কবিতার ফর্ম, স্ট্রাকচার, টেকনিক ও ভাষা

কবিতার ফর্ম, স্ট্রাকচার ও ভাষা – এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হলে আমরা একটি বাড়ির কথা চিন্তা করতে পারি। সমস্ত বাড়িটি হলো কবিতার ফর্ম, বাড়ির রুমগুলি হলো স্ট্রাকচার আর ফার্নিচারগুলি হলো কবিতার ভাষা। কবিতার পড়াশোনায় কবিতার ফর্ম, স্ট্রাকচার ও ভাষা পর্যবেক্ষণ করার সাথে সাথে আমাদের দেখতে হবে এগুলো কীভাবে কবিতার ভালোলাগা ও বোঝার সাথে জড়িত। নিচে একটা টেবিল তৈরির মাধ্যমে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যায়।

কীচিন্তাবিবেচনা
ফর্ম  যে ভিত্তির ওপর একটা কবিতা দাঁড়ায় সেটি হলো কবিতার ফর্ম/আধার/আকার/কন্টেইনার। একটা কবিতাকে দাঁড় করানোর জন্য কবি একটা ভিত্তির ওপর আশ্রয় নেন। যেমন মহাকাব্য একটা ভিত্তি। আগেরকার কবিতাগুলি এই ভিত্তির ওপর বেশি জোর দিছে। ফ্রি ভার্স বা মুক্ত গদ্য/ মুক্তক অক্ষরবৃত্ত বা গদ্যছন্দ হলো আমাদের আধুনিক ও উত্তারাধুনিক সময়ের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ফর্ম। কেউ কেউ আবার সনেট, আখ্যান, হাইকু, শোক গাথা, বাল্লাড, লিমেরিক ইত্যাদিরে ভিত্তি হিসাবে ধরেন। ভিত্তির আকার কেমন হবে তা নির্ভর করে কবির মুড ভাব বা চিন্তার ওপর। এক এক কবি এক এক রকমের ফর্ম তিরি করেন। যে বেশি যেইটাতে স্বাছন্দ্যবোধ করেন সে সেই ফর্মে লিখেন।একটু চিন্তা করে দেখেন, কবিতাটির ফিজিক্যাল  মুখটির ওপর তাকান। আপনি কী কোনো নির্দিষ্ট ফর্ম ধরতে পারেন? ভেবে দেখেন কেন কবি এটি পছন্দ করেছেন? নিজেকে প্রশ্ন করেন- এই ফর্মটি কীভাবে এই কবিতার ম্যাসেজ বা আইডিয়ার সাথে লিঙ্ক করতে পারছে?          কে কোন ফর্ম নিয়া লিখলো বড় কথা নয়, কবিতাটি কবিতা হলো কিনা সেটিই বিবেচ্য।  যদি আপনি কোনো স্পেসিফিক ফর্ম চিনতে না পারেন, তাহলে কবিতার স্ট্রাকচারের দিকে খেয়াল করুন, দেখুন এটি কীভাবে কবিতার সাথে লিঙ্ক করছে। স্ট্রাকচার না ধরতে পারলে কবিতাটির ভাষার দিকে নজর দেন।              
স্ট্রাকচারকবি যেভাবে তার কবিতাটা সাজিয়ে তোলেন মানে এর লাইন বা পংক্তি, স্টাঞ্জা- স্তবক বা পংক্তিগুচ্ছ, কত লাইনের স্তবক, পংক্তি আর স্তবকের ভেতর দূরত্ব-  এইসব হলো স্ট্রাকচারের অংশ। কবিতা যেহেতু সবচেয়ে সৃষ্টিশীল কাজ তাই কবিরা এই স্ট্রাকচারে বেশি সষ্টিশীলতা দেখাইতে পারেন। কবিতায় যতিচিহ্ন, কমা, দাড়ি,  বা স্পেস দিয়া গ্যাপ তৈরির মাধ্যমে স্ট্রাকচার বানানো যায়। একটা বাড়ি(কবিতার ফর্ম) বানাইলে তার রুমগুলো(স্ট্রাকচার) কী রকম হবে কোন কালার(ভাষা), কোন মাপের বা কোন ধরণের আসবাবপত্র(ভাষা) লাগবে তা কবি ঠিক করে বা কবিতার ফর্মের সাথে সাথে এটি চলে আসে।     ভেবে দেখুন- কবিতার লাইন ও স্তবক যেভাবে কবিতায় সাজানো আছে কীভাবে  তা কবিতার প্রভাব আর অর্থের সাথে জড়িত? যদি কবিতার পংক্তি এরকম সজানো না থাকতো তাহলে কবিতাটির উদ্দেশ্য বোঝা যাইত কিনা? অনেক কবি আছেন স্ট্রাকচার নিয়া বেশি কেরেদানি করেন, এইটা কাম্য নয়। কবিতাটির ফর্ম ঠিক কইরা যে  স্ট্রাকচার আপনা আপনি কবিতার মধ্যে আসে সেইটাকেই ধইরা রাখা দরকার।  পড়ার সময় ধীরে ধীরে কবিতার ছোটো বা বড় আকার, পুরা গড়ন, স্তবক, লাইনের দৈর্ঘ, লাইন ও স্তবকের গতি চাল চলনে আলোকপাত করুন। অনেক নতুন কবি আছেন  স্ট্রাকচার নিয়া বেশি পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। এতে করে হয়ত কবিতাটির মূল মজা, মূল সৌন্দর্য ভোগ করা যায় না।     
ভাষা/ কবিতার টেকনিক কলাকৌশল                                        কবিতার ভাষা লিটারেল মানে আক্ষরিক ভাষা নয়, কবিতার ভাষা ফিগার‍্যাটিভ মানে আলঙ্কারিক মানে কল্পনাশ্রিত। মাঝে মাঝে এমন হতে পারে  ভাষার আক্ষরিক  ব্যবহার এবং  ফিগার‍্যাটিভ ব্যবহার এক মন হতে পারে। কবিতার ফিগার‍্যাটিভ ভাষাকে জানান দেয়ার জন্য কবি কিছু টেকনিক বা কলা কৌশল কবিতায় ব্যবহার করেন। অন্যতম ফিগার‍্যাটিভ ল্যাংগুয়েজ গুলি হলো – সিমিলি(উপমা, তুলনা), মেটাফর বা রূপক, ইমেজেরি বা চিত্রকল্প হাইপারবোল(অতিশয়োক্তি),  এলিটেরেশন(অনুপ্রাস) পারসোনিফিকেশন ইত্যাদি যা কবিতার ভাষাকে প্রাত্যহিক, রোজকার ভাষা থেকে আলাদা করে ফেলে। এইগুলোর অভাবে একটা লেখা কবিতা না হয়ে  পদ্য বা ছড়ায় পর্যবেশিত হতে পারে।    যখন আমি কবিতাটি পড়ি বা পড়া শেষে কোন শব্দ বা লাইন মনে রাখতে পারি কিনা?। কেন আমি এই গুলোকে মনে রাখতে পারি কেন এগুলো শক্তিশালি? কবিতাটির ভাষা কীভাবে ওভারল কবিতাটির প্রভাব বা অর্থকে প্রাকশ করছে? কবিতার ম্যাসেজ আর মুড ধরার পর আমি কী বুঝতে পারি কবি কীভাবে ভাষা ব্যবহার করেছেন? আমি কী বুঝতে পারছি  কবিতার টেকনিক কিভাবে কবিতার প্রাণ তৈরি করে, কবিটাতিকে জীবিত করে তোলে। যে কবি কবিতায় বেশি প্রাণ দিতে পারেন তার কবিতা বেশিদিন পাঠকের মনে জায়গা করে নেয়।      ভাষা হচ্ছে কবিতার ইঞ্জিন। কী এর প্রাণবিন্দু যা কবিতাটির ভাষাকে পরিচালনা করে? কবিতাটির মেটাফর বা রূপক, সিম্বল বা সংকেত, ইমেজারি বা চিত্রকল্পগুলো বুঝতে পারলে কবিতাটির ভেতরে যাওয়ার সহজ হয়। টেকনিক বুঝতে পারা পাঠকের কাজ নয় হয়ত। কিন্তু কবিতা সমালোচনার জন্য টেকনিক আর এর সাথে কবিতার সম্পর্ক বোঝা হয়ত জরুরি।                      
ট্রাডিশনাল ছন্দ বা শব্দের  ধ্বনিমাধুর্য/   রিদম বা দোলা, মিল/অন্তমিল        কবিতায় যে ফর্মেই লেখা হোক না কেন কবিতার লাইনে বা স্তবকে একটা রিদম বা দোলা থাকতে পারে। কবিতায় ছন্দ বা শব্দগুলোকে বিশেষভাবে সাজিয়ে একটা ধ্বনিমাধুর্য সৃষ্টি করা যায়। কবি ট্রাডিশনাল বাংলা তিন ছন্দে করতে পারেন অথবা কবিতার দেহছন্দ দিয়ে ধ্বনিমাধুর্য  সষ্টি করতে পারেন। কবিতার দোলা  যে কেবল অন্তমিল বা শব্দে শব্দে মিলের কারণে হতে পারে তা নয়। সেটি শুধু শব্দ বা শব্দসমূহকে বিশেষ কায়দায় ব্যবহার করার কারণে ঘটতে পারে।                              কবিতাটি পড়ার সময় কোনো বিশেষ ধ্বনির দোলা কানে টের পান কিনা? যদি পেয়ে থাকেন চিন্তা করে দেখুন- এটি কিভাবে  কবিতাটির মুড এর সাথে লিঙ্ক?                                                কবিতার ছন্দ যেমন কবিতার পাঠে এক ধরণের মনোরম ধ্বনি দোলার সৃষ্টি করে তেমনিভাবে এটি  কবিতার মজাকে কেড়ে নিতে পারে? অনেক কবি ছন্দের হাত দেখানোর জন্য কবিতার ভাষাকে পাঠকের কাছে ভার স্বরূপ হাজির করেন। সেখান থেকে কবিতাটি মুক্ত কিনা? কবি জীবনানন্দ দাশের কথা চিন্তা করুন। তার ছন্দ বলতে সেই অক্ষরবৃত্তই। তেমন বৈচিত্র নাই,  তিনি ছন্দপ্রাণ কবি নন, তিনি ভাষাপ্রাণের কবি, ভাষা বদলের কবি।                              

Leave a Reply