বাঙালি মুসলমান নারীর মন

বাঙালি মুসলমান নারীর মনের খোঁজ নিতে গেলে যার কথা সর্বপ্রথমে আমাদের মনে আসে তিনি হইলেন বেগম রোকেয়া শাখাওয়াত হোসেন। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বেগম রোকেয়া ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান নারীদেরকে ভালো মুসলমান হিসাবে বাঁচার অধিকারটুকুর পরিবেশ তৈরি করে দিতে চাইছিলেন। তখন ভারতবর্ষের সকল ধর্মের সমাজ বিশেষ করে এর নারী সদস্যগণ শিক্ষায়, দীক্ষায় ও সামাজিক অংশগ্রহণে যেভাবে পিছিয়ে পড়ছিল মুসলমান নারীরাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ঐতিহাসিকভাবে ইসলাম পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর ওপর দাঁড়াইয়া আছে সত্য, কিন্তু ইসলাম সামাজিক ন্যায় বিচার, নারীদের শিক্ষা-দীক্ষা, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাজে অংশীদারত্বকে অস্বীকার করে না। জন্মলগ্ন থেকেই ইসলাম নারীকে তাদের অধিকার নিশ্চয়তাপূর্বক, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক পরিবেশে একটা গাইডলাইনের ভেতরে থেকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে বলে। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে তখনকার মুসলাম নারীদের অবস্থা গোটা ভারতীয় নারীদের চেয়ে ভালো কিছু ছিল না। এইটা ইসলামের দোষ না, দোষ সময় ও সমাজের। সেই যুগে ঔপনিবেশিক ক্ষমতা, তার কাঠামোর ভেতর থেকে ভারতীয় সমাজের দ্বন্দ্বমুখর ধীর বিকাশ ও সাথে সাথে উৎপাদন ও সম্পদের সমবণ্টনহীনতা ও সোশ্যাল জাস্টিসের অনুপস্থিতি অনেকাংশে দায়ী। তার ফলে ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ভারতে পুরা মুসলমান জাতির যে দুরবস্থা সেখানে মুসলমান নারীদেরকে অধিক হারে পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক শ্রেণিই বলা যায়। নারীদের বায়োলজিক্যাল গঠন ও ঐতিহাসিকভাবে তার মাতৃতান্ত্রিকতার প্রতি স্বাভাবিক ঝোঁক ও অবস্থানের জন্য  ইসলাম অনেকাংশে নারীদের বিষয়ে, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল। এইটার সাথে বর্তমানের ভোগবাদী লিবারেল সভ্যতার সাথে মিলাইয়া দেখলে ভুল করা হবে। কিন্তু এও মনে রাখা দরকার ইসলাম নারীদের পরিবার ও সমাজে, আইনসঙ্গত ভিন্নমত ও স্বাধীকারের বিষয়টি শুধু স্বীকারই করে না তাকে নিশ্চয়তাও প্রদান করে।

বেগম রোকেয়ার সেই সময়ের মুসলমান নারীদের শিক্ষা ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াইকে আধুনিককালের পশ্চিমা নারীবাদিতার সাথে মিলাইয়ে দেখা চলবে না। হালের নারীবাদিতা একটা সামাজিক এক্টিভিজম, মূলত মডার্নিজমের হাত ধইরা আশির ও নব্বইয়ের দশকে প্রবলভাবে হাজির হইছে। তার লক্ষ্য প্রথমে যদিও পুরুষ ও নারীর সমঅধিকার ও সমআয় রোজগারের সুযোগ ও ক্ষমতা ভাগাভাগির লড়াই ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে তা পুঁজিবাদী তথা কর্পোরেট দুনিয়ার জালে আটকা পড়ে নারীকে পুঁজির দাসে পরিণত করছে। তার দেহের মুক্তি তথা দেহের নিয়ন্ত্রণ তারা করতে পারছে ঠিকই কিন্তু তা আসছে সেই দেহ ও মনকে চড়া দামে পুরুষকেন্দ্রিক সিস্টেম ও কর্তার কাছে নিজকে ক্রমশ অবজেক্টিফাইড করার মাধ্যমে। কিন্তু বেগম রোকেয়া লড়ছিলেন ইসলামের নাম করে তৎকালীন মুসলমান নারীদেরকে মুসলমান পিতৃতান্ত্রিক সমাজ যেভাবে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে পিছিয়ে রাখার চেষ্টা করছিল সেই শক্তির বিরুদ্ধে। আর সেইটা ছিল তখনকার ভারতীয় সমাজের একটি  ঐতিহাসিক সামাজিক ধারা। ইউরোপ আমেরিকা তথা পুরা পৃথিবীতে তখন পুরুষের এই ফিউডাল-শক্তিভিত্তিক পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অংশীদার প্রতিষ্ঠা পাইছিল।  মনে করে দেখেন বেগম রোকেয়ার কিছুকাল আগে বিদ্যাসাগর কিভাবে হিন্দু নারীদের সতীদাহ প্রথা, বাল্য বিবাহ প্রথা বন্ধ করার জন্য উঠে পড়ে লাগছিল। সেই সময়ে বেগম রোকেয়া তার মরহুম স্বামীর নামে স্কুল খুলছিলেন সেখানে অন্যান্য শিক্ষার সাথে কোরান শিক্ষার ব্যবস্থাও করছিলেন। তিনি ইসলামের শিক্ষা থেকেই মনে করছিলেন যে এডুকেশন ছাড়া বাঙালি মুসলমান নারী নিজের সম্ভাবনাকে, নিজের পরিচয়কে বুঝে উঠতে পারবে না। মুসলমান নারীরাও তো মানুষ, তাদেরও সোশ্যাল এডুকেশন দরকার। পর্দা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বেগম রোকেয়ার যে  অবস্থান তা ভারতীয় সমাজের পিছিয়ে পড়া পুরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের বিরুদ্ধেই অবস্থান যেন। হিন্দু নারীদের সামজিক কুসংস্কারে নিষ্পেষিত হওয়ার মতো মুসলমান নারীরাও ব্যতিক্রম ছিল না। আমাদের মনে রাখতে হবে ইসলামিক পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে বেগম রোকেয়ার কোনো লড়াই ছিল না, ছিল পর্দাকে ক্ষমতা চর্চার একটা টুল হিসাবে ব্যবহার করা পুরুষ সমাজের কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই। তার লড়াই ইসলামিক ধর্মীয় ইথিকসের বিরুদ্ধে নয়, তা ছিল এর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে।


পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলাইয়া, ইসলামফোবিক মিডিয়ার ক্রমাগত মিথ্যাচারের ফলে তৈরি অজ্ঞতা থেকে তারা ইসলামকে ‘এনেমি অব সিভিলাইজেশন’ মনে কর


তবে খেয়াল কইরা দেখেন আজকালকের নারীবাদী সেক্যুলার মুসলমান নারী আর বেগম রোকেয়ার মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য আছে। তার সাথে পরবর্তী মুসলমান নারীবাদী লেখকদের মধ্যে পার্থক্য শুধু চিন্তা আর মননে নয় তার প্রধান ফারাক জ্ঞানে ও বিশ্বাসে। বেগম রোকেয়ার রচনাগুলি বিশেষ করে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ পড়লে উনিশ শতকের ইংরেজ কর্তৃক ভারত দখল এবং তার ফলে এর সাথে আসা প্রাচ্যবাদী ধারণার পরীক্ষাভূমি ভারত এবং পরে ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে থাকা ইউরোপীয় বাইপ্রোডাক্ট- অপরিণত বেঙ্গল রেনেসাঁর আদর্শের কথা শুনতে পাইছিলেন। এই সময়ে তার এক লেখায় হিন্দু ধর্মের ধর্মবাণীগুলিকে মানুষের লেখা বলে মনে হইছে। ‘কোনো ভগ্নী মস্তক উত্তোলন করিয়াছেন, অমনি ধর্মের দোহাই বা শাস্ত্রের বচন-রূপ অস্ত্রাঘাতে তাঁহার মস্তক চূর্ণ হইয়াছে। … আমাদিগকে অন্ধকারে রাখিবার জন্যে পুরুষগণ এই ধর্মগ্রন্থগুলি ঈশ্বরের আদেশ বলিয়া প্রচার করিয়াছেন। … এই ধর্মগ্রন্থগুলি পুরুষরচিত বিধিব্যবস্থা ভিন্ন কিছুই নহে। মুনিদের বিধানে যে কথা শুনিতে পান, কোনো স্ত্রী-মুনির বিধানে হয়তো তাঁহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন। … ধর্ম আমাদের দাসত্বের বন্ধন দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর করিয়াছে; ধর্মের দোহাই দিয়া পুরুষ এখন রমণীর উপর প্রভুত্ব করিতেছেন।‘ বোঝা যাইতেছে তিনি ক্রমশ ধর্মের ক্রিটিক হয়ে পড়ছিলেন এবং ব্যক্তি ও সামাজিক মনন নির্মাণে  ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থগুলির ডিসকার্সিভ  ভূমিকাকে পরখ করতে চাইছিলেন। পিতৃতান্ত্রিক সমাজের এক চেটিয়া ক্ষমতার অপব্যবহারে বিরক্ত হয়ে আন্দাজ করা যায় তিনি সোশ্যাল জাস্টিসের চেয়ে পুরুষের ইনজাস্টিসকে তুলে ধরতে চাইছেন। আমরা ধারণ করতে পারি বোন রোকেয়া একজন মনে প্রাণে মুসলমান নারী ছিলেন এবং কোরানকে নাজিল হওয়া পবিত্র গ্রন্থ বইলা মানতেন। তা না হইলে তিনি এখানে কোরানের কথাও বলতেন। অবশ্য না বললেও বোঝা যায় তিনি আস্তে আস্তে ইউরোপীয় ও ভারতীয় নব্য, আধা-সেক্যুলার ভাবাদর্শে নিজেকে তৈরি করছিলেন এবং আঠারো ও উনিশ শতকের ওরিয়েন্টালিস্ট বিশেষ করে ইংলিশ লেখক ও দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন ও জন স্টুয়ার্ট মিলের মতো চিন্তাবিদদের যুক্তিভিত্তিক, অভিজ্ঞতাবাদী ন্যারেটিভিটিকে এস্তেমাল করছিলেন ভালোভাবেই।

বিশ শতক গত হইছে সত্য কিন্তু একবিংশ শতক হইতে যে একশ বছর লাগছে সেই একশ বছরে সামাজিক জীবনে যে পরিবর্তন সাধিত হইছে তা আগেকার কয়েকটি শতকেও হয় নাই। যেমন : র‍্যাডিকাল ফেমিনিজম, সমসেক্সের মধ্যে বিবাহ, দুনিয়াব্যাপী ইন্টারেস্ট ভিত্তিক অর্থনীতি, সুপার ফাস্ট টেকনোলজিক্যাল কমিউনিকেশন সিস্টেম ইত্যাদি। বাংলাদেশ ভূরাজনীতি ও সংস্কৃতির বাইরে না, কিন্তু এর সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো, অবকাঠামো, অর্থনীতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং নিরপেক্ষ শক্ত সিভিল সোসাইটি এখনো ইউরোপীয় জীবন ব্যবস্থার সাথে তাল মিলাইয়া গড়ে উঠে নাই। তবুও গ্লোবালাইজেশনের কারণে বা সাইবার সংস্কৃতির কারণে, নিউলিবারেলিজমে আক্রান্ত অবাধ ভোগবাদিতা যা ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে আমাদের দেশে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে দেখা যায়, তার স্থূল ও কৃত্রিম কাঠামোর বাইরে বাঙালি মুসলমান নারীরাও যাইতে পারে নাই। আঠারো শতকে জার্মান দার্শনিক কান্ট খ্রিষ্টান ধর্মকেন্দ্রিক এপিস্টোমোলোজিক্যাল ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অভ্যন্তরে থেকেই এনলাইটেন্টমেন্টের কথা বলছিলেন, পরে একই ঘরানার আর এক ভাববাদী হেগেলও ঐতিহাসিক ও ব্যক্তিগত স্পিরিট থেকে পরম স্পিরিটের সাথে কনশাসনেসের মিলনের আকাঙ্ক্ষা করে সমাজে ধর্ম ও যুক্তির মধ্যে একটা ভারসাম্য রক্ষা করতে চাইছিলেন। কিন্তু কিছুকাল পরে কার্ল মার্ক্স বললেন—না সবকিছুই ম্যাটার বা বস্তুকেন্দ্রিক, সেইখানে আমাদের জীবন উৎপাদন, শ্রম ও অর্থনীতি-কেন্দ্রিক। তিনি হেগেলের মাথাকে পায়ের দিকে নামিয়ে আনলেন মানে ভাববাদিতা থেকে বস্তুতান্ত্রিকতার দিকে মানুষের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বিকাশ দেখাতে চাইলেন। কিছু পরে নিৎশে খ্রিষ্টীয় গডের মত্যু ঘোষণা দিলেন। তাই কিছুকাল মানুষের চিন্তার জগতে বস্তুবাচকতা এবং এর থেকে আসা আধুনিক জীবন কেন্দ্রিক ইহজাগতিকতা এবং পরে নাস্তিকতাবোধ প্রথমে ব্যক্তির ফ্রিডমের ধারণা আনলেও পরে তা বিংশ শতাব্দীর মানুষ নামের কর্তার মধ্যে চরম ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং তার থেকে জন্ম নেওয়া নিঃসঙ্গতা ও অপার শূন্যতাবোধ সৃষ্টি করতে পারছে। সেই সূত্রে বা তার ছায়া ধরে একশ বছর আগে বোন বেগম রোকেয়া মুসলমান নারীদের শিক্ষা ও কুসংস্কার কেন্দ্রিক জীবনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের চিন্তার ফলে, ফেমিনিজম নামের সোশ্যাল এক্টিভিজম বিশেষ করে নারীমুক্তির ধারণা ও তার মতো আরও কিছু উত্তর আধুনিক সোশ্যাল থিওরির গ্লোবালাইজেশনের কারণে বাংলার মুসলমান নারীদের বুদ্ধি এবং কারো কারো দেহের মুক্তি হইছে সত্য।

আজ সন্দেহ নাই যে পশ্চিমা সেক্যুলার কারিকুলামে লেখাপড়া কইরা, নারীর ক্ষমতায়নের কারণে নানাবিধ সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণপূর্বক বাঙালি মুসলমান নারীদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক কনশাসনেসে পরিবর্তন আসছে। তার হাত ধরে তাদের ভূমিকা বদল হইছে এবং পশ্চিমা আদলে মুসলমান নারীবাদী লেখকের জন্ম হইছে—যা বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ঘটনা, কিন্তু আশাতীত নয়। সেক্যুলার মন মানসিকতা হোক বা অজ্ঞতাস্নাত হীনম্মন্য মনোভাবের কারণেই হোক লিবারেল মধ্যবিত্ত ও বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি কালচারে বড় হইয়া বাঙালি মুসলমান নারী মুসলমান হিসাবে নিজেদেরকে আর পরিচয় দিতে স্বস্তি বোধ করেন না। মুসলমানি কালচারও ধরে রাখতে চান না। উল্টা তাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ইসলামফোবিয়া লক্ষ করা যায়। তারা মাদরাসা বা ইসলামি শিক্ষার ঘোরবিরোধী, কোরবানিবিরোধী, পর্দা প্রথা বা বোরকাবিরোধী। পুরুষের সাথে সমান তালে চলতে চায় বলে তারা ঘরে বাইরে পুরুষের কর্তৃত্ববিরোধী। তারা মনে করে ইসলাম আরব দেশে থেকে আসছে, তাই এইটা আরব সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। পশ্চিমাদের সাথে তাল মিলাইয়া, ইসলামফোবিক মিডিয়ার ক্রমাগত মিথ্যাচারের ফলে তৈরি অজ্ঞতা থেকে তারা ইসলামকে ‘এনেমি অব সিভিলাইজেশন’ মনে করে। শত শত বছর ধরে ওরিয়েন্টালিস্ট ও দেশি-বিদেশি ছদ্ম মুক্তমনা, ছদ্ম মানবিক উদারবাদী, ইসলামবিরোধী লেখকদের তৈরি করা ডিসকোর্সের ফান্দে পইড়া তারা একটা আজব কুসংস্কারাচ্ছন্ন জ্ঞানকাঠামোর গোলক ধাঁধায় ঘুরপাক খাইতেছে। এই ডিসকোর্সের অন্যতম অবদান হইতেছে কিছু ডিমিনিং টার্ম—যেগুলি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। যেমন ইসলাম হইল মেডিয়েভল বা মধ্যযুগীয়, পিতৃতান্ত্রিক এবং নারী নির্বতনমূলক ধর্ম ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে যে টার্মটি ইসলামের বিরুদ্ধে করা হয় সেটি হইল—মেডিয়েভল বা মধ্যযুগীয়। টার্মটির মধ্যে যে সম্মানহানিকর শব্দ আছে তা হইল—অন্ধকার। এইটাও পশ্চিমাদের তৈরি ইসলামকে স্টিগমাটাইজড করার জন্য একটা টার্ম।


বেগম রোকেয়া বাঙালি মুসলমান নারীদের পাচিল ভাঙার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন।


‘মধ্যযুগ’ বইলা ইসলামকে ট্যাগ করার যে দুষ্টু মানসিকতা আমাদের এই অঞ্চলে চালু আছে তা আসলে ইউরোপীয় ইতিহাসের একটি সময়কাল। এইটা ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হইছে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের মাধ্যমে এবং শেষ হইছে ১৫০০ সালে, ইউরোপীয় রেনেসাঁ প্রাপ্তির আগ পর্যন্ত। রোম সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে যখন কোনো রাষ্ট্র বা গভার্নমেন্ট ছিল না তখন ক্যাথলিক চার্চই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হইয়া ওঠে। সে সময় ইউরোপ ছিল প্রকৃতভাবেই চার্চকেন্দ্রিক যা ছিল একটা টোটালিটারিয়ান, বুলিং সিস্টেম। সেই সময়ের ইতিহাস ঘাটলেই জানা যায় যে ইউরোপে তখন ছিল চার্চকেন্দ্রিক বর্বরতা। সেখানে ধর্মযাজক ও রাজতন্ত্রের যৌথশাসন মানুষের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছিল। ধর্মের নামে যাবতীয় অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক চিন্তা, কূপমণ্ডূকতা, অন্ধত্বের প্রসার চূড়ান্তরূপ ধারণ করছিল। কোনো চিন্তাশীল মানুষ, দার্শনিক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী বা যেকোনো পরিবর্তনকামী মানুষ গির্জার অনাচারের বিরুদ্ধে টুঁ শব্দ করলেই তাকে পুইড়া মারা হইত, শূলে চড়ানো হইত, গিলোটিনে শিরচ্ছেদ করা হইত, ফুটন্ত তেলের পাত্রে ফালাইয়া দেওয়া হইত। নারীদের কোনো ব্যক্তি স্বাধীনতা ছিল না, তারা ছিল ঘরের দাস ও পুরুষের শয্যাসঙ্গী, সন্তান উৎপাদন ও সন্তানসেবার উৎস। কিন্তু এই মধ্যযুগেই ইসলামি সভ্যতা জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার মধ্য দিয়া নতুন রেনেসাঁর জন্ম দেয়। এই মধ্যযুগীয় রেনেসাঁর ফলেই জন্ম নিছিল শত শত পণ্ডিত, দার্শনিক, বিজ্ঞানী যারা জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শন এইসবের বিকাশ ও আবিষ্কার করে মানব সভ্যতার ক্ষেত্রে অভাবনীয় অবদান রাখছেন। তাই তো বিশিষ্ট ইউরোপীয় গবেষক Paul J. Balles বলেন, ‘মধ্যযুগে মুসলমানরা যখন অবিশ্বাস্যভাবে সভ্যতা বিনির্মাণে বিপুল অবদান রাখে তখন ইউরোপ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার প্রতিযোগিতায় গ্রিক ও রোমান সভ্যতার ধারকগণ আরব মুসলমানদের অতিক্রম করতে পারে নাই। বরং গ্রিক বিজ্ঞানকে আরবিতে অনুবাদের মাধ্যমে মুসলমানরা যে বিশাল অবদান রাখছিল তার জন্য আধুনিক বিজ্ঞানীরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ’। হিজরি ৬১০- ১৫০০ সাল পর্যন্ত আরব পেনিনসুলা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইসলাম যে চিন্তা, জ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞান, রসায়ন শাস্ত্র ও গণিতে যে বিরাট অগ্রগতি শুরু করছিল তার হাত ধরেই ১৬ ও ১৭ শতকে ইউরোপীয় স্কলাস্টিক দার্শনিকদের মাধ্যমে ইউরোপে নতুন চিন্তা ভাবনার গোড়া পত্তন হইছিল।

ইসলামের ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়—ইসলামের প্রথম দিকে আরব সমাজগুলোতে কন্যাসন্তান হত্যা বন্ধের ফলে নারীর জীবনে আসে নিরাপত্তা, পরিবার ও সমাজে আসে শান্তি। ইসলামি আইন অনুসারে বিয়েতে নারীর সম্মতি বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে নারীর সামাজিক সম্মান ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বে বিয়ের সময় কন্যার পিতাকে বরপক্ষকে উপঢৌকন, যৌতুক দিতে হইত। কিন্তু ইসলামি আইন চালু হওয়ার ফলে বৈবাহিক উপহার হিসেবে স্ত্রীকে মোহরানা দিয়া বিবাহ করার প্রথা চালু হয়। এইটা সেই সময়ের আরবে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন। প্রাচ্যতত্ত্ববিদ উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াটের মতে—ইসলাম যে সময়ে শুরু হইছিল, নারীদের অবস্থা ভয়াবহ ছিল। তাদের সম্পত্তির অধিকার ছিল না, তাদেরকে পুরুষের সম্পত্তি হিসেবে দেখা হইত। আর যদি কোনো পুরুষের মৃত্যু হইত তার সকল সম্পত্তি তার পুত্রদের কাছে চলে যেত।  মুহাম্মাদ (স.) নারীদেরকে সম্পদের অধিকার, উত্তরাধিকার, শিক্ষা ও বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার দান করে তাদেরকে মৌলিক নিরাপত্তা প্রদান করেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় পটভূমি থেকে শ্রমশক্তি যোগ হইত। সেই সময়ে পুরুষ ও নারী উভয়ই বিভিন্ন পেশা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। সেই সময় নারীরা প্রাইমারি সেক্টর—কৃষক হিসাবে, সেকেন্ডারি সেক্টর—নির্মাণ শ্রমিক, বস্ত্রশিল্পে রং দেয়া ও চড়কার কাজ ইত্যাদি এবং টারশিয়ারি সেক্টরের যেমন বিনিয়োগকারী, চিকিৎসক, সেবিকা, গিল্ড এর প্রধান, দালাল, পাইকার, ঋণদাতা, পণ্ডিত ইত্যাদি বিস্তৃত পরিসরের বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড ও বৈচিত্র্যময় পেশায় জড়িত ছিলেন। আর মুসলিম ইতিহাসের প্রথম দিকে, মুসলিম বিজয় ও যুদ্ধে সৈন্য বা সেনাধ্যক্ষ হিসাবে কাজ করছে এরকম উল্লেখযোগ্য নারীর উদাহরণ হচ্ছে—নুসাইবাহ্‌ বিনতে ক্বাব আল মাজিনিয়াহ, আয়েশা, খাওলাহ্‌ এবং ওয়াফেইরা।

যা হোক যা বলছিলাম, বাঙালি মুসলমান নারী তাদের প্রাত্যহিক জীবনে ইসলাম অনুমোদিত মৌলিক অনুশাসনকে ইগনোর বা এক্সক্লুড করে। কিন্তু হিন্দুদের পূজা মণ্ডপে যাইতে তাদের কোনো বাধা নাই, কোনো বেদিতে ফুল দিতে বাধা নাই, নারী পুরুষ মিলে থার্টি ফার্স্ট বা নিউইয়ার করতে তাদের বাধা নাই। মানে সকল দোষ হইল এই ‘আরব’ দেশের ধর্মের। কিন্ত সুশিক্ষিত সচেতন জনগণ ভালো করেই জানে যে মধ্যযুগে ইউরোপ আমেরিকা যখন আলোহীন, অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল তখন সপ্তম শতাব্দী থেকে শুরু করে পনের শ শতাব্দী পর্যন্ত মুসলমানেরা একাডেমিক সমস্ত শাখাতেই কত শত অবদান রাখছে। কিন্তু আমাদের দেশের মুসলমান নারীরা তাদের এই ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা ভুলে গিয়া মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচারকে অকাট্য সত্য হিসাবে মনে করে। তাই প্রশ্ন জাগে বেগম রোকেয়া আমাদের মুসলমান নারীদের, এই ইসলামবিদ্বেষী নারীবাদী সাজার ঘটনা মাইনা নিতে পারতেন কিনা? তার রচনাপাঠে এই মনে হয় তিনি নারীদেরকে ঘরের বাইরে আনতে চাইছিলেন, তাদেরকে গৃহবস্তু না করে, বাইরের বস্তু করতে চাইছিলেন। হয়তো পিছিয়ে পড়া ভারতীয় নারীদের পশ্চিমা আধুনিকতার আদলে একটু স্মার্ট বানাতে চাইছিলেন। কিন্তু তার ভারতীয় জটিল সামাজিক স্ট্রাকচার, সামাজিক বর্ণপ্রথা সম্পর্কে ধারণা থাকলেও এর বিরুদ্ধে তিনি চিন্তার লড়াই বজায় রাখেন নাই। তাই তার এই চিন্তাকে ইউরোপবাহী এবং ইংরেজ নারীদের দেখাদেখি বাঙালি মুসলমান নারীদের মেম বানানোর এক ঔপনিবেশিক রোমান্স মনে হয়। তিনি হয়তো অবগত ছিলেন না যে তার বাঙালি মুসলমান নারীরা আজ ঘর থেকে বাইর হইছে, কিন্তু চিন্তা ও চেতনায় যতটা ক্ষয়িষ্ণু হইছে তার সাথে মুসলমানের ধর্ম পালনেও বিরাট অবহেলায় পতিত হইছে। বেগম রোকেয়া বাঙালি মুসলমান নারীদের পাচিল ভাঙার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, কিন্তু তার মানসে ভবিষ্যৎ পুঁজিবাদী আধুনিক সমাজের বাঙালি মুসলমান নারীদের পুঁজির তথা কর্পোরেট দুনিয়ার কাছে ক্রীতদাস হওয়ার চিত্রটুকু ভেসে উঠে নাই। উঠলে তিনি হয়তো অনেক শরমিন্দা হইতেন।


পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে পালিত নারীরা নিজেদের ক্ষমতা হারায়া ‘অপর’ হওয়ার ইচ্ছা বা পুরুষ হওয়ার ইচ্ছা করে।


বাঙালি মুসলমান নারীবাদী লেখকদের নারীবাদিতার মূলে যে ডিসকোর্স তা অনেকটাই ফরাসি নারীবাদী লেখক সিমোন দ্য বোভোয়ারের দ্য সেকেন্ড সেক্সের (১৯৪৯) প্রভাবে গড়া, যেখানে নারীর শরীরকে আল্লাহর দান না মনে করে ঐতিহাসিকভাবে সমাজের সৃষ্টি মনে করা হইছে। তার মতে নারীর শরীর নারীর সম্পদ, কিন্তু পুরুষ শাসিত সমাজ নারীর শরীরকে মানুষের শরীর মনে না কইরা নারীকে দিছে কিছু নারীসুলভ নেগেটিভ ভ্যালুজ। সিমোন দ্য বোভোয়ার মনে করেন পুরুষরা নারীদেরকে নির্যাতন করেন প্রধানত তাদেরকে অপরপক্ষ (other) হিসাবে বিবেচনা করে, এবং বিরুদ্ধপক্ষ হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে। তাই পুরুষ কর্তা (বিষয়) হয়ে যায় অন্যদিকে নারী হয়ে পড়ে বস্তু (বিধেয়) যা শক্তিহীন। পুরুষ অপরিহার্য, পরম এবং ধরা ছোঁয়ার বাইরে। অন্যদিকে নারী অপরিহার্য, অসম্পূর্ণ এবং কখনো বিকৃত। পুরুষ তার ইচ্ছাকে আরোপ করার জন্য জমিনে ঘুইরা বেড়ায়, যেখানে নারী স্থির এবং অন্তর্মুখী হওয়ার জন্য ধ্বংস হয়ে যায়। পুরুষ সৃষ্টি করে, কাজ করে, উদ্ভাবন করে কিন্তু নারী পুরুষের আশ্রয়ের জন্য অপেক্ষায় থাকে। আমাদের দেশের প্রয়াত অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ দ্য সেকেন্ড সেক্সের ছায়ায় নারী’ নামে একটা বই লিখছিলেন। যাতে তিনি প্রায় সকল ধর্মে উল্লেখিত নারীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কথা খুব আবেগমাখা কাব্যিক ভাষায় বর্ণনা করছেন। কিন্তু আজাদ যেহেতু আরবি জানতেন না এবং তিনি প্রকাশ্য ইসলামবিরোধী, তথাকথিত প্রথাবিরোধী লেখক বলে নিজেকে মনে করতেন, তাই কোরান ও হাদিসের রেফারেন্সগুলি হইছে বায়াজড, এবং কোনোরকম প্রেক্ষিত উল্লেখ ছাড়াই। তিনি এমন কিছু অনুবাদ বইয়ের ওপর নির্ভর করছেন যেগুলির অথেনটিসিটি খুবই দুর্বল। হুমায়ুন আজাদের ব্যর্থতা এইখানেই যে তিনি বাংলাদেশের ৯৫ ভাগ লোকের ধর্ম ও তার সাথে লালিত, পালিত জীবনধারণ ও আচরণকে বাতিল করে ‘প্রথাবিরোধী’ লেখক সাজতে চাইছিলেন!

যা হোক আজ আমরা বাংলাদেশে যে নারীবাদী লেখক বা এরকম সোশ্যাল এক্টিভিস্টদের কথা বলতে শুনি তাদের এক্টিভিজম মূলত পশ্চিমা নারীবাদীদের চিন্তা-ধারণাপ্রসূত। তা বাংলাদেশের সমাজ, ধর্ম, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে মূল্যায়ন করে হয় নাই। তাই তারা নারীর শরীরকে তার ন্যাচারাল ভ্যালুজ ও ভূমিকা দিতে নারাজ, তাদের মতে নারীর শরীরের ওপর কেবল নারীই অধিকার রাখে। সবাই লক্ষ করে থাকবেন বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পোস্টস্ট্রাকচারালিজম এবং নারীবাদ সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হইছিল। ফ্রান্সের পোস্ট মডার্নিস্ট দার্শনিক মিশেল ফুকোর রচনায় বিশেষ করে তার বই The History of Sexuality (১৯৭৬) তে এই দুইটা ধারা বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। যদিও ফুকো তার লেখায় নারী বা লিঙ্গের ইস্যুতে তেমন কিছু বলেন নাই, কিন্তু তার ক্ষমতা, শরীর এবং যৌনতার মধ্যে সম্পর্কের ব্যাপারে ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ নারীবাদী আগ্রহকে ব্যাপকভবে উদ্দীপিত করতে পারছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। ফুকো মনে করেন শরীর এবং যৌনতা প্রাকৃতিক ঘটনার পরিবর্তে সাংস্কৃতিক গঠন। এইটা আশির ও নব্বইয়ের দশকে নারীবাদী সমালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বইলা মনে হয়। বাঙালি মুসলমান নারীর মনকে ফ্রয়েডীয় এবং বিশেষ করে লাঁকান সাইকোএনালিসিসের ছায়ায় দেখলে আমরা দেখব তারা ঔপনিবেশিকতার কারণে পিতৃতান্ত্রিক পরিবেশে দীর্ঘদিন জীবন যাপন করার কারণে, এবং কালচারাল ও পলিটিক্যাল থিউরির মিথস্ক্রিয়ার ফলাফলে তাদের আনকনশাসে, ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতাহীনের ক্ষমতা লাভের হাহাকার জমা হইতে থাকে। তাদের এই ঘেরাটোপ হতে বের হয়ে যাওয়ার এই অভ্যন্তরীণ প্রসেসটাকে লাঁকার ভাষায় অজ্ঞান বা অভাব বলা যায়। এই অভাব পূরণের জন্য তারা লিবারেলিজমের পরাকাষ্ঠা ফেমিনিজমের ছায়াতলে আশ্রয় নেন ও তার ভাষায় কথা বলেন। বাঙালি মুসলমান নারীদের ক্রমশ মূল ইসলামের কাঠামো থেকে বার হয়ে নামমাত্র কালাচারাল ইসলামকে ধরে হাজির থাকা এবং তাদের সেক্যুলার সাইকো-বিকাশ ও নারীশক্তি হিসাবে প্রভাব-বিস্তার, তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি বা বুদ্ধির মুক্তির কারণ হইছে বইলা যারা মনে করেন—তারা ভুল করেন। এইটা হইছে তাদের ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণেই। আন্তর্জাতিক ডাটাবেজড সার্ভে অনুযায়ী আজকে এই ভাবধারার নারীরাই বেশি অসুখী এবং পারিবারিক, সামাজিক সংগঠনে অস্থিতিশীলতা জন্মদানের জন্য একটা প্রচ্ছন্ন প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। লিবারেলিজম এবং তথাকথিত হিউমান রাইটস যেহেতু পশ্চিমাদের অবাধ স্বাধীনতাভিত্তিক নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত তাই এর কুপ্রভাব ইসলামিক ট্রাডিশনাল পরিবার ও সমাজে পড়তেছে, যার ফলে বিবাহ, পরিবার সংগঠন আজকে হুমকির সম্মুখীন। পিতৃতান্ত্রিক পরিবারে পালিত নারীরা নিজেদের ক্ষমতা হারায়া ‘অপর’ হওয়ার ইচ্ছা বা পুরুষ হওয়ার ইচ্ছা করে। কিন্তু লাঁকার ডিসকোর্স মোতাবেক তাদের সকল ডিজায়ার অপূর্ণ থাইকা যায়, তাই অভাবের সৃষ্টি হয়, সেই থেকে অজ্ঞান। এই ক্ষেত্রে নারী যা কামনা করছে তা সে কখনো পায় না, সমাজ-পিতা তার কাসট্রেশন [খতনা করে ফেলে অনেক আগেই। কিন্তু তার বাসনা প্রকৃতিস্থ হয় ভাষায়, তার আশ্রয় ভাষায়—তাই নারী ভাষায় মানে ফেমিনিজমের ডিসকোর্সে মেটাফর আর মেটিমনিতে অশেষ যাত্রা অব্যাহত রাখে। লাঁকার কাসট্রেশন [খতনা দিয়া বিচার করলে নারীদেরকে অপমানই করা হয়। কারণ এই ক্ষেত্রে নারীর আসল পরিচয় ও মহিমাকে ছোট করা হয়।

অন্যদিকে ইসলাম নারী-পুরুষের সমতায় বিশাস করে না, কিন্তু ইসলাম নারী পুরুষে জাস্টিসে বিশ্বাস করে। পরিবার ও সমাজ জীবনের নারী পুরুষের সংকট নিরসনে কোরআনে দুটি আয়াতে বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ‘পুরুষ নারীর কর্তা। কেননা আল্লাহ তাদের একে অপরের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন এবং এ জন্য যে পুরুষ তাদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে। সুতরাং সাধ্বী স্ত্রীরা অনুগতা এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে আল্লাহ যা সংরক্ষিত করেছেন তা হেফাজত করে… (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৪)। উল্লিখিত আয়াতে নারীর ওপর পুরুষের কর্তৃত্ব দেওয়া হয়েছে অভিভাবক হিসেবে, পরিবারের ব্যবস্থাপক হিসেবে। কিন্তু পুরুষের ওপরও সংসারে নারীরও বিধিবদ্ধ অধিকার রয়েছে। সুতরাং পুরুষ কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী আচরণ করতে পারবে না।  সুরা বাকারায় উল্লেখ আছে ‘আর পুরুষদের তেমন স্ত্রীদের ওপর অধিকার রয়েছে তেমনিভাবে স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে পুরুষদের ওপর। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরাক্রমশালী, বিজ্ঞ’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২৮)। কিন্তু নারীবাদী মুসলমান লেখকদের সমস্ত আক্রমণের লক্ষ্য ইসলাম কেন? যে ইসলাম কিনা নারীদেরকে পারিবারিক, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক মর্যাদা দিছে, তাদের শিক্ষা, চাকরি ও অধিকারকে একটা ন্যায্য সীমারেখার মধ্যে রাইখা তাদেরকে বিশেষভাবে মূল্যায়িত করছে, সেখানে নারীবাদী মুসলমান কর্মীরা এত বিরাগ কেন? তারা বলে তারা মুসলমান কিন্তু মুসলমানিতে তাদের ভালো লাগে না। এইটা একটা আজব প্যারাডক্স। এইটার কারণ তারা নিজেরা অজ্ঞানতা ও বিদ্বেষবশত ইসলামকে জানতে অনাগ্রহী, কারণ তারা ইসলামের মৌলিক অনুশাসন যেমন সালাত আদায় করা, সিয়াম পালন করা, পরকালে বিশ্বাস করা—এগুলি করতে ও মানতে অবহেলা করে। অধিকন্তু তারা ইসলামিক ডিসকোর্স ও শরিয়ার নির্দেশকে পশ্চিমাদের চোখ দিয়া বিচার করে একে নিবর্তনমূলক অনুশাসন বলে মনে করে ।


গ্রামের মুসলমান নারীদের পোশাক-আশাক, সাজ-শয্যা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মেলামেশাকে কোনোভাবেই শুদ্ধ ইসলামিক বলা যাবে না।


আমরা এখন নিজেদেরকে প্রশ্ন করতে পারি, বাঙালি মুসলমান নারী কারা? এর উত্তরে যারা বাঙালি হিন্দু বা খ্রিষ্টান নারী নন, বা যারা ধর্মমতে এখনো ইসলামকে ধর্ম বলে মানে ও চর্চা করে তাদেরকেই আমরা বাঙালি মুসলমান নারী বলব। এর থেকে কালচারাল মুসলিম নারীদেরকে বাদ দেয়া যাবে না কারণ তারা পিতামাতার ধর্মকে হয়তো পুরা মানে না কিন্তু নিজেকে একটা মুসলিম ধর্ম পরিচয়ে মানসিকভাবে এখনো ধরে রাখে। যদিও তারা বলেন তারা সেক্যুলার, বা জানে না তারা কী, তদুপরি তারা যে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক, বা সামাজিক ধর্মীয় পরিচয় ধরে থাকেন সেই মোতাবেক তাদেরকে মুসলমানিত্ব থেকে আলাদা করা যায় না। কারণ আমাদের দেশে বা ইসলামিক দেশগুলিতে এমন কোনো আইন নাই যে তাদের এ্রইরূপ গুপ্ত ও প্রকাশ্য ইসলামিক জীবনধারার মধ্যে না থাকাকে একটা আইনি মামলায় সুরাহ করা যায়। যারা না পুরাপুরি মুসলমান, না অন্য ধর্মী, তাদের দুই একজনের সাথে কথা বলে এই লেখার রচনাকারী সবিস্ময়ে জানতে পারেন যে তারা আবার হিন্দু বা খ্রিষ্টান হয়েও মরতে চান না। তাই তাদেরকে বাঙালি মুসলমান নারী বর্গে রাখাই ভালো। যে কারণে ধর্ম পালনকারীর পরিচয় কাঠামোতে আমরা ঐতিহাসিক কাল থেকেই দুইটা বর্গ খেয়াল করতে পারি। একপক্ষ শুধু ধর্মে বাস করে না, কেন বাস করে কেন চর্চা করে তার উত্তরও দিতে পারে। দ্বিতীয় পক্ষ ধর্মে আছে বলে পারিবারিকভাবে দেখা যায়, কিন্তু নিজে যেহেতু একটা সেক্যুলার শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় হয় তাই তাদের মধ্যে এর শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক জ্ঞান কোনোটাই গড়ে ওঠে না। তাই বলা যায় তারা পশ্চিমা ও  আমাদের পাশের দেশের শিক্ষা সংস্কৃতি দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়ে পড়েন। কার্ল মার্কসের মতে উৎপাদন ও অর্থনীতি নির্ভর অন্যান্য সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ইনস্টিটিউশনগুলি টিকে থাকে,  উৎপাদন অর্থনীতি সম্পর্কের ওপরই সমাজে আমাদের পরিচয় গড়ে ওঠে। তাই বাঙালি মুসলমান নারীরা, শিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিত হোক, এই সমাজে আগত ও গঠিত, সেক্যুলার সরকারি বেসরকারি ইনস্টিটিউশনগুলির কাছে ধরা খাওয়া। এইটা সত্য যে উনিশ ও বিশ শতকে ব্রিটিশ ভারতীয় জমিদারি তথা সামন্তপ্রথা প্রভাবিত পুরুষপ্রধান পরিবার ব্যবস্থাকে ক্রমশ বিলুপ্ত করে বাঙালি মুসলমান নারীরা নিজেদের ভয়েসকে পুরুষের পাশাপাশি দাঁড় করতে পারছে ঠিকই। কিন্তু পাশের দেশ ও আন্তর্জাতিক ফাস্ট প্রোগ্রেসিং গ্লোবালাইলেজেশনের কারণে তাদের রিয়েল আইডেন্টিটিকে হারায়া ক্রমশ একটা প্রশ্নবোধক চিহ্নের মধ্যে আটকা পড়ে আছে।

আলোচনার সুবিধার্থে বাঙালি মুসলমান নারীদেরকে প্রধান দুইটা ভাগে ভাগ করা যায়। গ্রামের মুসলমান নারী এবং শহরের শিক্ষিত মুসলমান নারী। গ্রামের অসচ্ছল, গরিব মুসলমান নারীদের মন কৃষিনির্ভর সভ্যতায় লালিত হয়ে যেভাবে পালা গান জারি গান অথবা সিনেমা গানের  সুরে দোলায়িত, তেমনিভাবে এখানে ধর্ম কর্ম করার মানসে তারা তেমন কমিটেড না। কিন্তু এখানে প্রকৃতিকে চেনা জানার মানসে যেভাবে তাদের মানস ও শরীর গড়ে ওঠে সেভাবে বাপ দাদা ভাই বা স্বামীদের দ্বারা পালিত ধর্মের প্রভাবটি তারা ধরতে সক্ষম। তার মধ্যে হয়তো খাঁটি মুসলমান ধর্মের আদলটুকু পাওয়া যাবে না কিন্তু তাদের মধ্যে তেমন ফাঁকি নাই, কপটতা নাই। তারা কেউ কেউ সালাত আদায় করে এবং কোরান পড়ে। তাছাড়া চারপাশের মসজিদকেন্দ্রিক সামাজিকতা যেভাবে গড়ে উঠছে তাতে করে তাদের মনে একটা ইসলামিক স্পিরিট গড়ে উঠার বিকল্প কিছু নাই। তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজে পাঠানোর প্রয়োজনীয়তা থেকে শুরু করে মক্তবে ইসলামিক শিক্ষা গ্রহণের ইচ্ছাও থাকে। এর থেকে প্রমাণ হয় যে আমাদের গ্রামের বাঙালি মুসলমান নারীদের মনে ইসলাম ও এর অনুশাসন এখনো হাজির আছে। তাদের মধ্যে ইহজাগতিক ও পারলৌকিক মানসিকতা একই সাথে মিশে আছে। ইসলাম ইহজাগতিকতাকে পারলৌকিক জীবনের ভিত্তিস্তর বইলা মনে করে। তাই কোরানে মুসলমানদের জন্য এ জীবন একটা পরীক্ষা হিসাবে উল্লেখ করা হইছে। কিন্তু গ্রামের মুসলমান নারীদের মধ্যে এই জ্ঞানকাঠামো গড়ে উঠে নাই বইলা অনেক সময় তারা নিজের অজান্তেই ত্রুটিযুক্ত ইসলামের সাথে জড়িত হইয়া যায়। গ্রামের বিপুল জনগোষ্ঠী কৃষিকাজের সাথে সাথে ছেলেমেয়ে, সন্তান নির্ভর শহর ও বিদেশ নির্ভর অর্থনৈতিক কাজ কারবারের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই গ্রামের মুসলমান নারীরা যে আধুনিকতা থেকে পিছনে পড়ে আছে তা বলা যাবে না। তাদেরকে ব্যাপকভাবে যে মাধ্যমটি প্রভাব বিস্তার করেছে তা হইল মোবাইল টেকনোলজি আর এর মাধ্যমে তারা সক্ষম হইছে দেশ ও বিদেশ নির্ভর গ্লোবাল আধুনিক ফাস্ট সংস্কৃতি দেখা, শোনা ও আত্মস্থ করা। যেহেতু আজকালের সংস্কৃতি হইল অপরকে খুশি করার সংস্কৃতি তাই গ্রামের শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত বাঙালি মুসলমান নারী, না বুঝে এমন একটি গ্লোবাল আইডেন্টিটিতে প্রবেশ করছে যে ক্রমশ শহর আর গ্রামপ্রধান জীবন যাপন ও জীবনাচরণের মধ্যেও তেমন কোনো পার্থক্য নাই। তবে যে জিনিসটি চিন্তার তা হইল প্রাচ্যবিদ্যার প্রতিভূ মডার্নিজম তাদেরকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতেছে। তারা ট্রাডিশনাল ইসলামকে মডার্নিজমের আদলে দেখতে এবং পাইতে চায়। আবার বাংলাদেশের সমাজ থেকে কৃষি সভ্যতার ক্রিয়াকাণ্ড ক্রমশ কমে যাওয়ার কারণে, সেখানে মোবাইল টেকনোলজি নির্ভর আধুনিক সভ্যতা গড়ে উঠার কারণে, ইসলামকে জাস্ট একটা আনুষ্ঠানিক পর্ব বানানোর একটা প্রচলন দেখা যায়।

তাই গ্রামের মুসলমান নারীদের পোশাক-আশাক, সাজ-শয্যা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক মেলামেশাকে কোনোভাবেই শুদ্ধ ইসলামিক বলা যাবে না। একশ বছর আগে গ্রামের মুসলমান নারীরা যেভাবে একটা পর্দা প্রথার মধ্যে জীবন যাপন করত আজ সেটা লুপ্ত। আর্থ সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তনের সাথে সাথে দ্রুত গ্লোবালাইজড লিবারেল সংস্কৃতি হয়তো এর জন্য একটু দায়ী। এক সময় গ্রামে গেলে যেভাবে মা খালা বোন ভাবিদের মধ্যে লজ্জা দেখা যাইত আজ এইটা নাই। ক্রমশ নগরানায়নের কারণেই হোক বা ইসলামিক শিক্ষাহীনতার কারণেই হোক আজ তারা ইসলামিক ইথিকস হারাইতে বসছে। এমন না যে তাদের পাশে এমন ইসলামিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠী বাস করে যে তারা সরাসরি নিজেদেরকে সেই সংস্কৃতির আলোকে সাজিয়ে তুলবে। আজ গ্রামে গঞ্জে প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি প্রকল্প মুসলমান নারীদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এমন করে আন্দোলিত করছে যে গ্রামের নারীরা দ্বিধাগ্রস্ত ও বিভ্রান্ত, তাদের আর উপায় নাই—এই পরিস্থিতি থেকে নিজেদেরকে বার করে নিয়ে আসার। তারা শুনছে তারা পরাধীন নয়, তারা কাজ ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে মুক্তি অর্জন করতে পারবে কিন্তু তারা প্রতিষ্ঠানগুলির পেট্রনদের কাছেই পরাধীন থাকতেছে। যে আধুনিকতার স্বাধীকার আস্বাদের আশায় তারা আকর্ষিত হয় সেইখানে তারা শুধু লাভ করে বস্তুগত ও মানসিক ঋণের বোঝা। এ যেন একটা বিরাট তলাহীন গর্ত যেখানে মফস্বলের নারীরা কেউ পড়ে গেছে বা কেউ কেউ এর সামনে দাঁড়াইয়া আছে। তাদের বাপ দাদারা যে শিক্ষা দিয়া গেছে, যে ইসলামিক শিক্ষা তারা এক সময় পাইছে আজ তা কিছু দেশি ও বিদেশি অর্থলোভী প্রতিষ্ঠান ও সংঘের প্রভাবে হারাইয়া যাইতে বসছে।


এরা মননে ও মেজাজে সেক্যুলার, এদের ভাবগুরু রবীন্দ্রনাথ ও তার গান। এদের পোশাক-আশাক ভারতীয় অথবা পশ্চিমাদের অনুকরণে বানানো।


শহুরে বাঙালি মুসলমান নারীদেরকে আলোচনার জন্য দুই ভাগে ভাগ করা যায়। শহুরে উচ্চবিত্ত এবং শহুরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত বাঙালি মুসলমান নারী। দেশভাগ ও বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পরবর্তী দশকগুলিতে প্রথম শ্রেণিটি সরকারি ও বেসরকারি অর্থ আত্মসাতের পর কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান। নীতি নৈতিকতার গুষ্টি মেরে তারা রাতারাতি অগাধ সম্পদের মালিক হয়ে পড়েন। তারা বাঙালি মুসলমান হলেও তাদের চলা-চলতি, খাবার-দাবার, পোশাক-আশাক, ভাষা ব্যবহার পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণে চলে। বাপ দাদার উৎস গ্রাম হইলেও তারা কৃষিকে খারাপ চোখে দেখেন, বাপ দাদা বা গ্রামের আত্মীয়স্বজন পাড়াপড়শিদেরকে গ্রাম্য, খেত, বর্বর এসব নামে ডাকেন। বিদেশ তাদের অতিপ্রিয়, নিজে হলিডে করতে বিদেশ ভ্রমণ করেন, সন্তানদেরকে বিদেশে লেখাপড়া করান, বাড়ি গাড়ি কিনে দেন, যাতে নিজেরা একসময়ে সেখানে স্থায়ী হইতে পারেন। বাংলা ভাষার প্রতি তাদের তেমন একটা টান নাই বা টান থাকলেও তা বাংলিশ টাইপের। ইসলাম ধর্মকর্ম বলতে তাদের অনেকের মধ্যে দেখা যায় পরিবারের কারো মৃত্যু  হইলে পেইড হুজুরদের মাধ্যমে কোরান তিলাওয়াত বা খতম, রমজানের সময় ইফতার পার্টির আয়োজন এবং জাকাতের সময় কাপড় বিতরণ ইত্যাদিতে সীমাবদ্ধ। এদের মধ্যে বয়স্ক কেউ কেউ আছেন যারা নিজেদেরকে এখনো মুসলমান নারী হিসাবে পরিচয় দিতে আগ্রহবোধ করেন এবং প্রকৃতপক্ষেই ইসলামি জ্ঞানধারার আলোকে জীবনকে পরিচালিত করেন।

বাঙালি কালচার ও শিল্প সাহিত্যের সাথে যে গ্রুপটি বেশি জড়িত তারা হইল সেই মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান নারী সমাজ। এই গ্রুপটাই বেশি করে বাঙালির উৎসব, অনুষ্ঠান সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও বিশেষ দিবসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই গ্রুপের সৃষ্টি হইছে কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে, তথা বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে। সহজ করে বলা যায় বাংলা সংস্কৃতি ও সাহিত্যই এই গ্রুপের নির্মাতা। তাদের জীবনচলা, প্রাত্যহিক কথাবার্তা, পোশাক-আশাক প্রায় সব কিছুই এই কলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতি ও সাহিত্যমাখা। এরা মননে ও মেজাজে সেক্যুলার, এদের ভাবগুরু রবীন্দ্রনাথ ও তার গান। এদের পোশাক-আশাক ভারতীয় অথবা পশ্চিমাদের অনুকরণে বানানো। স্বাধীনতাপরবর্তী বিকশিত হয়ে এই বিশেষ চরিত্রের বাঙালি মুসলমান নারী বাংলা ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদকেই তাদের ধর্মজ্ঞান, উপলক্ষ্য ও উপায় মনে করে। তাই এর ফলাফলে এরা ইসলামিক সবকিছুকেই সন্দেহের চোখে দেখে। তারা যেহেতু উনিশ শতকীয় কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু বাঙালি বুদ্ধিজীবিতার দ্বারা নির্মিত তাই স্বভাববশতই তারা মনে প্রাণে মুসলমান সংস্কৃতি ও মুসলমান জীবনধারাবিরোধী। তারা অবহেলা করে বা এড়িয়ে চলে মাদরাসা, মৌলভি, আরবি ভাষা, ওয়াজ মাহফিল, মসজিদের আজান, কোরানপাঠ ইত্যাদি সকল ইসলামকেন্দ্রিক এক্টিভিটিজ। উল্টা দিকে রবীন্দ্রনাথের গান না শুনলে তাদের ‘স্পিরিচ্যুয়ালিটি’ আসে না, পূজা পার্বণে না গেলে তাদের আধুনিকতার অধিকার থাকে না, মোল্লা, মৌলভিদের বিরুদ্ধে কথা না বললে তাদের মিটিং মিছিল এবং সাহিত্য হয় না। মক্কা মদিনা বা মসজিদ তারা ভালোবাসে না, তারা ভালোবাসে ভারতীয় হিন্দি সিনেমা, হিন্দি, ইংরেজি এবং কিঞ্চিৎ রবীন্দ্র সংগীতের বৈশাখীমেলা, দেশি, আন্তর্জাতিক সংগীতমেলা ও সাহিত্য আসর। তারা নিজেরা নামাজ রোজা করে না, অন্যরা করলেও তাদের জন্য আছে এক ধরনের তুচ্ছতাচ্ছিল্য মনোভাব। কোনো ইসলামিক ডিসকোর্সের বিষয়ে তাদের যদি সবিশেষ আগ্রহ থাকে তাহলে ইসলামিক পর্দা প্রথা ও নবিজির বিবাহ, বিশেষ করে পুরুষের চারটা বিবাহ। এই দুইটা ইসলামিক বিষয়ের প্রতি তাদের আগ্রহ এত বেশি যে এইটার যে একটা সামাজিক, ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এইটাকে তারা কোনো ডিসকার্সিভ দিক থেকে বাজিয়ে দেখতে চান না। কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্য ও সংস্কৃতি, নিয়ন্ত্রণহীন গ্লোবালাইজেশন এবং ইসলামবিরোধী মিডিয়ার প্রভাবে তাদের মগজ এমনভাবে ধোলাই হয়ে গেছে যে এরা নিজেদের ধর্মটাকেও ভালো করে জানে না। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের মতো ইসলামে নারীকে কমোডিটি মনে করে না, বরং ইসলাম নারীকে দিছে সম্মান ও অধিকার। এই পরিপ্রেক্ষিতে একটা হাদিস দিয়া আমার রচনার এইখানেই ইতি টানতেছি। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল (স.)-এর কাছে একদিন এসে জিজ্ঞাসা করল, ‘হে আল্লাহর রাসুল! কে আমার উত্তম আচরণ পাওয়ার বেশি হকদার?’ তিনি বললেন ‘তোমার মা’; সে বলল, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা’; সে আবারও বলল, ‘তারপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার মা’। সে পুনরায় বলল, ‘এরপর কে?’ তিনি বললেন, ‘তোমার বাবা’। (বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফ)।

_____________________________________________________________

সহায়ক গ্রন্থ ও পাঠ:  

১। আমাদের অবনতি বেগম রোকেয়া,  নবনূর, ২য় বর্ষ, ৫ম সংখ্যা। আগস্ট-সেপ্টেম্বর, ১৯০৪। কলকাতা, পৃষ্ঠা ২১৬-২১৮

২। The Second Sex (1949), Simone de Beauvoir, Gallimard, Paris

৩। নারী (১৯৯২), হুমায়ুন আজাদ, আগামী প্রকাশনী

History of Sexuality-vol 1 (2008), Michel Foucault,  Paperback, Penguin Press

৫। আল  কোরান, সুরা নিসা, আয়াত-৩৪, সুরা বাকারা, আয়াত-২২৮

৬। https://www.britannica.com/event/Middle-Ages ১০/০৯/২০২১

৭। https://www.history.com/topics/middle-ages/middle-ages ১৬/০৯/২০২১

৮। The Four Fundamental Concepts of Psychoanalysis, Jacques Lacan, Translated by Alan Sheridan, W.W Norton & Company, New York, London 1981

২৬. ০৯. ২০২১

Leave a Reply