
আমরা এমন এক সময়ে বাস করতেছি, যখন ইতিহাসে সম্ভবত মানুষ নিজেকে এর আগে কখনো এতটা স্বাধীন বইলা ভাবে নাই। আধুনিকতার দীর্ঘ যাত্রা আমাদের শিখাইছে- মানুষ নিজেই নিজের কেন্দ্র, নিজের নৈতিকতার উৎস, নিজের পরিচয়ের নির্মাতা এবং নিজের ভাগ্যের একমাত্র স্থপতি। রাষ্ট্র, পরিবার, ধর্ম, ঐতিহ্য কিংবা সম্প্রদায়, যে কোনো বহিরাগত কর্তৃত্বের প্রতি সন্দেহই যেন আধুনিক মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিকতার প্রথম শর্ত।
‘নিজের মতো বাঁচো’, ‘নিজেকে অনুসরণ করো’, ‘তোমার সত্য তোমাকেই খুঁজে নিতে হবে’- এই ভাষ্যগুলি আজ শুধু জনপ্রিয় সংস্কৃতির স্লোগান নয়, এগুলি আধুনিক সভ্যতার নৈতিক গাইডলাইনে পরিণত হইছে। কিন্তু এই গাইডলাইন কি মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? মোটেই না।
আধুনিকতা আমাদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিছিল। কিন্তু সেই স্বাধীনতার যুগেই পৃথিবী প্রত্যক্ষ করছে উদ্বেগ, একাকীত্ব, পরিচয়-সংকট, বিষণ্নতা, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা ও জীবনের অর্থহীনতার এক অভূতপূর্ব বিস্তার। প্রযুক্তিগত উন্নতি যত বাড়ছে, মানুষের অভ্যন্তরীণ জগত ততই অস্থিতিশীল ও রিক্ত হয়া পড়ছে । মানুষ যেন ক্রমশ নিজের ভেতরেই অপরিচিত হয়া উঠছে। এইটা কেবল মনস্তাত্ত্বিক সংকট নয়, এইটা সামাজিক ও দার্শনিক সংকট। কারণ আধুনিকতার সবচেয়ে মৌলিক স্লোগান- মানুষ সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত (autonomous), এইটা বাস্তবতার সঙ্গে একদম মিলে না।
তাই প্রশ্ন আসে- মানুষ কি সত্যিই সম্পূর্ণ স্বাধীন? আমরা কি আমাদের জন্ম নির্বাচন করছি? আমাদের পরিবার, ভাষা, সংস্কৃতি, শরীর, জিন, আবেগ, মানসিক প্রবণতা কিংবা মৃত্যুর সময়? আমরা কি আমাদের সময় নির্বাচন করছি?আমরা কি সেই পৃথিবী নির্বাচন করছি যেখানে আমরা জন্ম নিছি? উত্তর প্রতিবারই একই— না।
অর্থাৎ মানুষ শুরু থেইকাই এক সম্পর্কিত (relational) ও নির্ভরশীল(dependent) সত্তা। সে নিজেকে সৃষ্টি করে নাই বরং সে নিজেই একটা প্রদত্ত বাস্তবতার অংশ। তার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা সীমিত। সে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত শূন্যে জন্ম নেয় না। ইতিহাস, জীববিজ্ঞান, পরিবার, ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও সমাজ- সবকিছু এক সাথে মানুষের ইচ্ছাকে গঠন করে।
তবু আধুনিক মানুষ নিজেকে ‘স্বাধীন’ বইলা দাবী করে! এখানেই আধুনিকতার সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিভ্রম। কারণ আজ মানুষকে আর দৃশ্যমান শাসক শাসন করে না। তাকে শাসন করে অদৃশ্য ব্যবস্থা।
অ্যালগরিদম তার মনোযোগ নির্ধারণ করে। বিজ্ঞাপন তার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার আত্মপরিচয় নির্মাণ করে। বাজার তার স্বপ্ন নির্ধারণ করে। ডোপামিন তার অভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করে। সে ভাবে সে নির্বাচন করছে, বাস্তবে তাকে নির্বাচন করানো হইতেছে।
ফরাসি দার্শনিক, ইতিহাসবিদ এবং সামাজিক তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault, ১৯২৬–১৯৮৪) তার বই ‘Discipline and Punish: The Birth of the Prison’ এ দেখাইছেন যে আধুনিক ক্ষমতা (modern power) কেবল রাষ্ট্র বা শাসকের দমনমূলক শক্তি নয়, এইটা শিক্ষা, চিকিৎসা, কারাগার, পরিবার এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মানুষের আচরণ, পরিচয় ও আত্ম-অনুশাসন (self-discipline) গইড়া তোলে।
পোলিশ সমাজ বিজ্ঞানি জিগমুন্ট বাউমান (Zygmunt Bauman, ১৯২৫–২০১৭)বলছিলেন ‘তরল আধুনিকতার’ (Liquid Modernity)-র কথা, যেখানে সম্পর্ক, পরিচয় এবং মূল্যবোধ সবই ক্ষণস্থায়ী।
দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মগ্রহণকারী জার্মান-ভিত্তিক দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক তাত্ত্বিক বাইয়ুং-চুল হান (Byung-Chul Han, জন্ম ১৯৫৯) বলছেন- আধুনিক মানুষ আর বাহ্যিক নিপীড়নের শিকার নয়, সে নিজেই নিজের শোষক। সে নিজেকেই অবিরাম উৎপাদন, প্রদর্শন এবং উন্নত করার চাপে ক্লান্ত করে তোলে।
অর্থাৎ আধুনিক মানুষ দাসত্ব থেকে মুক্ত হয় নাই। তার প্রভুর রূপ বদলাইছে মাত্র।
এই প্রেক্ষাপটে হাইপার-ইন্ডিভিজুয়ালিজম বা অতি ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানে ‘আমি’ ক্রমশ সবকিছুর কেন্দ্রে অবস্থান করে। ব্যক্তিগত ইচ্ছাই সত্য, ব্যক্তিগত অনুভূতিই নৈতিকতার মানদণ্ড, ব্যক্তিগত পছন্দই পরিচয়ের উৎস।
কিন্তু একটা সভ্যতা, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজেই নিজের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব, সেখানে কোনো যৌথ নৈতিক ভিত্তি দীর্ঘস্থায়ী হইতে পারে না। স্বাধীনতা যখন দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা থেইকা বিচ্ছিন্ন হয়, তখন তা আত্মবিনাশী হয়া ওঠে। কাঠামোহীন স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়।
প্রকৃতিও আমাদের এই শিক্ষা দেয়। প্রতিটি জীবন্ত ব্যবস্থা একটা ভারসাম্যের মধ্যে দাঁড়াইয়া আছে। শরীরের কোষ যদি নিয়ন্ত্রণ অস্বীকার করে, তখন ক্যান্সার সৃষ্টি হয়। নদী যদি তীর অস্বীকার করে, বন্যা হয়। সমাজ যদি নৈতিক সীমা অস্বীকার করে, তবে সম্পর্ক নষ্ট হয়া যায়। সভ্যতা যদি আত্মসংযম হারায়, তবে তা ভোগবাদের ভারে ক্লান্ত হয়া পড়ে।
ইসলাম এখানেই মানুষের প্রকৃতি, স্বাধীনতা এবং অস্তিত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।
আধুনিকতার মানব-ধারণার সঙ্গে ইসলামের পার্থক্যটি ঠিক এখানেই। আধুনিকতা মানুষকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, আত্মনির্ভর ও স্বায়ত্তশাসিত সত্তা হিসেবে কল্পনা করে। ইসলাম মানুষকে দেখে সম্পর্কিত, নির্ভরশীল ও নৈতিকভাবে জবাবদিহিসম্পন্ন এক সত্তা হিসেবে। অর্থাৎ ইসলাম কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এইটা মানুষ সম্পর্কে একটা ভিন্ন নৃতাত্ত্বিক ও অস্তিত্বতাত্ত্বিক (anthropological and ontological) দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে।
সাথে সাথে এইটাও মনে রাখতে হবে ইসলাম মানুষের কর্মক্ষমতা অস্বীকার করে না। মানুষ স্বাধীনভাবে তার কর্ম নির্বাচন করে, তাই সে জবাবদিহির অধিকারী। কিন্তু ইসলাম মানুষের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকে অস্বীকার করে।কারণ মানুষ কখনোই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, সে সর্বদাই নির্ভরশীল। এই নির্ভরশীলতা কোনো দুর্বলতা নয়, বরং অস্তিত্বের সত্য।
ইসলাম বলে, মানুষ যার কাছে আত্মসমর্পণ করে, ধীরে ধীরে সে তারই চরিত্র ধারণ করে। তুমি যদি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ না করো, তবে তুমি অন্য কারও কাছে আত্মসমর্পণ করবেই।
হইতে পারে নিজের নফসের কাছে। হইতে পারে ভোগবাদের কাছে। হইতে পারে বাজারের কাছে।হইতে পারে রাষ্ট্রের কাছে। হইতে পারে জাতীয়তাবাদের(আমাদের ক্ষেত্রে বাঙালি জাতীয়তাবাদ!) কাছে। হইতে পারে সামাজিক স্বীকৃতির কাছে। হইতে পারে ডিজিটাল অ্যালগরিদমের কাছে।
তাহলে এখানেই সেই কল্পনাকে শেষ করা যাক যে আপনি সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সার্বভৌম। বাস্তবতা হলো, সর্বোচ্চ আপনি সীমিত মাত্রার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা (agency) রাখেন, এবং আপনি বহু কিছুর ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু আধুনিক সমাজ আমাদের বলে ‘তুমি স্বাধীন। যা ইচ্ছা তাই হও, যা ইচ্ছা তাই করো।’ শুনতে সুন্দর লাগে কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
প্রশ্ন কখনোই এইটা না – মানুষ আত্মসমর্পণ করবে কি না? প্রশ্ন হইলো- সে কিসের কাছে, কার কছে আত্মসমর্পণ করবে? আধুনিকতা মনে করে আত্মসমর্পণ স্বাধীনতার বিপরীত। ইসলাম বলে, সঠিক আত্মসমর্পণই প্রকৃত স্বাধীনতার সূচনা। কারণ যে মানুষ আল্লাহর দাস, সে আর অর্থের দাস নয়, জনমতের দাস নয়, ক্ষমতার দাস নয়, নিজের নফসেরও দাস নয়। সে কোনো সভ্যতা, জাতীয়তা, ভাষা ও সংস্কতির দাস নয়।
আজকের সংকট তাই মূলত রাজনৈতিক নয়, আধ্যাত্মিকও নয় কেবল। এটি মানুষের আত্মপরিচয়ের সংকট।
আমরা এমন এক যুগে বাস করতেছি, যেখানে মানুষ সবকিছুর সঙ্গে সংযুক্ত, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের কেন্দ্র থেইকা বিচ্ছিন্ন। সে সবকিছু জানে, কিন্তু জানে না- সে কে। সবকিছু দেখতে পায়, কিন্তু নিজের ভেতর দেখতে পারে না। সবকিছু অর্জনের স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সে কেন বাঁচবে- তার উত্তর ক্রমশ হারাইয়া ফেলছে।
স্বাধীনতা মানে সীমাহীন ইচ্ছার অনুসরণ নয়। স্বাধীনতা মানে সত্যকে বাইছা নেওয়ার সক্ষমতা। স্বাধীনতা মানে প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া। স্বাধীনতা মানে এমন নৈতিক কাঠামো গ্রহণ করা, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে স্থিতিশীল করে।
কাঠামোহীন স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত বিশৃঙ্খলায় পরিণত হয়। আর জবাবদিহিহীন স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার নতুন রূপ সৃষ্টি করে। সুতরাং আমাদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রাজনৈতিক নয়, দার্শনিক; সামাজিক নয়, অস্তিত্বগত।
তাই প্রশ্ন আসে – আমি কি স্বাধীন? সম্ভবত উত্তর হইলো- আমি সীমিতভাবে স্বাধীন। কিন্তু আরও বড় প্রশ্নটি হইলো- আমি কিসের কাছে আত্মসমর্পণ করতেছি?
মানুষ শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিরই প্রতিচ্ছবি হয়া ওঠে, যার কাছে সে নিজের হৃদয় সমর্পণ করে। আর ইসলামের দাবি হইলো, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে না, বরং সকল মিথ্যা প্রভুর দাসত্ব থেইকা মুক্ত করে তাকে তার প্রকৃত মানবিক মর্যাদায় ফিরাইয়া আনে।
সম্ভবত, আধুনিকতার সবচেয়ে বড় সংকট স্বাধীনতার অভাব নয়। বরং স্বাধীনতার অর্থ সম্পর্কে আমাদের গভীর ভুল বোঝাবুঝি।
রেফারেন্সঃ
Foucault, M. (1975). Discipline and Punish: The Birth of the Prison. New York: Pantheon Books.
Bauman, Z. (2000). Liquid Modernity. Cambridge: Polity Press.
Han, B.-C. (2017). Psychopolitics: Neoliberalism and New Technologies of Power. Verso.
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা, সমকালীন দার্শনিকদের রচনা এবং উন্মুক্ত অনলাইন উৎস।