেন আর ডাকাত দলের সর্দারের পিছু নিলেন।

ডাকাত সর্দার রাইগা গিয়া  ধমক দিয়ে বললো, ‘কী রে ছোকরা, মরতে চাস নাকি? পিছে পিছে আসছিস কেন?’

গাজ্জালী হাতজোড় করে বললেন, ‘ভাই, আপনার পায়ে পড়ি। আমার টাকা-পয়সা সব আপনি রাইখা দেন, কিন্তু ওই কাগজের গাট্টিটা আমারে ফেরত দিন। ওগুলার মধ্যে এমন জ্ঞান আছে যা অর্জনের জন্য আমি বছরের পর বছর নিজের ঘরবাড়ি ছাড়ছি।’

এই কথা শুনে ডাকাত সর্দার হো হো কইরা হাইসা উঠলো। সে তামাশা করে বললো, ‘তুমি কেমন পণ্ডিত? ডাকাতরা তোমার কাগজের তল্পিতল্পা কাইড়া নিলেই তোমার সব জ্ঞান হাওয়া হয়া যায়? তাইলে ওইটা কেমন জ্ঞান যা কাগজের টুকরায় বন্দি থাকে, তোমার বুকের ভেতরে থাকে না?’

এই এক লাইনের খোঁচা! ডাকাত সর্দার তো হাসতে হাসতে ওনার কিতাবগুলো ফেরত দিয়ে চইলা গেল, কিন্তু ওনার মাথায় যেন চড়ক গাছ পড়লো। গাজ্জালী পরে ওনার ডায়েরিতে লিখছেন, ‘আল্লাহ মূলত ওই ডাকাত সর্দারের মুখ দিয়া আমাকে এক বিরাট শিক্ষা দিছিলেন।‘

তুস শহরে ফিরা গাজ্জালি টানা ৩ বছর ঘর থেইকা বার হন নাই। উনি নিশাপুরে বইসা যত নোট নিছিলেন, সব মুখস্থ করে নিজের মগজ আর বুকের ভেতর গাইথা ফেললেন। উনি বুঝলেন জ্ঞান কিতাবে রাখার জিনিস না, জ্ঞান রাখার আসল জায়গা হইলো নিজের ভেতর!

ক্ষমতার চূড়ায় ও ভাঙনের শুরু

এরপর গাজ্জালীর লাইফ গ্রাফ রকেটের গতিতে ওপরে উঠতে লাগলো। ওনার মেধা দেইখা সেলজুক সাম্রাজ্যের উজির নিজামুল মুলক ওনারে বাগদাদের ‘নিজামিয়া মাদ্রাসা’র প্রধান বানায় দিলেন। তখন ওনার বয়স মাত্র ৩৪ বছর! ভাবা যায়? আজকের দিনে অক্সফোর্ড-হার্ভার্ডের ভিসি হওয়া বা সরকারের চিফ জাস্টিস হওয়ার মতো পাওয়ার ছিল ওনার। মন্ত্রী-আমলারা ওনার সামনে মাথা নিচু করে বইসা থাকতো।

কিন্তু ওই যে, ভেতর থেকে ডাকাত সর্দারের সেই খোঁচা ওনারে তাড়া করে ফিরতো । জ্ঞান কি শুধু নাম-ডাক আর টাকা কামানোর জন্য?

১০৯৫ সালে ওনার লাইফে আসলো সেই বিখ্যাত ট্র্যাজেডি। ওনার মন ও শরীরের ভেতর এমন এক ডিপ্রেশন আর মানসিক টেনশন শুরু হইলো যে, উনি ক্লাসে লেকচার দিতে গেলে ওনার গলা দিয়া কোনো আওয়াজ বার হইতো না। ডাক্তাররা আইসা বললো, ‘ওনার শরীরের কোনো রোগ নাই, ওনার মনের রোগ হইছে।‘

গাজ্জা্লী বুঝলেন, দুনিয়ার এই জাঁকজমক ওনার আত্মাকে ধ্বংস কইরা দিতেছে। উনি তখন হাজ্জের উসিলা দিয়া বাগদাদ থেইকা পালাইয়া গেলেন। নিজের সমস্ত ধন-সম্পত্তি গরিবদের মধ্যে বিলাইয়া দিয়া এক জোড়া সুফী চাদর গায়ে দিয়া উনি উধাও হয়া গেলেন।

১০ বছরের বৈরাগ্য ও প্রত্যাবর্তন

এরপরের ১০টা বছর ইমাম গাজ্জালী পুরাই মিসিং। উনি দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের মিনারে একাকী বইসা ধ্যান করতেন, জেরুজালেমের মসজিদে গিয়ে ঝাড়ু দিতেন, মক্কা-মদিনায় একদম অচেনা মানুষের মতো ঘুইরা বেড়াইতেন। এই দীর্ঘ ১০ বছর উনি নিজের ইগো বা অহংকারকে পায়ের নিচে পিষা মারেন।

এই নির্জন সাধনার পরেই ওনার কলব বা অন্তর পুরাই খাঁটি সোনা হয়া যায় এবং উনি ওনার জীবনের মাস্টারপিস- ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন লেখেন। শেষ বয়সে উনি আবার নিজের শহরে ফিরা আসেন এবং নিজের বাড়িতেই একটা ছোট মাদ্রাসা ও খানকাহ তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ফ্রিতে পড়ানো ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা দিতে শুরু করেন।

১১১১ খ্রিষ্টাব্দের এক সোমবারে, এই মহান মনস্তাত্ত্বিক দরবেশ ওনার প্রিয় ছাত্র আর ভাইকে ডাইকা বললেন, ‘আমার কাফনের কাপড়টা নিয়ে আসো।‘ কাপড়টা আইনা ওনার চোখের সামনে রাখতেই উনি ওটাতে চুমু খাইলেন এবং বললেন, ‘মালিকের হুকুম চলে আসছে, আমি রেডি।‘ এই বইলা বিছানায় শুইয়া উনি ওনার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

ডাকাত সর্দারের ওই ছোট্ট একটা খোঁচা কীভাবে একজন সাধারণ ছাত্রকে শতাব্দীর সেরা ইমাম বানাইয়া দিল- এই গল্প শুনলে আসলেই গায়ে কাঁটা দেয়।

এইবার তার লেখালেখি ও অবদান নিয়া আলোচনা করিঃ

ইমাম গাজ্জালীরে যদি আমরা স্রেফ একজন মধ্যযুগীয় ধর্মতাত্ত্বিক হিসাবে দেখি, তাইলে ওনার প্রতি চরম অন্যায় করা হবে। ওনার আসল পরিচয় হইলো – উনি ছিলেন ক্রান্তদর্শী বুদ্ধিজীবী, আত্মার মনস্তাত্ত্বিক ও এপিস্টেমোলজিস্ট (জ্ঞানতাত্ত্বিক)।একাদশ শতকের মুসলিম বিশ্ব যখন গ্রিক দর্শনের আক্রমণ , বাতেনী সম্প্রদায়ের পলিটিক্যাল আগ্রাসন আর আলেমদের ভেতরের পদপ্রীতির কারণে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাইতেছিল, ঠিক তখন গাজ্জালি একাই একটা ইন্টেলেকচুয়াল রেভ্যুলেশন ঘটায় দেন।

ওনার এই বিশাল ক্যানভাসটাকে আরও কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কোণ থেইকা অ্যানালাইসিস করা যাক:

১. জ্ঞানতত্ত্ব (Epistemology): সত্য জানার আসল সোর্স কোনটা?

বুদ্ধিজীবী মহলে গাজ্জালীর সবচেয়ে বড় আলোচনা ওনার জ্ঞানতত্ত্ব বা ‘হাউ ডু উই নো হোয়াট উই নো’ নিয়া। ওনার আধ্যাত্মিক আত্মজীবনী ‘আল-মুনকিয মিনাদ দলাল’ (বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি) কিতাবে উনি দেখাইছেন যে, মানুষ কীভাবে সত্যের সন্ধান পায়। উনি সত্যের খোঁজে চারটা গ্রুপকে এক্সামিন করছিলেন: দার্শনিক (Philosophers), বাতেনী বা রহস্যবাদী (Esoterics), কালাম শাস্ত্রবিদ (Theologians) এবং সুফী (Mystics)।

এইখানে উনি একটা চরম স্কেপটিসিজম বা সংশয়বাদের মধ্য দিয়া গেছেন, যা ওনার প্রায় ৭০০ বছর পরে ফরাসি ফিলোসফার রেনে দেকার্ত উনার ‘কার্তেসীয় সংশয়বাদ’ থিওরিতে দেখাইছিলেন। গাজ্জালী বললেন:

আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক) আমাদের ধোঁকা দেয়। যেমন দূর থেইকা বড় সূর্যকে একটা পয়সার মতো দেখায়। সুতরাং, ইন্দ্রিয়লব্ধ জ্ঞান চূড়ান্ত সত্য না।

এরপর উনি আসলেন বুদ্ধির (Reason) কাছে। কিন্তু উনি দেখাইলেন বুদ্ধিও অনেক সময় কনট্রাডিক্টরি রেজাল্ট দেয়।

শেষমেশ উনি সিদ্ধান্তে আসলেন যে, চূড়ান্ত মেটাফিজিক্যাল সত্য পারমার্থিক সত্য কেবল বুদ্ধি বা ইন্দ্রিয় দিয়া লাভ করা সম্ভব না। এইটার জন্য প্রয়োজন নূর (Divine Light) যা আল্লাহ মানুষের কলবে বা অন্তরে ঢাইলা দেন। বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা মাইনা নিয়া হৃদয়ের স্বজ্ঞা বা ইনটুইশন (Intuition)কে ওনার এই স্বীকৃতি দেওয়াটা ছিল জ্ঞানতত্ত্বের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

২. কার্যকারণ তত্ত্ব খণ্ডন: কজালিটি বনাম অকেশনালিজম

দার্শনিক মহলে গাজ্জালীর অন্যতম জটিল এবং সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত অবদান হইলো কার্যকারণ তত্ত্ব বা Causality-র ব্যবচ্ছেদ। ওনার সময়ে ফিলোসফাররা দাবি করতেন- প্রকৃতির সবকিছুর পেছনে একটা ফিক্সড কজ অ্যান্ড ইফেক্ট (কার্যকারণ সম্পর্ক) আছে এবং এইটা বদলানো অসম্ভব। এমনকি স্রষ্টাও এটা ভাঙতে পারেন না। যার কারণে তারা অলৌকিক ঘটনা বা মোজেজাকে অস্বীকার করতেন। গাজ্জালী উনার তাহাফুত আল ফালসিফা কিতাবে এই ধারণার গোড়া কাইটা দিলেন। উনি বললেন- আগুন আর তুলার সংস্পর্শে তুলা পুড়ছে- আমরা শুধু এই দুইটা ঘটনার একসাথে ঘটা (Association) দেখছি, কিন্তু আগুনই যে তুলারে পোড়াইতেছে, তার কোনো অকাট্য যৌক্তিক প্রমাণ নাই।

উনি প্রস্তাব করলেন ‘অকেশনালিজম’ (Occasionalism) বা উপলক্ষবাদ। উনার মতে, আগুন পোড়ায় না, বরং আল্লাহ প্রতিবার আগুন ও তুলার মিলনের উপলক্ষে পোড়ানোর ঘটনাটি ঘটান। মজার ব্যাপার হইলো, উনার এই তত্ত্বের শত শত বছর পর আধুনিক পাশ্চাত্য দর্শনে ডেভিড হিউম (David Hume) ঠিক একই কায়দায় কজালিটি বা কার্যকারণ তত্ত্বকে লজিক্যালি রিজেক্ট করেন।

৩. বাতেনী মতাদর্শের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলা

ইমাম গাজ্জালির সময়ে সেলজুক সাম্রাজ্যের জন্য সবচেয়ে বড় থ্রেট ছিল বাতেনী বা ইসমাঈলী চরমপন্থীরা, যাদের একটা উইং ছিল হাসান বিন সাব্বাহর হাশাশিন বা অ্যাসাসিন্স। তারা পলিটিক্যাল অ্যাসাসিনেশন বা গুপ্তহত্যার মাধ্যমে ত্রাস সৃষ্টি করছিল এবং তাদের থিওরি ছিল- ইসলামের কোরআন-হাদিসের বাহ্যিক কোনো অর্থ নাই। সবকিছুর একটা গোপন বা বাতেনী অর্থ আছে, যা কেবল তাদের ইমামই জানে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে শরিয়তের প্রতি এক ধরণের উদাসীনতা তৈরি হইতেছিল। উজির নিজামুল মুলকের অনুরোধে গাজ্জালী এই বাতেনী মতাদর্শের বিরুদ্ধে একাডেমিক যুদ্ধ ঘোষণা করেন। উনি ফাদাইহ আল-বাতেনিয়্যাহ (বাতেনীদের কেলেঙ্কারী) সহ বেশ কয়েকটা বই লিখে দেখালেন যে, বাতেনীদের এই গোপন জ্ঞানের থিওরি আসলে ইসলামের রুটকে কাইটা দেয় এবং এটা সমাজকে একটা চরম নৈরাজ্যের দিকে নিয়া যায়। উনার এই কাউন্টার-ন্যারেটিভ বাতেনী আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড ভাইংগা দিছিল।

৪. ‘ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন’ ও প্রাতিষ্ঠানিক আলেমদের সাইকোলজিক্যাল ব্যবচ্ছেদ

গাজ্জালি যখন ওনার লাইফের সবচেয়ে বড় কিতাব ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন’ লিখলেন, উনার মূল টার্গেট কিন্তু সাধারণ মানুষ ছিল না,উনার মেইন টার্গেট ছিল উনার নিজের ক্লাসের মানুষ- অর্থাৎ আলেম এবং ফেকাহবিদরা (Jurists)। উনি দেখাইলেন, উনার সময়ের আলেমরা দ্বীনকে বানায় ফেলছে রাজদরবারে চাকরি পাওয়ার বা সমাজে বাহবা পাওয়ার একটা প্রফেশন। তারা খুঁটিনাটি ফিকহী মাসআলা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত, কিন্তু ইসলামের আসল স্পিরিট নিয়া আলোচনা নাই।

গাজ্জালী এই আলেমদের দুই ভাগে ভাগ করলেন: উলামাউদ দুনিয়া (দুনিয়ালোভী আলেম) এবং উলামাউল আখিরাত (পরকালমুখী আলেম)। উনি কড়া ভাষায় বললেন, যারা শুধু নিজেদের আভিজাত্য টিকায় রাখার জন্য ফিকহ চর্চা করে, তারা মূলত ধর্মের কসাই। উনি আইন বা ফিকহকে দুনিয়ার বিজ্ঞান (Science of the World) বইলা অভিহিত কইরা বললেন- আইন সমাজকে শৃঙ্খলায় রাখে ঠিকই, কিন্তু মানুষের আত্মাকে আল্লাহর সাথে জুইড়া দেওয়ার জন্য আধ্যাত্মিকতার কোনো বিকল্প নাই। উনার এই সেলফ-ক্রিটিসিজম বা আত্ম-সমালোচনা মুসলিম স্কলারশিপের ইতিহাসে বিরল।

৫. সমাজ ও রাজনীতি: নসীহতুল মুলুক এবং ক্ষমতার ভারসাম্য

গাজ্জালির পলিটিক্যাল ফিলোসফি ছিল রিয়ালিজম বা বাস্তবতাবাদের ওপর দাঁড়ানো। উনি খিলাফতের আইনি বৈধতা ধইরা রাখার পাশাপাশি সেলজুক সুলতানদের সামরিক ক্ষমতাকে রিকগনাইজ করছিলেন। কারণ উনি বুঝতেন, ক্ষমতার শূন্যতা (Power Vacuum) তৈরি হলে সমাজ খণ্ডবিখণ্ড হয়া যাইবো। সুলতান ও উজিরদের উদ্দেশ্যে লেখা ওনার নসীহতুল মুলুক (রাজাদের জন্য উপদেশ) কিতাবে উনি একাধারে পারস্যের রাজকীয় ঐতিহ্য ও ইসলামিক জাস্টিসের একটা ব্লেন্ড তৈরি করছেন। উনি শাসকদের মনে করায় দিতেন- প্রজাদের ওপর জুলুম করার চেয়ে বড় কুফরী আর নাই। উনি রাজদরবারের বিলাসিতা আর চাটুকারিতার বিরুদ্ধে সুলতানদের সরাসরি ওয়ার্নিং দিতেন। ওনার পলিটিক্যাল থিওরির মেইন মেসেজ ছিল -ক্ষমতা বা শক্তি (Power) ছাড়া জাস্টিস এস্টাবলিশ করা যায় না, আবার জাস্টিস (Justice) ছাড়া ক্ষমতা টিকায় রাখা যায় না।

বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন: গাজ্জালির আসল লেগাসি কী?

পাশ্চাত্যের অনেক ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদ যেমন এডওয়ার্ড সাঈদ এক জায়গায় দাবি করেন, গাজ্জালি নাকি দর্শনের কড়া সমালোচনা করে মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিছিলেন। কিন্তু এই ক্লেইমটা একদমই সস্তা আর বায়াসড। গাজ্জালী বিজ্ঞান বা গণিতকে কখনো নিষেধ করেন নাই, উনার আপত্তি ছিল ফিলোসফারদের সেই মেটাফিজিক্যাল অহংকার নিয়া, যা মানুষের সীমিত বুদ্ধিকে স্রষ্টার ওপরে স্থান দিতে চাইছিল। উনার আসল লেগাসি হইলো- উনি ইসলামের ভেতর একটা গ্রেট সিন্থেসিস (Great Synthesis) বা মহামিলন ঘটাইছেন। উনি অর্থডক্স শরিয়তকে তাসাউফের মরমি অনুভূতি দিয়া রিফ্রেশ করছেন, আবার তাসাউফ যেন শরিয়তের বাউন্ডারি ক্রস কইরা বেদাত বা কুসংস্কারে রূপ না নেয়, সেই লাগামটাও টাইনা ধরছেন।

আজকের জটিল মনস্তাত্ত্বিক সংকটের যুগে গাজ্জালীর সাইকো-স্পিরিচুয়াল অ্যানালাইসিস বা আত্মশুদ্ধির মেথডগুলি একজন আধুনিক মানুষকে তার অস্তিত্বের সংকট থেইকা মুক্তি দিতে খুবই কার্যকর। উনি এমন এক বুদ্ধিজীবী যিনি সিস্টেমের উপরে উঠাইয়া সিস্টেমের গলদ ধইরা তা সংস্কার করার জন্য নিজের লাইফ নিয়া পরীক্ষা করছেন। নিজের পদবী ও প্রতিষ্ঠান ছাইড়া, একটা লম্বা সময় ধইরা লোক চক্ষুর আড়ালে থাইকা নিজেকে শুদ্ধ কইরা, তার অন্যতম কিতাব ‘ইহ্ইয়াউ উলুমিদ্দীন’ লিখছেন।

আজকের দুনিয়ায় কেন গাজ্জালী প্রাসঙ্গিক?

আজকের হাইপার-মডার্ন সমাজে আমরা যে চরম নৈতিক সংকটে ভুগতেছি, তার সমাধান লুকাইয়া আছে গাজ্জালীর দর্শনেই। তিনি যখন আসছিলেন, তখন মুসলিম বিশ্বে গ্রিক দর্শনের ওভার-ডোজ চলছিল। সবাই সবকিছুকে অতিরিক্ত লজিক দিয়ে মেলাতে চাইছটেক গাজ্জালী  আইসা সেই ট্রেন্ড ভাঙলেন। তিনি পরিষ্কার করলেন- আকল বনাম ওহি, মানুষের বুদ্ধির একটা লিমিটেশন আছে। আমাদের পঞ্চেন্দ্রিয় বা লজিক আমাদের ধোঁকা দিতে পারে কিন্তু ওহি বা আল্লাহ-প্রদত্ত জ্ঞান কখনো ভুল করে না। জটিল লজিক দিয়া কখনো রিলিজিয়ন বা বিশ্বাসের কোর ফিলোসফি প্রমাণ করা যায় না। সাধারণ মানুষের সরল বিশ্বাসকে খটোমটো লজিকের বেড়াজালে আটকাইয়া ফেলার তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি।

ইউরোপীয়রা তাঁকে একজন বড় দার্শনিক হিসেবে ব্র্যান্ডিং করতে চাইলেও গাজ্জালী নিজে দর্শনের অন্ধ অনুসরণের ওপর বড় ধাক্কা দিছিলেন। তিনি মুসলিমদের গ্রিক লজিকের গোলকধাঁধা থেইকা বার কইরা আবার কুরআন-হাদিসের পিওর সোর্সে ফিরাইয়া আনছিলেন। আর এই কারণেই তাঁকে বলা হয় ‘হুজ্জাতুল ইসলাম’ বা ইসলামের অকাট্য দলিল।

সোর্সঃ

  1. Ihya Ulum al-Din (The Revival of the Religious Sciences) Translated by Fazlul Karim, Islamic Book Trust Kuala Lumpur 2015১। AL-GHAZALI’S
  2. TAHAFUT AL-FALASIFAH
    [INCOHERENCE OF THE PHILOSOPHERS]
    TRANSLATED INTO ENGLISH
    by SABIH AHMAD KAMALI
    1963
    PAKISTAN PHILOSOPHICAL CONGRESS
  3. ওয়েব দুনিয়া থেইকা পাওয়া ইমাম গাজ্জালী বিষয়ে বিভিন্ন রচনা

Leave a Reply