সাদা পাতা আমার সামনে ঘুরাঘুরি করে। ক্লাসে, লাইব্রেরি, রেস্টুরেণ্ট, বাজারের লিস্ট আর ট্রেনে জানালার বাইরে। আমার দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা দেয়। এখন এই যে আমার সামনে সে পা ছড়িয়ে বসে আছে, তাক করে তাকিয়ে আছে- একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে যেন। একদিন, দুইদিন সাতদিন যায় সে আমার পিছু ছাড়ে না। আমার বিছানায়, আমার পায়ের কাছে বসে থাকে। ’আয় আয় আমাকে ভরে দে! ’সে তাকিয়ে থাকে আর হাসে। আশ্চর্য! শয়নে স্বপনে জাগরণে সে আমার পিছু নেয়। ’আয় পারিস যদি আয়। তোর সন্তান দে। বাসা বাড়ি তৈরি কর’। আমি প্রাত্যহিকের মানুষ, কাজ করে খাই, সকালে ট্রেন ধরি, বিকালে বাসায় এসে বাজারের ব্যাগ ধরি। শূন্যকে শূন্য বলি, গোলাপকে গোলাপ আর হলুদকে হলুদ। আমার কোনো ভাষা নাই কথা বলার ভাষাটি ছাড়া। কিভাবে এই অনন্ত সাদা পাতা ভরে তুলি? আমার ভাষা অফিসে, আদালতে, বাসা বাড়িতে, মেহমানখানায় মানুষের কথ্যপ্রতিভায় ভেসে যায়। উইকেণ্ডে বাজারে টমেটোর লালে টোকা মারে। আমি মানুষ, আমি খাই দাই, ঘুমাই। আমি সাদা পাতা এড়িয়ে চলি। না আমি পারব না।
এভাবে কতদিন চলে যায়। সাদা পাতার আর দেখা নাই। তখন আমি হাফ ছেঁড়ে বাঁচি। কিন্তু যখন আমার কাছাকাছি কেউ নাই তখন আবারো সে এসে হাজির। আমার কিন্তু ব্যথা হয়। বেশ যন্ত্রণা হয়। মুখ শুকিয়ে যায়, হাত পা কেঁপে ওঠে। আমি হেঁটে চলি, দৌড়ে চলি, সিঁড়ি ভাঙ্গি। মাকে ডাকি, ভাইকে বলি ভাই। সকাল হলে জানালা খুলি। আশ্চর্য আমার কোনো ভাষা নাই। ভাষা কোথায় পাই? প্রতিদিন ট্রেন চলে যায় প্লাটফর্ম ছাড়িয়ে। একই প্যাসেঞ্জার, একই চুল একই জামা, হাত পা, নিউজপেপার, টয়লেট্রিজ। তো একদিন আমার ট্রেনটা একটা ছোট ব্রিজের কাছে চলে আসে। দেখি সেই ব্রিজাটার নিচে সেই সাদা পাতা বসে আছে। তাকে এখন আরো ঘন সাদা লাগছে। তেজি, সাদা ঘোড়া যেন। ’আয় আয় চরবি তো আয়’। কিছুক্ষণ পর আবারো বয়ে যাওয়া টলটলে পানিতে সাদা রাজহাঁস হয়ে বসে থাকে। কই তুই কোথায়, কোথায় পালালি? আয়। আমাকে তুলে নিয়ে যা রে পাগল! আমি চোখ বন্ধ করে রাখি। তাড়াতাড়ি স্টেশনে নেমে বাড়ির দিকে দৌড়াই। তো একদিন আচানক কি হলো সারারাত ধরে বৃষ্টি হলো। আমাদের ছোট বাসা আর সারি সারি গাছপালা বৃষ্টিতে ভিজে গেল। একটা কুকাবারা ট্রা ট্রা টক্কর টক্কর ডেকে গেল। খবর পেলাম নেপালে হাজার হাজার মানুষ মরে গেল ভূমিকম্পে। হঠাৎ বেঁচে যাওয়া এক শিশুর মুখ দেখা গেল শত মৃতের মাঝখানে। আহা মিরাকল! আহা কি শান্তি! সারারাত ঘুমে, নির্ঘুমে আমি এক সৃষ্টিছাড়া পাগল দৌড়ে গেলাম আমার সামনে দাঁড়ানো নিঝুম সাদা পাতায়। আর তার চোখ মুখ, বুক পিঠ, সারা শরীর ভরে দিলাম কালোর পাগলামিতে।
সাদা পাতা
কিছু সূর্য পড়ে আছে পাহাড়ি খন্দকে
সহস্র হ্রেষাধ্বনি চলন্ত সাদা মাঠে
আমি কি করে গড়ে তুলি আমার বাস্তুভিটা?
চারিদিকে দাউ দাউ সিপাহি ও পেয়াদা
খাখা তরবারি ঢুকে পড়ছে দুর্বাঘাস
উড়ন্ত মস্তিকে।
পেয়ালার আলো শেষ, জল শুধু অন্ধকার
ছলধ্বনি। উদীয়মান তাতারবংশ, রক্ত
রাজটীকায়! দাঁতে মৃতহাঁস,আগুন উড়ছে
মরহুম ভ্রাতার কুনিয়ায়।
তবু আজ কলম খুলে এক টুকরো গাছ
বুনে যাই এই বাঙলাবংশীয় প্যাপিরাসে,
সাদা তুমি স্বাতি হও, ঝুল বারান্দা ছেড়ে
পথে পথে লাল দাও- গাঢ় জলতরু প্রপেলার।
একদিন মৃত শালিকের আঙুল ভেদ করে
গজিয়ে উঠুক পাখিডিম, হিজলের পাতা!
০৩/০৫/২০১৫