সরলতা ও অন্যান্য কবিতা

আমার পঞ্চম কবিতার বই ‘শাদা সন্ত মেঘদল’ বার হইছিল বইমেলা ২০১১ সালে। প্রকাশক ছিলেন সরকার আশরাফ, সম্পাদক, নিসর্গ। কবিতাগুলি ২০১০ সালের দিকে লেখা। বিদেশে আসছি প্রায় একযুগ হয়ে গেল কিন্তু দেশের বন্ধন থেকে মুক্ত হইতে পারতেছি না। দেশের জন্য কী যেন একটা মায়া, ভালোবাসা সারাক্ষণ মনে, প্রাণে জড়িয়ে থাকত। কলেজ থেকে ফেরার পথে হারিয়ে যাওয়া সময়গুলো নিয়ে ভাবতাম। সাথে ছিল পথের কিনারের গাছ গাছালি, মাথার ওপরে ছড়ানো বিশাল আকাশ। বিদেশের প্রকৃতিকে বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করতাম। আর একটা ব্যাপার গোপনে ঘটছিল। বাসায় ফেরার পথে বিশাল এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা একটা চার্চের সামনে গাড়ি থামিয়ে ভেতরের শান্ত, বিস্ময়কর সবুজ ঘাস, আকাসিয়া, ইউকিলিপটাস, ওয়ারাথা গাছের দিকে তাকাইয়া থাকতাম। এইগুলি আমাকে একটা অদ্ভূত আবেশে ঘুম পাড়িয়ে দিত যেন। এর মধ্যে এখানকার কূল কিনারাহীন উত্তাল সমুদ্র, ঢেউ খেলানো উপত্যকা, সাদা বালির বিচ, সাই সাই হাইওয়ে তো দেখা হয়ে গেছিল। তখন মনের ভেতর অস্ফুট সুরে কে যেন কথা বলে উঠত। সে কি কবিতার কোনো বীজ, না-জন্মানো শিশু? সে চিৎকার করে উঠত না, একটা মৃদু আলোড়ন দিয়ে সে তার অস্তিত্বের জানান দিত। বলত – এই যে আমি আছি, আমি তোমার নতুন পৃথিবী, তার সুন্দর, তার বিশাল বিস্ময় নিয়ে তোমার চোখের সামনে আছি, না ঠিক চোখের সামনে না, বুকের গহীনে। তাই সেই সময়ের ভাষা নিজেকে নতুন করে পাওয়ার ভাষাই যেন হয়ে উঠল। নিজেকে নতুনের মধ্যে পাওয়া, কিন্তু পুরাতনকে নিয়েই তার সম্ভাবনাগুলি সৃষ্টি হতে লাগল। কবিতা ঠিক যা দেখছি, যা সামনে প্রকাশিত, সেই সত্যকে ধারণ করে না হয়ত, কিন্তু যা ধারণ করে তা সত্যের সুন্দরকে, ক্ষণস্থায়ী মুহুর্তগুলিকে এক নতুন চিরকালীনরূপে, নতুন ভাষায় জাগিয়ে তোলে। আমার এই কাব্যগ্রন্থটি সেই সবের সাক্ষী হয়ে থাকলো।

৩১/০৫/২০২২

 

স র ল তা

সরলতা ধরে রাখি

প্রিয় আম গাছ তুমি আমার আত্মীয়।

এই শিকারমুখর জনসভায় তোমার যদি ছায়া পাই

যেমন সতত আম্রবীথিকায়।

পরিহারপ্রবণতা মুদ্রা হয়ে আসে, তবু ভালো লাগে

তবু মানুষের ভালোবাসা চাই।

দূর থেকে কী সব পাঠাও-

বিষখালি মাঠঘরে শত্রু, রাইফেল

কবুতর হানটিঙ- এসব সমাধি বিহ্বলতা

পথে পথে শিকারি যেমন।

একটি যে আগুন তারও ফুলশিখা এই বিভোর বাতাসে।

সরলতা মনপ্রাণ দিয়ে, আগর জ্বালিয়ে অপেক্ষায় থাকি-

তুমি মাংস ব্যবসায়ীর পালঙ্ক থেকে ছুটে এসে

আমাকে বিবাহ করো।

কণ্ঠভরা সীতাহার, সিনেমা শো – সবকিছু নোনসেন্স

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ধারণা যেমন।

*

ম ল্লি মু ক বী চে র কা ছে

সীতা হরণের কাল শেষ এইখানে।

নদীমাতৃক বাতাস শীর্ষ আহরণে আকাশের

দোল খাওয়া নৌকা।

সমুদ্র বাঘের মতো উঠে পড়ছে দুদিকে।

যূপকাষ্ঠ অপহৃত মেঘস্নাত রৌদ্র ভূমিকায়

আর আমাদের চলাকাল যুদ্ধহীন চোখবোঁজা

জলকাতর স্বদেশ, মহাদেশে।

কলহপ্রবণ জ্ঞান, গীতিকথা আজ বাদই দিলাম।

শুধু পাতাপতনের শব্দ শুনে টের পাই

পাশে গাঙচিল, মাছের সন্তান।

কীরকম নীল জামা নীল পেয়ে যায় এইসব জল

না দেখলে বোঝাই যায় না!

যেন ছোটবেলার রঙিন ঘুড়ি উড়ে উড়ে

আমাদের গ্রামে আলপথে।

গ্রামবাঙলার গণঅনুষ্ঠান-

লোককাহিনীর দরবারে দাও

এই মাতৃপ্রতিম সমুদ্রঘর।

আমি হাত দিয়ে ছুঁবার বাসনা করে

অবসরে ঘুমিয়ে পড়েছি। হায়!

*

ভি উ

সারি সারি আপেল বাগানে নিরাশার দোলা,

আর হাতে ধরা লালবল পাজামার কাছে শিশু

গ্রামাঞ্চল কানামাছি খেলা।

ফুটে আছে যে আপেল তার পরিপক্ব দেহের

লাবণ্যে ক্রমাগত ভোরবেলা।

আহা লাল রঙের আপেলগুলো

দূরে মেয়েদের গোল চাঁদে গোপনে ভাসছে

পাশে নিমজ্জিত ঘাসে একলা কবরখানা।

আমরা মাঠের কাছে অপেক্ষায় আছি,

বাসে করে পৌঁছে যাব বাড়ি

লাল নীল জামা-পরা ছেলেমেয়ে,

কীভাবে ব্যাকুল- চন্দ্র আর সূর্যগ্রহণে

কবে আসে বাস

কবে আসে ঘুমঘুম অজগর হাইওয়ে।

একদিন আপেলে ঢুকবে পোকা

একদিন সাদাকালো হয়ে যাবে লালরঙ জামা।

পিতামহ আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছো

আপেলের জন্য আসা আর আপেলের জন্য যাওয়া।

তাই সারি সারি আপেল বাগান

পাশে নিমজ্জিত ঘাসে একলা কবরখানা ।

*

যু দ্ধ ক্ষে ত্র

ফেলে গেছ রক্তকম্বলে

পাশে কাঁটাতারের সীমানা

তোমাকে অধিকার অথবা হরণ করি কোন সাহসে !

ভূমিদখলের অভিশাপ নিয়েছি মাথায়

কাছে আসে দূরে যায় শত্রুছাউনি

আশেপাশে জাতিপ্রথা কামুফ্লাজ রীতি

সেহেতু অতিসাবধানতা

সদা মন বাঘ বাঘদাস ।

দেশ অপহরণের মন্ত্র জপি

ট্রেঞ্চের পাশে বন্ধু রাইফেল

উড়ে যায় বোমারু বিমান গুলি খাওয়া পাখি।

কখন শেষ হয় এই ধর্মযুদ্ধ

কখন সরে যায়

হামজার বুক থেকে আবু সুফিয়ানের বল্লম।

কখন ঘণ্টা বাজে স্কুলে

কাঁটাতারের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন আম্মা

কবর খোঁড়া শেষ হলে-

শাদা পতাকা উত্তোলন।

*

অ ভি বা স ন

ধূ ধূ দেশ বদলের দায়

কার কাছে খবর দিই

কাকে সৎমনোরূপে অভিযোগ করি।

শুধু জলপাংশু যোগাযোগ রেখা

আর হতবাক নিবন্ধকরণ।

পথে পথে নিম্নরূপ ছদ্মবেশ

ঘটে ঋষিবেশ অপরিচিতিকরণ

প্রজা জনসভায়।

আহা বিদেশি বাতাস

আর এক ভূভাগের আকাশ!

আর ভালোবাসা দূরে থাকে।

ঘুম আর ভ্রমণের কালে

পড়ে যাওয়া নৌকা কোন সমুদ্রে নামে।

*

একো রি য়া ম ০ ২

মাথার উপর দিয়ে ভেসে আসা হাঙর আমাকে কামড়াবে না।

হাত দিয়ে ধরার চেষ্টা করি- হা করে তাকিয়ে আছে শিলালিপি

দাঁতের নিবিড় কারুকাজ।

জলদেশে ঘুমিয়ে থাকা সমুদ্রঘাস

ফুটে ওঠা নিঝুম বনপাতার দোলাচল- গ্রামবাঙলা।

আমি নিশ্চিত- কলহপ্রবণতা শেষ জলদালানের কাছে

তারামাছের আনন্দগান দোল খায়

তেড়ে আসা হাঙরের নিশানায়।

হারিয়ে যাওয়া মাছের ভবিষ্যৎ কতো নিরাপদ

আহার করছে আর সাঁতার কাটছে

তোমার শরীর আমার কাছে- পুঁটি না মাগুর!

জলবাস চাই জলনীরবতা

নিরর্থ বাণিজ্যভাষা- ঘুমিয়ে থাকা কচ্ছপের কাছে।

*

ভো ক্লু জ সি মে ট্রি র কা ছে

কবরখানার কাছে বেঁচে থাকার কবিতা!

শীতসকালের বায়ু শিশুনিদ্রা সরলতা।

নিচে সাগর উছলে পড়া ঠাণ্ডাহিমজল-

মানুষের কাছাকাছি আসা ভূত-ভবিষ্যৎ।

আমার পয়সা গ্রহণের কথা মনেও থাকে না

শুধু বেহালা বাজানোর জাগতিক ইচ্ছা-

সনাতন ঘাসে বাতাসের আনন্দে।

আহারপ্রবণ মানুষেরা দৌড়ে দিয়ে

মেদ ফেলে দিচ্ছে- আগুনের তাপে।

সারি সারি যীশুগাছ, সিমেন্ট সাজানো রাস্তা

মনেই হয় না ওরা একদিন শান্তি পাবে

কবরের বন্ধুদের মতো ।

ভালোবাসা স্নেহশব্দ কেমন মাথার কাছে

মৃদু লাইটের মতোন জ্বলছে;

আর পাথরে খোদাই এপিটাফ মনে করিয়ে দিচ্ছে-

জল কারবারীর ব্যবসা কোনোদিন অমর হয় না।

*

যী শু র ম ন

সহজ শ্রমণমন ধরে আছে স্বর্গকামী ভক্ত

গোলাপের চাষে কোনো ক্লান্তি নেই।

দরোজা সরিয়ে দেখা যায় লাল নীল পাখি

ডানা ঝাড়ে, স্বরলিপি।

আকাসিয়া গাছতলে খুদ বাটি জল

ঘাসে ঘাসে স্নেহপ্রদান মাতৃময়।

আহা! শিশু অবস্থায় মানুষের মন

মাঠে মাঠে ধুপছায়া উড়ন্ত ঈশ্বর।

অতি শাদা দেয়াল পেরিয়ে দেখা যায় মাননীয় যীশু

লটকে রয়েছে ক্রসে, কাটা দুম্বা-ভঙ্গিমায়। মৃত অনাবৃত।

নিচু মুখ, মাথা থেকে রক্ত, দেহে ভালোবাসা অত্যাচার

রক্ত দিয়ে ধুয়ে দেবে মানুষের পাপ নিরাশা সকল!

আমি ঘরে ফেরার সমন নিয়ে আসি-

পথ ফেলে যেতে হবে দূরে- কোনদিকে যায় বাদামবিক্রেতা

ছেলেমেয়েদের হাতে লালবল, স্কুলখাতা,

পথে পথে শত্রুবদলের চিহ্ন ঘোড়া আর তরবারি।

দেয়ালের পাশে যীশুঘর। সাজানো গোছানো বাড়ি

দেখে মনেই হয় না কোনোদিন কেউ উপত্যকা হেঁটে হেঁটে

চোখ ভালো করে দিতো অন্ধদের

আর পথ চেয়ে থাকতো জননী মরিয়ম মেরী।

*

ফ লে র দো কা নে

ফলের দোকানে এসে এই পরিত্রাণ

এই রূপগন্ধ ভালোবাসা, ভুলে যাই প্রতিহিংসা

সবাই আমার ভাই, সবাই বুকের কাছাকাছি

শুধু ফলপড়া নিঝুম প্রভাত গাছে গাছে পাখি

পাতা পতনের দৃশ্য মিহি ঘাসকারুকাজ ।

শরীরে ধরছে যে লাবণ্য তার স্বাদ, মানুষের অভিলাষ

বসে থাকা শালিকের বুকে গুলি মারছে শিকারি

রক্ত বেয়ে পড়ে আম গাছে পাতার সবুজে

ফল আহারীর মৃত্যু ছলাকলা প্রতি ফলবাসে।

ঝুঁকে পড়া পেয়ারার দিকে তাকালেই মন একটা আকাশ

মেঘনাব্রিজের নিচে হাত ধরাধরি করে মাছ ধরি

কোনো মাছই আসলে উঠছে না এমন নিরর্থ আহ্লাদ

ফলের দোকান ঘেঁষে নদী বানানোর চেষ্টা, অপরাধ।

ফল কারবারি – থোকা থোকা আঙুর ঝুলিয়ে রাখে সাধনায়

আর শিশু গ্রহণের কথা সত্য হয় শীতে

মশারীর নিচে গণযোগাযোগ ফলন্ত কপিলা।

কাছে আসে নিচে যায়

মন-সরোবর কৃষিকাজ সকালের হাওয়ায়।

*

খু ন

একটা কাক আর একটাকে কীভাবে মারে

আর কবর দেয় পাথরের নিচে?

আর আমার ঈর্ষা কাছাকাছি আসে।

রূপ হয়ে বোন সেজে আমাকে ডাকে

দিই জ্বেলে দাবানল ঘাসের মর্মরে

আদমের পরিবারে।

ভাই হাবেল তুমি প্রিতৃপ্রেম চুরি করো

আর আমি দ্বিধাবিভক্ত, বঞ্চিত

যতটুকু পারি ঘৃণা করি

আমার কোরবানি উপেক্ষিত।

যে ঋণ গ্রহণ করি ভালোবাসা প্রতিশোধে

তাই ভার; কাঁধের ভূভাগে পাথরের ভার ।

তুমি নাও আমি নিই।

বাকীটুকু প্রায়শ্চিত্ত আসমান থেকে নামে

আর লেখা থাকে গরুর খামার ফসলের মাঠে।

 

 

 

Leave a Reply