কবিতায় জোর চলে না, কবির ওপর জোর চলে। মানে কবি ইচ্ছা করলে নতুন ভাষা শিখতে পারে, নিজের পড়াশোনা বাড়াইতে পারে, সাথে সাথে তার রুচিবোধও চেইঞ্জ করতে পারে। কোনো শিল্প সৃষ্টি- ইমানুয়েল কান্ট কথিত ‘প্রায়োরি’র মতো- মানে এই বোধ স্বয়ংসম্পূর্ণ, কোনো রকম শর্ত সাপেক্ষহীন। এই বোধ কবি যেখান থেকেই পাক না কেন- এইটা আগে থেকেই জেনিটেকেলি হয়ে আছে। হইতে পারে এই পাওয়া তার সামাজিক সাংস্কৃতিক, জাতিগত ও ব্যক্তিগত বহমান পরম্পরা। কিন্তু সেষ পর্যন্ত এইটা কবির- সাইকি সম্পত্তি।
কবি প্রথম যে সংবেদনটা পায় সেইটা অদেখা, অচেনা একটা সেনসেশন, এইটা কবির পাইতে হবে। এইটা মনে করেন সমস্ত সংবেদনার মধ্যে একটা নিউক্লিয়াস। এইটা ছাড়া তার চলবে না। এই সেনসেশন কোথা থেকে আসে? দেখেন কবি হওয়ার জন্য আপনার সাইকি আগে থেকেই তৈরি, মানে কবিতাকারবারি ইনবোর্ন, বিল্টইন। কথা হইলো আপনি সেই সংবেদন, ‘ধাক্কা’, ‘হাজির’ ‘চলে আসা’ ইত্যাদিকে কীভাবে প্রকাশ করবেন? এইটার জন্য আপনাকে ভাষার সিম্বোলিক চেইনের মধ্যে যাইতে হবে। ভাষা সিম্বোলিক- কারণ এক একটা সিগ্নিফাইইয়ার এক একটা জিনিসের সিম্বল, আবার তা খামখেয়ালি ভাবে তৈরি করা, মানে এক জায়গার সিগ্নিফাইয়েরের সাথে অন্য জায়গার সিগ্নিফাইয়েরের কোনো মিল নাই। কিন্তু ভাষার ইউনিভারসাল বিধি ধইরা সবাই একটা ইউনিফাইড কোড ও আনকোডের চেইনে কাজ করে, ভাব আদান প্রদান করে। কিন্তু কবিকে এই ব্যক্তি-ভাষার ভেতরে থেকেই যে ভাষা ‘অপর’ ভাষা হয়ে গেছে, সেই নতুন ভাষার কাছে কবিকে পৌঁছাইতে হবে। ব্যাক্তিভাষা কমিউনিকেট করে, কিন্তু কবিতার ভাষা কমিউনিকেশন আড়াল করে চিন্তা আর ভাবের নতুন দুনিয়ায় নিয়ে যায়।
কথা হইলো আপনি সেই ভাষায় পৌঁছবেন কীভাবে? সেইটার জন্য একজন কবির কাছে দুইটা রাস্তা খোলা। ১- ভাষার পরম্পরার দিকে যাইতে পারেন ২- পরম্পরায় যে ভাষা আছে তাকে ভেঙ্গেচুরে নতুন আর একটা ভাষা বানাইতে পারেন। প্রথম ভাষাটি অর্জন অপেক্ষাকৃত সহজ, কারণ এইটা অলরডি তৈরি হয়ে আছে। হাইডেগারের মতে- ভাষা অবশ্য আমাদের সত্তা আসার আগেই, মানে মানবের আলো দেখার আগেই হাজির আছে। আমরা এর গোপন ও প্রকাশ্য হকদার। দ্বিতীয়টির অর্জন নির্ভর করে আমি ‘বিং( being)’ হিসাবে আমার রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি ও কাল- উত্তরণ সম্পর্কিত জীবন ও ভাষাবোধে আমি কতটুকু সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলা আর শক্তিকে মনে রাইখাও আমার ‘বিং( being)’ দ্বারা পরিচালিত। এই ‘বিং( being)’ সেই আমিত্ব, যা আমার ভেতর আপনা আপনি গড়ে উঠেছে সেইটা আমার ভেতর একটা বিরাট গাছের শেকড়ের মত আমার ভেতর বাসা করে রাখে। এই বাসা বদলায়, কারণ বিঙ বদলায়, বদল ও চলনই তার বিকামিং অব ‘বিং( being)’ । তাই এই যে দুই রকমের পথের কথা বললাম, এই দুই রকমের পথ- চিহ্ন ও চিন্তায় আলাদা।
একটা উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানো যাক। যেমন ধরুন আমি মাছ নিয়ে কবিতার কয়েকটি লাইন লিখবো ভাবছি।
১
নৌকা বেয়ে নদী নদী যাই- চারদিকে কেউ নাই, কেউ নাই
নদীভরা দেখি বিহ্বল- সোনালী সাঁতারু মাছ।
২
নদী থেকে দৌড়ে ধরলে ধব-ধবে সাদা মাছ-
নিবিড় পাতাল রক্তে তোমাকে ছোঁবার স্বাধ- মাছ হয়ে জাগে।
প্রথম কবিতাটির ইতিহাস- কবিতা ভাষার পরম্পরার ইতিহাস। শব্দে শব্দে, দৃশ্যে, দৃশ্যে একটা অর্থের দিকে ধাবমান এই কবিতা- যাকে বলি লগোসেন্ট্রিক। এইটা মধুর, পাঠকের সাথে যোগাযোগ করে সরাসরি। কোনো আড়াল নাই, বিয়োগ নাই, সাস্পেন্স নাই। ‘সোনালী সাতারু’ শব্দ দুটি একটা ধ্বনিগত মিস্টি সুর তোলে হয়ত, কিন্তু এটি পুরা কবিতাটিকে আর একটা স্টেজে নিয়ে যাইতে পারে না। নদী ভ্রমণ আর সুন্দর মাছ দেখার মধ্যে এই কবিতার ইসেন্স শেষ হয়ে যায়। এই ধরণের কবিতা দিয়ে বাংলা কবিতা ভরপুর। কেন? কারণ কবি যে ভাষিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও লোক সংস্কৃতির মধ্যে থেকে কবিতা রচনা করে, তার সাইকি সেখানেই অক্সিজেন পায়, শক্তিশালী হয়। সেখান সে আরাম বোধ করে, সে অন্যতে লুপ্ত হয়ে তার অটোনমি হারায় ফেলে।
দ্বিতীয় কবিতাটি অন্যদিকে, বাংলা কবিতার পরম্পরায় থেকেও, নতুন ভাষার দিকে ইঙ্গিত করে। পুরা কবিতাটি আপাত কোনো কনক্রিট অর্থ দেয় না। সরাসরি কোনো কমিনিউকেটও করে না। কিন্তু পাঠকের মনে একটা অনির্বচনীয়, সোন্দর্যবোধ আর পিপাসা সৃষ্টি করে। এখানেও কেউ নদী নদী ঘুরে বেড়াইতেছে। কিন্তু ‘নিবিড় পাতাল রক্তে তোমাকে ছোঁবার স্বাধ মাছ হয়ে জাগে’ এই বিস্ময়-উক্তি মানুষের ইচ্ছারূপি বাসনাকে মাছের রূপকে হাজির করে। আর সেইখান থেকে কবিতা আর একটি ভাষা পাইলো। এই ভাষা এক জায়গায় থাইমা থাকে না কারণ- ‘মাছ হয়ে জাগে’- এই গভীর চিত্রকল্প- পাঠককে একটা নতুন অভিজ্ঞতার ভেতর থ্রো করে। আবার সিনেমাটিক, পাতালের ইচ্ছারূপি মাছ -একটা অবাক গেইজ(gaze) দিল যেন। মানে মাছ এখানে নিজেই তাকাইয়া আছে যে মাছকে ছুঁতে চায়- তার দিকে। এই গেইজ- এমন এক আধিভৌতিক প্রেষণা আইনা দিল কবিতাটির শরীরে যে, কবিতাটি মাছ শিকারির স্বাধীন অস্তিত্বকেই নাড়া দিয়ে দিল যেন। এইটা- কবিতা পড়ার এক অনন্য মুহূর্ত, দ্বিতীয় জন্ম লাভের মত পৃথিবীকে দেখা গেলো যেন। আমার কথাও শেষ হইলো।
০১/০৪/২০২০