স্থান- সিডনি, তারিখ- ১৬ ডিসেম্বর, ২০১২।
কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আর আমি একই সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করেছি। সে তো অনেকদিন হয়ে গেল। এখন আমরা দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে থাকি। সুব্রত এখানে প্রায় ১৬/১৭ বছর আর আমি এক যুগের একটু বেশি। পেশায় সুব্রত আই, টি স্পেশালিস্ট আর আমি এখানকার একটি কলেজের ইংরেজির শিক্ষক। সুব্রতকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রয়োজন নাই। আশি দশকের কবিদের মধ্যে তিনি অগ্রগণ্য ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। কবিতার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাস,অনুবাদও সাহিত্য সমালোচনাতে সমান প্রতিভার স্বাক্ষররেখেছেন। আর আমার লেখালেখির হাত-মকশো শুরু হয় আশির একদম শেষের দিকে, কিন্তু কবিতা সহযোগে আবির্ভূতহই নব্বই দশকের শুরুতে। ১৯৯৯ সালে দেশান্তরবা দ্বীপান্তরের কারণে একটা লম্বা সময় লেখায় বিরতি। আবার ২০০৮ সালে একটি দ্বিতীয় জন্মলাভের অনুভূতি নিয়ে কবিতায় ফেরা। কবিতা লেখার পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধ ও কিছু অনুবাদ কাজ করেছি। খ্যাতি -(কু)খ্যাতির পাল্লার দিকে না তাকিয়ে শুধু লেখার আনন্দেই অনেকটা সময় পার করে দিলাম।
অনেক দিন ধরেই আমার ইচ্ছা ছিল সুব্রতর সাথে একটা সাহিত্যিক আড্ডায় বসব, কবিতা, প্রবাস জীবন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলব। উদ্দেশ্য- বাঙালি কবিদের একটাবিশেষ অংশ,কীভাবে স্বদেশ থেকে অনেক দূরেলেখালেখি চালিয়ে যাচ্ছে, কবিতা সর্ম্পকে কী ভাবছে তা ধরে রাখা। ভবিষ্যতে হয়তো এর একটি ঐতিহাসিক মূল্য থাকতেও পারে। দেখা হলেই তো আমরা অনেক কথা বলি, এক সাথে কফি খাই। পাঠকের সাথে শেয়ার করার জন্য ভাবলাম এবার আমাদের কথাবার্তা লিখে রাখব। সুব্রতকে আমার ইচ্ছার কথা জানাই। সে হ্যাঁ করাতে, যে কোনো রবিবার আমরা ধার্য করি, কারণ রবিবারে আমরা দুজনই ফ্রি। সে মোতাবেক দুজনে সিডনির লাকেম্বারএকটা কফিশপে বসে আড্ডা দিলাম।
____আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: অনেকদিন ধরেই তো তুমি অস্ট্রেলিয়াতে আছ। ১৫/১৬ বছর তো হবে। এই দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশবাসের কারণে তোমার লেখালেখি কোন পথে গেছে বা যাবে বলে মনে করো। নিজ দেশে অবস্থান করলে নিজ দেশের মানুষ,ভাষা,ভূপ্রকৃতি ও জনসংস্কৃতির সান্নিধ্য পাওয়া যেত- তা এখানে অনুপস্থিত। তুমি এই বিষয়টি কিভাবে দেখোএবং কিভাবে লেখালেখিতে জড়িত থাকো?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: হ্যাঁ, অনেকদিন হ’য়ে গেল এখানে। ১৭ বছরের উপর আসলে। এই সুরম্য কারাগারে। ২-৩ বছর পর-পর দেশে যাই যখন, প্রতিবারই ঢাকাকে নোতুন লাগে। আরও অচেনা, আরও অচেনা। আবার এই দেশটাও অচেনাই থেকে গেল। অচেনা লাগে নিজেকেও। পরবাসের মতো “অপরিচায়ন” আর কিছুতেই ঘটায় না বোধ হয়। ফলে, একপ্রকারের শৈশব-প্রত্যাবর্তন ঘ’টে যায় যেন আমার।
আমার বাল্যকাল কেটেছিল লোকচক্ষুর আড়ালে থাকবার নিরন্তর চেষ্টায়। পরিবার-পরিজন-সাথিরা কেউ কেমন ঠিক আমার ছিল না; ওদের ভরপুর দুনিয়ায় আমি এক একলাটি আজনবি ছিলাম (“সকল লোকের মাঝে ব’সে আমার নিজের মুদ্রাদোষে আমি একা হতেছি আলাদা”), কেউ আমায় না-দেখুক, না-জানুক, না-ঘাঁটাক, এই ছিল আমার সকাল-সাঁঝের পেটার নস্টার। আর কাজেই আমার নিজের জন্য আমাকে একটা জগৎ গ’ড়ে নিতেই হয়েছিল, যে-জগৎটা ভর্তি ছিল কল্পিত আর পঠিত, বা টিভি-মুভিতে দেখা দৃশ্যে আর লোকজনে। ধরো হ্যামলেট ছিলেন আমার সেই আপন সাম্রাজ্যের যুবরাজ। না, “সেক্ষপীর” তখনও আমার অনধীত। হ্যামলেটের একটা রুশ চলচ্চিত্রায়ণ দেখেছিলাম মা-বাবার সাথে। ছেলেটা পর্দা থেকে বেরিয়ে এসে আমার মগজ দখল ক’রে বসেছিল। সে যে ডেনমার্কের যুবরাজ তা অব্দি আমি তখন জানতাম না বা খেয়াল করি নি, অনেকদিন জানতাম সে রুশ; আর রাশা : সে ছিল আমার মনোরাজ্যের আরেক নাম…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: স্বদেশ ছেড়ে বিদেশ গেলে কবিতায় একটা পরিবর্তন আসার কথা। কারণ আমরা যাই কিছু করি না কেন আমাদের এই ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের চিন্তা ভাবনার সাথে মিশে যায়। কবিতার স্থানিকতা সরাসরি না হোক, স্থানীয়ভাবে জীবন ধারণের ফলে এখানকার জল, বায়ু, আলো, বাতাস আর নতুন মানুষ, নতুন পরিচয়- চেতনাকে নতুন ভাবে সাজিয়ে নিচ্ছে, ভেতরের গড়া অনুভব অভিজ্ঞতার সাথে সংশ্লিষ্ট হচ্ছে। আমার যেমন কিছু হয়েছে। আমি মনে করি এটি আমার একটি দ্বিতীয় জন্ম। কবিতার বিষয় ভাষা প্রকাশ উপস্থাপনা সবই আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। তোমার এমন কিছু হয়েছে কিনা?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: বলছি। বিদেশে আসবার পর আমার লেখার ধরনে কোনো বাঁক-বদল হয়েছে কী না তা নিশ্চয় করে বলা শক্ত। আমাদের তো বয়সও বেড়েছে এ- কয়েকদিনে। ফলে একটা কিছু পরিবর্তন যা এসে থাকতে পারে তার কতটা বিদেশবাসের ফল আর কতটা বয়োবৃদ্ধির ফলশ্রুতি আমি জানি না। তবে বদল যে কিছু এসেছে তা তো নিশ্চয়ই। হয়তো অনেক বেশি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি। দেশকে, ঘরকে যেন পুনরাবিষ্কার করছি। হারিয়ে যাওয়া ঢাকা, ধোলাইখাল, সুত্রাপুর… হারিয়ে যাওয়া জীবন আমার…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তোমার বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসার কারণ কী?শুধুই ব্যক্তিগত, নাকি অন্য কোনো কিছুর কারণে তুমি এক ধরনের নির্বাসিত। তুমি একজন শক্তিশালী কবি,লেখক। এখানে আসার আগে যেভাবে তুমি নিজের একটা জায়গা তৈরি করেছিলে,একটি চূড়াতে পৌঁছে গিয়েছিলে তার তুলনা নাই। আমার মনে হয় কেউ কেউ হয়তো ঈর্ষাকাতর হয়ে তোমাকে সরিয়ে অন্য কাউকে শ্রেষ্ঠ করতে চেয়েছিল। তুমি কি কোনো সাহিত্যিক রেসিজম বা ফিউডালিজমের শিকার?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: না না, কেউ আমাকে উৎখাত করে নি, আমি নিতান্তই ব্যক্তিগত-পারিবারিক কারণেই দ্বীপান্তরী। আর কে আমাকে কর্নার করল না-করল সে-সব নিয়ে কখনও ভাবি না। ভালো লিখতে না-পারা, সময়ের অনটন, ধৈর্যের অভাব, এ-সবই আমাকে পীড়া দেয় বরং। লেখকের কাজ লেখা, সম্মানপ্রাপ্তি, দাক্ষিণ্যপ্রাপ্তি নয়। আমার লেখা কারো ভালো লাগলে আমি খুশি হই, অস্বীকার করবার কোনো কারণ নাই, কিন্তু আমিই আমার লেখার শ্রেষ্ঠ পাঠক, নিজের কাছেই ভালো না-লাগলে কারো প্রশংসাতেই মন ভরে না, মনে হয়, লোকটা বুঝতে পারে নি এটা পচা লেখা, বা আমাকে স্তোক দিচ্ছে। তবে রেসিজম না-হ’লেও, অনর্থক রেশারেশির শিকার আমি হয়েছি যে তা অস্বীকার করতে পারি না, কিন্তু এ-সব খুব বড় মনঃকষ্টের কারণ হ’য়ে দাঁড়ায় নি কখনও। আমি ছাপাবার জন্য লিখি না, অপোগণ্ড বয়স থেকেই জানি যে লিখতে হবে, ললাটঙ্ক লিখন, তাই লিখি। বরং লিখতেই যে পারছি না, অন্ততঃ যেমনটি লিখব ব’লে আশৈশব প্রস্তুত হচ্ছি, তেমন— নিজের প্রতি করা এই অপরাধের তুলনায় বন্ধু বা শত্রুদের অবহেলাকে নিছক খুনসুটি ব’লেই মনে হয়।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: কোন ধরনের লেখা তুমি লিখতে চাও? যেগুলি লিখছ সেগুলি কি তোমার মনের মতো হয়নি?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ:ঠিক কোন্ ধরনের তা বলা মুশকিল… আর “ধরন” না-ব’লে বলা দরকার “মান”। আমার সৌভাগ্য তথা দুর্ভাগ্য এই যে, নেহাত অপোগণ্ড বয়স থেকেই বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে এবং ধ্রুপদি বাংলা সাহিত্যেরও সঙ্গে কিছু মিল-মুলাকাত আমার হয়েছিল, মনের মধ্যে উত্তম সাহিত্যের মান সঙ্ক্রান্ত একটা ধারণাও আস্তে-আস্তে দানা বেঁধে উঠেছে তখন থেকেই… তার সঙ্গে তুলনায় গেলে আমি যা লিখেছি তার প্রায় সবটুকুই হাত-মকশো করার বেশি কিছু নয়; চিত্রশিল্পী বা ভাস্করেরা এ-ধরনের কাজ রোজ গার্বেজ বিনে খালাস করেন, ভাষাশিল্পীরাও— প্রকৃতই যাঁরা শিল্পী— তা-ই করেন (বাংলাদেশের বাইরে)। আমি, আমরাই, শুধু পারি না… মায়া একটু বেশিই আমাদের, প্রায় আত্মঘাতী মাত্রায়…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তোমার কবিতার সাথে বোঝাপড়া করলে আমার মনে হয়ে যে তুমি জন্ম থেকেই কবিতার সাথে আছ। মানে তুমি জন্মকবি। একদম মায়ের কোল থেকেই কবিতাকে বা সাহিত্যকে নিয়ে এসেছ। এভাবে কবিতা,বাংলা ভাষা,ব্যাকরণের সাথে মিশে থাকার মতো মানুষ আজকাল আর তেমন চোখে পড়ে না। এটি রীতিমতো আমার কাছে একটি ঈর্ষণীয় বিষয়।
আর আমি কবিতা লেখা শুরু করি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। এর আগে যে লিখিনি তা নয়। কিন্তু সেগুলোকে আমি কবিতার প্রতি মোহ বলি,কবিতার প্রতি তীব্র ভালোবাসা থেকেই জন্ম হয়েছে তাদের। হয়তো আমার ভেতর কেউ একজন বসে ছিল আগে থেকেই, আমি টের পাইনি। নিজের ভেতরের টান না থাকলে তো আর কিছু করা যায় না। আমার পরিবারে কেউ সিরিয়াস লেখক ছিল না। আম্মার কাছ থেকে শুনেছি যে আব্বা পুলিশের চাকরি করার সময় কোনো এক থানায় বসে বসে গল্প বা কাহিনি জাতীয় কিছু লিখেছেন। আব্বাকে আমি হারিয়েছি পাঁচ বছর বয়সে। তাই কিছুটা অসচ্ছল অবস্থার মধ্যে বড় হয়েছি। এস এস সি পাশ করার সাথে সাথে দুই–তিনটা টিউশনিতে ঢুকে পড়ি। বাসায় কাজী নজরুল ইসলামের ‘সঞ্চিতা’আর জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ আর শেক্সপিয়ারের ‘ওথেলো’ নাটক ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমার মেজ ভাই মাঝে মাঝে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় কবিতা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে প্রথম হয়ে যাই।পুরস্কার হিসাবে পেয়েছিলাম সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহর ‘লাল সালু’ আর মুনির চৌধুরীর ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটকের বইটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ার সময় আমার কাছে ইংরেজি সাহিত্যের প্যান্ডরার বাক্স খুলে যায়। শেক্সপিয়ার, কীটস, এলিয়ট, ইয়েটস, ফ্রস্টের কবিতা পড়ে পাঠ-অভিজ্ঞতা বদলে যায়, কবিতার নতুন দরোজা গেল খুলে। সাথে সাথে তখনকার লিটল ম্যাগ যেমন একবিংশ বা এরকম আরো দুই তিনটা লিটল ম্যাগের সান্নিধ্যে এসে কবিতা সম্পর্কে নতুন ভাবে ভাবনা শুরু হয়। সত্যি যে আমার পেছনে তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু সামনে ছিল— হয়ে যাওয়া আর হয়ে ওঠা। যেমন যা আছে ভেতরে তার চেয়ে বেশি যা নেই বা কোথাও লুকিয়ে আছে- এমন একটা বোধ নিয়ে আমার কবিতার ভাষা সৃষ্টি হয়েছে। এ-ভাবেই কবিতার সাথে জড়িয়ে পড়ি। তুমি কীভাবে এই ব্যাপক সাহিত্যিক-জ্ঞান অর্জন করলে?কোনো পারিবারিক প্রভাব বা বলয় তোমাকে কি এই বিষয়ে সহযোগিতা করেছে?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: (অট্টহাস্য।) না, বসুষেণের মতো, কবিতার কবচকুণ্ডল-সহ জন্মাই নি আমি। অন্যভাবে বলা যায় আবার যে, সবাই ওভাবেই হয়তো জন্মায়, পরে কেউ বদলে যায়, কেউ যায় না। কে জানে।
আমার, সাহিত্যের, স্বপ্নের ভিতর বেড়ে ওঠবার পিছনে সবচেয়ে বড় হাত ছিল আমার মায়ের, আমার নানা’র, আর আমার একাকিত্বের। মায়ের বই পড়বার বদ-খাসলত ছিল, আর আমাকে তাঁর পঠনের ভাগিদার করবারও। তাঁর-আমার হামেশা কাড়াকাড়ি হ’ত বই নিয়ে। বাসায় বইপত্র সবসময়েই আসত কিছু-কিছু, নানা কিসিমের, মেঘনাদ থেকে দস্যু বনহুর। ঈশ্বরগুপ্ত বিদ্যাসাগর মাইকেল বঙ্কিম বিহারীলাল রবিঠাকুর শরৎ নজরুল জসীম সুকুমার সুকান্ত— যা যা থাকে আরকি— ছিল; আর ছিল অনেক অনেক রুশ বই (বাংলা তরজমায়), যে-সব তখন প্রায় বিনামূল্যে পাওয়া যেত। ঐ যে গোর্কির আলিওশা, যে তার মা’কে গোর দিতে দেখছে আর ভাবছে মায়ের সঙ্গে জ্যান্ত চাপা-পড়া ব্যাংটার কথা; সাগর-মহাসাগর দাবড়ে বেড়িয়ে শেষে একটা চৌবাচ্চায় খাবি খেয়ে মরা উভচর ইকথিয়ান্ডর; তিয়াপা, বরকা আর রকেট; ইস্টেশনের ডাকবাবু; দুলালি; কাতিউশা; ছোট্ট গোল রুটি… এইসব ছিল সেই জগতে একদিন…
আমার নানা— তাঁর গল্প শোনবার কেউ ছিল না তখন, কিন্তু কত কী ছিল যে তাঁর বলবার। প্রায় আজীবন নাবিক, ব্রিটিশ রণতরিতে ছিলেন, দু’টি বিশ্বযুদ্ধেই। হেন মহাদেশ নাই যান নি, হেন বড় শহর কম যাতে তাঁর পা পড়ে নি। আর কী যে বইয়ের পোকা ছিলেন— বই কেন শুধু, যে-কোনো ছাপা লেখা, খবরের কাগজ হোক, বাচ্চাদের পড়ার বই হোক, এমনকি ঠোঙা খুলেও পড়তেন। পড়তেন আমার নানিও, তবে তাঁর পাঠ্য ছিল কেবলই নভেল— তাঁর কাছে শোনা হ’ত কিরীটী-সুব্রত।
নানা (আমি ডাকতাম নানু) গল্পের ছলে আমাকে পৃথিবীর ভূগোল আর ইতিহাস ব’লে যেতেন— তাঁর কথাকে আমার তখন গল্প বা রূপকথা ব’লেই মনে হ’ত। আমি স্বপ্ন দেখতাম নাবিক হ’ব, ঢেউয়ের মাথায়-মাথায় জ্ব’লে-ওঠা ফসফরাস, বাচ্চা-কোলে ডুগং, ঐ অদ্ভুত নামের জায়গাগুলি : বেচুয়ানাল্যান্ড, হেলিগোল্যান্ড, কামচটকা, বে অব বিস্কে, টিয়েরা ডেল ফুয়েগো…। ইংরাজি সাহিত্য পড়তে ঢা.বি.-তে ঢুকে দেখি যে অ্যাংলো-স্যাক্সনদের কথা আমি আগেই জানতাম, দেখি যে আমি যা-সবকে রূপকথা জানতাম, তারা আসলে ইতিহাস!
আর রবীন্দ্রনাথ। আমার ফাঁকা আকাশটার প্রত্যেকটা হাওয়াই কোষ মধুতে ভ’রে রেখেছিলেন তিনি। বিনিময়ে, মা-কে খেয়ে-ফেলা পতঙ্গের মতো, আমি তাঁকেই কাটাছেঁড়া ক’রে-ক’রে ছন্দ শিখতে শুরু করেছিলাম। একটা বই, একটা লেখা আমি পাই নি তখন ছন্দ নিয়ে। স্রেফ পড়ার ঝোঁক দিয়ে স্ক্যান ক’রে যেতাম শত-শত কবিতা, নিরন্তর, বুঝতে চাইতাম কবিতাগুলির চলন। কলেজ-কালে, নটরডেম-এর লাইব্রেরির কী একটা বইয়েতে প্রথম পড়তে পেলাম সত্যেন্দ্রনাথের ‘ছন্দ সরস্বতী’, এক নূতন দিগন্ত খুলে গেল যেন কলম্বাসের চোখে…। কিন্তু ঐ বয়সে ব্যাকরণ আমার খুব প্রিয় বিষয় ছিল না, সত্যি বলতেকি। আরও পরে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমার ব্যাকরণ বা ভাষা বিষয়ক বই প্রিয় হ’য়ে ওঠে।
আর, পেটুক পাঠক ছিলাম পুরানো বাংলা কবিতার, যেথায় যা পেতাম— সেই থেকেই চর্যাপদ, বৈষ্ণব পদাবলি, মঙ্গলকাব্য, নাথ-কাব্য, মুসলমান কবিদের রোমান্স-কাব্য, ইত্যাদি আমার ভেজায় সান্ধাতে শুরু করে (আজকে তারা ফের বেরিয়ে যাওয়ার পথে)। লাইব্রেরি বিহার ছিল আমার প্রিয়তম কর্ম, আর বাংলাবাজারের পুরানো-বই-ঠাসা ফুটপাত প্রিয়তম জায়গা।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের ফলে বাংলাদেশের কবিরা বাংলা ভাষার বিরাট চেইন থেকে কাট-আপ হয়ে,নিজেদের ভূমিতে আলাদা হয়ে কিছু করার সুযোগ পায়। এই প্রথম ওরা “অন্য”হওয়ার সুযোগ পায়। পশ্চিমবঙ্গের সাথে ভাষাগত মিল হওয়া সত্ত্বেও,বাংলাদেশের ভিন্ন সমাজ,লোকসংস্কৃতি,বিশেষত পাকিস্তানি শাসন-শোষণ,স্বৈরাচারী দুশমনিমনোভাবের কারণে,১৯৪৭-১৯৭১ পর্যন্ত ঐ সময়ের কবিদের কাছে নিজেদেরকে বোঝার তথা আইডেনটিটি পাওয়ার আর নিজেদের অধিকার আদায়ের একটি ভাষা তৈরি হতে থাকে। সেই সময় থেকে শুরু করে বা তার থেকে উদ্ভূত বাংলাদেশের কবিতায় কোন দিগ্বলয়টিকে তুমি অর্জন বা অপচয় বলে মনে করো। এর হাত ধরে বাংলাদেশের কবিতা কোন দিকে যাচ্ছে?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: সাতচল্লিশে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম ভারতীয়রা আমাদের রাজনীতিকে দখল করে, যাদের আছর তার আগে-অব্দি আমাদের উপর সরাসরি পড়ত না তেমন। ঝড়ের বড় ঢেউগুলি ভাঙত কলকাতার ক্লিফে, ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছত না প্রায়শঃ, আর পৌঁছালেও, অ্যাদ্দূর আসতে-আসতে তারা শান্তশিষ্ট ব্যাকওয়াটার হ’য়ে যেত।
ঢাকায় ইংরাজি-শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি তখন-অব্দি ছিল প্রধানতঃ হিন্দু (উচ্চবিত্ত মুসলমানদের ছেলেপিলেদের কেউ কেউ, যেমন নবাবনন্দনেরা ইংরাজি শিখতেন, তবে তাঁরা আবার বাংলা বলতেন না, বলতেন উর্দু)। দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলা থেকে ইংরাজি-শিক্ষিত মুসলমানেরা ঢাকায় এসে ঠাঁই নিলেন…
ঢাকা অন্ততঃ এক আরেক শহর ছিল আগে, কলকাতার বাচ্চা কদাপি নয়। তো হ’ল কী, বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের চিত্তে কলকাতার রঙ লাগল, আর যাদের মনে সেই রঙ লাগল না, তাদের লাগল পাকিস্তান-স্বপ্নের রঙ। ঢাকার অধিবাসীদেরই মনে এক নীরব করাচি-কলকাতা যুদ্ধ শুরু হ’য়ে গেল। পশ্চিম পাকিস্তানি শোষক শ্রেণি, উদ্বাস্তু বিহারি আর ভারত সরকারকে যদি তুলে নিই ঐ দৃশ্য থেকে তো কী দেখি? বাঙালি মুসলমান মানসের দু’টি পরস্পর-বিরোধী অংশের ভিতর ছিল এই যুদ্ধ, যা থামে নি আজও। ১৯৭১-এ কলকাতার জয় হয়েছিল, পরে করাচির, আবার কলকাতা, আবার করাচি, আবার… অ্যাড ইনফিনিটাম।
পূর্ব বাংলা তথা বাংলাদেশের ভাষার ইতিহাসও এই দ্বন্দ্বের, ডাইকটমির, ইতিহাস। তুমি যাকে বলছ বাংলা সাহিত্যের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হ’য়ে একটা স্বতন্ত্র ধারার গোড়াপত্তন, আমি তাতে দেখছি সংস্কৃতির আরোপণ তথা কালচারাল কলোনাইজেশন। কলকাতাকে ছিন্ন ক’রে ঢাকার জন্ম হয়েছে, তা নয়, প্রাচীন ঢাকার উপর কলকাতাকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আজকের ঢাকা একটা প্রকৃত বর্ণসঙ্কর নগরী, তার এক-সিকি প্রাচীন ঢাকা, এক-সিকি কলকাতা, এক-সিকি করাচি আর এক-সিকি পরিচয়হীন (বোম্বাই? ন্যুয়র্ক?)। অলীক ভাবনার কোনো অর্থ না-থাকলেও, একবার ভাবতে চেষ্টা করো তো যে কলকাত্তাইয়া হুমায়ুন কবির, আহসান হাবিব, ফররুখ আহমেদ, সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান-রা (কলকাত্তাইয়া বলতে “কলকাতা থেকে আগত” বোঝাচ্ছি না, তা নিশ্চয়ই বুঝবে) যদি না-থাকতেন, তা’লে কোন্ পথে যেতে পারত আমাদের কবিতা?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: অনেকেই এক সময়ের দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানকে কবিতায় প্রাত্যহিকতা,সরলীকরণ বা তালিকা-করণের নামে দূরে সরিয়ে রাখতে চায়। তাকে স্বাধীনতার কবি বলে খণ্ডিত করে। এটি কোনো গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র?তুমিও কি মনে করো শামসুর রাহমান তা–ই করেছেন?এটি তাঁর প্রাপ্য? তার তো অন্য রকম একটি জগৎ আছে। তার প্রথম দিকের কাব্যগ্রন্থ যেমন ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মুত্যুর আগে’, ‘রৌদ্র কোরোটিতে’ইত্যাদি কাব্যগ্রন্ধে কবিতার শিখরকে স্পর্শ করার একটি আকাঙ্ক্ষাকে শনাক্ত করা যায়।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: সর্বভূতে ষড়্যন্ত্র খোঁজার আদত আমার নয়। যে যেমন বোঝে এবং না-বোঝে, তেমন বলে। শামসুর রাহমান যত কবিতা লিখেছেন আজীবন, তার কতটা প’ড়ে এ-সব বলা হয় কে জানে। আমি নিজে তাঁর কবিতা বেশি পড়ি নি, তবে সেই অত্যল্পপঠনেও, বেশকিছু এমন কবিতা দেখেছি, যেগুলো ঐ স্বাধীনতা-উন্মাদনার কবিতাগুলির থেকে অনেক আলাদা, আবার হুবহু তিরিশের কলাকৈবল্যবাদী অনুবর্তনও নয়। বাংলাদেশের কবিতার ইতিহাসে রাহমানের জায়গাটা পোক্ত হ’য়েই গেছে— যদিও-বা তা হয় তাঁর ভুল-কবিতাগুলির জন্যে।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ভুল কবিতার কথা বলতে তুমি কি তার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম ইত্যাদি নিয়ে লেখা জনপ্রিয় কবিতাগুলির কথা বলছ?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ:হ্যাঁ, মোটের উপর সেগুলির কথাই বলছি।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: কবি আল মাহমুদকে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি বাংলা কবি,বাংলাদেশের কবি বলে মনে হয়। তার মতো ন্যাচারাল,প্রতিভাবান কবি আমাদের সাহিত্যর সম্পদ। কিন্তু তার রাজনৈতিক অবস্থান বা দল নির্বাচন এখন বিতর্কিত। আমার কাছে মনে হয় তিনি এগুলি করছেন কিছুটা বিশ্বাস থেকে আবার কিছুটা অর্থনৈতিক কারণে। ইসলাম ধর্ম কৌমভিত্তিক হয়েও ব্যক্তির নিজের আমল,আখলাক তার ইমান আকিদার উপর নির্ভরশীল। সেই অর্থে একজন মুসলিম গোষ্ঠীনির্ভর বা রাজনৈতিক দল নির্ভর না হয়েও স্বাধীনভাবে তার ধর্ম পালন করতে পারে। আর রাজনৈতিকভাবে কোনো কিছু করতে চাইলে তাকে সমাজের সর্বক্ষেত্রে ইনসাফ স্থাপন আর জুলুম বিরোধী ভূমিকার কথাটি চিন্তা করতে হয়। কিন্তু ১৯৭১ সনে জামাত ইসলামী, ইসলামের এই বিশেষ দিকটির গুরুত্ব না দিয়ে পাকিস্থানীদের বে-ইনসাফি, জুলুমকে সম্মতি দিয়েছে ও পালন করেছে। তাই বলছিলাম যে কবিকে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, কোনো বিতর্কিত রাজনৈতিক দলের ছায়াতলে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নাই। এই বিষয়ে তোমার মতামত জানতে চাই।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: আল মাহমুদের ব্যক্তি-জীবন আমার অনুসন্ধিৎসার বিষয় নয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধা না রাজাকার, আওয়ামি না জামাতি, সাধু না চোর, সাত্ত্বিক না তামসিক, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা আমার নাই। জ্যঁ জেনে-কে, দাগি ব’লে, সমকামী ব’লে, কেউ ফেলে দেয় নি। আর নাস্তিক হ’য়েও আমি জানি যে মানুষের মহত্তম উচ্চারণগুলি, কবিতাগুলি, আছে ধর্মগ্রন্থগুলিতেই। আর— জামাতি হওয়া যদি হয় অপরাধ, এই পার্টিকে নিষিদ্ধ করা কেন হচ্ছে না? বিশেষ, আজ যখন আওয়ামী লীগ তক্তে?
আল মাহমুদের হাত শামসুর রাহমানের তুলনায় অনেক পাকা, চোখা; কিন্তু সার্বিকভাবে রাহমানের অবদান অনেক বেশি ব’লে আমার মনে হয়। দু’টো অ্যানালজি দাখিল করছি : ১. ওয়্যর্ডজওয়্যর্থ ও কোলরিজ, এবং ২. ম্যারাথন দৌড়বাজ ও একশ’-মিটার দৌড়বাজ।
কোলরিজ, ওয়্যর্ডজওয়্যর্থের তুলনায় ঢের কম লিখেছেন, এক-দশমাংশ হয় কি না হয়—‘এক্সক্যর্ঝন’ বা ‘প্রেল্যুড’-এর আকার-প্রকারের কোনো বড় রচনা তো একটাও নাই কোলরিজের; মাত্র তিন কি চারটি কবিতা তাঁকে চিরস্মরণীয় ক’রে রেখেছে। তো কোলরিজ যে ওয়্যর্ডজওয়্যর্থের থেকে বেশি জনপ্রিয়— কি সেকালে কি একালে— তাতে সন্দেহ নাই, কিন্তু তিনি কি তাই ব’লে ডবল্যু ডবল্যুর থেকে বড় কবি? আমি বলব, ডবল্যু ডবল্যু ম্যারাথন দৌড়বাজ হ’লে এস টি কে ১০০-মিটার। ১০০-মিটার বিজেতা স্টেডিয়াম ফাটিয়ে ফ্যালে, ম্যারাথন দৌড়-শেষে দৌড়বাজের দশটা হাততালি জোটে কি জোটে না; কিন্তু একজনের পিছনে থাকে ২৬ মাইল, আরেকজনের ১০০ গজ।
তো শামসুর রাহমান দীর্ঘ দমের, শক্তি ধ’রে রেখে-রেখে দৌড়ানো কবি; আর আল মাহমুদ ছোট পাল্লায় বিদ্যুদ্গতি, চোখ-ঝলসানো, নিপুণ— এ-ই আমার কাছে আমাদের এই দুই বড় কবির প্রধান পার্থক্য। তো এ-দুইয়ের কাকে রাখতে কাকে ফেলতে আমি চাই? আমার দু’জনকেই লাগে। বাংলাদেশের, দু’জনকেই লাগে।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে ষাটের উন্মাতাল,বর্হিমুখী, বিষণ্ণ, কখনো অথর্ব রাজনৈতিক কবিতার পরে,সত্তরের স্লোগানধর্মী কবিতার দীর্ঘ অপচয় ও সৃষ্টিহীনতার পর আশি দশকে এসে বাংলাদেশ প্রকৃত কবিতার চাষবাস করেছে,কবিতা কবিতায় স্থিত হয়েছে। যদিও তা ঘটেছে বিশ্বব্যাপী কবিতার পাঠ, কবিতার বাঁকবদল,নতুন নতুন থিওরির হাত ধরেই। আশি দশক/নব্বই দশকের কবিরা কীভাবে এটি করল?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: অমন একরৈখিকভাবে ইতিহাসকে দেখতে আমি পারি না। কোনো সময়ের গায়ে যেখানে দশকের ছাপ লাগাতেই আমার আপত্তি, সেখানে আবার সেইসব দশকের গায়ে একেকটা রেশন কার্ডের নম্বর বসিয়ে দেওয়া তো অভাবনীয় আমার পক্ষে। আমাদের, প্রকৃত-সমালোচকহীন দেশের এরণ্ডবৃক্ষেরা ও-সব ক’রে থাকে নিজেদের পাঠ আর বোধের দৈন্য ঢাকতে :— ও, সত্তরের কবি?— স্লোগান। আশির কবি?— রাজনীতিবিমুখ। ইত্যাদি।
এমন কোনো নিরঙ্কুশ, নিষ্কলঙ্ক সময় আসলে আসে না বড়একটা। পৃথিবী তো জাহান্নাম বা জান্নাত নয়। আমরা যুগ ব’লে চিহ্নিত করি যে-সময়গুলিকে, তাদের প্রধান যে-চেহারা, তার আড়ালে কিন্তু অন্য নানা আরও অনেক চেহারা মুখ লুকিয়ে থাকে— থাকেই, যারা শুধু যে প্রধান চেহারাটির মতো নয়, তা-ই নয়, তারা একেবারেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্পর্কে জড়িত ঐ প্রধান চেহারার সঙ্গে। এবং এও হামেশা সত্য যে ঐ-সকল অপ্রধান (“মামুলি” অর্থে নয়) চেহারাগুলোর প্রেক্ষাপটের বাইরে প্রধান চেহারাটাও হয়তো প্রধান হ’য়ে ফুটে উঠতে পারত না।
আবার দেখা যায় যে এই কালে যা কীনা একটা গৌণ স্রোত, পরের যুগে সে-ই মুখ্য হ’য়ে উঠেছে। তুমি আমি ইংরাজির ছাত্র যেহেতু, ইংরাজি কবিতার থেকেই উদাহরণ টানি? এলিজাবেথান রোমান্টিসিজমকে প্রায় মাটি-চাপা দিয়ে দিয়েছিল এক দিকে মিল্টনের ক্ল্যাসিসিজম ও অন্য দিকে ড্রাইডেন-পোপের নিওক্ল্যাসিসিজম, ঠিক তো? কিন্তু এই সময়টায় কি রোমান্টিসিজম ম’রেই গেছিল একেবারে? নাকি ব্লেইক, টমসন, গ্রে, বার্নজ— এঁদের মধ্যে দিয়ে তার টিমটিমে লণ্ঠনটাকে জ্বালিয়ে রেখেছিল, যা কীনা রোমান্টিক রিভাইভালে আবারও মূলধারা হ’য়ে উঠবে? এমনকি যে মিল্টন, তাকেও খতিয়ে দেখলে একটা রোমান্টিক চেহারা কিন্তু তাঁরও প্রধান চেহারাটির নীচে দেখা যাবে…
তো ষাট-সত্তরে অনেক— যাকে বলে “লাউড” কবিতার ফাঁকে-ফাঁকেও অন্য ধারার কবিতার চকিত চাউনি কি আমরা হামেহাল দেখি নি? দেখি নি, এমনকি, যাঁদেরকে বিশেষভাবে মুক্তিযুদ্ধের কবি ব’লে বলা হ’য়ে থাকে, তাঁদেরও অনেকের (যথা রফিক আজাদের) মধ্যে?
আর আশি-কে কিছু বাড়তি মহিমা প্রদানের একটা রাজনীতি আমি লক্ষ ক’রে আসছি বেশ-ক’দিন। আশি নিজেই একটা মহাযুগ হ’য়ে দাঁড়াতে না-পারলে, কারু-কারুর “যুগন্ধর” শিরোপা খ’শে পড়বার আশঙ্কা তৈরি হয় বোধ হয়।
তবে একটা কথা খেয়াল করা দরকার। কয়েকজন তুলনামূলক লেইট-স্টার্টারকে (যথা খোন্দকার আশরাফ হোসেন বা মঈন চৌধুরী) বাইরে রাখলে, আশি-র বেশিরভাগ কবির পক্ষেই সরাসরি মুক্তিযোদ্ধা (বা রাজাকার) হবার সম্ভাবনা ছিল না। যুদ্ধ আর স্বাধীনতার সময়ে এদের বয়স গড়পড়তা পাঁচ থেকে পনেরোর মধ্যে তখন, যুদ্ধের স্মৃতি হয়তো কিছু ছিল তাদের, কিন্তু তা শৈশব-কৈশোরের— যত-না আতঙ্কের, তারও চেয়ে বেশি খেলার, বালকোচিত উৎসাহের, উত্তেজনার। ষাট-সত্তরের কবিদের, স্বাধীনতা-কেন্দ্রিক প্রবল, সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্তি এদের থাকবার কথা নয়। অন্য দিকে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির ন্যক্কারজনক চেহারাটা আবার তারা দেখেছে বেড়ে উঠতে-উঠতে, একাধিক রেজিসাইড (দেশপ্রধানদেরকে রাজা ভাবা গেলে), সামরিক অভ্যুত্থান ও শাসন, রাজনীতিকদের মুহুর্মুহুঃ লেবাস-বদল, অভাবনীয়, নগ্ন মিথ্যাচার, ব’লে-ক’য়ে পুকুরচুরি, ইত্যাদি-ইত্যাদি…। শুভদিন আসবে, বাংলার মানুষের প্রকৃত মুক্তি ঘটবে— এইসকল রঙিন রোদচশমা তাদের চোখে ছিল না; আর সে-সব নিয়ে উত্তেজিত হবার মতো মনও আর ছিল না। ফলে শিল্পের দিকে সম্পূর্ণ নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকাবার কিছু বাড়তি ফুরসত তাদের হয়েছিল বোধ হয়। ষাট-সত্তরের প্রধান স্রোতটিকে এড়িয়ে বরং চোরা-স্রোতগুলিকে তারা লক্ষ করল যে, এটা হয়তো ভবিতব্যই ছিল তাদের। রাজনৈতিক কবিতার মূল মোটা ধারাটা ছড়াকারদের সঙ্কীর্ণ খাতে ধুঁকতে-ধুঁকতে বইতে শুরু করল— সে যে আবারও বাংলা কবিতার তক্ততাউশ দখল করবে না কোনোদিন, সেটা হলফ ক’রে বলা যায় না। বাংলাদেশ ব’লেই যায় না।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তোমরা যখন আশির দশকে লেখা শুরু করলে তখন পশ্চিম বঙ্গের ৭০/৮০ দশকের রণজিৎ দাশ, মৃদুল দাশগুপ্ত, জয় গোস্বামী, জয়দেব বসু, জহর সেন মজুমদার ইত্যাদি জনপ্রিয় কবিরা কি তোমাদেরকে প্রভাবিত করেনি? সেই সময়ের মধ্যবিত্তের রান্নাঘর আর গৃহবধূদেরকে নিয়ে লিখিত গৃহপালিত, আবার কখনো কামতাড়িত লিরিক্যাল রসঘন কবিতার পাশাপাশি জয় গোস্বামীর ব্যাধিগ্রস্ত জীবনের (উন্মাদের পাঠক্রম) প্রলাপ পদ্যমালা বা ভুতুমভগবান জাতীয় কুহকতাড়িত কবিতার ছাপ তোমার ভেতর না থাকলেও বিষ্ণু বিশ্বাস, শোয়েব শাদাব, শান্তনু চৌধুরী, সাজ্জাদ শরিফ, সৈয়দ তারিক এরকম অনেকের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। এটি কেন হয়েছিল? তোমরা কি কোনো রাস্তা পাচ্ছিলে না? এ সম্পর্কে তোমার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাই।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ:সব যুগেই হয়তো, তরুণ লেখকদের একটা বিশেষ সমস্যাকে মোকাবেলা করতেই হয় : “আমরা কেমন লিখতে চাই এবং চাই না”। আমাদের ক্ষেত্রে, কেমন লিখতে চাই না তা হয়তো আমরা নিজের-নিজের মতো ক’রে জানতে পেরেছিলাম, কিন্তু কেমন লিখব, তার কোনো স্পষ্ট দিঙ্-নির্দেশনা প্রথম দিকে আমাদের তেমন ছিল না। তো আমাদের একটু আগের, পশ্চিমবঙ্গীয় কবি-রা, যেমন শক্তি, শঙ্খ, বিনয়, উৎপল, রণজিৎ, অনন্য, জয়, মৃদুল, গৌতম (চৌধুরী), প্রসূন—এঁরা আমাদের একাংশের (বিশেষ ক’রে ‘গাণ্ডীব’ গোষ্ঠির) রোল-মডেল হ’য়ে দাঁড়িয়েছিলেন তখন। এঁদের কবিতা আমি অল্পবিস্তর পড়েছি, এবং তোমার মতো খারিজি সরলীকরণে চ’লে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না আমার পক্ষে। বাংলা কবিতায় এত নানা সুর এঁরা বাজিয়েছেন যে মুগ্ধ না-হবার অভিনয় করবার তৌফিক আল্লাহতা’লা আমায় না-দিলেই আমি বাধিত হ’ব।
তবে আমার ক্ষেত্রে যা আমি শাপে-বর বিবেচনা করি, তা হ’ল, হ’য়ে ওঠার ঊষালগ্নে এঁদের সঙ্গে আমার তাদৃক্ চিন্-পরিচয় ঘ’টে ওঠে নি—তারিকের পেড়াপিড়িতে মাঝেসাঝে আড়নয়নে তাকানোটুকু-ছাড়া।
তবে, এই কবিদের কাছেই আমরা—আমিও—একটা জিনিস হাসিল করতে পেরেছিলাম : প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা। না, সে শুধু অমুক কাগজে লিখব, তমুকে লিখব না—এই গণ্ডিবদ্ধ চিন্তার কথা নয়; বরং এই প্রতিষ্ঠানবিরোধ, এ ছিল আমাদের জীবনচর্যা। অবশ্য আমাদের সবাই যে কায়মনোবাক্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী ছিল তা কিন্তু নয়। অনেকেই শুধুই অভিনয় ক’রে গেছে, প্রতিষ্ঠানের নিরাপদ্ দুর্গে অবস্থান পাকা করতে পারা পর্যন্ত…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমি তো পশ্চিম বঙ্গের এইসব কবিদেরকে খারিজ করি নাই। আমি খারিজ করার কে? শুধু তাদের বিশেষ প্রবণতাগুলির কথা বলছি।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আশি দশকে প্রকাশিত তোমার প্রথম কবিতার বই ‘তনুমধ্যা’— বাংলাদেশের কবিতার ভুবনে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এটির প্রকাশের ইতিহাস বলো। আমার কাছে মনে হয়েছে টেকনিকেলি এই বইটির উপর এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যাণ্ড’-এর একটি পরোক্ষ ছায়া রয়েছে। বিশেষত এর গঠন-প্রণালীটা তা মনে করিয়ে দেয়। যতটুকু জানি এটা লেখার সময়ে তুমি ইংরেজি বিভাগের ছাত্র। এর সাথে তোমার এলিয়ট পাঠের কোনো যোগসূত্র আছে?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: হ্যাঁ, ডিপার্টমেন্টে থাকতেই বইটার সবটুকুই লেখা হয়েছিল, কয়েক বছর ধ’রে, আরআবারও হ্যাঁ, ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ সে-সময় আমার উপর যথেষ্ট কর্তৃত্ব করত। ‘তনুমধ্যা’-র কবিতাগুলির পরিকাঠামো এলিয়টেরই, কিন্তু ভিতরে যা আছে তা আমার। কাঁচা— তবু, আমারই। বলা দরকার যে একই সময়ে প’ড়ো জমি-র অনুবাদও আমার হাত থেকে বেরুচ্ছিল, দু’টোরই অধিকাংশ (মনে আছে তোমার?) ডিপার্টমেন্টের করিডরের রেলিং-এ দুই পা তুলে দিয়ে, বিপজ্জনকভাবে ব’সে-ব’সে…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তোমার কবিতায় প্রায় সময়ই বিভিন্ন রকমের ইতিহাস,ধর্ম বিশ্বাস,দেশি–বিদেশি পুরাণ,সঙ্গীত, লোকায়ত কাহিনি ইত্যাদির বিরাট একটা যজ্ঞ থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয় আমি হয়ত কোনো চর্যাপদ বা কালিদাস আমলের কবিতা পড়ছি। কখনো মনে হয়েছে এটি তোমার স্টাইলকে একটি জায়গায় আবদ্ধ করে রেখেছে। নাম দেখেই বলা যায় যে তুমি কবিতায় কি বলতে চাও। আবার একসময় দেখি তুমি এমন সব শব্দ ব্যবহার করো যে এগুলি বুঝতে হলে অভিধান বা রেফারেন্স বইয়ের সাহায্য নিতে হয়। আমার কাছে— এটি কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের একই সাথে শক্তি আর দুর্বলতা মনে হয়। এই বিষয়টি কি তোমার সহজাত না ইচ্ছাকৃত?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: তোমার এই প্রশ্নের কোনো জবাব হয় না, কারণ এতে তোমার নিজের পাঠরুচির বিষয়েই বলা হয়েছে, আমার লেখার নয়। মানে, বলা হচ্ছে তুমি আমার কবিতা কীভাবে পাঠ করছ, বা তোমার সমমনা কোনো পাঠক কীভাবে আমার কবিতা পাঠ করতে (বা না-করতে) পারে। আর স্টাইল বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, আমি স্টাইলে বিশ্বাসী না, মানে নিজের ক্ষেত্রে। আমি অনেক রকমের কবিতা লিখতে চেয়েছি, এখনও চাই। আর, কবিতার কাঁচামালকে স্টাইল বলা যায়ও না। আমার কবিতায় যে-যে-উপাদানের কথা বললে, সেগুলি তোমারও কবিতায় আছে, সজ্ঞানে তাদের ব্যবহার করো বা অজ্ঞানে। তোমার “অভিজ্ঞতা” (মনোদৈহিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক) তোমার লেখায় প্রতিফলিত হবেই, তুমি তাদেরকে লুকিয়ে ফেলতে চাইলেও হবে… তো আমার কবিতায় যা-কিছু আসে বার-বার… তারা আমার অভিজ্ঞতার অংশ ব’লেই আসে, আমার বাইরে থেকে আসে না… কোথাও কোনো যোগসূত্র থাকেই…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তুমি কি তাহলে কবিতায় অনুভব বা বোধকে গুরুত্ব দাওনা? মানে অনুভবের হাত ধরে অজানা একটি বোধ কি তোমার ভেতর কাজ করে না? তোমার বিষয় কি আগে থেকেই জানা থাকে?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ:আমি যদি স্বয়ং কবিতা হতাম, তাইলে অনুভবকে গুরুত্ব দিতাম না; কিন্তু আমি তো মানুষ, কবিতা লিখি বা না-লিখি, তাই অনুভবকে গুরুত্ব না-দিতে হ’লে যথেষ্ট পরিমাণ গোরুত্ব আমাকে অর্জন করতে হ’ত।
অনুভব, বোধ, চিন্তা, যা-কিছুই বলো, এ-সবই কবিতার কাঁচামাল, কবিতা নয়—ইনপুট, আউটপুট নয়। কবিতায় যা থাকে তা, চোখের তরফে কতগুলি হরফের বিন্যাস, আর কানের তরফে একটা ধ্বনি-সমবায়। বোধ, অনুভব, এ-সব থাকে কবি-র ও তার পাঠকের মনে—কবিতায় নয়। কবিতা যেন—এক যুদ্ধবন্দি সঙ্কেতলিপি পাঠিয়েছে আরেক যুদ্ধবন্দিকে। একজন এনকোড করছে, আরেকজন করবে ডিকোড। তো লিপিটা যত সুলিখিত হবে, ততই আরও বেশি অর্থবহ হ’য়ে ওঠবার সম্ভাবনা তৈরি হবে তার।
আর দ্যাখো, আমাদের ভাষার সঙ্গে ভাবের কোনোই সাক্ষাৎ-সম্বন্ধ নাই। দেরিদা না-প’ড়েও এটা বোঝা যায়। তো কথা বলা-মাত্রই যেখানে একপ্রকার অনুবাদ-কর্ম, কবিতা লেখা তো তার থেকে ঢের বেশি তা-ই। তো কবিতার রচনা-প্রক্রিয়ায় রচনা-প্রক্রিয়াই মুখ্য বিবেচনার বিষয়, বোধ বা অনুভব নয়—মানে সে-সব তো আছেই যথাস্থানে, কিন্তু সেটাকে যদ্দূর পারা যায় অন্য আরেক মনে সঞ্চারিত করতে পারার জন্য কারিগরি দক্ষতার দরকার করে। যেমন ধরো—আমি জোক বললে ইমন ভুরু কোঁচকায়, কিন্তু একই জোক আসিফ বললে সে কুমড়া-গড়াগড়ি দেয়—কেন? জোক তো একই? এমনও না যে আসিফের রসবোধ আমার থেকে অনেক বেশি উন্নত মানের… কিন্তু চুটকি বলার কায়দাটা সে রপ্ত করেছে, আমি করি নাই… তো কজ এক থাকা সত্ত্বেও ই্যফেক্ট আলাদা হচ্ছে। একই বিষয় নিয়ে লিখলেই সবার লেখা একই হয় না, আর গান গাইতে গিয়ে যারা ভাবাতিশয্যে হাউমাউৎকার করে তারাই শ্রেষ্ঠ গায়ক এমন ভাববারও অবকাশ বাড়ন্ত।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তুমি ভাষার শুদ্ধতা,ব্যাকরণ,কবিতার প্রকরণ, বিশেষত ছন্দ, বিষয়ে অতিমাত্রায় যত্নশীল। আমার মনে হয়েছে তুমি কবিতায় খুবই রক্ষণশীল গোছের। একদম আভিধানিক শব্দ বা বাক্য প্রয়োগ চাও। মানে তুমি একটি প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর ভেতর থেকে সবকিছু দেখছ,নির্মাণ করছ বা যাচাই বাছাই করছ। সৃষ্টিশীলতা আর এই নির্মিত শাস্ত্রীয় কাঠামোর মধ্যে তো একটি ব্যবধান আছে। সৃষ্টি প্রাকৃতিক আর তার ডেকোরেশন কৃত্রিম। তাই সৃষ্টিশীলতায় শুদ্ধতা কিছুটা আপেক্ষিক,অনিবার্য নয়। এর মধ্যে ভুল করারস্বাধীনতাআসলে শিল্পকে একটি প্রথম নিষ্পাপ অস্তিত্বের অধিকার দেয়। যার থেকে আমরা সম্ভাবনা পাই,পাই প্রথম জীবনের সৌন্দর্য। এ সময়ে তোমার এই গ্রামার মনস্কতা আমার কাছে মাঝে মাঝে কবিতায়,এক ধরণের পিউরিটানিজমের প্রতিষ্ঠা ও অত্যাচার বলে মনে হয়। এই বিষয়টি তুমি কিভাবে দেখ।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: এই প্রশ্ন, বা অভিযোগ, আরও নানাভাবে অনেকবার শুনতে আমাকে হয়েছে, এবং এ নিয়ে বিস্তারিত বলবার দরকার আছে মনে হয়। আর সেটা ঠিক আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য নয়, বরং শিল্প নিয়ে, কবিতা নিয়ে, আমার নিজস্ব বীক্ষণটাকে সামনে আনবারই স্বার্থে— নিজেরই সঙ্গে বোঝাপড়া করতে যেন…
প্রথমেই জনান্তিকে ব’লে নিই যে তোমার প্রশ্নটি, আরও অনেকেরই প্রশ্নের মতো, অনেকটাই উপরিতলের, অনেকটাই আংশিক পঠনের ফসল। আমি এক ধরনের কবিতা লিখি নি, একটামাত্র পোয়েটিক মেথডের ঘানি টানি নি; ছন্দ-ব্যাকরণের আনুগত্যই করি নি কেবল, তাদের নিয়ে খেয়ালি খেলাও বিস্তর খেলেছি। তবু, তোমার কথাগুলি যথাযথ, এটা ধ’রে নিয়েই পরের কথাগুলি বলব।
প্রথমেই প্রশ্ন আসে : ব্যাকরণ কী, এবং ছন্দ কী। তারা কি আসলেই ভাষার প্রকাশের পথে বাধাস্বরূপ? হয় যদি, কীভাবে? নাকি তারা বরং প্রকাশকে সার্থক ও সুষ্ঠু ও আরও অর্থপূর্ণ ক’রে তোলবার হাতিয়ার?
অবশ্য ব্যাকরণ বলতে তুমি ভাষার ব্যাকরণকে বোঝাচ্ছ, নাকি স্টাইলের ধ্রুপদিয়ানাকে, তা স্পষ্ট নয় আমার কাছে। পরেরটা হয় যদি তো তা অন্ততঃ আমার লেখালিখির সাথে একেবারেই যায় না। ব্যাকরণের তর্কটা আপাততঃ মুলতবি রাখাই সমীচীন সে-ক্ষেত্রে। ছন্দ/গদ্য— এই ডাইকটমি-টা আদতে ভুল। লেখামাত্রই ছন্দঃশাস্ত্রের বিষয়, গদ্যও। সংস্কৃত ছন্দোবিজ্ঞানে, গদ্যও, বৃত্ত ও জাতি ছন্দের সঙ্গে, ছন্দের একটা প্রধান বিভাগ; এবং পদ্য ছন্দের মতো, গদ্যও শিখতে হয়। লেখ্য ভাষামাত্রই কৃত্রিম। যে-লেখাকে “স্বাভাবিক”, “স্বতঃস্ফূর্ত” মনে হয়, তা পাঠকের তরফেই শুধু তাই, লেখকের নয়। ঐ “স্বাভাবিকতা” সচেতন প্রয়াসের ফসল, অমনি-অমনি কাগজে গজিয়ে-ওঠা কিছু নয়। নিজের লেখনির উপর নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে কমিয়ে দিলে লেখা সবচেয়ে “স্বাভাবিক” হয় না, সবচেয়ে অস্বাভাবিক হয়, এটা দাদাবাদীদের বেলায়, স্বতোলিখনের নানা নিরীক্ষায়, ভূরি-ভূরি দেখা গেছে (এই অধমও সেটা চেষ্টা ক’রে দেখেছে অনেক)।
আবার, ছন্দ পুরানো দিনের রদ্দি মাল, গদ্য ঝাঁ-চকচকে আইপ্যাড ফোর, এও এক গৎ-বাঁধা ধারণামাত্র। পৃথিবীর প্রাচীনতম শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলির সিংহভাগ গদ্যে, বা গদ্যোপম পদ্যে, লেখা। এমনকি আধুনিক গদ্য কবিতারও বয়স বড় কম হয় নি। ইংরাজিতে রোমান্টিকদেরও পুরোবর্তী ক্রিস্টফার স্মার্ট গদ্যে কবিতা লিখেছেন, উইটম্যানের কথা বলা বাহুল্য… বাংলায়ও, সেই রবিঠাকুর থেকে… আজ আর গদ্যকে আলাদাভাবে নোতুনকিছু বলবার জো থাকবার কথা না, বরং বেশ কিছুকাল গদ্যাভ্যাসের পর, পদ্য ছন্দকেই পুনরাবাহন করা যেতে পারে নোতুন বা নূতনীকৃত একটা মাধ্যম ব’লে। ছন্দ না-জেনে তাকে অবজ্ঞা করে যে, সে হয় অক্ষম নয় তো অলস; ছন্দ জেনেও তাকে বর্জন করে যে, বা তাকে ভাঙতে উদ্যত যে হয়, তাকেই এ-সকল মন্তব্যের লায়েক ব’লে মানতে হয়।
ছন্দের ব্যাপারে জাতিগত প্রবণতার কথাও বিবেচনায় রাখতে হবে। বাংলায় গদ্যের ঐতিহ্য বেশিদিনের নয়। ইংরাজের প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলা গদ্যের নমুনা খুব বেশি পাওয়া যায় না, যা-ও যায় তার সিংহভাগ এক বিভীষিকা। বাঙালির রক্তের ভিতর থেকে গেছে যুগ-যুগ ধ’রে রাতভর পুথি শোনার অভ্যাস। কবিতাকে গদ্যে শোনবার (মানে পড়বার) ক্ষেত্রে তাই তাদের একটা মানসিক প্রতিবন্ধ থেকেই যায়, কি পাঠকের কি কবির তরফে। তো যাতে আমাদের কানই সাড়া দেয় না, প্রাণ কী দেবে।
গদ্যের বাড়াবাড়ি, নোতুন-কিছু-করো’র তাড়াহুড়া— এ-সবই পশ্চিমের বাতিক। ওরা অমনভাবেই বড় হয়েছে, সেরেনডিপিটি ওদের মজ্জায়— আমাদের তো সেই কৃষ্টি নয়, আমাদের শিল্প এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষে, গুরু-শিষ্য-পরম্পরায় গড়ায়, যা-কিছু ভালো আর নোতুন, তা ঐ চির-পুরাতন-চির-নূতনেরই ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে, আসে স্থায়িভাবে, পপগায়কের মতো ক্ষণপ্রভার রূপে নয়, ঘরানাদার খেয়ালিয়ার মতো। পশ্চিমের অনুকরণ ক’রে আমরা পশ্চিমের অপটু আর হাস্যকর তোতাপাখি বড়জোর হ’তে পারি, তাদের অন্যতম কখনও হ’ব না।
ছন্দোবর্জন বাংলা কবিতার জন্য স্বাভাবিক নয়, এবং এর দ্বারা যে-ক্ষতিটা আমাদের হ’য়ে গেছে তা হ’ল, এককালে কবিতা না-লিখেও কেউ-কেউ কবিতা পড়ত— এই বিশুদ্ধ পাঠক-শ্রেণিটি বিলুপ্ত হয়েছে বিলকুল। আজকে কবিরা ছাড়া কবিতা কেউ পড়ে না। আসলে কবিরাও পড়ে না। কবিতা কেবলই লেখা হয়। কেবল লেখা-ই হয়।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তোমার কথাসূত্রে বলছি— ছন্দ সম্পর্কে আমারও একটি ব্যক্তিগত বিশ্বাস, দর্শন আছে। আমি মনে করি পৃথিবীতে সব কিছুরই একটি গঠন আছে, একটি ভিত আছে। মানুষের শরীরকে যেমন হাড় একটি অবলম্বন দেয়, তেমনিভাবে কবিতারও একটি গঠন বা ছাঁচ লাগে— যার উপর ভর করে কবিতা দাঁড়ায়। কিন্ত শুধুমাত্র হাড়ের সুবিন্যস্ত ক্রাফটসম্যানশিপ যে মানুষকে মানুষ আকার দেয় না, তাকে বাঁচার বা চলার কোনো শক্তি দেয় না, তার জন্য যেমন একটি প্রাণ আর রক্ত লাগে, তেমনিভাবে কবিতার ফর্মের সাথে প্রধান জরুরি বিষয় তার প্রাণ, তার রক্তকণিকা।কবিতার এই প্রাণ হচ্ছে— কবিতার ভাব, চিন্তা, কল্পনা ও কবিতার বিশেষ নতুন ভাষাভঙ্গি। আবার কবিতার জন্য শুধু ছাঁচ তৈরি করলেই শেষ হল না, তার সাথে প্রয়োজন কিছু ভাষাটেকনিক— যেমন অনুপ্রাস, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, পান, এপিগ্রাম, চিত্রকল্প, ছন্দ ইত্যাদি ইত্যাদি।এইসব টেকনিকের মধ্যে যেটি কবিতার সহজাত তা হল এর সাথে আসা একটি দোলা বা ছন্দ। একটি শব্দকে উচ্চারণের গতি ধরে এই দোলার সৃষ্টি হয়। এই বিশেষ দোলাকে আবিষ্কার করতে হলে একজন কবিকে তার কানের ফ্রিকোয়েন্সিকে বাড়িয়ে দিতে হয়। পড়ার সময় কোথায় উচ্চারণে কানে খটকা লাগছে কি না—তীক্ষ্ণ কান তা বলে দেয়। কারণ কবিতার নির্মাণ চায় প্রকাশিত ভাব আর প্রবাহিত ধ্বনিপ্রবাহের মধ্যে একটি ব্যালান্স। তাই মনে যা আসে তাই কবিতা আকারে বলার কোনো স্কোপ নেই। এই ভাব আর তার সাথে আসা দোলাটাকে কেউ কেউ বাঙলা কবিতার প্রধান তিন ছন্দের একটিতে বাঁধতে পারেন, আবার নাও পারেন। এটি সম্পূর্ণই কবির ইচ্ছা। এর মধ্যে কোনো জোরজবরদস্তি চলে না। কারণ কবিতা একান্তভাবে, প্রথমত কবির একটি বিমূর্ত ভাব, একটি হঠাৎ হয়ে ওঠা ধরেই জন্ম লাভ করে বলে এর প্রধান অবলম্বন কবির কল্পবিস্ময়, কবির ভিশন, শব্দের ধ্বনিতাললয় নয়। একটি নির্ধারিত নিয়ম যা কবিতার তাল বা লয় নির্ধারণে সহায়ক— তা কবিতার মর্যাদা বিধানে ক্যাটালিস্টের ভূমিকা পালন করতে পারে না, এটি একটি কবিতার শক্তিকেও পরিচয় করিয়ে দেয় না। কবিতার শক্তি কবিতার বিশেষ প্রকাশে, তার ভাষার বিস্ময়ে। সমাজ বা যুগ পরিবর্তন তথা মানুষের মস্তিস্কে চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের সাথে সাথে ভাষা সম্পর্কিত স্ট্যাটিক এই ছন্দ প্রয়োগের ধারণাও পাল্টায়। তাই এটি কোনো কবিতার পেটেন্ট নিয়ে কবিতার এক চেটিয়া অধিকার দাবি করতে পারে না।
আসলে যে বিষয়টি দেখতে হবে সেটি হল— কবিতাটি কোনো বিশেষ অনুভূতি (যা কিছুটা হঠাৎ করে প্রাপ্ত) এর উপর দাঁড়াল কি না, কবিতাটি পাঠে পাঠকের কানে বাঁধা না পেয়ে তরতর করে এগিয়ে গেল কি না। কারণ কবিতা একটি কেওটিক ভাব-ভাবনার মধ্যে সৃষ্টি হলেও এর প্রকাশপ্রতিষ্ঠান নিশ্চিত হয় এর একটি নির্ভার উপস্থাপনার উপর। তাই শাস্ত্রীয় ছন্দ হোক বা কবির স্বতঃস্ফূর্ত ভাষাবাহনের কারণেই হোক— একে দিতে হবে একটি মসৃণ গতি। কবিতা নির্মাণে ছন্দ একটি বিবেচনার বিষয়, তবু শুধু ছন্দ দিয়েই কবিতা লেখা যায় না। যদি তাই হতো তাহলে বাংলার ছন্দের অধ্যাপকেরা রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বড় কবি হয়ে পড়তেন। কবির প্রাথমিক ভিশন (একটি স্বপ্ন, বস্তু বা অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত একটি ইম্পালস থেকে উদ্ভূত একটি বিশেষ অনুভূতি) পাওয়া থেকে কবির ভেতরে প্রথম একটি কবিতা-বীজের জন্ম হয় তখন সেই কবিতার ভাষা সেই ভিশন, তার সেই ড্রিমি আলোবিন্দুর উপর ধীরে ধীরে তার ঘরবাড়ি তৈরি করে। কবির ভিশন পাওয়ার মুর্হূতের সাথে কবিতার এইসব টেকনিকের একটি গভীর কিন্তু অদৃশ্য বিনিময় সম্পর্ক, একটি শর্তহীন মিলনপ্রক্রিয়া ঘটে থাকলে একটি রচনা ভালো কবিতা হয়ে উঠতে পারে। কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন ও ঘোড়া কিংবা আল মাহমুদের কবিতা এমন, শামসুর রাহমানের রূপালি স্নান কবিতাগুলি এরকমের। ছন্দ নয়, তাদের এই বিশেষ ড্রিমি, ভিশন পাওয়া পরিবেশনের জন্যই কবিতাগুলি আমাদের কাছে আজো এক বিস্ময়ভরা অভিজ্ঞতা।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ:ছন্দ “দিয়ে” কবিতা লেখা হয় না বা কবিতায় ছন্দ “দেওয়া” হয় না। অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ-এর মতো, ছন্দ কবিতার “অলঙ্কার” নয়। গানের সঙ্গে তুলনা দিয়ে বলা যায়, তান-গমক-মিড়-সুঁৎ-সরগমের সঙ্গে যেমন গানের লয়-তাল বা টেম্পো-বীট-কে গুলিয়ে ফেলা ঠিক নয়। ছন্দকে বরং বলবার একেকটা ধরন বলা যায়, তার কোনোটাকে অক্ষরবৃত্ত, কোনোটাকে আবার মাত্রাবৃত্ত নাম দেওয়া হয়েছে, কোনোটাকে গদ্য। আমাকে যদি ধ’রেই নাই যে অক্ষর-মাত্রা-স্বর না-দেখলে আমি যে কোনো রচনাকে পত্রপাঠ বিনে “ইটা মারি”, হয়তো বড়ই ভুল করবে। আমার প্রিয়তম পাঁচটি বাংলা কবিতার নাম করতে হ’লে, রবীন্দ্রনাথের ‘আমি’ আর জীবনানন্দের ‘হাওয়ার রাত’-এর নাম তাতে আসবেই। এগুলো গদ্যে লেখা। অমিয় চক্রবর্তীর না-পদ্য-না-গদ্য কত কবিতা, রণজিৎ দাসের কত কবিতা, খোদ ছন্দোগুরু জয় গোস্বামীরও কত অবিশ্বাস্য গদ্য কবিতা, বিষ্ণু বিশ্বাসের ‘আনন্দধ্বনি জাগাও’ বা ‘নীল কৈ’ বা ‘ভোরের মন্দির’… কত বলব। কিন্তু যেহেতু গদ্য এবং মুক্তকও ছন্দই আমার কাছে, আমি তাই বলি, ছন্দ-ছাড়া কবিতা হয় না।
আর— যে-রক্তমাংসমজ্জার কথা বলছ কবিতার, তারা কিন্তু হাড়ের কাঠামোটার বাইরে থাকতে পারে না। তার মানে এ নয় যে কবিতার কঙ্কালকে আমি কবিতা বলি; শুধু বলি যে কঙ্কালটুকু না-থাকলে চলেই না।
ছন্দের অধ্যাপক কী জিনিস জানি না, তবে ছান্দসিক-মাত্রই বড় কবি হবে না, এটা তো স্বাভাবিক; বড় কবিকে কিন্তু ছন্দঃপ্রাজ্ঞ হ’তেই হবে, তা তিনি পদ্যে লিখুন বা গদ্যে। গানের মাস্টার-মাত্রই সুগায়ক নয় ব’লে কিন্তু বলা যাবে না যে গান শেখবার কোনো দরকার নাই। সুগায়ককেও গান শিখেই আসতে হয়।
ধর্মভীরু জাতি আমাদের। সবারই প্রত্যাশা মিরাকলের, আসমান থেকে নাজেল হওয়া সহসা-সৌভাগ্যের, লটারি জেতার— পরিশ্রম এড়াবার পরিশ্রমে গলদ্ঘর্ম নন্দলালের নন্দনেরা…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমি সব সময় লক্ষ্য করি,যে এখনকার কবিতায় বিভাগওয়ারি হোক আর দশকওয়ারি হোক,যখন কবিদের নাম আসছে কেউ কেউ শুধু মাত্র হাতে গোনা দুই–চার জনের নাম উল্লেখ করে বা নিজস্ব দলভুক্ত কবিদের নাম বলে দেয়। যেমন কিছুদিন আগে কবি মাসুদ খান এমনটি করছেন। তার সাক্ষাৎকারে তিনি দুই তিনটি নাম যেমন সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ, ব্রাত্য রাইসু বা তারই দলের অন্য কারো নাম তিনি ঘুরে ফিরে উচ্চারণ করেছেন। তার ফলে মনে হয়েছে বাংলাদেশে আর কেউ কবি নন। এবং এটি বারবার হচ্ছে। মানলাম যে জনপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত মিডিয়াতে যারা আছে তারা এই কবিদের পরিচিত,বন্ধু বা সাগরেদ। কিন্তু এটিকে একটি পরিকল্পিত সাহিত্যিক অসততা,বা সাহিত্যিক জেনোসাইড বলে আমার মনে হয়েছে। এর ফলে পাঠক বাংলাদেশে যে আরো প্রতিভাবান আর শক্তিশালী কবি আছেন— তা জানতে পারছে না। তোমার এই বিষয়ে মতামত কী?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: আমার এ-বিষয়ে কী মত এর আগে আরেক সাক্ষাৎকারে তা বলেছি। কোনো একজন মানুষের, একই কালের কয়েকশ’ কি কয়েক হাজার কবি একই সঙ্গে প্রিয় হয় কেমন ক’রে? এটাই কি স্বাভাবিক নয় যে কেউ একজন, সাক্ষাৎকারে অল্প ক’জন কবির নামই নেবেন (নেন যদি আদৌ)? তাছাড়া সাক্ষাৎকার যাঁর নেওয়া হচ্ছে, তিনি একজন ব্যক্তিমানুষ, সারা দেশের, সমাজের, বা কবি-সমাজেরও প্রতিনিধি ন’ন, সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের কথা বলতে বসেছেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করতে বসেন নি; আর সাহিত্যের ইতিহাস যাঁরা লেখেন, তাঁরাও কি কোনোই নাম বাদ দেন না, বাধ্য হ’ন না বাদ দিতে? নাকি সাহিত্য-ইতিহাস মানেই নামায়ন কাব্য?
আর নামের ফিরিস্তিতে আসলে পাঠকের কী লাভ হয়? কী লাভ হয় উল্লিখিতনাম কবির? যারা কোনো একজন কবির কবিতা পড়েই নি, তাকে জানেই না, একগাদা নামের ভিড়ে তার নামটি তারা শুনলেই কী না-শুনলেই কী? আবার যারা তাকে জানে, পড়েছে, তাদের তো নাম শোনবার কোনো দরকার নাই… বাছবিচারহীন মেলাকতক নামের উল্লেখ, উল্লিখিতদের জন্য অবমাননাকর ব’লেও ধরা যায়।
তবে, যদি বিজ্ঞাপনের অর্থে ব’লে থাকো, যেমন মাসুদ খান যেহেতু মশহুর কবি, তাঁর মুখে উচ্চারিত হ’লে নামটা অনেকে মনে রাখতেও পারে, তাতে কবিতা ছাপাবার সুবিধা হ’তেও পারে— এমন যদি হয় (বিজ্ঞাপনের, বিপণনের যুগ এইটা যেহেতু), প্রশ্ন থাকবে যে সাক্ষাৎকারদাতা তা মুফতে করবেন কেন। তাঁর মুখে নিজেদের নাম শোনাতে যাঁরা চান, তাঁদের কি উচিত হবে না তাঁকে বিজ্ঞাপন-খরচা দেওয়া? আমি মা.খা.-কে বলতে পারি পরের সাক্ষাৎকারের আগেই এফবিতে এলান করতে, তার মুখে উচ্চারিত হবার ফি কত (বা কত শব্দে কত)।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তোমাকে যদি জিজ্ঞেস করি এখনকার কয়েকজন কবির নাম বলো যাদের কবিতা তোমার ভালো লাগে। তুমি কাদের নাম বলবে?কি কি কারণে ওদের কবিতা তোমাকে টানে বলে তুমি মনে করো।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: এই প্রশ্নের জবাব আমি দেওয়া আত্মহত্যার শামিল আমার পক্ষে। যথেষ্ট গুলিগালাজ খেতে হয়েছে আমাকে এরই মধ্যে। আন্নাকালী।
তবে কয়েকটি নাম, শুধু কবি নয়, মানুষ হিসাবেও, নিতে আমাকে হবেই। এরা প্রায় সবাই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, কাজেই একে নিজের দলের ঢাক পেটানো বলা হবে আমি জানি; কিন্তু ঐ যে বললাম, শুধু কবি নয়, মানুষ হিসাবে, কবি-মানুষ হিসাবে যারা আমার একান্ত হ’য়ে আছে, তাদের নাম বলতে গিয়ে অপরিচিতজনের নাম বলি কী ক’রে?
তো, অবধান করো: ১. অসীমকুমার দাস, ২. মাসুদ খান, ৩. বিষ্ণু বিশ্বাস, ৪. ব্রাত্য রাইসু, ৫. শামিম কবির।
তার মানে কিন্তু এ নয়— আর এটা পরিষ্কার ব’লে রাখা ভালো— যে এদের বাইরে আর সব্বাইকে খারাপ কবি, খারাপ মানুষ বলা আমার উদ্দেশ্য। আরও অনেক কবি আমাকে বারে বারে স্বপ্নতাড়িত, ঈর্ষাপীড়িত, বিস্ময়স্ফারিত করেছে, ক’রে চলেছে, যথা মোহাম্মদ কামাল, ফরিদ কবির, আবু হাসান শাহরিয়ার, সৈয়দ তারিক, রাজা হাসান, রিফাত চৌধুরী, জুয়েল মাজহার, সাজ্জাদ শরিফ, শান্তনু চৌধুরী, তসলিমা নাসরিন, শোয়েব শাদাব, তাপস গায়েন, সেলিম রেজা নিউটন, সরকার আমিন, আহমেদ নকিব, সুমন রহমান, মজনু শাহ, কামরুজ্জামান কামু, মুজিব মেহদী, বদরে মুনীর… আরও কত-না জ্বলজ্বলে নাম। কামুর কাছে অনেক চাওয়া আমার; সব্বাইকে নিজের-নিজের বাজিতে মাত ক’রে দিয়ে চ’লে যাবে সে। বদরেটা কোথায় যে গেল… আর অ্যাল্টার ইগো জুয়েলের বারেমে-ই বা কী ক’ব। আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ মানে তোমার কবিতাও, দিনে-দিনে এমন খুলছে, প্রায়ই অবাক্ হ’য়ে যাই। পশ্চিম বাংলার সতীর্থদের কথাও তেমন ক’রে উল্লেখ করছি না এখানে, যদিও তাদের কবিতা আমাকে অনেক হাসি-কান্না-উল্লাস-হাহাকার জুগিয়ে চলেছে আজ কত-কত দিন। কাছাকাছি-বয়সীদের মধ্যে : জয়দেব বসু, মন্দাক্রান্তা সেন, সৌম্য দাশগুপ্ত, মিতুল দত্ত… কিন্তু এই পাঁচজনকে আমি চিনিয়ে দিতে চাই, আমার সত্তার অংশ ব’লে…
অসীমকুমার দাস-কে আজকে চেনে না কেউ, তাকে নিয়ে একটু বিশেষ :
অসীম দা-র মুখে তাঁর কবিতা যে না-শুনেছে, সে “কবিতা” শোনে নি কোনোদিন, শুনেছে শুধুই “আবৃত্তি” বা “কথা”। আমার প্রিয়তম ক’জন কবিতা-বলিয়ে আছে বাংলায় : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শম্ভু মিত্র, গৌতম চৌধুরী, অসীমকুমার দাস, বিষ্ণু বিশ্বাস, মাসুদ খান এবং মিতুল দত্ত। এদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ আর অসীম দা-ই শুধু, কোনো অর্থেই “আবৃত্তি” করে নি; মানে আবৃত্তি-শিল্পের কোনো আইন-কানুনের তোয়াক্কাই করে নি, বলে গেছে শুধু; কিন্তু— আব্দুল করিম খাঁ-র বিষয়ে ধূর্জটীপ্রসাদ যেমন ফরমান “হোয়াটএভার হি সিংজ ইজ মিউজিক,” এ-দু’জনের বাবদে অমনি বলা যায় : “হোয়াটএভার দে আটার্ড ওয়াজ পোয়েট্রি।” বিষ্ণুর গলা ছিল দেবতার, তদুপরি “স্বনন”-এ আবৃত্তিকলার কিছু তালিমও তার জুটেছিল, যা তার বাচনভঙ্গিকেও প্রভাবিত করত (রাইসু যেমন বলল একবার যে বিষ্ণু কবিতা পড়ার মতো ক’রে কথা কইত)।
কিন্তু ঐসকল অ্যাপারেটাস, যথা ভয়েস মড্যুলেশন, যদি ও দমের সুষ্ঠু ব্যবহার… এসবের কোনো ধার না-ধেরে এক সুরে এক টানে পড়তেন অসীম দা, কিন্তু যখন তিনি তা করতেন, তিনি এবং তাঁর শ্রোতারা, মায় ঘরের টেবিলে আধপোড়া মোম কি মাঠের গাছে দুপুরের নিঃসঙ্গ কাক, সব্বাই একটা মহাকবিতার একেকটা লাইন… তিনি বলতেন : “দেখা হবে, বেলাডোনা সমুদ্রের পারে,” আর আমি দেখতাম তাঁর এলোচুল উড়ছে সুগন্ধ হাওয়ায়, বেগুনি ফসফরাস-চূড়ার কালো ঢেউগুলি আছড়ে ভাঙছে তাঁর পায়ে…
আমি এই জীবনে একজন-মাত্র “সম্পূর্ণ” কবিকে দেখেছি; তিনি অসীমকুমার দাস।
তোমার কার কার লেখা ভাল লাগে?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ভালো তো লাগে কিন্তু নাম নিতে চাই না। কারণ যাদের নাম নেব ওরা তো আমার নামটি নেয় না। হিংসা করে, কু-রাজনীতি করে। এতো ভালো ভালো কবিতা লিখলাম, ২০/২২টা না, ধরো ২০০/৩০০ তো হবেই। এর মধ্যে ধর ১০০টা না হোক ১০/২০টা কবিতা দাঁড়াইয়া যাবে ইনশাল্লাহ। কবিরা খালি মিথ্যা করে, চেনা জানাদের নাম লয়। (হা.. হা.. হা..হাসি) যা হোক বলি তাহলে। আমার ভালো লাগা কোনো ধরণের শ্রেষ্ঠত্বের মাফকাঠিতে বিচার্য নয়। সেটি আমার একান্তই ব্যক্তিগত। তালিকাটি তোমার মত এত দীর্ঘ হবে না।
তোমার কিছু কবিতা আমার ভালো লাগে, সব নয়। তারপর যেমন ধরো শান্তনু চৌধরী, খোন্দকার আশরাফ হোসেন(তিন রমণীর ক্বাসিদা) কাজল শাহনেওয়াজ(যদিও সে আর লেখে না) মাসুদ খান (পুরানা মাসুদ খানের কথা বলছি), সৈয়দ তারিক, জুয়েল মাজহার, বিষ্ণু বিশ্বাস, তুষার গায়েন, খলিল মজিদ (যদিও সে আর লেখে না), মোস্তাক আহমাদ দীন, সরকার আমিন, মুজিব মেহদী, চঞ্চল আশরাফ ইত্যাদি। নিজের দশকের কবিদের কবিতার বিচার করতে চাই না। তবু বলার জন্য বলি –রাইসুর ফান-টা এনজয় করি… ঐ যে তার বাওয়া ব্যাঙ… (হা.. হা…হাসি)। কামুর প্রথম দিকের কবিতা ভালো লাগত। একটা সম্ভাবনা ছিল। পরে সে দেশের কবিতা লিখতে গিয়ে কেমন যেন কন্ঠস্বরই হারিয়ে ফেলেছে। কবিতাকে সংগীতের কাছাকাছি নিতে চাইছে। তাই মনে হয় তার কবিতার ভাব ব্যঞ্জনা, গভীরতা কমে গেছে। কখনো মনে হয় তা সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের শব্দ ও ছন্দসাধনা, গীতলতার বিস্তার। মজনু শাহ ফিউশনের ওস্তাদ। তার কবিতা অ্যাসিমিলেশন অব আদার ভয়েস বলা যায়। বিশেষত পশ্চিম বঙ্গের কিছু জনপ্রিয় কবির স্বর ও স্টাইল। এই সময়ের অনেক তরুণ কবিদের কবিতাও আমার ভালো লাগে। যেমন ধর পিয়াস মজিদ, মুক্তি মণ্ডল, আন্দালিব আমিন, মাজুল হাসান, রাশেদুজ্জামান, হিজল জোবায়ের, তানভির মাহমুদ, জাহানারা পারভীন, আল ইমরান সিদ্দিকী, রওশন আরা মুক্তা ইত্যাদি। মাজুল, রাশেদ, হিজল ভালোভাবে লেগে থাকলে একটা জায়গায় পৌঁছাতে পারবে।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ‘একবিংশ’ পত্রিকার সাথে তোমার পরিচয় ঘটে। কিছুদিন লিখে তুমি আর কন্টিন্যু করো নাই। এর পেছনে কি কোনো ব্যক্তিগত কারণ ছিল?কবিতার কাগজ ‘একবিংশ’কে তুমি কীভাবে মূল্যায়ন করবে?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: ‘একবিংশ’ প্রথম বের হ’ল যখন (তুমি আমি দু’জনেই ডিপার্টমেন্টে তখন), এর মান অনেক উঁচু ছিল। সেই প্রথম দিকে (সৈয়দ) তারিকের একটা বড় অংশগ্রহণ এতে ছিল, মনে পড়ে এমনকি সাজ্জাদ শরিফও লিখেছে এখানে সে-সময়— আবার পশ্চিম বাংলার সমসাময়িক লেখা থাকত, ভালো প্রবন্ধ, অনুবাদ, কবিতা… সব মিলিয়ে একটা কিছু করবে এ-কাগজ, এমন মনে হ’ত। পরে কিন্তু এটা একটা মফসসলি (এখানে মফসসলি বলতে কোনো স্থান নয়, সাহিত্যরুচিকে বোঝাচ্ছি) কাগজে পর্যবসিত হ’ল, মিডিয়ক্রিটির পোতাশ্রয় হ’য়ে দাঁড়াল, আফসোস। তবে সে-জন্য যে আমি এখানে তেমন লিখি নি, তা নয়। আমি কাগজপত্রে কখনোই রেগুলার ছিলাম না (এখনও নই)। এমন যদি হ’ত যে ‘একবিংশে’ আমি এককালে লাগাতার লিখতাম, পরে তাকে ছেড়ে কোনো দ্বাবিংশে গিয়ে ঢুকেছি, তা’লে না হয় বলতে পারতে। তখনকার প্রায় সব কাগজেই আমি লিখেছি হয়তো, কিন্তু কোনো কাগজেই নিয়মিত না— আমার উন্মাতাল জীবনযাপনের সঙ্গে লেখা-ছাপাছাপি ঠিক যেত না আসলে।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: কিন্তু আমি মনে করি সেই নব্বই দশকে এটি অনেকের জন্য দরোজা খুলে দিয়েছিল। বিশেষ তো যারা সেই সময়ের অন্য সব লিটল ম্যাগে লেখার সুযোগ পেত না। সারা দেশের কবি ও কবি যশঃপ্রার্থীরা একটা প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পেয়েছিল তখন। পশ্চিম বঙ্গের অনেক কবি-সাহিত্যিকও এখানে লিখেছেন। পৃথিবীর নানান দেশের কবিতার অনুবাদ হয়েছে এখানে। এখান থেকে হয়ত কয়েকজন প্রতিভাবান কবি বের হয়ে আসছিল। যেমন খলিল মজিদ, তুষার গায়েন, শামসুল আরেফিন, শাহীন শওকত, মোশতাক আহমেদ দীন, মুজিব মেহেদী এবং আমি নিজে।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: তা হয়তো ঠিক, হয়তো নয়। বেরিয়ে আসবার হ’লে সাধ্য কার আটকায়। বরং প্রকৃত শিল্পীর জন্য “অমিত প্রগল্ভতার” সুযোগ যত কম থাকে, তত ভালো (বোধ হয়)।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমি ‘একবিংশ’-তে এত বেশি লিখেছি যে বলা যায় যে আমি ‘একবিংশ’র কবি। মানে প্রায় এক যুগ আগে অস্ট্রেলিয়াতে চলে আসার আগ পর্যন্ত জড়িত ছিলাম। আমার সাথে পরে কবি তুষার গায়েন ও খলিল মজিদ যোগ দেয়। আমি লক্ষ্য করেছি যে শুধুমাত্র ‘একবিংশ’-এ লেখার কারণে বা খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’-তে লেখার কারণে এইসব কবিদেরকে এক ধরণের আউটসাইডার বা কর্নাড করে রাখা হয়। মানে অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তাদের কবিতা বা স্বীকৃতিরকথা ভুলেও কেউ উচ্চারণ করে না। অনেকেই ‘একবিংশ’ কবিতাপত্রকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের ব্যক্তিগত বিশ্বাস,আচার আচরণ,দোষগুণাবলীর সাথে একাকার করে বিষয়টিকে বিচার করে। মানে এই কবিদের কোনো নিউট্রালিটি বিবেচনায় আনে না। এই বিষয়ে তোমার মন্তব্য শুনতে চাই।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: এ নিয়ে আমার কিছু বলা ঠিক কীনা জানি না। আমি প্রায় কাউকে কোনো পত্রিকার সঙ্গে মিলিয়ে দেখি নি। কেউ দেখে থাকতে হয়তো পারে। যতদূর জানি তুমি না-হ’লেও, তুষার, খলিল, প্রমুখ ‘নিসর্গ’-তেও নিয়মিত ছিল। তো দু’দু’টি “বড়” ছোটকাগজ যাদের হাতে, তারা কেন আরও কাগজের হাহাকার করবে, বিশেষ ক’রে বাণিজ্যিক কাগজের, আমার জানা নাই। আর, করলে, সে-সব জায়গায় লেখা পাঠালেই হয়। আর, অনেক অনেক ওয়েবজিন-ও হয়েছে এখন, দু’-বাংলারই, সেগুলির অধিকাংশই যথেষ্ট অবারিতদ্বার।
আশরাফ স্যর-এর কবিতার অপ্রশংসা কখনও আমি করি নি। ওনার অনেক কবিতা আমার ভালো লেগেছে, লাগে। আর ব্যক্তি-উনিও আমার অপ্রিয় মানুষ ন’ন… আমাদের নাক-উঁচু ডিপার্টমেন্টে ক’জন শিক্ষকেরই সাথে আর মন খুলে কথা কওয়া যেত… কিন্তু উনিই ‘একবিংশ’-কে খেলো ক’রে ফেলেছিলেন, এও সত্য… তবে আমি এ-ব্যাপারে আর বেশি না-ই বলি… যে যার মতো ক’রেই তো ভাববে, তাই না?
তবে তুমি যে-কথাগুলি বললে, যাদের উদ্দেশে, তারাও কিন্তু একই কথা, তোমার ক্ষেত্রে বলতে পারে, পারে না? মানে ধরো তুমি বললে—“সাজ্জাদ শরিফ আমার নাম করে না”, সাজ্জাদও কি বলতে পারে না “আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ আমার কথা বলে না”? কিন্তু এই বলাবলি যদি একপাক্ষিক হয়, মানে শুধু তুমি বললে আর সাজ্জাদ বলল না, তাইলে তুমিই কি এই অভিযোগের দ্বারা তাকে তোমার থেকে উঁচু আসন দিয়ে ফেলছ না? যে-আসন হয়তো তার প্রাপ্য নয়?
আমাদের কালের ব্যর্থ প্রেমিকদের একটা বান্ধা ডায়ালগ ছিল : “কেউ আমারে চিনল না!”— এই দীর্ঘশ্বাস নিজের বুক চিরে বের-হওয়া-মাত্রই তুমি নিজেকে ব্যর্থ কবি ব’লে প্রমাণ ক’রে ফেলবে। সাধু সাবধান।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: নব্বই দশক থেকে অনেকেই নতুন কবিতা লেখার জন্য চেষ্টা করছে। মানে বাংলা কবিতার ধারায় যে ঐতিহ্য,উত্তরাধিকার আছে যেমন ধরো চর্যাপদ,মধুসূদন,রবীন্দ্রনাথ,জীবনানন্দ,আল মাহমুদ,শামসুর রাহমান বা বিনয় মজুমদার ইত্যাদির কাব্যভাষা থেকে স্বতন্ত্রএকটি কাব্যভাষা তৈরির জন্য অনেকেই নতুন কবিতা লেখার চেষ্টা করছে। আমিও এই পথের পথিক,একজন নগণ্য কবিতা-লেখক। আমার প্রশ্ন— তুমি কি নতুন কবিতায় বিশ্বাস করো?তুমি কি মনে করো আবহমান কবিতাধারার রাজত্ব যথেষ্ট হয়েছে,এখন নতুন কিছু করার আছে বা করা যায়?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: বাংলাদেশে পুরানো যদি বলা হয় থোড় বড়ি খাড়া-কে, নোতুন তবে নিশ্চয়ই খাড়া বড়ি থোড়। কে যে কোন্ নোতুন কী করছে আমি দেখলাম না এই নজরে; এমন একটাকিছু, একটাও কিছু, যা আগে হয় নি, এবং আরও ভালোভাবে হয় নি। মূর্খামিকে, গোড়ায় গলদকে যদি নোতুন বলা লাগে, অর্থহীন (অ-) বাক্য-মাত্রকে যদি কাব্য বলা লাগে, আই উড বেগ টু বি এক্সকিউস্ট।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তোমার কাছে আমার কথাগুলি পরিস্কার হলো কিনা। আমার মনে হয় তুমি হয়তো জেনেশুনেই ব্যাপারটি এড়িয়ে যেতে চাইছ। তুমি যেভাবে বিচার করছ বিষয়টি হয়তো তা নয়। নতুন এমন একটা কিছু নিশ্চয় আছে এবং তা কোথাও না কোথাও হচ্ছে। মানে গৎ-বাধা, ছাঁচে-ঢালা, চার-মাত্রা ছয়-মাত্রা ইত্যাদি স্ট্যাটিক, অলরেডি ডিফাইন্ড, এক রৈখিক লেখালেখির পাশাপাশি আর একটি ধারা, আমাদের নিত্য দিনের চেনা জানার বাইরে, কবিতার স্বাভাবিক ছন্দে, শব্দকে চিত্রকে তথা ভাব আর বোধকে নতুন ভাবে রেজিস্টার করার মাধ্যমে, কবিতার উপস্থাপনকে একটা ম্যাজিকেল মুহূর্তে নিয়ে যাওয়ার মানসিকতা ক্রমশ ডানা মেলে উড়ছে। তুমি তাকে ইগোসেন্ট্রিক হয়ে ‘মূর্খামি’‘অর্থহীন’ ইত্যাদি ভয়ংকর অপবাদ দিয়ে সরিয়ে দিতে চাইছ।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ:আমার কথা একটু চড়া হ’য়ে যায় মাঝে-মাঝে। সরি। তবে যদি ছন্দে না-লেখাকেই অভিনবতার প্রধান চাবিকাঠি বিবেচনা করো, আমার আর বলার কিছুই থাকে না। চার-মাত্রা ছয়-মাত্রার বাইরে কবিতা আগেও লেখা হয়েছে, অনেক আগের থেকেই, এসবকে বর্জন করলেই তাই খুব নোতুন-কিছু করা হ’ল তা মনে করতে পারা মুশকিল।
একদিকে বলছ, “আমাদের নিত্যদিনের চেনাজানার বাইরে,” আবার বলছ “কবিতার স্বাভাবিক ছন্দে”! কবিতার স্বাভাবিক ছন্দ কী? গদ্য? তাহলে আসো গদ্য-ছন্দ নিয়েই ভাবি? গদ্য যদি হয় (বা যখন হয়) “স্বাভাবিক”, তার স্বাভাবিকতার প্রতিপাদন হয় কীসের দ্বারা? প্রসাদগুণরূপ মধু তার থেকে নির্গলিত হয় কোন্ কোন্ ক্রিয়াকলাপের কারসাজিতে? কোন্ “গুণে” তা কবিতা হ’য়ে ওঠে? লক্ষ করো বাইবেলের বাক্যগুলির অর্ধচ্ছেদ (সেঝুরা) -প্রযুক্ত অপরুপ ভারসাম্য; শুনে দ্যাখো আল কোরআনের সোজাসাপ্টা কথাগুলি কোন্ জাদুবলে আয়াত হ’য়ে উঠছে; বুঝে দ্যাখো কেন টমাস হার্ডি বা বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলিকে কাব্য হিসাবে পড়া যায়। আর, পড়ই-না কেন জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’ আর ‘নগ্ন নির্জন হাত’, পাশাপাশি খুলে : এর একটা পদ্যে লেখা, একটা গদ্যে। ছন্দের কথা তোমার মনে আসে, এর একটাও পড়বার সময়? বা, মনে হয় কি যে ‘বনলতা’“স্বাভাবিক” ছন্দে লেখা নয়, বা গদ্যে লিখলে আরও উতরাত?
নূতনত্বের সঙ্গে— বা আসলে উৎকর্ষের সঙ্গে— ছন্দ থাকা-না-থাকার তেমন কোনো সম্বন্ধ নাই। আদতে কবিতা পাঠকের কাছে শিল্প হ’য়ে উঠতে পারছে কী না, সেটাই দেখবার বিষয়। আজকালকার কয়টা কবিতা ততটা উজ্জীবিত আমাকে করে যতটা কীটস-এর ‘নাইটিংগেল’ বা কোলরিজ-এর ‘কুবলা খান’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’? শিল্পের কাছে কেন আমি কেবলই নোতুন-কিছু (“নোতুন কিছু করো, একটা নোতুন কিছু করো…” ইতি ডি এল রায়) কেন চাইব? শিল্প তো হানিফ সংকেতের ঈদ-ভাঁড়ামি নয় যে ফি-সন নোতুন কোনো “আইটেম” না-থাকলে চান্দিতে পচা আণ্ডা?
“কেউ যাহা জানে নাই, কোনো এক বাণী আমি ব’হে আনি”— এ তো সকল কালের সকল কবি’র দম্ভ। কিন্তু ভেবে দ্যাখো, কেউ কিন্তু বিজ্ঞানীর মতো নোতুন কিছুর “উদ্ভাবন” বা অভিযাত্রীর মতো নোতুন মুল্লুকের “আবিষ্কার”-এর দ্বারা কবি নয়। যে-মোকাম তাদের সাধনা, তা একাধারে চিরপুরাতন এবং চিরনূতন। প্রকৃত শিল্প একবার হ’য়ে গেলে তার আর পুরানো হবার উপায় থাকে না— তাজমহল পুরানো হয় না, ফৈয়াজ খাঁ বুড়া হ’ন না, বত্তিচেল্লির ভিনাস চিরকাল সাগরের থেকে নবজন্ম নিতেই থাকে। শিল্প হ’য়ে ওঠে নি, এমন কাব্যপ্রয়াস প্রায় পত্রপাঠ পুরানো হ’য়ে যায়— একবার শুনে-ফেলা জোক-এর মতো।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: এখন যারা কবিতা লিখতে আসছে তারা কেউ যদি কবিতা সম্পর্কে আমার মতামত জানতে চায়— আমি প্রথমেই বলি মিল রেখে বা অন্ত্যমিলে কোনো কবিতা লিখবে না, পুরানা রাইমিং প্যাটার্ন বাদ দিয়ে, নতুন নতুন এক্সপ্রেশনে,নতুন ভাষা আর বিস্ময়ের কবিতা লেখ।মনে করো এইমাত্র তোমার জন্ম হয়েছে— এই ধ্যানে কবিতা লেখ ইত্যাদি ইত্যাদি বলি। কিন্তু এইসব কথায় কাজ হচ্ছে বলে মনে হয় না। কারণ নতুন প্রায় সবাইকে দেখছি রবীন্দ্রনাথ,জীবনানন্দ,আল মাহমুদ,বিনয় মজুমদার,জয় গোস্বামীবা ইদানীং কেউ কেউ তোমার কায়দায়ই লেখা শুরু করে বা করতে চায়। আমার মনে হয় তারা জানে না কি করতে হবে বা কি পড়তে হবে, কিভাবে লিখতে হবে। তারা জানেনা যে একই ধরনের কবিতা লিখে লিখে আর আবর্জনা বাড়ানোর প্রয়োজন নাই। এইসব নতুন কবি,কবিযশঃপ্রার্থী— তাদের জন্য তুমি কি উপদেশ দিতে চাও।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: যদি ছন্দ-মিলের বর্জনকে নোতুন ভাষার, নোতুন কবিতার শর্টকাট বিবেচনা ক’রে থাকো আর সে-মতো উপদেশও ছোটদেরকে দাও, তবে আমি সত্যিই চিন্তায় প’ড়ে যাব। আর “কবিযশঃপ্রার্থীদের” আমি কোনো উপদেশ দিতে চাই না। নাম কামাবার জন্য যারা লেখে, আমি তাদের রাস্তা মাড়াই না। পরন্তু আমি কাউকেই কোনো উপদেশ-দানের লায়েক ব’লেও ভাবি না নিজেকে। শুধু কবিদের, আমার গুরু ইয়েটসের কথা ধার ক’রে বলতে পারি : “ল্যর্ন ইয়োর ট্রেড।” এর কোনো বিকল্প নাই। শিল্প মানুষের সৃষ্টি, ভগবানের নয়, কাজেই, তা নাজেল হবে না নিজে-নিজে।
আর ছন্দে এযাবৎ বিশ্বে যত কবি লিখেছে, তারা স্রেফ আবর্জনা বাড়িয়ে গেছে পৃথিবীর, এই খবর “নোতুন”। তো আবর্জনার সংজ্ঞার্থ কী? শুধুই কি, কারো-কারো মতে, যা মানুষের বর্জন করা উচিত; নাকি তা-ও, যা মানুষ সচরাচর বর্জন ক’রে থাকে? যেমন ধরো, সিগারেট মানুষের বর্জন করা উচিত— বদ্যি-হেকিমদের রায়। কিন্তু তা-সত্ত্বেও কোটি-কোটি মানুষ তা বর্জন করে নি, করে না। আবার মাছের আঁষ বিষয়ে কোনো ফতোয়া না-থাকলেও প্রায় সবাই তা বর্জন ক’রে থাকে। তো এ-দুইয়ের কোনটা আবর্জনা? বা, কোনটা বেশি আবর্জনা?
বাই দ্য সেম টোকেন, কারো-কারো মতে বর্জনীয় হ’লেও, আজও অনেকে ‘কল্পনা’ বা ‘রূপসী বাংলা’-র পাতা ওল্টায়, কিন্তু কোনো বাধ্যবাধক না-থাকলেও, ভুলেও প্রায় কেউ “আধুনিক” কবিতা পড়ে না, খোদ কবি ও তার দায়ে-ঠেকা বন্ধুরা ছাড়া, দ্যাট ইজ টু সে। তো আর্বজনা কে ফলাচ্ছে বা কে বেশি ফলাচ্ছে?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তোমার কবিতা পড়লে কখনো মনে হয় তোমার ধর্ম হিন্দু আবার কখনো মনে হয় তুমি মুসলমান। আমার তোমাকে খ্রিস্টান মনে হয়নি বেশি। যদিও তোমার মিডল আর লাস্ট নাম দুটি খ্রিস্টান ধর্ম অনুসারীদের। তুমি কোনটায় বিশ্বাস করো?আসলেও কোনো ধর্মে বিশ্বাস করো নাকি?করলে তা কতোটুকু তোমাকে অনুপ্রাণিত করে?তোমার কবিতায় কি এর প্রভাব আছে?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: আমি কোনো ধর্মে বিশ্বাসও করি না, অবিশ্বাসও করি না। ধর্ম বিষয়টা আমার কাছে ইন্টারেস্টিং, যেমন সাহিত্য। আমি আকৈশোর নাস্তিক; কিন্তু এর মানে এ নয় যে আমি ধর্মদ্বেষী বা আস্তিকদের শত্রু গণ্য করি। অবশ্য আস্তিকেরা আমার নাস্তিক্যকে নিতেই পারে না, গায়ে প’ড়ে উপদেশ দেয়, “পথে” টানতে চায়, ব্যাপারটা প্রায়ই উপভোগ করি…
আমি আগে কোথাও বলেছিলাম যে “বিশ্বাস”-মাত্ররই ভিতর কিছু অন্ধকার, কিছু অন্ধতা থাকতে হয়ই হয়। অন্ধতা যত বেশি, বিশ্বাসও তত পোক্ত, কেননা— যিশুর ভাষায়—“যারা দেখে বিশ্বাস করে, তাদের থেকে, যারা না-দেখে বিশ্বাস করে, তারা উত্তম” (কথাটা টায়-টায় মনে নাই)। ওনার এই কথায় একটা ফাঁক বা ফাঁকি আছে। দেখে বিশ্বাস করা সম্ভব না। এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কোনো ব্যাপারই থাকে না আর, থাকে “দেখার”। আমি এমন বলতেই পারি না যে “কালকে রাতে চাঁদ দেখার পর আমার বিশ্বাস হ’ল যে ওটা চাঁদ”। কারণ যখনতুরি চাঁদ দেখিই নাই, তারে, মানে তার ধারণায় বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করা সম্ভব, যেটা তাকে দেখার সাথে-সাথে ভেঙে, বা না-ভেঙে, যাওয়া শুধু সম্ভব, নোতুন ক’রে তাকে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস করা সম্ভব না। বিশ্বাস/অবিশ্বাস কাজেই, অভিজ্ঞতাপূর্ব (আ প্রিয়রি) হ’তে বাধ্য, তাই না?
যারা বলে, “আমি বিশ্বাস করি, কিন্তু অন্ধবিশ্বাসী না”, তারা হয় বিশ্বাসী (এবং অন্ধ) বা অবিশ্বাসী (এবং তবু অন্ধ, কারণ তারা তাদের অবিশ্বাসকে বিশ্বাস ব’লে ভুল করছে)। এই অন্ধতা যে অব নেসেসিটি খারাপ কিছু, তা কিন্তু নয়। দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষের জীবনযাপনকে বরং সহজতর করে এই অন্ধকার। ব্লাইন্ডে খেলব, কিন্তু হারব না, ব্লাইন্ড ডেট করব, কিন্তু হিড়িম্বা জুটবে না, এমন সুবিধার জীবনখেলা আর কী হ’তে পারে। কিন্তু কারু-কারু হকিকত এটা যে সবগুলি তাস তারা উল্টিয়ে খেলবে…
আমি হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান কমুনিস্ট নাস্তিক, সবই। এই সবই মানুষের সৃষ্টি; চিন্তার, মননের, দর্শনের, রাজনীতির একেকটা বড়-বড় জ্ঞানকাণ্ড, সবেতেই আমার উত্তরাধিকার। তাছাড়া আমার নাস্তিকতায় আর-কারু বা পৃথিবীর ক্ষতি তো হচ্ছে না কিছু, বরং অনেকের “আস্তিকতা” অনেক রক্ত বইয়েছে এ-যাবৎ।
আর তুমি?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমি কোনোদিন নাস্তিক ছিলাম না, (আমার মনে হয় নাস্তিক্য বোধ আসে মানুষের এক ধরনের বস্তুবাদি, স্বার্থপর চিন্তাজাত পচা গলা অ্যারোগ্যান্স থেকে, তার অকৃতজ্ঞতাকে থেকে) আবার এখন পর্যন্ত খাটি অনুশীলনকারী মুসলিমও হতে পারি নাই। তবে ক্রমশ একটা সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দেয়ার ইজ পসিবিলিটি। বার বার একটা মুর্খ অন্ধ অহং গলা টিপে ধরে। অথচ দেখ কলেমা তৈয়বা ‘লা ইলাহ ইল্লাল্লাহু’ মনে প্রাণে বিশ্বাস করে চর্চা করলে মানুষের মধ্য এই রোগ থাকার কথা না। এখানে আমার আমি আমার ‘সেল্ফ’কে আমরা একদম শেষ করে দিয়েছি। তখন আমার তো এই দুনিয়ায় কিছুই নাই, সবই তার। দেখ নবী মোহাম্মদ বলেছেন একজন মুমিনের মধ্যে এক তিল পরিমানও যদি অহংকার থাকে, তাহলে সে বেহেস্ত যেতে পারবে না। বুঝ ঠেলা। কবি ও দার্শনিক কিয়ের্কগার্দের কথাটা মনে পড়ে- বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে সত্যিকারের সেল্ফকে আমরা পাই। যে সেল্ফ কিনা সুপার সেল্ফ এর সাথে মিশে যায়। মাঝে মাঝে আমি আল্লাহর স্বরূপটা বোঝার চেষ্টা করি, তার জাহিরি, বাতিনি কারবারে মাথা খাটাই। বুঝি, বুঝি না। মানুষের মাথা মনে হয় এখনো এইসব লীলাখেলা বোঝার জন্য তৈরি হয় নাই। কিন্তু মাঝে মাঝে এই যে এত নিয়ম কানুন, এত আচার আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কিছুটা দ্বন্দ্ব কিছুটা সংশয়ের ছুরিতে কাটা পড়ি, রক্তাক্ত হই! মনে হয় জীবনভর এমনই চলবে।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: জীবন আর মৃত্যু সম্পর্কে তোমার উপলদ্ধি কী?তুমি কি ধর্মকথিত পাপ,পুণ্য,বেহেস্ত,দোযখ, কেয়ামত বা আখেরাত এগুলো মানো?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: উপরের প্রশ্নের পর এ নিয়ে বেশিকিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। উত্তর, এক কথায়, না। মানি না। আর মৃত্যুকে অস্বীকার করলে যেহেতু জীবনকেও করা হয়, তাই আমি মৃত্যুকে স্বীকার করি, তবে জীবনের বাইনারি অপজিট হিসাবে না (যেমন মিথ্যা, সত্যের বাইনারি অপজিট না, বরং হয়তো, যে কোনো মাত্রায়, তার বক্রতা)।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: কবিতা,গল্প,গদ্য অনুবাদ সব জায়গাতেই তোমার ভালো হাত আছে। এসবের মধ্যে কোনটাতে বেশি প্রাণ ঢেলে দাও। বর্তমানে তুমি কি লিখছ?
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: আমি আজ অনেক বছর কোনো গল্প লিখি নি, গদ্যও লিখি নি বড়একটা। আর কবিতা লেখার অনুভূতির সঙ্গে গদ্য লেখার অনুভূতিকে মেলানো যায় না ঠিক। যেন দু’জন মানুষ লেখে ঐ দুই কিসিমের লেখা। কবিতা লেখবার সময় আমিত্বের বেশ-খানিকটা অপলাপ হ’য়ে যায়— যেন আমি লিখি না, আমাকে দিয়ে লেখানো হয়। গদ্যে বরং আমিই লিখি, আদ্যোপান্ত, তার জের-জবর-নোক্তা-সমেত।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমার যেমন হয়েছে অনেকবারই দেশে চলে যেতে চেয়েছি। প্রথম চার পাঁচ বছর তো মন শুধু উড়াল দিতে চাইছে। তুমি হয়ত জাননা যে আমার প্রায় দশ বছর লাগছে বিদেশকে দেশ বানাতে একটা বাংলাদেশ বানাতে। তাই এখন আর তেমন লাগেনা। সয়ে গেছে। তবে অনেক সময় লাগছে লেখালেখিতে ফিরে আসতে।লেখালেখি থেকে অনেকদিন দূরে ছিলাম।৬/৭ বছর কিছুই লিখি নাই। বড় সাংঘাতিক জিনিস ঘটছে।তোমার কি কখনো মনে হয় তুমি চলে যাবে। একেবারে চলে যাবে। বাংলাদেশে গিয়ে একটা কিছু করবে।
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: না, মনে হয় না। আমার একদিনের জন্য এমন মনে হয় নি যে আমি দেশের বাইরে আছি, প্রিয়জনদের থেকে দূরে আছি। বরং হয়তো দেশে থাকলে তেমন মনে হ’তে পারত কখনও। আর ফেরার কথা বলছ— সে এক ঘন স্বপ্ন হ’য়ে গেছে। ফিরে গেলেই যে-স্বপ্নটা ভেঙে যাবে। শুধু দেশের মাটিতে মিশে থাকতে পারতাম যদি মরার পর— এইটুকুই সাধ, যাকে রোজ রাতে গলা টিপে মারি, পরদিন সকালেই আবার সে দাঁত কেলিয়ে হাসে।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: চল আর এক কাপ কফি খাই
সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: চল…
০৭/০১/২০১৩
