আধুনিক কবিতা- নিরীশ্বর, বিশ্বাস হারানো মানুষের কবিতা। যেন ফ্রয়েড কথিত মানসিক প্রতিবন্ধীদের চোখে দেখা এক বিকলাঙ্গ পৃথিবী। অহঙ্কার, আত্মশ্লাঘা, পাপাচার, ব্যভিচার ইত্যাদির মতো সুস্বাদু অন্ধকার যার অনিঃশ্বেষ চারণভূমি। এখানে কবিদের পরিপ্রেক্ষিত বন্ধ্যা, দুঃখদুষ্টে ক্লিন্ন, কষ্ট জর্জর, স্বমেহনের মতো আত্মক্ষয়ী রুগ্নতা আর গ্লানিতে পূর্ণ। আধুনিক কবিরা এমন এক অসুখে নিজেদেরকে সঁপে দিয়েছেন যেখানে শয়তানও যেতে ভয় পায়। ক্ষণিক নরকস্তন চুষে যা সুখ পাওয়া যায় তা মেকি, ভঙ্গুর আর সদা নিরাশায় দোদুল্যমান।
আধুনিক কবিতা না বুঝতে চেয়েছে মানুষের শুদ্ধতা, না স্পর্শ করতে পেরেছে আরশি নগর আর তার পড়শির পরমতা। সে থাকতে চেয়েছে উঁচুতে থাকা ঐ মেঘের মতো নিরালম্ব একা, আপনার ছায়াঘরে বিষাদবন্দি। তাই স্বভাবতই আধুনিক কবিতা একপেশে, করুণ রুগ্ন। এর কবি নার্সিসাস বোধে এত আত্মমগ্ন যে কবিতার নির্মাতা আর নির্মাণের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যায় না। এই ক্ষুদ্র পরিধিজুড়ে সে যা ভাবছে, বা যা করছে তাই যেন কবিতার অনায়াস বয়ন, কবি আর কবিতার এ যেন অনিবার্য নিয়তি। কবি এক বিশ্বাসহীন, নাস্তিময়, জ্বরাক্লিষ্ট পৃথিবীর সাক্ষী; তার কবিতাও সৃষ্টিতে খর্বকায়, রুগ্ন। পৃথিবীর দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধ মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ধ্বংস করে দিয়েছিল। মানুষের শুভবোধ, খোদা-ধারণা থেকে মানুষকে তাড়িয়ে ক্রমশ নিমজ্জিত করেছে এক মধুর নরককুঞ্জে। যুদ্ধের করুণ স্মৃতি আর তার গলিত শব বিনির্মাণ করার দায় পড়ল আধুনিক শিল্প সাহিত্যের রচিয়তার ঘাড়ে। এ রকম চলল পুরো শতাব্দি ধরে। সেই আত্মস্বীকৃত বৈনাশিক চিন্তা থেকে বের হয়ে আসল কত অসংখ্য তত্ত্ব ও তথ্যের কীট আর কীট। এই আত্মক্ষয়ী, মরবিড কবিতার শেকড় বাকড় ডালপালা ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীর সকল দেশে। কবিতায় বোদলেয়ার, পাউণ্ড, এলিয়ট, উপন্যাসে জয়েস, কনরাড, ফকনার, কাফকা, কামু; দর্শনে নিৎটসে, সাত্রে যা শুরু করেছিল তার হাত ধরে পৃথিবীর ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল এই রুগ্নবার্তা- আধুনিক হও, অদৃশ্যে বিশ্বাস করো না, নাস্তিবাদি হও। এ যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা। এক মায়াবী সুরে ডেকে নিয়ে গেল সবাইকে- এক ’পড়ো জমি’র গন্তব্যহীন ধ্বংস-জগতে। কী করুণ অপচয়- মানুষের শক্তির আর সম্ভাবনার।
আধুনিক মানুষের অবিশ্বাস, চিন্তা, দর্শন, অর্থব্যবস্থা, রাষ্ট্র কাঠামো, রাজনৈতিক বিশ্বাস কিছু মানুষকে করে তুললো নরকের নিপীড়ক আর কিছুকে করে তুললো সদা সন্দেহপ্রবণ, সদা পলায়নপর, পাগলপ্রায় আশ্রয়হীন কুকুরসম প্রাণীতে। এই আধুনিক মানুষ সৃষ্ট ব্যবস্থা আজো পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে কোনো শান্তি, সাম্য ও ন্যায় বিচার কায়েম করতে পারেনি। যে পুঁজিবাদি শিল্প কারখানা নির্ভর, বস্তুবাদি আর্থ-সামাজিকতা আধুনিক কালের চুড়ায় উঠছে, তাতেও গণ মানুষের মুক্তি মেলেনি। মানুষ দাস থেকে দাসতর হয়েছে, নারী হয়েছে কর্পোরেট ভোগবাদি, আলো ঝলমলে ডল হাউজের পরাধীন পুতুল। অত্যাধুনিক ফ্যাশনের প্রয়োগক্ষেত্র- সে নিজেকে ভাবে স্বাধীন, ক্লাব আর উৎসবে নেচে গেয়ে মনে করে আত্মনির্ভর, বেঁচে যাওয়া। আহা সে জানেইনা মুনাফাখোর, মজামুখি এই বাজারসমাজ তাদেরকে আত্মনির্ভিরতার ডোজ দিয়ে রুগ্ন আর নগ্ন করে ছেড়ে দিয়েছে ক্ষুর্ধাত কাপালিকের কাছে!
তো যে নেতি আর মনোবৈকল্যর ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক কবিতার জন্ম তাকে আর পড়া যায় না। তাদের স্বমেহন, মেকি দুঃখকাতরতা, আত্মরতির রুগ্ন কবিতাগুলো আজ যেন মরা মানুষের দেহের গন্ধ বয়ে আনে। এখানে নেই কোনো চলমানতা, নেই কোনো নতুন, নেই কোনো সৃষ্টি। আধুনিক কবিতা নিজেই আটকে গেছে তার শবদেহে। তার ভূগোল সংক্ষিপ্ত, তার পরিধি ক্ষুদ্র তার চিন্তা শৃংখলিত। তাই বারবার ঘুরে ফিরে আসে হাতে গুণা কয়েক গুচ্ছ মৃত শব্দ। যেখানে আছে দুর্গন্ধ, আর ভন ভন করে ঘুরে বেড়ায় হাজার হাজার বিষাক্ত শব্দমাছি।
ভাগ্য ভালো যে সময় বয়ে চলে নিরবধি। মানুষ আজ টের পেয়েছে এই আধুনিকতার চোরাগুপ্তা অসারতা, তার মৃত্যুমুখর বেঁচে থাকাকে। তাই মানুষ তার হারানো আত্মপরিচয় উন্মোচন করে, তার নিজ সত্তার কাছে প্রশ্ন রাখে, উত্তর খুঁজে পরমের কাছে। সে স্বভাবতই পরিধি অতিক্রমকারি, ক্রমশ খুঁজে বেড়ায় তার অস্তিত্বের অর্থময়তা, খুঁজে বেড়ায় হারানো ’যোগাযোগ’কে। প্রশ্নের স্তরায়নে, আত্মিক শুদ্ধির অনুপ্রেরণা পায় তার অস্তিত্বের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক মহা অধরা, অজানার কাছে। ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্ব খুঁজে পায় ইতিহাস ঐতিহ্যে, সংস্কৃতির যৌথ দোলাচলে। মানুষ বুঝতে পারে সে একা নয়, সে এক বিশাল কৌমের অধীন। আর তার আছে অধিকার আর অঙ্গীকার, তার আছে দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ। তাই তো আধুনিক-পরবর্তী যূথবদ্ধতা, মানুষের জ্ঞান-গভীরতা, আর দেহ আর মনকে চেনা জানা সূত্রের বাইরে হারিয়ে যাওয়া ’যোগাযোগ’ নিবেদনে বোঝা শুরু হলে, কবিতার অজস্র জানালা খুলে যায়। ব্যক্তি তার খোলস ভেঙ্গে চলে আসে আরো ব্যক্তির কাছে, তার নিজের প্রকৃত পরিচয়ের কাছে। সে বুঝতে পারে এই বিশ্বে সে আর কিছু নয় সে এক অনন্য সৃষ্টি, এক অনন্তের সাথে মিলনের উদ্দেশে সে হাত ধরে এগুচ্ছে। তাই কবিতার মায়াবি পর্দা দুলে ওঠে, যোগাযোগের এনকোড আর ডিকোড খুলে যায়, তার অদেখার সাথে একত্রিত হওয়ার লোভ এই বিশ্ব চরাচরকে করে তোলে সদা চলমান, গঠনশীল এক ’হয়ে ওঠা’
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ
২৫/০৪/২০১৫

অসাধারণ, আধুনিক কবিতা নিয়ে বিশ্লেষণটি ।