প্লেটোর রিপাবলিক, খ্রিস্টপূর্ব ৩৭৫ সালের দিকে রচিত একটা সক্রেটিক সংলাপ। এই বই আজ পর্যন্ত পাশ্চাত্যে যত রাজনৈতিক ও নৈতিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হইছে তার ভিত্তি হিসাবে দাঁড়াইয়া আছে। এইটা সক্রেটিস এবং আরও কয়েকজন কথোপকথনকারীর, বিশেষ কইরা প্লেটোর ভাই গ্লোকন এবং অ্যাডিম্যান্টাসের মধ্যে একটা আলোচনা । এইটার আসল লক্ষ্য ছিল ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা এবং এইটা দেখা যে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি অন্যায়কারী ব্যক্তির চেয়ে বেশি সুখী কি না। ন্যায় বিচারের রূপ বাইর করার পাশাপাশি এই বইতে আরো দুইটা থিম বেশি উল্লেখযোগ্য- ফর্মস-এর তত্ত্ব (Theory of Forms) ও Allegory of Cave(গুহার রূপক)।
১. ন্যায়বিচারের প্রকৃতি(The nature of Justice)
ন্যায়বিচারের সন্ধানঃ সংলাপটি বিভিন্ন চরিত্রের দেওয়া ন্যায়বিচারের প্রচলিত সংজ্ঞার মাধ্যমে শুরু হইছে।
সেফালাস: ন্যায়বিচার হইলো কেবল সৎ হওয়া ও ঋণ পরিশোধ করা।
পোলিমার্কাস: বন্ধুদের সাহায্য করা ও শত্রুদের ক্ষতি করা।থ্রাসিম্যাকাস:
একজন সোফিস্ট, যিনি যুক্তি দিছিলেন যে, ‘শক্তিশালী যা চায়, তা-ই ন্যায়বিচার।’ তাঁর মতে- ক্ষমতাবানরা নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী ‘ন্যায়বিচার’ এর সংজ্ঞা তৈরি করে।
সক্রটিস পুরা বইয়ে এই মতামতগুলিরে খণ্ডণ করেন এবং যুক্তি দেন এই বইলা যে, ন্যায়বিচার হইলো – আত্মার একটা সুস্থির অবস্থা, আত্মার সুস্বাস্থ্য।
পুরা আলোচনার মূল প্রশ্নটি হইলো- ন্যায়বিচার আসলে কী, এবং একজন অন্যায়কারীর জীবনের চেয়ে একজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তির জীবন কি বেশি লাভজনক?
বইয়ের শুরুতে সোফিস্ট পণ্ডিত থ্রাসিম্যাকাস একটি বিতর্কিত সংজ্ঞা দিয়েছিলেন: ‘শক্তিশালী যা চায়, তা-ই ন্যায়বিচার।’ (Might is Right)। সক্রেটিস (প্লেটোর মাধ্যমে) এইটা খণ্ডণ কইরা দেখান যে, ন্যায়বিচার হইলো একটি শিল্প (Art), যার লক্ষ্য শাসকের স্বার্থ নয় বরং শাসিত জনগণের মঙ্গল সাধন করা।
কেন ন্যায়বিচার(Justice) ভালো? প্লেটো যুক্তি দেন যে, ন্যায়বিচার কেবল একটি সামাজিক নিয়ম নয়, এটি আত্মার একটি ‘সুস্বাস্থ্য’। অন্যায্য মানুষ তার নিজের লালসার দাস, তাই সে কখনো সুখী হইতে পারে না। ন্যায়পরায়ণ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে শান্ত এবং সুখী কারণ তার আত্মার সব অংশ সুশৃঙ্খল।
ন্যায়বিচার(Justice) বিষয়টি কেবল আইন-কানুন বা আদালতের বিষয় নয়। এইটা একটা মানুষের আত্মা , একটা অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য ও শৃঙ্খলার নাম। প্লেটো একে -সঠিক কাজ করার চাইতে সঠিক মানসিক অবস্থায় থাকা হিসাবে বেশি গুরুত্ব দিছেন। প্লেটোর ন্যায়বিচারের ধারণার প্রধান দিকগুলি হইলো:
কেন আমরা ন্যায়পরায়ণ হবো? আলোচনাটি শুরু হয় যখন গ্লকন এবং অ্যাডিম্যান্টাস সক্রেটিসকে চ্যালেঞ্জ করেন এটি প্রমাণ করতে যে, ন্যায়বিচার নিজের গুণেই ভালো, কেবল পুরস্কার বা সম্মানের জন্য নয়। তারা ‘রিং অফ গাইজিস’ (Ring of Gyges)-এর রূপক ব্যবহার করে বলেন—যদি কেউ অদৃশ্য হওয়ার আংটি পাইত এবং তার অন্যায়ের জন্য কোনো শাস্তি পাইতে না হইতো, তবে সে অবশ্যই অন্যায় করত। সক্রেটিসকে প্রমাণ করতে হবে যে, শাস্তি না পাইলেও অন্যায় করা একজন মানুষের জন্য ক্ষতিকর। প্লেটো যুক্তি দেন যে, ন্যায়বিচার সহজাতভাবেই অন্যায়ের চেয়ে ভালো কারণ ন্যায়পরায়ণ মানুষ মুক্ত। সে যুক্তির দ্বারা পরিচালিত, নিজের খামখেয়ালি বা ক্ষুধার দাস নয়। অন্যায়কারী মানুষ একজন স্বৈরশাসক, তার হাতে পৃথিবীর সব ক্ষমতা থাকলেও তার নিজের আত্মার ভেতরে গৃহযুদ্ধ চলতে থাকে, যা তাকে সবচেয়ে অসুখী মানুষে পরিণত করে।
রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার সামষ্টিক একটা অবস্থা। সক্রেটিস প্রস্তাব করেন যে, ন্যায়বিচারকে বড় পরিসরে অর্থাৎ একটি নগর-রাষ্ট্রে (Polis) দেখা সহজ। তিনি ন্যায়বিচারকে বিশেষজ্ঞতা বা নিজ কাজে দক্ষতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করছেন। ন্যায়বিচার হইলো নিজের কাজ করা এবং অন্যের কাজে হস্তক্ষেপ না করা। আদর্শ রাষ্ট্র বা কালিপোলিস-এ ন্যায়বিচার তখনই থাকে যখন শাসক শ্রেণি প্রজ্ঞা দিয়া নেতৃত্ব দেয়। সৈন্যদল সাহস দিয়া রক্ষা করে। উৎপাদক শ্রেণি পরিমিতিবোধ দিয়া পণ্য ও সেবা সরবরাহ করে। ন্যায়বিচার হইলো সেই শক্তি যা এই তিনটি শ্রেণিকে নিজ নিজ অবস্থানে ধইরা রাখে।
প্লেটো যুক্তি দেন যে, মানুষের আত্মার গঠন এবং একটি সুস্থ নগর-রাষ্ট্রের গঠন একই রকম। তিনি নগর-আত্মা সাদৃশ্য (city-soul analogy) ব্যবহার কইরা দেখান কীভাবে এই সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
ক্ষুধা- এইটা উৎপাদক বা শ্রমিকদের সাথে তুলনীয়। এর কাজ হইলো পরিমিতিবোধের মাধ্যমে শারীরিক চাহিদা পূরণ করা।
যুক্তি- এইটা দার্শনিক রাজাদের সাথে তুলনীয়। এর কাজ হইলো প্রজ্ঞার সাথে শাসন করা।
শৌর্য- সৈনিকদের সাথে তুলনীয়। এইটা কাজ হইলো শহর রক্ষা করা এবং যুক্তির আদেশ মাইনা চলা।
শিক্ষাশাসক শ্রেণির জন্য প্লেটো একটি বিস্তারিত পাঠ্যক্রমের কথা বলছেন, যাতে তারা দুর্নীতিমুক্ত থাকে এবং সাধারণ মঙ্গলের প্রতি মনোনিবেশ করে।
ব্যায়াম এবং সঙ্গীত: দেহের জন্য শারীরিক প্রশিক্ষণ এবং আত্মার জন্য সঙ্গীত বা সাহিত্য ও শিল্পের ভারসাম্যমূলক প্রশিক্ষণ।
যৌথ জীবন: লোভ প্রতিরোধ করার জন্য অভিভাবকদের কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকবে না এবং তারা যৌথ আবাসে বসবাস করবেন।
মহৎ মিথ্যা- রাষ্ট্র একটি মিথ প্রচার করবে যে মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধাতু (সোনা, রুপা, ব্রোঞ্জ) নিয়া জন্মাইছে। এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে, কারণ মানুষ মনে করে তাদের সামাজিক অবস্থান ঈশ্বর নির্ধারিত।
২ ‘ফর্মস’-এর তত্ত্ব (Theory of Forms)
প্লেটোর দর্শনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং রহস্যময় অংশ হইলো ‘ফর্মস’-এর তত্ত্ব (Theory of Forms বা Theory of Ideas)। সহজ কথায়, প্লেটো বিশ্বাস করতেন যে আমরা চারপাশে যা দেখি তা প্রকৃত সত্য নয়। এইগুলি কেবল প্রকৃত সত্যের একটি অসম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি বা ছায়া মাত্র।
প্লেটোর মতে জগত মূলত দুটি স্তরে বিভক্ত:
বস্তুগত জগত (World of Senses/Matter): এইটা আমাদের চারপাশের পরিবর্তনশীল জগত। এইখানে সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, অসম্পূর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ। আমরা যা দেখি, শুনি বা স্পর্শ করি—সবই এই জগতের অংশ।
ফর্মস-এর জগত (World of Forms/Ideas): এইটা হইলো পরম সত্যের জগত। এখানে প্রতিটি জিনিসের একটি নিখুঁত, চিরন্তন এবং অপরিবর্তনীয় রূপ বা ‘ফর্ম’ বিদ্যমান। এই রূপগুলি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে ধরা যায় না, কেবল যুক্তির মাধ্যমে উপলব্ধি করতে হয়।
উদাহরণ: ধরুন একটি সুন্দর ফুল, ফুলটি আজ সুন্দর কিন্তু কাল ঝরে যাবে। প্লেটোর মতে, ফুলটি সুন্দর কারণ এইটা সৌন্দর্য (Form of Beauty) নামক একটি নিখুঁত ও শাশ্বত ধারণার সাথে কিছুটা মিল রাখে। ফুলটি ধ্বংস হইলেও সৌন্দর্য-এর ধারণাটি চিরকাল অপরিবর্তিত থাকে।
প্লেটো দেখাইছেন যে আমাদের জ্ঞান কীভাবে সাধারণ অনুভূতি থেইকা উচ্চতর সত্যের দিকে অগ্রসর হয়। তিনি একে ‘বিভক্ত রেখা’ বা Divided Line-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন। নিচের স্তর (Opinion/Doxa): এখানে আমরা ছায়া এবং বস্তুগত জিনিসগুলো দেখি। এটি অনিশ্চিত জ্ঞান বা অভিমত। উপরের স্তর (Knowledge/Episteme): এখানে আমরা গাণিতিক সত্য এবং সর্বশেষ ‘ফর্মস’ বা পরম সত্যকে উপলব্ধি করি। এটিই প্রকৃত জ্ঞান।
The Form of the Good
সবগুলো ফর্ম-এর শীর্ষে অবস্থান করে পরম মঙ্গলের রূপ (The Form of the Good)। প্লেটোর মতে, এইটা হইলো সূর্য বা আলোর মতো, যা অন্য সব ফর্মকে দৃশ্যমান ও বোধগম্য কইরা তোলে। কোনো কিছুর সত্যতা বা অর্থ বোঝার জন্য তার মধ্যে মঙ্গলের বা উত্তম একটা গুণ থাকা প্রয়োজন।
প্লেটো কেন এই তত্ত্ব দিছিলেন? প্লেটো এই তত্ত্বটি তৈরির মাধ্যমে দুইটা বড় দার্শনিক সমস্যার সমাধান করতে চাইছিলেন।
১. পরিবর্তন বনাম স্থায়িত্ব: হেরাক্লিটাস বলছিলেন জগত সদা পরিবর্তনশীল, আবার পারমেনিডিস বলছিলেন সত্য অপরিবর্তনীয়। প্লেটো বললেন, জগত পরিবর্তনশীল ঠিকই, কিন্তু এর পেছনে থাকা ফর্মস চিরস্থায়ী।
২. জ্ঞান বনাম অভিমত: যদি সবকিছুই পরিবর্তিত হয়, তবে আমরা নিশ্চিত জ্ঞান পাব কীভাবে? প্লেটো উত্তর দিলেন, আমরা কেবল ‘ফর্মস’-এর জগতের দিকে তাকালে নিশ্চিত জ্ঞান পাইতে পারি।
সমালোচনার জায়গা (Critique)
প্লেটোর এই তত্ত্বটি নিয়ে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র অ্যারিস্টটলসহ অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন:
বিচ্ছিন্নতা: প্লেটো কেন মনে করলেন যে এই জগত এবং ফর্মের জগত একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন? এটি একটি অবাস্তব দ্বৈতবাদ (Dualism) কি না, তা নিয়ে আজও বিতর্ক হয়।
তৃতীয় মানুষের যুক্তি (Third Man Argument): অ্যারিস্টটল প্রশ্ন করেছিলেন, যদি একটি মানুষের প্রতিচ্ছবি একটি ফর্ম হয়, তবে সেই মানুষ এবং সেই ফর্ম-এর মিল বোঝার জন্য কি আরেকটি তৃতীয় ফর্মের প্রয়োজন নাই? এইভাবে তো ফর্মের সংখ্যা অসীম হয়া যাইবো।
৩.গুহার রূপক (Allegory of the Cave)
প্লেটোর রিপাবলিক (Republic) গ্রন্থের সপ্তম খণ্ডে বর্ণিত গুহার রূপক (Allegory of the Cave) পাশ্চাত্য দর্শনের অন্যতম বিখ্যাত ও শক্তিশালী একটা কাহিনী। এইটা মূলত মানুষের অজ্ঞতা, শিক্ষা এবং প্রকৃত সত্য বা জ্ঞানালোক অর্জনের প্রক্রিয়ার একটা রূপক বর্ণনা।
রূপকটির মূল কাহিনী
কল্পনা করুন একটি অন্ধকার গুহা যেখানে একদল মানুষ ছোটবেলা থেইকাই বন্দি।
বন্দি অবস্থা: তাদের হাত-পা এবং ঘাড় শিকল দিয়া বাঁধা। তারা কেবল গুহার দেয়ালের দিকে তাকাইয়া থাকতে পারে।
ছায়ার খেলা: তাদের পেছনে একটি আগুন জ্বলছে এবং আগুনের সামনে দিয়া বিভিন্ন মানুষ ও বস্তু চলাচল করতেছে। আগুনের আলোর কারণে গুহার দেয়ালে সেই বস্তুগুলোর ছায়া পড়ে। বন্দিরা কেবল সেই ছায়াগুলোই দেখে এবং সেগুলোকে বাস্তবতা বলে মনে করে।
মুক্তি: যদি একজন বন্দিকে মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং সে আগুনের দিকে তাকায়, তবে প্রথম দিকে আলোর তীব্রতায় তার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে এবং সে কষ্ট পাবে।
বাইরের জগত: বন্দিটি যদি গুহার বাইরে বেরিয়ে আসে, তবে সে সূর্য (পরম সত্যের প্রতীক), গাছপালা এবং প্রকৃত জগত দেখতে পাবে। সে উপলব্ধি করবে যে গুহার ভেতর সে যা দেখেছিল তা ছিল কেবলই ছায়া বা মিথ্যা।
ফিরে আসা: সেই ব্যক্তি যখন পুনরায় গুহায় ফিরে গিয়া অন্য বন্দিদের সত্য কথা বলতে যায়, তারা তাকে পাগল মনে করে এবং এমনকি তাকে মেরে ফেলার চেষ্টাও করতে পারে (এটি সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ডের প্রতি একটি ইঙ্গিত)।
রূপকটির প্রতীকী অর্থঃ
| প্রতীক | প্রকৃত অর্থ |
| গুহা | আমাদের দৃশ্যমান বস্তুগত জগত (যা পরিবর্তনশীল)। |
| বন্দি | সাধারণ মানুষ, যারা কেবল নিজেদের ইন্দ্রিয় দিয়া জগতকে বিচার করে। |
| ছায়া | আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা, যা পূর্ণ সত্য নয় (Opinion/Doxa)। |
| শিকল | আমাদের সংস্কার, কুসংস্কার এবং অজ্ঞতা যা আমাদের সত্য দেখা থেকে আটকে রাখে। |
| সূর্য | পরম মঙ্গল বা ‘The Form of the Good’—যা প্রকৃত সত্যের উৎস। |
| মুক্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি | একজন দার্শনিক, যিনি সত্যের সন্ধান পাইছেন। |
বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা
আজকের যুগেও গুহার রূপক অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া বা প্রোপাগান্ডা অনেক সময় আমাদের সামনে ছায়া বা কৃত্রিম সত্য তুইলা ধরে। আমরা অনেক সময় গুহার বন্দিদের মতো সেই স্ক্রিনের ছবিগুলোকেই আসল জগত বইলা মনে করি। যারা আমাদের ভিন্ন কিছু বলতে চায় বা আসল তথ্য দিতে চায় তাদের বিশ্বাস করিনা। পশ্চিমা মিডিয়ার কথা ভাইবা দেখেন, এইগুলি কিভাবে প্রাচ্যকে নিয়া প্রোপাগাণ্ডা চালায়, যা আসলে ৯০ ভাগই মিথ্যা।
প্লেটোর রিপাবলিক এবং ইসলাম
১. ইসলামি দর্শনের ইতিহাসে আল-ফারাবির ‘আল মদিনা আল ফাদিলা’ বইতে প্লেটোর রিপাবলিক-এর সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা যায়। তিনি প্লেটোর আদর্শ রাষ্ট্রকে ইসলামি প্রেক্ষাপটে রূপান্তর করেন। দার্শনিক রাজা বনাম ইমাম/নবী- প্লেটোর দার্শনিক রাজার ধারণা ফারাবির কাছে ইমাম বা নবীর ধারণায় রূপান্তরিত হয়। ফারাবি যুক্তি দেন যে, আদর্শ রাষ্ট্রের প্রধানকে কেবল একজন দার্শনিক হইলেই চলবে না, তাকে ওহী বা ঐশ্বরিক প্রজ্ঞার অধিকারী হইতে হবে। প্লেটোর লক্ষ্য ছিল ন্যায়বিচার (Justice), আর ফারাবির লক্ষ্য ছিল জনগণের সুখ (Sa’adah), যা অর্জিত হয় ইহকাল ও পরকালের সমন্বয়ে।
২. ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য (Adl)প্লেটোর রিপাবলিক-এর প্রধান থিম হইলো ন্যায়বিচার। ইসলামেও ‘আদল’ বা ন্যায়বিচার একটি কেন্দ্রীয় স্তম্ভ। প্লেটোনিক সামঞ্জস্য: প্লেটোর মতে, ন্যায়বিচার হইলো আত্মার তিনটি অংশের -যুক্তি, শৌর্য, ক্ষুধার ভেতর সামঞ্জস্য। ইসলামি নীতিশাস্ত্রে (যেমন ইমাম আল-গাজালির মতে) ন্যায়বিচার হইলো মানুষের ভেতরের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। যখন কোনো ব্যক্তি তার প্রবৃত্তি বা লালসাকে যুক্তির অধীনে আনে, তখন সে ন্যায়পরায়ণ হয়—যা প্লেটোর চিন্তার সাথে অনেকটাই মিইলা যায়।
৩. শাসনব্যবস্থা: অভিজাততন্ত্র বনাম খিলাফত। প্লেটোর শাসনকাঠামো এবং ইসলামের শুরুর দিকের রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে কিছু মিল ও অমিল রইছে।
৪.যোগ্যতা ও বিশেষজ্ঞতা: প্লেটো বিশ্বাস করতেন কেবল জ্ঞানীরাই (দার্শনিক) শাসন করবে। ইসলামেও খলিফা বা শাসকের জন্য ইলম (জ্ঞান) এবং তাকওয়া (খোদাভীতি) একটি আবশ্যিক শর্ত। পার্থক্য: প্লেটোর ব্যবস্থা ছিল একটি কঠোর শ্রেণিবিন্যাস (Caste-like hierarchy)। অন্যদিকে, ইসলামে সাম্য (Equality) এবং শুরা (পরামর্শ ব্যবস্থা)-র ওপর জোর দেওয়া হইছে।
৫. প্লেটোর ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের শাসনকাজে কোনো ভূমিকা নাই, কিন্তু ইসলামে শাসকের জবাবদিহিতা জনগণের কাছেও থাকে। প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রে নৈতিকতা রক্ষার জন্য কবিতা ও সঙ্গীতের কঠোর সেন্সরশিপের কথা বলেছেন। ইসলামেও শিল্পের উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন নয়, বরং নৈতিক চরিত্র গঠন। অনেক মুসলিম পণ্ডিত প্লেটোর এই যুক্তিটি পছন্দ করছেন যে, এমন শিল্প বা সংস্কৃতি যা যুবকদের চরিত্র নষ্ট করে বা আমাদের সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ভুল ধারণা দেয়, তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।
স্পেনের বিখ্যাত দার্শনিক ইবনে রুশদ প্লেটোর রিপাবলিক-এর ওপর একটি বিখ্যাত ধারাভাষ্য (Commentary) লিখছিলেন। তিনি প্লেটোর রাজনৈতিক দর্শনের অনেক কিছুর প্রশংসা করেন। তবে তিনি প্লেটোর এই ধারণার কঠোর সমালোচনা করেন যে, শাসককে অবশ্যই মহৎ মিথ্যা বা প্রতারণার আশ্রয় নিতে হবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যের ভিত্তি কখনো মিথ্যা হইতে পারে না।
প্লেটোর রিপাবলিক ইসলামি চিন্তাবিদদের জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো প্রদান করছিল, যার মাধ্যমে তারা ইসলামিক শাসনব্যবস্থা এবং আত্মার পরিশুদ্ধিকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন। তবে তারা সবসময় প্লেটোর কঠোর শ্রেণিবিন্যাসের চেয়ে ইসলামের সাম্যবাদী নীতিকে প্রাধান্য দিছেন।
সূত্রঃ
- The Republic, Plato, Penguin Classics, London, 2007
2. ওয়েব দুনিয়া
