আল-গাজ্জালির ‘তাহাফুত আল-ফালাসিফা’ নিয়া নোটস

১০৯৫ সালে লিখিত ইমাম আল-গাজ্জালির তাহাফুত আল-ফালাসিফা– Incoherences Of philosophers (দার্শনিকদের অসংলগ্নতা) ইসলামি দর্শন তথা বিশ্ব দর্শনের ইতিহাসে একটি বৈপ্লবিক গ্রন্থ। এই বইটিতে তিনি তৎকালীন গ্রিক দর্শন প্রভাবিত মুসলিম দার্শনিকদের(বিশেষ কইরা ইবনে সিনা ও আল ফারাবি) ২০টি প্রধান দাবিকে যুক্তি দিয়া, সিস্টেমেটিকভাবে খণ্ডন করছেন। ভাবতে অবাক লাগে ১১ শতকে( ১০০০ বছর আগে) এক মেধাবী তরুণ, শিক্ষক কিভাবে নিজে গ্রিক লজিক, গণিত, কসমোলজি(বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্ব), দর্শন ইত্যাদি পরিশ্রম কইরা পইড়া আবার তাদের অসংলগ্নতার বিরুদ্ধে কলম ধরলেন! এ এক যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ কী? কারণ হইল তার আগের বিজ্ঞানি ও বুদ্ধিজীবী ইবনে সিনা গ্রীক ফিলোসফারদের(প্লেটো ও এরিস্টটল) দর্শন পইড়া ইসলামিক মূল বিশ্বাস যেমন তাওহিদ(আল্লাহর একত্ব), আল্লাহর Omnipotence -সর্বশক্তিমত্তা ও Omniscience– সর্বজ্ঞতা, আখিরাত বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছিলো। এরিস্টটল বিশ্বসৃষ্টিতত্ত্ব, মহাবিশ্ব, আত্মা ও ফাইনাল জাজমেন্ট নিয়া যে স্পেকুলেশন করছে্ন, ইবনে সিনা যাচাই বাছাই না কইরা তার বইগুলিতে(কিতাবুন নাজাত ) তাই গ্রহণ করছেন এবং ইন্ডাইরেক্টলি তা চর্চা করার জন্য আহবান করছেন। কিন্তু গাজ্জালি বলছেন ‘খামোশ ইবনে সিনা, আমার কথা আছে।’

মনে রাখা দরকার গাজ্জালি দর্শনের বিরোধীতা করেন নাই। তিনি দর্শন ও এস্ট্রোনমি পছন্দ করতেন। তিনি গ্রিক দর্শন প্রভাবিত ইবনে সিনার দর্শন থোরোলি আগে পইড়া নিছেন, তারপর এর বিভ্রান্তি ও অসংলগ্নতার বিরুদ্ধে কথা বলছেন। গাজ্জালির আগে মুসলিম বিশ্বে এরিস্টটল এবং প্লেটোর দর্শনকে প্রায় অকাট্য মনে করা হইতো। আল-ফারাবি এবং ইবনে সিনার মতো দার্শনিকরা মনে করতেন, ধর্ম আর গ্রিক দর্শন আসলে একই সত্যের ভিন্ন রূপ! গাজ্জালি দেখাইলেন যে, গ্রিক দর্শন সবক্ষেত্রে নির্ভুল নয় এবং অনেক জায়গায় তা স্ববিরোধী। তার এই বইরের পরে মুসলিম বিশ্বে গ্রিক দর্শনের যে অন্ধ আনুগত্য ছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরে। তারা প্লেটো ও এরিস্টটল পড়ল কিন্তু ফিলোসফি আর ইসলামিক থিউলোজি এক কইরা, কোনো বাউণ্ডারি রাখে নাই। গাজ্জালি বললেন একটা বাউণ্ডারি রাখতে হইব, যদি তা নাহয় তাইলে নাস্তিক বা অবিশ্বাসি হওয়ার সুযোগ আছে। বইটা পড়লে বোঝা যায় তার সময়ের মুসলিম বিশ্বের গ্রিক দর্শন কেন্দ্রিক পঠন পঠনের কারণে যে সন্দেহের যাত্রা শুরু হইছিল তা দেইখা তার অন্তরে রক্ত ঝরছিল, মন বিদ্রোহে চিৎকার করতেছিল। আল গাজ্জালি এক বিস্ময়কর প্রতিভা! তারে না পড়লে তা বোঝা যায় না। আহা এখন পর্যন্ত কত কত বই পড়লাম, শেক্সপিয়ার পড়লাম, বাইরণ,কীটস, হেগেল, কান্ট, মাক্স, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ পড়লাম, আফসোস গাজ্জালি পড়লাম না। এই রকম বোদ্ধিক, জ্ঞানগর্ভ, সৎ, পরিশ্রমী ও সিস্টেমাটিক যুক্তিনির্ভর বই লেখার জন্য আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসি করুন।

‘তাহাফুত আল-ফালাসিফা’ (Tahafut al-Falasifa) কেবল একটি বই নয়, বরং এইটা ইসলামি চিন্তাধারার ইতিহাসে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। এই বইটির প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, এটি মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্র চিরতরে বদলে দিছিল। গাজ্জালির মূল লক্ষ্য ছিল এইটা প্রমাণ করা যে, এই দার্শনিকরা যে যুক্তির (Logic) বড়াই করেন, তাদের আধিভৌতিক (Metaphysics) তত্ত্বগুলি আসলে সেই যুক্তির কষ্টিপাথরেই টিকে না।গাজ্জালির আগে ধর্মতত্ত্ববিদরা (Mutakallimun) দার্শনিকদের সাথে তর্কে প্রায়ই পিছিয়ে পড়তেন কারণ তাদের কাছে দার্শনিকদের মতো শক্তিশালী যুক্তি ছিল না। গাজ্জালি প্রথম দেখাইলেন যে, দর্শনকে পরাজিত করতে হলে দর্শনের অস্ত্রই ব্যবহার করতে হইবো। তিনি যুক্তিশাস্ত্র বা Logic-কে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে বৈধতা দেন। এর ফলে পরবর্তীকালের ইসলামি পণ্ডিতরা দর্শনের যুক্তি ব্যবহার কইরাই ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের শক্তি অর্জন করেন। এই বইয়ের মাধ্যমে গাজ্জালি প্রমাণ করেন যে, শুধু ‘আকল’ বা বুদ্ধি দিয়া স্রষ্টাকে পুরোপুরি চেনা সম্ভব নয়। বুদ্ধির একটা নির্দিষ্ট সীমা আছে। তিনি মানুষকে যুক্তিনির্ভর দর্শনের চেয়ে ‘কাশফ’ (আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি) এবং সুফিবাদের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। গাজ্জালির এই কাজের ফলেই সুফিবাদ বা তাসাউফ ইসলামি মূলধারার একটি স্বীকৃত এবং সম্মানিত অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।


বইটির মূল বিষয়গুলি নিয়া নোটসঃ

১. মহাবিশ্বের শুরু বনাম অনাদিত্ব (Cosmology)

এটি ছিল সময়ের অস্তিত্ব নিয়ে লড়াই।

দার্শনিকদের দাবি: মহাবিশ্ব অনাদি (Eternal)। তাদের যুক্তি ছিল, যদি মহাবিশ্বের একটি শুরু থাকে, তবে প্রশ্ন উঠবে—আল্লাহ কেন একটি নির্দিষ্ট সময়েই এটি সৃষ্টি করলেন? এর আগে কেন নয়? যেহেতু আল্লাহর কোনো অভাব নেই, তাই তাঁর সৃষ্টিও অনাদিকাল থেকে তাঁর সাথে থাকা উচিত (যেমন সূর্য থাকলে তার আলোও থাকে)।

গাজ্জালির যুক্তি: গাজ্জালি বলেন, মহাবিশ্ব সময়ের ভেতরে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি একটি যৌক্তিক ধাঁধা ব্যবহার করেন: যদি মহাবিশ্ব অনাদি হয়, তবে বর্তমান সময়ে পৌঁছাতে আমাদের একটি “অসীম” সময় পার করতে হতো। কিন্তু অসীম পথ কখনো শেষ হয় না, তাই আমরা আজ এখানে থাকতে পারতাম না। তিনি বলেন, আল্লাহর ‘ইচ্ছা’ (Will) অনাদি হতে পারে, কিন্তু সেই ইচ্ছা একটি নির্দিষ্ট ‘সময়ে’ কার্যকর হতে বাধা নেই।

নব্য-প্লেটোবাদ (Neoplatonism) এবং অ্যারিস্টটলবাদ (Aristotelianism) আল ফারাবী ও ইবনে সিনার মগজ ভালো কইরাই গ্রাস করছিল। এই দুইটা কীঃ এই দুইটা হইলো প্রাচীন গ্রিক দর্শনের দুইটা প্রধান এবং প্রায়শই পরস্পর সংযুক্ত ধারা। ৩য় শতাব্দীতে শুরু হওয়া নব্য-প্লেটোবাদ মূলত প্লেটোর অধিবিদ্যার (metaphysics) সাথে অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা ও নীতিশাস্ত্রের এক সমন্বয় ঘটায়। অ্যারিস্টটল যেখানে দৃশ্যমান জগতের অভিজ্ঞতামূলক অধ্যয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করছিলেন, সেখানে নব্য-প্লেটোবাদীরা এই দুই দর্শনের মধ্যে একটি মিল খুঁজে পাইতে বিশ্বাসী ছিলেন। তারা প্রাকৃতিক জগতকে বোঝার জন্য অ্যারিস্টটলকে পথপ্রদর্শক হিসেবে ব্যবহার করতেন, তবে বুদ্ধিগ্রাহ্য এবং ঐশ্বরিক জগতের ক্ষেত্রে প্লেটোকে প্রাধান্য দিতেন।

নিউপ্লাটোনিক( প্লেটোর অনুসারি- প্লটিনাস ও অন্যান্য দার্শনিকগণ, ৩য় শতক এ.ডি) ও অ্যারিস্টটলবাদ (Aristotelianism) এর অনুসারি দার্শনিকেরা(ইবনে সিনা ও আলা ফারাবি) দাবি করতেন যে, এই জগত বা মহাবিশ্ব অনাদি (Eternal) অর্থাৎ, এর কোনো শুরু নাই। এইটা সবসময় ছিল ও থাকবে। তাদের যুক্তি ছিল—আল্লাহ যদি অনাদি হন, তবে তাঁর সৃজনী শক্তিও অনাদি, তাই সৃষ্টিও অনাদি হতে বাধ্য। সোজা কথা তারা বলেন- এই বিশ্ব জগত একটা নির্দিষ্ট সময়ে আল্লাহ সষ্টি করেন নাই এবং যেহেতু এইটা ইটারনাল বা অনাদি তাই এর কোনো শুরু ও শেষ নাই। গাজ্জালি একে অসার ও মহা অযৌক্তিক কথা বল্লেন। গাজ্জালি বললেন মহাবিশ্ব যে অনাদি এইটা দার্শনিকেরা প্রমাণ করতে পারেন নাই, এইটা তাদের একটা অনুমান, যেইটা এরিস্টটল থেইকা আসছে। তিনি দর্শনের যুক্তি দিয়া দেখাইয়া দিলেন, আল্লাহ হইলো সষ্টিকর্তা, আল্লাহর ‘ইচ্ছা’ (Divine Will) আছে। তিনি অনাদিকাল থেইকাই সিদ্ধান্ত নিয়া রাখছিলেন যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তিনি জগত সৃষ্টি করবেন। যখন তিনি মনে করছেন তখনি মহা বিশ্ব সৃষ্টি করছেন। সময়েরও শুরু আছে এবং আল্লাহ সময়েরও ঊর্ধ্বে। আর আল্লাহর যখন ইচ্ছা হইবো, তখনি এই বিশ্ব ধংস হইয়া যাইবো। আল গাজ্জালি মনে করেন যেই দার্শনিকেরা( ইবনে সিনা ও ফারাবী) মহাবিশ্ব অনাদি তত্ত্বে বিশ্বাস করে, বিশ্বাস করে যে মহা বিশ্বের শুরু নাই, কিন্তু আল্লাহ যে একটা নির্দিষ্ট সময়ে মহা বিশ্ব সষ্টি করছেন- তা বিশ্বাস করে না, তারা আদতে কুফর(disbelief) করছেন।

পরের পয়েন্ট হইতেছে আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্ব নিয়া যুক্তি ও খণ্ডনঃ

দার্শনিকেরা আল্লাহকে সষ্টিকর্তা হিসাবে মানে ঠিকই, তারা নাস্তিক না। কিন্তু গাজ্জালি মনে করেন তাদের এই বিশ্বাস রক সলিড কিছু না। ইবনে সিনা ও আল ফারাবি আল্লাহর Necessary Existent (অনিবার্য অস্তিত্ব) এর ওপর তাদের তর্ক তুলে ধরেন। Necessary Existent বা অনিবার্য অস্তিত্ব বলতে এমন এক সত্তাকে বোঝায়, যার অস্তিত্ব থাকাটা বাধ্যতামূলক বা অনিবার্য। অর্থাৎ, তিনি বা এটি এমন এক সত্তা যা না থেকে পারেই না এবং যার কোনো শুরু বা শেষ নেই। ইবনে সিনা বা আল-ফারাবির দর্শন এবং পশ্চিমা অধিবিদ্যায় (Metaphysics) এই ধারণাটি বহুল ব্যবহৃত। ইবনে সিনা এটিকে আরবিতে ওয়াজিবুল উজুদ (Wajib al-Wujud) বলে আখ্যায়িত করেছেন। মহাবিশ্বের সবকিছুই যেহেতু সম্ভবপর অস্তিত্ব, তাই এর পেছনে একজন অনাদি, অকারিত ‘অনিবার্য অস্তিত্ব’ বা সৃষ্টিকর্তা (ওয়াজিবুল উজুদ) থাকা যৌক্তিকভাবে আবশ্যক। এটি গাজ্জালীও মানতেন। তবে গাজ্জালী আপত্তি তোলেন ইবনে সিনার ‘অনিবার্য অস্তিত্ব’-এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যের ওপর। তিনি যুক্তি দেন যে, ইবনে সিনা আল্লাহকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, তাতে আল্লাহর ঐশ্বরিক গুণাবলী, পরম ক্ষমতা এবং স্বাধীন ইচ্ছা সম্পূর্ণ লোপ পায়। ইবনে সিনার আল্লাহ এক প্রকার নিষ্ক্রিয় এবং যান্ত্রিক সত্তায় পরিণত হন। গাজ্জালি বলেন আল্লাহর অস্তিত্ব ওহী ও যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণিত, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, স্বয়ংভু ও স্বাধীন সত্তা। গাজ্জালি এইসব ইসলামি দার্শনিকদের উদ্দেশ্য করে বলছেন- আমাদেরকে গ্রিক দার্শনিকদের ওপর পুরাপুরি ভরসা কইরা বা তাদের অনুমতি নিয়া আল্লাহর অস্তিত্ব ও একত্বে বিশ্বাস করার প্রয়োজন নাই। কারণ এই বিষয়ে তাদের রক সলিড কোনো প্রমাণ নাই। কিন্তু আমাদের প্রমাণ -আমাদের এশী গ্রন্থ কোরান।

ইবনে সিনারা, এরিস্টটলের Prime Mover (আদি চালক) dharNa ধইরা বলে আল্লাহ হইতেছে সরল, চূড়ান্ত সত্তা, তার পরম সত্তা ছাড়া কোনো গুণাবলি নাই। আল গাজ্জালি বলতেছে – অবশ্যই আল্লাহর গুণাবলি আছে যেমন আল্লাহ মহা জ্ঞানি, সর্বশক্তিমান, সর্বদ্রষ্টা, পরম দয়ালু ইত্যাদি। ইবনে সিনারা আরো বলে যে আল্লাহকে যদি বিভিন্ন গুণে ধরা হয়, তাইলে তার অনেকগুলি ভাগ হয়া যাইবো(আস্ততাগফিরুল্লাহ)। ইবনে সিনার পরম সত্তা বেশ দূরের, বিমূর্ত একটা ধারণা। গাজ্জালি মনে করেন ইবনে সিনার এই রকম ধারনা গ্রিক দার্শনিকদের Necessary Existent থাইকা না, এইটা তার চয়েস।

২. আল্লাহর জ্ঞান: সামান্য বনাম বিশেষ (Epistemology)

এটি ছিল স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টিকে কতটা চেনেন বা জানেন তা নিয়ে লড়াই।

দার্শনিকদের দাবি: আল্লাহ কেবল ‘সামান্য’ বা মহাজাগতিক নিয়মগুলো (Universals) জানেন। যেমন: তিনি জানেন মানুষ মরণশীল বা আগুন পোড়ায়। কিন্তু তিনি ‘বিশেষ’ বা ব্যক্তিগত ঘটনাগুলো (Particulars) জানেন না (যেমন—কে কখন কাঁদছে বা কার মৃত্যু হচ্ছে)। তাদের যুক্তি ছিল, পরিবর্তনশীল তুচ্ছ বিষয় জানলে আল্লাহর অপরিবর্তনীয় স্বত্তায় পরিবর্তন আসবে।

গাজ্জালির যুক্তি: গাজ্জালি একে সরাসরি কুফর বলেন। তিনি যুক্তি দেন যে, জ্ঞান এবং জানা বিষয়ের পরিবর্তন এক নয়। আমি যদি জানি সূর্য উঠেছে এবং পরে জানি সূর্য ডুবেছে, তবে আমার জ্ঞানের তথ্য বদলাচ্ছে, আমার সত্তা নয়। তিনি বলেন, স্রষ্টা যদি তাঁর প্রতিটি মাখলুক বা সৃষ্টির অবস্থা না জানেন, তবে তিনি ‘সর্বজ্ঞ’ হতে পারেন না এবং তাঁর প্রতি ইবাদত অর্থহীন হয়ে পড়ে।

৩. দৈহিক পুনরুত্থান (Bodily Resurrection)

দার্শনিকদের দাবি: দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন যে, মৃত্যুর পর কেবল আত্মার মুক্তি ঘটে। জান্নাত বা জাহান্নামের শারীরিক বর্ণনাগুলো তাদের কাছে ছিল রূপক (Metaphor), যা সাধারণ মানুষকে সৎ পথে রাখার জন্য বলা হয়েছে। তারা মনে করতেন শরীর পচে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসা অসম্ভব।

গাজ্জালির যুক্তি: গাজ্জালি বলেন, আল্লাহ যেহেতু শূন্য থেকে একবার সৃষ্টি করতে পেরেছেন, তাই দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা তাঁর জন্য আরও সহজ। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী শেষ বিচারের দিনে শরীর ও আত্মা উভয়েরই পুনরুত্থান হবে। একে অস্বীকার করা ইসলামের মূল বিশ্বাসের পরিপন্থী।


৪. কার্যকারণ তত্ত্বের ওপর আক্রমণ (Attack on Causality)

এটি এই বইয়ের সবচেয়ে আলোচিত অংশ। দার্শনিকরা মনে করতেন প্রাকৃতিক নিয়মে ‘কারণ’ এবং ‘ফলাফল’ (Cause and Effect) অবিচ্ছেদ্য। যেমন—আগুন তুলাকে স্পর্শ করলে তুলা পুড়তে বাধ্য, এটি আগুনের নিজস্ব ক্ষমতা।

গাজ্জালির ব্যাখ্যা (Occasionalism): গাজ্জালি বলেন, আগুন ও পোড়ানোর মধ্যে কোনো যৌক্তিক বা আবশ্যিক সম্পর্ক নেই। আমরা শুধু দেখি আগুনের পর পোড়া ঘটছে, কিন্তু আগুনই যে পোড়াচ্ছে তার কোনো প্রমাণ নেই।

গাজ্জালির মতে, প্রকৃত কর্তা কেবল আল্লাহ। আগুন যখন তুলাকে স্পর্শ করে, আল্লাহ তখনই ‘পোড়ানো’ তৈরি করেন। এই তত্ত্বটি অলৌকিক ঘটনা বা মোজেজাকে (Miracles) ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে (যেমন—ইব্রাহিম আ. আগুনে না পোড়া)। কারণ আল্লাহ চাইলে আগুনের স্পর্শে পোড়ানোর বদলে শীতলতা তৈরি করতে পারেন।


পশ্চিমা দর্শনের ওপর প্রভাব (ডেভিড হিউম ও রেনে দেকার্তে)

অবাক করার মতো বিষয় হলো, গাজ্জালির এই বইটির প্রভাব ইউরোপীয় রেনেসাঁ এবং আধুনিক দর্শনের ওপরও পড়ছিল। গাজ্জালি যে কার্যকারণ তত্ত্ব (Cause and Effect) আক্রমণ করেছিলেন, তার প্রায় ৭০০ বছর পর বিখ্যাত দার্শনিক ডেভিড হিউম ঠিক একই ধরনের যুক্তি দিয়ছিলেন। গাজ্জালির সংশয়বাদ (Scepticism) পদ্ধতি আধুনিক দর্শনের জনক দেকার্তের চিন্তাধারায় ছায়া ফেলেছিল বলে অনেক পণ্ডিত মনে করেন।


৩০/০৫/২৬

সূত্রঃ

১। AL-GHAZALI’S
TAHAFUT AL-FALASIFAH
[INCOHERENCE OF THE PHILOSOPHERS]
TRANSLATED INTO ENGLISH
by SABIH AHMAD KAMALI
1963
PAKISTAN PHILOSOPHICAL CONGRESS

২। ওয়েব দুনিয়া

Leave a Reply