(কিছুদিন আগে ফেসবুক ভিত্তিক কবিতার পাতা ঘুমঘোর কবিতার ক্যাফের সাথে আমার কিছু কথোপকথন হয়। অনেকের অনুরোধে পুরো কথোপকথনটি এখানে আপলোড করা হলো। কৃতজ্ঞতা: ঘুমঘোর কবিতার ক্যাফে।)
১। ঘুমঘোর: কবি হয়ে ওঠা কি আপনার মোক্ষ না বাধ্যবাধকতা? কবি না হলে আক্ষেপ হতো? আপনার কবি হয়ে ওঠার ব্যক্তিগত জার্নিটার কথা আমাদের জানান।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: মোক্ষটাই আসল। আমার কাছে কবিতা একটা যাত্রা। লক্ষ্যে পৌঁছা নয়, সবর্দা যাওয়া। আমার সদা বেঁচে থাকার প্রেরণা, টিকে থাকার উপায়। কী হতো কবিতাছাড়া এই জীবন? ভাবতেই কেমন লাগে! কবিতা লেখার আগে কবিতা-পাঠক হয় মানুষ। তার ভেতরে যদি কবিত্ব থেকে থাকে একটু, তাকে সাথে করেই আগায় সেই কবিতা-পাঠক। এর মানে হয়ত একজন বিশেষ কবিতা-পাঠেকর মধ্যেই একজন ভবিষ্যতের কবি বসে থাকে নীরবে। ঢাকা কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় থেকেই কবিতার সাথে নিবিড় পরিচয়। মূলত সেই সময় থেকেই নিয়মিত কবিতা পড়া, কবিতার বিস্ময়কর ভাষার প্রতি দুর্বলতা বাড়ে। বুঝলাম কবিতার ভাষা ঠিক গল্পের ভাষা বা উপন্যাসের ভাষা নয়। তো সেই যে একটা ভাবনার কথা অন্য রকম করে, অন্য ভাষায় গড়ে তোলা যায়, সেই বিষয়টি সর্ব প্রথমে আমাকে টানল। স্কুলে পড়ার সময় পাঠ্য পুস্তকে কত ধরণের কবিতা পড়েছি, পদ্য পড়েছি। রবীন্দ্রনাথের ছড়া-কবিতা, নজরুলের বজ্রকণ্ঠের দেশ মাতৃকার কবিতা, আরো কতো কতো মিনিংফুল, নীতি উপদেশমূলক পদ্য । কিন্তু কেমন জানি এগুলো বেশি টানতো না। একদিন পাঠ্যপুস্তকে হঠাৎ করে পাওয়া বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ‘নদী-স্বপ্ন’ এর দুটি লাইন ‘কোথায় চলেছো? এদিকে এসো না! দুটো কথা শোনা দিকি
এই নাও- এই চকচকে ছোটো, নুতন রূপোর সিকি’ পড়ে কেমন জানি লাগল। তারপর বড় হয়ে কলেজের লাইব্রেরীতে বসে জীবনানন্দের ‘মহিনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জোৎস্নার প্রান্তরে’ অথবা ‘তার প্রেম ঘাস হয়ে আসে’ এসব লাইন পড়ে বিব্হল হয়ে পড়লাম, দেখা আর অনুভবের দরোজাটাই যেন খুলে গেল নতুন করে। মনে হল কবিতাও এরকম হয়! এই যে পরাভাষা, বিশেষ করে তার মূর্ত ও বিমূর্তের খেলা, আমাকে বিভোর করে রেখেছিল অনেকদিন। প্রথম থেকেই সরাসরি কমিউনিক্যাটিভ, গাছ ফুল নদী নারী প্রেম এইসব অতিব্যবহৃত, কবিতাগন্ধী বিষয় নিয়ে লিখতে ইচ্ছা হয়নি। তাছাড়া আমার পারিবারিক আর অর্থনৈতিক জীবনও আমাকে আমার মতো কবিতা লিখিয়েছে। আমি আমার বাবাকে হারাই খুব অল্প বয়সে। তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বা ছয়। আমরা তখন ১৩ ভাইবোন। ভাইবোনদের সাথে অভাব অনটনে জীবন কেটেছে। শৈশবে এমনও হয়েছে দুপুরের খাবার রাত্রে খেয়েছি, রোযার সময় মসজিদে গিয়ে ইফতার করেছি। কলেজ জীবনটা পায়ে হেঁটে, ইউনিভার্সিটির জীবনটা পায়ে হেঁটে, টেম্পুতে চড়ে আর টিউশনি করে কেটেছে। তাই আমার কবিতা শুরুতেই কিছুটা আত্মজৈবনিক, রক্তাক্ত, ব্যর্থতা ও শূন্যতাবোধ, অস্থির আর অনিদির্ষ্ট জীবনটাকে বোঝার মধ্যে দিয়ে বিস্তার লাভ করেছে। তাই আমার প্রথম ও দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ যথাক্রমে ‘শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ’ ‘বাল্মীকির মৌনকথন’এ কবি তুষার গায়েনের ভাষায়, কখনো ছায়াপরিবার, কখনো ইতিহাসকে পূর্ণনির্মাণ, কথনো রাজনীতির অন্তসারশূন্যতা, দৈনন্দিন জীবনের টানাপোড়েন- এইসবের ছায়া দেখা যাবে। বলা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়ার সময় আমি কবিতার প্রতি মোটামুটি সিরিয়াসলি ঝুঁকে পড়ি। সেটি ১৯৮৮/৮৯ সালের দিকে হবে। তখন ‘একবিংশ’র সম্পাদক ও ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেনের সাথে পরিচয় হয়। তিনি তার পত্রিকায় লিখতে অনুরোধ করেন। সেই তো শুরু।
২। ঘুমঘোর: স্বত:স্ফুর্ততা ও প্রয়াস—এই দুয়ের মিথষ্ক্রিয়া বা স্বতন্ত্রভাবে কোনটির ভূমিকা কবিতা রচনার ক্ষেত্রে কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: একটি কবিতা কবির সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া লেখা হয় না। সত্য যে প্রাথমিক একটা অনুপ্রেরণা, ভেতরে কিছু একটা হাজির হওয়া বা স্পার্ক করা বা ‘নাজিল’ হওয়া যাই বলি না কেন এগুলো কাজ করে। কিন্তু এই প্রথম উপলব্ধি, প্রথম কবিতা পাওয়াটাকে ছাড়া তো আর কবিতা লেখা যাবে না। আবার মজার বিষয় হলো প্রথম উপলব্ধিতে পাওয়া কবিতাটা আসলে কখনই লেখা হয় না। সেটিকে অন্য একটি ভাষায়, একটি তৈরি, সামাজিক কেজো ভাষায় লিখতে হয়। এমন করতে গেলে কবিতার প্রথম পাওয়াটা পরিবর্তন হয়ে যায়। তাই কবিতায় আমরা সবসময় আসল কবিতাটা হারাই। যা থাকে সেটি আর একটি কবিতা। যা হোক, একটা কবিতা কবির ভাবের, চিন্তার স্বতস্ফুর্ততা আর নিমার্ণের যৌথ ফসল। কবিতার স্বত:স্ফুর্ততা কবিতাটাকে প্রাণ দেয়, কবিতাকে বোধ ও ভাষার আর একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়। আর কবিতার নিমার্ণ প্রণালী কবিতাকে দেয় একটি শরীর।
৩। ঘুমঘোর: ভাস্কর চক্রবর্তী বলতেন, ”আমার একটাই দায় আছে। ভালো কবিতা লেখার দায়। এছাড়া আমার আর কোন দায়িত্ব নেই।“ আপনিও কি তা মনে করেন? একটা কবিতা কখন “ভালো কবিতা” হয়ে ওঠে আপনার চোখে?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ভালো কবিতা বা মন্দ কবিতা বলতে আদৌ কি কিছু আছে? লেখাটি কবিতা হয়ে উঠল কিনা সেটাই দেখার বিষয়। অনেকেই পাঠ্য পুস্তক অথবা কোনো কবিতার ছন্দ বিষয়ক বই-এ লেখা কবিতার অলংকরণ, ফর্ম ইত্যাদিতে তালিম নিয়ে বা পূর্বসুরি কারো কেতাবি ঢঙে লেখা কবিতা দেখে নিজেও কতো সুন্দর, সার্থক কবিতা লেখেন। কিন্তু এগুলোর মধ্যে ঐযে, নতুন চেতনার বিস্ময়, নতুন এক্সপ্রেশন থাকে না বলে এগুলো শুধু কবিতার মতো লেখা কবিতা মনে হয়। সত্য যে এগুলোতে লোক দেখানো একটা চাতুর্যময় মেকিং থাকে। আমি যখন কবিতার মতো বলি তখন তার উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ছন্দ ও ফর্ম, ধারাবাহিক নির্মাণ ইতিহাস, ঐতিহ্য মেনে একটা প্রতিষ্ঠিত, স্বীকৃত গড়ে ওঠাকে বোঝাই। এগুলো কবিতার মতো লেখা কবিতা। ভাবের কথাকে কবিতার মতো সাজিয়ে ফেললেই তো আর কবিতা হয়ে যায় না। কবিতা ভাব আর ভাষার সমন্বয়, এর মধ্যে না-দেখার বিস্ময়, উপলব্ধির বিস্ময় মিলে যখন একটা প্রসারিত নতুন চেতনার জন্ম দেয় তখনই লেখাটি কবিতা হয়ে ওঠে।
আজ আমরা এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছেছি এখান থেকে আর পেছনে ফিরে যাবার উপায় নাই, দরকারও নাই। একটা সাধারণ কথা মনে আসে- আগে লেখা কবিতার মতো আমি লিখব কেন? বড়জোর এগুলো পাঠ হতে পারে, তার মেকিং তার ভাষা জানা যেতে পারে। কিন্তু তাকে অনুসরণ করে লেখা মানে একটা প্রতিষ্ঠানের কাছে দাসত্ব করা। আমার কাছে মনে হয় এখন বাংলাদেশে কবিতার জগতে একটা দোদূল্যমান, কনফিউজড সময় বয়ে চলছে। দরকার একটা টার্নি পয়েন্ট, দরকার আবার নতুন করে শুরু করা। এর মাঝে কারো কারো কবিতার মধ্যে এই টার্নিং পয়েণ্টের শুরু দেখা যাচ্ছে। এটি বড় আশা জাগানিয়া বিষয়।
৪। ঘুমঘোর: একজন কবির কবিতা পর্যালোচনা করতে গিয়ে ব্যক্তি কবিকে জানা কতোটুকু প্রয়োজন? আদৌ প্রয়োজন কি না? নাকি তাঁর সৃষ্টিই তাঁর একমাত্র পরিচায়ক?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: এটি একটি আপেক্ষিক বিষয়। তবে আমি মনে করি কবিতাকে শুধুমাত্র কবিতার আলোকেই বিচার করা উচিত। অন্ততপক্ষে এই সময়ে। এতে সৃষ্ট শিল্পটির ওপর সুবিচার করা হয়। কারণ কবির ব্যক্তিগত জীবন জানা থাকলে আলোচক/সমালোচক পক্ষপাতিত্ব করতে পারেন। তখন কবিতা নয় কবির নাম, কবির জীবন কবিতা আলোচনায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কবির দুর্বল লেখাটাকে আলোচক বেশি ভালো, আবার ভালো লেখাটাকে কম মূল্য দিতে পারেন। যদি শুধু একটি কবিতা পর্যালোচনার জন্য হয়ে থাকে তাহলে কবিতাই মূল পাঠকেন্দ্র হওয়া উচিত। আবার যখন আমরা একজন কবির সামগ্রিক কাব্য-জীবন পর্যালোচনা করতে চাই তাহলে তার জীবন নয় তার কবিতার বিশেষ কিছু ট্রেণ্ড চিহ্নিত করে আলোচনা করি। সেই অর্থে কোনো কোনো সময় কবির ব্যক্তিগত জীবনও কাজে লাগে। যেমন ধরুন আমেরিকার ৬০ দশকের বীট জেনারেশনের কবিদের জীবন আর কবিতা সমান তালে চলেছে। তাই সেই সময় আর কবিদের জীবনটাকে জানা থাকলে কবিতায় আরো বিশদভাবে আলোকপাত করা যায়। আমাদের বাংলা কবিতায় জীবনানন্দ আর কাজী নজরুল ইসলামের কথা স্মরণ করুন। আমরা দুজনের জীবন আর কাব্য ঝোঁকগুলোর খবর কম বেশি জানি। জীবনানন্দ তার কবিতার মতোই পলায়নপর, নি:সঙ্গ, সন্দেহ প্রবণ, স্বপ্নচারি, কখনো আত্মহত্যাপ্রবণ। আবার নজরুল তার কবিতার মতোই উল্লাসপ্রবণ, উচ্চকণ্ঠী। সুতরাং এই চারিত্রিক গুণাবলি যেহেতু এই দুজন কবির কবিতার একটা প্যারালাল অবস্থায় থাকে তখন কবিতা বুঝতে আমাদের সুবিধা হয়।
৫। ঘুমঘোর: মহাকাল অত্যন্ত নির্মম ব্যক্তি সাহিত্যিকের প্রতি। বায়রন একসময় ছিলেন জনপ্রিয়তম, এখন তিনি অন্য রোম্যান্টিকদের তুলনায় কমই পঠিত হন। আন্যদিকে এমিলি ডিকিনসনের সাতটি কবিতা প্রকাশিত হয়েছিলো তাঁর জীবদ্দশায়, এখন তাঁকে ছাড়া আমেরিকান সাহিত্য ভাবাই অসম্ভব। মহাকালের বিচারে কে টিকে যান, কেনো টিকে যান বলে আপনার মনে করেন?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: এইটাই তো মহাকালের খেলা। কেন এমন হয়? ঠিক নিশ্চিত করে বলতে পারব না। কারণ মহাকাল নিয়ে ভাবিত নই। তবে আমার কাছে মনে হয় প্রতিভা, মোলিকত্ব, স্বর্ন খনির মতো লুকানো দেখার বিষ্ময়, ভাষার গুপ্ত আগুন ইত্যাদি কালজয়ী কবিদের আছে। মানুষ এই সোনা পাওয়ার লোভে বা আগুনে পোড়ার লোভে বার বার এই কবিকে আবিষ্কার করেন। প্রতিভা একটা বড় জিনিস। আপনি অনেক কায়দা কানুন জানতে পারেন, পড়াশোনা করতে পারেন। কিন্তু ঐযে প্রতিভা না থাকলে আপনি বেশিদূর আগাতে পারবেন না। হয়ত লোক যোগাযোগ, তোষামোদী, প্রচার, পশার এইসব দুই নম্বরী করে আপনার কালে পরিচিতি আদায় করতে পারবেন কিন্তু আপনার কাল গেলেই আপনি শেষ। লেখকদের মধ্যে এমন কেউ কেউ থাকেন যে তাদের সৃষ্টি ইউনিক। বাইরণকে এখন মানুষ তেমন একটা পড়ে না কারণ কবি বাইরণের আনন্দ-উচ্ছাস, রোমান্টিক স্বপ্নচারিতা বড়ই ফ্লাট, একঘেয়ে। মানুষ চিরদিনই তার সৃষ্টি-রহস্য, পৃথিবীতে তার অবস্থান, অনিকেত একাকিত্ব, রহস্যময় জীবনের কূল কিনারা খুঁজে বেড়ায়। টু বি আর নট বি-র মতো আর কি। কবি বাইরন যাকে কবিতা করতে চেয়েছেন তা সময়ের দাবিমাত্র, তাতে আজানার বিস্ময় নাই। তার রোমান্টিক উচ্ছাসমূলক কবিতার সারবত্তা সময় ফুরোলেই আর মূল্য থাকে না। অথচ তার সমসাময়িক কীটস এখনো স্মরণীয়, পঠনযোগ্য। কবিকে সময়ের বাইরে চিন্তা করতে হয়। অনেক কবি সাহিত্যিক আছেন তাদের বিষয়বস্তু, ভাষার কারণে সমসাময়িককালে তেমন পরিচিত পান না। কারণ তার চিন্তাধারা, তার কবিতার ভাষা তার কাল থেকে অনেক এগিয়ে। তিনি পাঠকের অজান্তেই তার সামনে এক ধরণের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে রাখেন। আম-পাঠক আগের ভাষায় অভ্যস্ত বলে বার বার একই ভাষা দেখতে চান। এমিলি ডিকিনসন নিজ সময়ে জনপ্রিয় বা বহুল পঠিত ছিলেন না কারণ তার কবিতার ভাষা তীব্র ভাবে এলিপ্টিক্যাল(যে ভাষায় শব্দ বা শব্দাবলি গোপন রাখা হয়)ইসেন্ট্রিক ঘূর্ণিভাষা, বা আমাদের সন্ধ্যা ভাষার মতো, আধা প্রকাশিত আধা অপ্রকাশিত । তাকে বোঝার জন্য নতুন দিনের পাঠকের জন্ম নিতে হয়।
৬। ঘুমঘোর: প্রবাস জীবন—যেখানে আপনার চারপাশে বাংলাভাষা বলিয়ের সংখ্যা অত্যন্ত কম, যেখানে আপনার দৈনন্দিন ক্রিয়াকর্মে-চিন্তাপ্রক্রিয়ায় অন্য ভাষা ব্যবহার করতে হয়, যেখানে অপরিচিত সংস্কৃতির ভেতর আপনাকে বসবাস করতে হয়—তার প্রভাব আপনার কবিতায় কতোটুকু?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: বিদেশ কাজের পরিবেশটুকু বাদ দিলে আমার বাকী সময়টুকুর সঙ্গী আমার বাড়ি, বাংলা ভাষা আর আমার স্মৃতি। তাছাড়া ঘরে সবাই বাঙলায় কথা বলি, একটা বাঙালি পরিবেশ বজায় রাখতে চেষ্টা করি, অনলাইন বাংলা পত্র-পত্রিকা তো আছেই। এগুলো বিরাট সুবিধা। অনলাইন ই-টেকের কারণে আজ কোনো কিছু আর দূরের মনে হয় না।সবই তো মোটামুটি হাতের মুঠোয়। কিন্তু ঘরের পরিবেশে বাংলা চালিয়ে যাওয়া কতোদিন কাজ করবে এ নিয়ে মাঝে মাঝে সন্দহে হয়। কারণ ছেলেমেয়েরা শুরু করে ভালো, মানে হাইস্কুলে না ওঠা পর্যন্ত ভালো বাংলা বলতে পারে। কিন্তু ওপরের ক্লাসে যেতে যেতে ধীরে ধীরে তাদের ভোকাবুলারি কমতে থাকে। তাই যে ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে যাচ্ছে তাদের সাথে বাংলা- ইংলিশ মিলিয়ে কথাবার্তা বলতে হয়।
তো ব্যক্তিগতভাবে একটা খালি জায়গা তো সব সময় থেকেই যায়। বেশি মিস করি ঐ সময়টাকে যখন দেশে বাল্যবন্ধুদের সাথে পার্কে বাদাম খেতে খেতে আড্ডা দিতাম। মিস করি বাংলা বইপত্র, ম্যাগাজিন, ফুচকা ওয়ালা, ফুটপাতের চায়ের দোকান আর বলাকা সিনামা হলের সামনের ব্রিজটাকে। একটা জায়গাতে আলাদা একটা ভাষাগত জীবন ব্যবস্থা থাকলে লেখালেখিতে কিছু পরিবর্তন তো আসবেই। আবার ভাষাই তো সবকিছু নয়। আরো কতো কিছু আছে- ফিজিক্যাল, নন-ফিজিক্যাল বস্তু, ধারণা আমার চারপাশে আছে। এই যে একটা স্টেশন দেখলাম একটা পাহাড় দেখলাম এটি তো আমার অতিচেনা জানা কমলাপুর বা ঘোড়াশাল স্টেশন নয়, পাহাড় নয়। তাহলে আমি কী করে দরদ দিয়ে জেনুইনলি অনুধাবন করব?এখানে আসার আগে প্রায় নিউমাকের্ট, নীলক্ষেত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে যেতাম। কোনো আড্ডা না, এমনিতেই। ফুটপাতের বইগুলো স্পর্শ করে দেখতাম। এই যে মাতৃভাষায় একটা জিনিসের সাথে সম্পর্ক করা এটি এখানে হয় না। কেমন জানি শধু প্রয়োজনের খাতিরে করা। বাঙালিদের আড্ডা আছে, খানাপিনা আছে, গান বাজনা, ওয়াজ মহাফিল আছে। কিন্তু কবি সাহিত্যিকদের কোনো আড্ডা নাই, মানে তেমনভাবে নাই। এখানে আমি আছি, কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আছে। কিন্তু সময়ের অভাবে আমাদের খুব একটা দেখা সাক্ষাৎ হয় না।
তবে আশার কথা হলো প্রাথমিক একটা ধাক্কা খাওয়ার পর, এক যুগের বেশি এখানে বাস করার পর, আস্তে আস্তে এই মায়াটুকু কাটতে বসেছে। এখানকার সন্ধ্যা, বিকাল, রাত্রি আমার নিজের হতে চলেছে। তা না হলে তো কবিতা লিখতে পারতাম না। স্মৃতি আছে কিন্তু শুধু স্মৃতি দিয়ে তো কবিতা লিখা যায় না। এখন যা দেখছি, পড়ছি, করছি তাই তো কবিতার ভাবনা খোড়াক হয়ে আসছে।
৭। ঘুমঘোর: আপনার কবিতা লেখার শুরু আশির দশকে হলেও আপনি নিজেকে নব্বইয়ের কবি বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। কিন্তু আপনার সমসাময়িকদের অনেকেই আশির কবি বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। আশির দশককে বাংলা কবিতার প্রকৃত উত্তরণের কালও বলা হয়ে থাকে। এমন এক সময়ের অংশ আপনি নিজেকে ভাবতে না চাওয়ার পেছনে কারন বলবেন কী?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমি আশির দশকের শেষের দিকে খুব সম্ভবত ১৯৮৮-১৯৮৯ সাল থেকে লেখা শরু করি, এটি সত্য। সব কবিরই একটা প্রস্তুতি পর্ব আছে, ভাষা ও স্টাইল খুঁজে বেড়ানো আছে। আমারও ঐ সময়টা কিছুটা এরকমই। সবাই লেখা ছাপাচ্ছে, আমি বসে থাকব কেন- একরকম ছেলেমানুষি আর কি। তখন একবিংশ আর কয়েকটি দৈনিক পত্রিকায় আমার লেখা বের হয়েছিল। কিন্তু আমি আমার চর্চাকাল শরু ৯০ দশকেই। আমার ভাষাটাও নব্বই দশকের, আশির দশকের নয়। সৈয়দ তারিক আর সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ আমার সহপাঠি হলেও ওরা দুজনেই আশির দশক থেকেই পরিপূর্ণভাবে কবিতা লেখা শুরু করেছে। তাছাড়া তারিক বয়সে আমার চেয়ে দুই বছর আর সুব্রত প্রায় এক বছরের বড়। যদিও এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়, তবু্ও এরা আমার কিয়ৎ সিনিয়র!
আশির দশক বাংলাদেশের কবিতার একটি পালাবদলের দশক অবশ্যই, কিন্ত নববইয়ের দশকে কবিতর বিষয়-আশয়, ফর্ম, উপস্থাপনা পুরোপুরি পাল্টে যায়। মনে করুন সেই সময়ে পোস্টমডার্ন সাহিত্য তত্ত্ব তুঙ্গে। কবিতার পূর্বেকার বুনিয়াদ, আধুনিকতার ঘিন ঘিনে অপচয়, ক্লিন্নতা, ক্লিশে কবিতার গায়ে ধাক্কা দিয়ে কবিতার বহুমুখি যাত্রার কাছে দায়বদ্ধ থেকে, হাজার বছরের শিল্পস্নাত ইতিহাস ঐতিহ্যকে পূর্ননির্মাণের মধ্য দিয়ে নব্বইয়ের কবিতা ছুঁয়েছিল জীবনের সবকিছুকেই। প্রতিষ্ঠিত ফর্ম ভাঙা থেকে শুরু করে, কবিতার এক রৈখিকতা ত্যাগ করে বহুরৈখিকতাকে গ্রহণ, মানে কেন্দ্রাতীগ কবিতা, ব্যাকরণ বিরোধীতা এইসব গুণ এই সময়ের কবিদের কবিতায় লক্ষ্য করা যায়। তাই সংগত কারণেই আমি নিজেকে নব্বইয়ের কবি বলে মনে করি।
ঘুমঘোর: একটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত আড্ডায় আপনি বলেছিলেন পপুলার মিডিয়াতে হাতে গোনা কয়েকজন কবির নাম ঘুরেফিরে আসে। জনপ্রিয় ও বহুলপ্রচারিত মিডিয়াতে যারা আছেন তারাএই কবিদের পরিচিত, বন্ধু বা সাগরেদ। কিন্তু এটিকে একটি পরিকল্পিত সাহিত্যিক অসততা, বা সাহিত্যিক জেনোসাইড বলে আপনার মনে হয়েছে। এর ফলে পাঠক বাংলাদেশে যে আরো প্রতিভাবান আর শক্তিশালী কবি আছেন তা জানতে পারছেন না। আপনি কেনো এটাকে পরিকল্পিত ভাবছেন? যাদের নাম ঘুরেফিরে আসে তাদের প্রায় সবাই তো শক্তিমান কবি। “জেনোসাইড”-এর মতো শব্দ যেহেতু আপনি এ-প্রসঙ্গে ব্যবহার করেছেন, সহজেই বোধগম্য যে এ-ব্যাপারে আপনার তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। এর কারণ কী ব্যাখ্যা করবেন? আর কাদের কবিতার কথা আসে না বলে মনে করেন?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ক্ষোভ নয়, একে অভিযোগ বলা যায়। আমার মনে হয়েছে যারা এটি করে বা করেছে এটি তাদের আইডেনিটি ক্রাইসিসের ফল। একটা বিরাট হীনম্মন্যতা। আর এটি বেশ ইচ্ছা করেই, পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। কারণ এটি যারা করে তারা এইসব কবি লেখকদেরই গ্রুপেরই মেরুদণ্ডহীন প্রতিভাহীন কবিযশোপ্রার্থী কেউ। এটি ক্রমশ দুবৃর্ত্ততাড়িত আমাদের সমাজের বাইরের কিছু নয় অবশ্য। যেরকমভাবে ক্যাডারভিত্তিক জোট, ট্যাণ্ডারবাজি, দালালি, হল দখল, জোর জবরদস্তির ক্ষমাতায়ন বাংলাদেশে ঘটে- এটিও ঠিক এরকম একটি মাস্তানি আর কি। তখন আমার চিন্তার কারণ হয়েছিল এই কারণে যে এরা মিডিয়া, সাহিত্যগোষ্ঠী বা এরকম গোষ্ঠীচালিত পত্রপত্রিকায় আপাতত একটি নিজস্ব ছায়াদূর্গ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল এবং খুব কায়দা করে একজন আর জনের নাম বলেছে, তালিকা তৈরি করেছে। তাই এদের নামই ঘুরে ফিরে এসেছে। কারণ তাহলেই তো পাঠককে একটা ফাঁকি দেয়া সম্ভব, পাঠক জানবে যে তারাই একমাত্র। তখন আমার কাছে তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে এখন ইন্টারনেট ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, অনলাইন পত্র-পত্রিকা, সোস্যাল মিডিয়া, ব্লগ চালু হয়েছে। এখন কোনো গোষ্ঠীরই একচেটিয়া প্রচার আর প্রশারের আর সুযোগ নাই। কবি এখন ইচ্ছা করলে যে কোনো জায়গা থেকে যে কোনো সময়ে কবিতা আপলোড করতে পারেন। পাঠকও তাই। পাঠক আগের চেয়ে আরো বেশি বিচার বিবেচনা বোধ, বুদ্ধি ব্যবহার করে বুঝতে পারছেন কারা কবি আর কারা অকবি। এটি যদিও ডাহা প্রমাণের বিষয় নয়, আর এখন কবিতা-লেখক হিসাবে এসব বলতেও আমার নিজেকে ছোট মনে হয়, তবুও বলেছিলাম কারণ বলার দরকার ছিল। আর একটি কথা বিবেচনার জন্য বলি। বাংলাদেশে কোনো সৎ সমালোচনা সাহিত্য এখনো গড়ে ওঠে নাই। এটির যেমন অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক কারণ রয়েছে তেমনি আছে লেখকের ব্যক্তিস্বার্থ, দূরভিসন্ধি। ফলে যখন এই শাখাটি ক্রীয়াশীল থাকে না তখন সাহিত্যে গ্রাম্য মাতব্বরি চলে, জোর জুলুম চলে। আর যাদের নাম আসে নাই, তারা তো এখন সবার সামনেই কবিতার ডালা নিয়ে বসে আছেন। পাঠক, কবি মিলিয়ে মিলিয়ে দেখতে পারছেন কার শক্তি কতটুকু। কেউ নাম উচ্চারণ করল কি করল না হু কেয়ারস!
৯। ঘুমঘোর: এখন আপনার একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ প্রবণতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষন করতে চাইছি: আপনার কবিতায় সওম, নামায, ক্বাবা, সিজ্বদা, জায়নামাজ, ইত্যাদি ইসলামিক-ফার্সী শব্দের ব্যাবহার অত্যন্ত দৃষ্টিগ্রাহ্য এবং তা আরোপিত মনে না হয়ে ভাষার স্বাভাবিক ধারার সাথে মিশে যায়। যেখানে দেখা যাচ্ছে সমাসাময়িক কবিরা এসব শব্দ খুব একটা ব্যাবহার করছেন না, বা করলেও খুব দৃষ্টিগ্রাহ্য নয়, সেখানে আপনি অবলীলায় এগুলো ব্যবহার করছেন। এবং করছেন যেহেতু, তাই বলতে পারি এইসব শব্দরাশি নিয়ে আপনার একটা নিজস্ব মতের জায়গা রয়েছে। তা কেমন?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: কবির কনশাসনেস সব সময় এক ধারায় একই টানে বা একই প্রপঞ্চে কাজ করে না। আমার এই শব্দগুলো বিশেষত আমার প্রকাশিতব্য নতুন কবিতার বই ‘সিজদা ও অন্যান্য ইসরা’ তে দেখা যায়। আমি গত দুই এক বছর একই সময়ে ব্যক্তিগতভাবে কিছুটা ডিভাইন-কনশাসনেস আর আর্থলি- কনশাসনেস এর ভেতর দিয়ে যাওয়া আসা করেছি। আর রাহমানুর রাহিম(ক্ষমাশীল) আর আল মুনতাকিম(শাস্তিদাতা) দুটি পরস্পরবিরোধী স্বরুপ বোঝার চেষ্টা করেছি। এটি একই সময়ে যন্ত্রণা ও আনন্দময় অভিজ্ঞতা। এমন কি মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়ার সময় জায়নামাজের দিকে তাকিয়ে অবচেতনে, আমি কবিতায় এই সব মায়াবি আবহে, মায়াবি শব্দে আবাহন করেছি। সৃষ্টিকর্তার এও এক বিশেষ মহিমা! ভেবে ভেবে আর্শ্চয আর মোহিত হয়েছি। একটা কথা মনে রাখতে হবে, যে শব্দ বা শব্দবন্ধের কথা এখানে উল্লেখ করা হলো এগুলো আরবি বা ফারসি হলেও এগুলো আমাদের ভাষায় এমনভাবে মিশে আছে যে এগুলো আর বিদেশি শব্দ হিসাবে ধরা যায় না। আমরা কি সংস্কৃত, ইংরেজি, পুর্তগীজ, চীনা ইত্যাদি বিদেশি ভাষা থেকে শব্দ নিয়ে বাংলা বলি না? কবিতা লিখি না? তখন তো কেউ কিন্ত কোনো আপত্তি করে না! একজন বাঙালি হিন্দু কবি বা বাঙালি সেকুলার কবি যদি ঈশ্বর, দেবতা, পুজা, পুরোহিত, প্রণাম ,মন্দির ইত্যাদি শব্দ অবলীলায় ব্যবহার করতে পারেন তখন একজন মুসলিম বাঙ্গালি কবি, ধর্মীয় কারণে হোক বা মুসলিম সংস্কৃতির কারণেই হোক, এইসব আরবি ও ফার্সি শব্দ ব্যবহার করে কবিতা লিখতে পারবে না কেন? এটির কারণ মনে হয়- আমাদের সাবকনশাস মাইণ্ডে ধরে রাখা বাঙালি সংস্কৃতির একচেটিয়া, অন্ধ আগ্রাসনমূলক প্রভাব।এ বিষয়টি বেশ সাম্প্রদায়িক। আল্লাহ, ইসলাম, মোহাম্মদ, নবী রাসুল, ইমাম, সালাত, সওম ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করলেই কেউ মোল্লা বা মৌলবাদী হয়ে যায় না। একজন কবিকে এই চাপানো ভয় থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমার এরকম কোনো পক্ষপাতিত্ব বা সমস্যা নাই। আমি সব ধরণেই শব্দই কবিতার প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারি। তবে আসল কথা হলো এগুলো কবিতা হলো কিনা নাকি কোনো ধর্মীয় উপদেশমূলক, হিতবাদী পদ্য হলো এটিই বিবেচ্য।
১০। ঘুমঘোর: ‘‘এমন একটা সময় হয়ত যায় সবার জীবনে—যেখানে এক রক্তপিপাসু সৃষ্টিডাকাত বর্শা ছুঁড়ে কবিতা লেখায়। কোনোভাবে ফেরানো যায় না তাকে। ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকের কথা। তখন একটা ঘোরের মধ্যে সময় কাটছে আমার। ডাক বিভাগে চাকরি করি। মনে যা আসে তা অফিসের টেবিলে প্রথমে লিখে রাখি তারপর দৌড় দিয়ে পাশেররুমে কম্পিউটারে বসে টাইপ করি। …তখন কবিতার আগুনে পুড়ছি আমি, আমার প্রতি পদক্ষেপে প্রতি শ্বাসে এক একটি কবিতা—বাতাস হয়ে উড়ছে, পাখি হয়ে বসছে আমার হাতে।’’—পলাশী ও পানিপথ কাব্যগ্রন্থের রচনাকালের কথা এগুলো। এই যে সৃষ্টিশীলতার ঘোর, কবিতার অগ্নিতে দহন—এর ভেতর কারো পক্ষে সমস্ত জীবন থাকা সম্ভব নয়। আপনার সেসময়কার সাথে এখনকার সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার তুলনা কেমন করে করবেন?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: তখন ৯০ দশকের শেষের দিক। আমার বয়স তখন কতো হবে ২৬/২৭ এরকম। একজন কবির জীবনে এই সময়টা বেশ বেদনাময়, পাগলা করা সৃষ্টিশীল সময়। সে যদি কবি হয়ে থাকে এই সময়টা তাকে জ্বালিয়ে দেবে, পুড়িয়ে দেবে- এটাইতো স্বাভাবিক। আমি তখন কিন্তু জনপ্রিয় বা বিখ্যাত হওয়ার লোভে কবিতা-জীবন শুরু করিনি। এটি ছিলো স্বত:স্ফূর্ত কবিতাযাপন, গাছ থেকে পাতা বের হওয়ার মতো অবস্থা। এমন হয়েছে যে আমি অফিসে গিয়েছি শুধু একটা কবিতা লিখতে! ‘পলাশি ও পানিপথ’ এর কবিতাগুলো সেই সময়েই লেখা। আর তখন একবিংশ বেরিয়েছ, বের হয়েছে নিসর্গ। লেখার তো একটা প্লাটফর্ম ছিলোই।
তারপর আমি ১৯৯৯ সালে মার্চ মাসে অস্রেলিয়া চলে আসি, অভিবাসি হয়ে। এখানে এসে বিরাট একটা কালচারাল শোক খেলাম। নতুন দেশ, নতুন ভূ-প্রকৃতি, নতুন লোকজন। শুধু ভাষাটা নতুন নয় কারণ ভাষাটা তো আমি জানতামই। তার সাথে রুটি রোজগারের জন্য চাকরি বাকরি খোঁজার ঝক্কি ঝামেলা শুরু হলো। তো এই দূরবস্থায় কবিতা এক রকমের পালিয়েই গেল। চেতনাগতভাবে একটা বিরাট চেঞ্জও এটি। তবুও কিছুটা যুদ্ধ করে করে ২০০৪ সাল পর্যন্ত অনিমিয়ত কবিতা লেখা চালিয়ে গেলাম। তারপর ২০০৪-২০০৮ প্রায় চার বছর প্রায় কিছুই লিখিনি। কবিতার জগৎ থেকে প্রায় হারিয়ে গেলাম। যা হোক ২০০৯ সালের দিকে এসে ইন্টারনেট, ব্লগ, সোস্যাল মিডিয়া বিশেষত ফেসবুক যখন আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ল তখন সমসাময়িক কবিবন্ধুদের কবিতাগত-অনুপ্রেরণায়(কাব্য-হিংসা!)আবারো লেখালেখিতে ফিরে আসি। প্রথমে ভাবলাম আমার আগের লেখার একটা সংকলন বের করি। তো পলাশী ও পানিপথ বের হল। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা তাগাদা অনুভব করলাম যে আগের থীম, টপিক, মেকআপ সব পরিত্যাগ করব। যেমন আবহমান বাংলা, ছায়াপরিবার, ইতিহাস, রক্তপাত মানে সরাসরি এগুলো আর লিখব না। এখন যা কিছু লিখব নতুনভাবে লিখব। এটি একটি সচেতনা আর কি, যদিও লেখা এইভাবে হয় না। তবুও আবেগটা টেনে ধরলাম, ভাষাটা আরো একটি শানিয়ে নিলাম। কবিতা আসতে লাগল চেতন আর অবচেতনে, রিয়েলিটি আর সাররিয়েলিটির মধ্য দিয়ে। তার সাথে যোগ হলো বিদেশ থাকার অভিজ্ঞতা। জীবনানন্দের মতো -তোমরা তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও- আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব- এরকম ভাবনা আর তাড়া করল না। বাস্তবতা হলো আমি বিদেশ আছি। আর এই বিদেশকে আমার দেশ বানাতে প্রায় দশ বছর লাগল। আশ্চর্য এখন ঢাকায় গেলে আমার সিডনির জন্য মন কাঁদে।
১১। ঘুমঘোর: শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ আপনার প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই এবং আসছে বইমেলায় বের হতে যাচ্ছে ক্রমশ আপেলপাতা বেয়ে । প্রথম ও শেষ বইয়ের মধ্যে আপনার কবিতায় কি ধরণের বিবর্তন এসেছে?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: এটি বিচারের মালিক তো পাঠক। কিছু পার্থক্য তো থাকবেই। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ’(১৯৯৫) প্রস্তুতি পর্বের লেখা দিয়ে সাজানো। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যাবে আমি একটি ভাষা খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিছুটা গুপ্ত, কিছুটা খোলা, মূর্ত ও বিমূর্ত চিত্ররেখার মতো। আর যা কিছু কবিতাগন্ধী তাই পরিত্যাগ করছি। নিজের রাস্তাটাকে ঘুরে ঘুরে আবিষ্কারের পালা যেন। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘বাল্মীকির মৌনকথন’(১৯৯৬) এ আরো গভীর ভাব আর বিন্যাসে নিজেকে সঁপে দিয়েছি। একটা ডুব দিয়ে কবিতা-সমুদ্রের গভীরে জলের আনাগোনা টের পাওয়া যেন। কিন্তু আমার তৃতীয় কবিতার বই ‘পলাশী ও পানিপথ’(২০০৯) এ আমি কবিতার ভেতর ও বাহির এই উভয় দোলাচালে ঘুরে বেড়িয়েছি। একদিকে বাংলা ভাষা, ভারতীয় উপমহাদেশ আর বাংলাদেশের মর্মরে থাকা ইতিহাসের রক্তমাখা মুখ, ঐতিহ্য ও রাজনীতির ট্রাজিক ফলাফল আর অন্যদিকে নিজের বিম্বে, কবিতার সদা পলায়নপর, থরো থরো কাঁপা মুখ। এর ধারককে সদা জ্বালিয়ে রেখে উভয় যেন একই সাথে এই বইতে ভাষা পেয়ে উঠল। এটি ছিল আমার কাব্য জীবনের প্রথম পর্ব।
আমার দ্বিতীয় জীবন ও কাব্যচর্চা উভয়ই শুরু হয় অস্ট্রেলিয়াতে এসে। এখানে এসে জীবনযাপন বদলে যাবার কারণে কাব্য-ধারণাও পাল্টাতে শুরু করে। বস্তুকে, তথা জীব জগৎ-কে ভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে দেখা, পরিধি থেকে বিন্দুর দিকে হাঁটা, স্রষ্টা আর সৃষ্টির মধ্যে সর্ম্পক নিরূপণের যন্দ্রণাদায়ক অবস্থা এবং ভাবনার বহুমুখি বিস্তার, এসব ঘটতে থাকে। আমার মনে হয় এই যে বাস্তবতা-পরাবাস্তবতা, চেতন-অবচেতন, মূর্ত-বিমূর্ত এই দ্বিরাচারি ভ্রমণ আমার জন্মগত। এটি বিষ্ময়ের দিক বা ভাবনার গুণ যাই বলি না কেন আমার কবিতার একটি অবিচ্ছেদ্য দিক। এটিকে আমি এড়াতে পারি না। প্রথাবদ্ধ ছন্দ ব্যবহার তো আগেই বাদ দিয়েছিলাম, কিন্তু এবার ধ্বনির সাথে আন্দাজ করা আরো তপোধ্বনি, পূর্ণতা-শূন্যতা, শব্দের শারীরিকতা নয়, অনুভূতি আর বোধের শারীরিকতা ইত্যাদি দিয়ে একটি আন্তর সাংগীতিকতাকে ধরতে চেয়েছি। আমার নতুন কবিতার বই- ক্রমশ আপেলপাতা বেয়ে-তে এই চিহ্নগুলোর খোঁজ মিলবে।
১২। ঘুমঘোর:নো ম্যানস জোন পেরিয়ে নামে আপনার একটি কবিতার বই আছে, কবিতার বইয়ের শিরোনাম হিসেবে নো ম্যানস জোন পেরিয়ে শব্দবদ্ধটি বাছাই করতে হলো কেন? কবি কি কোনো অর্থে ‘নো ম্যানস জোন’-এর বাসিন্দা বলে আপনার মনে হয়?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ঐ যে নতুন পরিসর, নতুন ভাষা খোঁজা, অন্য কবিতার সন্ধান ইত্যাদির একটা ‘জায়গা’ হিসাবে আমি এটি ব্যবহার করতে চেয়েছি। কবির নিজস্ব দেশ কাল সময় এসব তো থাকেই। তারপরও একজন কবি ঐ যে রেড-মার্ক করা, না-যাওয়া এলাকা, যেখানে মানুষ যেতে সাহস পায় না, সেখানে যেতে চায় মানে ফিজিক্যালি নয়, তার কাব্যিচন্তা দিয়ে। এটি সম্ভব হয় যদি আমি আমার চিন্তার বন্ধাত্ব, প্রয়োজনহীন অলংকরণের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে যেতে পারি। সবই একটা প্রতীক আর কি।
১৩। ঘুমঘোর: আপনার কবিতায় কনক্রিট ও এবস্ট্রাক্টের এক অদ্ভুত সমন্বয় বিভিন্নভাবে পাওয়া যায়। যেমন, “নদী অভিজ্ঞতা” নামক কবিতায় “নিবিড় পাতাল রক্তে তোমাকে ছোঁবার সাধ মাছ হয়ে জাগে”—এখানে এবস্ট্রাক্ট সাধের সাথে কনক্রিট মাছের তুলনা, বা একই কবিতায় “ভাবলে মৃত্যু খুব ঝুলন্ত থাকে— শাদামাছে”—এবস্ট্রাক্ট মৃত্যুর সাথে আবার মাছেরই তুলনা, যা কনক্রিট। এমন আরো উদাহরণ দেয়া যায় (“বাসবিষয়ক তিনটি” কবিতার “মায়াকামিজের মাংস” শব্দবন্ধ)। এই বিশেষ প্রবণতা নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আসলে মূর্ত আর বিমূর্ত বলতে কিছুই নাই। সব কিছুই সময়কে, এই বিশ্ব ব্রক্ষাণ্ডকে উপলদ্ধি করার ওপর নির্ভরশীল। আমরা চোখে যা দেখছি, অভিজ্ঞতায় যা মেনে নিয়েছি, সেটাইতো সেই বস্তুকে বা ধারণাকে একমাত্রিকভাবে প্রকাশ করে না। সবই তো ইল্যুশন, মায়া। আর সব জিনিসেরই একটা প্রাণ আছে, অস্তিত্ব আছে বলে টের পাওয়া যায়। আমি মনে করি আমরা একটি অনন্ত সময়ে বাস করি। তো এই সময়-আধারে সবকিছু বদলে যায় অহরহ। মানুষের চিন্তা ভাবনা, কামনা বাসনা, জ্ঞান অভিজ্ঞান অহরহ বদলে যায়। সিন্ধান্ত বদলে যায়। এমন কিছু জিনিস আছে যাতে আমাদের কোনো হাত নাই। আমরা ইচ্ছা করলেও ঠিক একই অবস্থায় ভিন্ন সময়ে চলতে পারি না। এই বিষয়টিকে আমি কবিতায় প্রকাশ করতে চাই। বাস্তব অভিজ্ঞতা আর অনিশ্চিতের মিলে যে একটা আপাত কেওয়্যটিক, কুয়াশা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সেই রকম অনুভূতি দিয়ে আমার কবিতা উপলব্ধ করা যায়। নদী অভিজ্ঞতা কবিতাটির শক্তি হলো ইমেজারি। ৯০ দশকের দিকে টিভিতে এক সুন্দরি মডেলের(খুব সম্ভবত মৌসুমি হবে) ফর্সা পা নদীতে নেমে যেতে দেখেছিলাম। কী অদ্ভুত সুন্দর সাদা পা, পায়ের আঙুল, তার সাথে টল টলে জল- এটাই আমার এই কবিতার ব্যাকগ্রাউণ্ড। মনে হলো মাছ ধরতে নামছে নারী আর পুরুষের প্রেম নদীর ভেতর লুক্কায়িত প্রেমশক্তি, রিরংসা, মাছ হয়ে স্পর্শ করতে চাইছে সুন্দর। এ এক অদ্ভুত এক্সপ্রেশন হয়ত, কিন্তু এটি একটি গভীর ইমেজারির মাধ্যমে পাঠকের সাথে যোগাযোগ করছে। আশ্চর্য, টামাস ট্রান্সট্রোমারের কবিতায় এখন এই গভীর ইমেজারির খোঁজ পাওয়া যায়।
১৪। ঘুমঘোর: এইযে ইদানীং দেখি আমরা অনলাইনে কবিদের মধ্যে দু-ধরণের মত—এক পক্ষ প্রথাবদ্ধ ছন্দ মেনে, মাত্রা ঠিক রেখে কবিতাচর্চায় গুরুত্ব দেবার পক্ষে, আর আরেক পক্ষ ছন্দকে খুব বেশি মুল্য দিতে চান না। প্রথাবদ্ধ ছন্দ জানা ও তার প্রয়োগ কতটা জরুরি কবিতা লেখার ক্ষেত্রে? সমসাময়িক কবিতা ছন্দের জাল ছিঁড়ে কতোটা বেরিয়ে গেছে এবং ছন্দের পুনর্বাসন কতোটা প্রয়োজন?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: এ বিষয়ে অনেক কথা হয়েছে, তর্ক, এমন কি মনোমালিন্যও হয়েছে। এ পৃথিবীতে ছন্দ ছাড়া কিছুই নাই। পৃথিবীর শুরুতে ছন্দ ছিল, পৃথিবীর শেষও হবে ছন্দে। আমি যে এই কথাগুলো বলছি এখানেও এক ধরণের ছন্দ আছে, ধ্বনির প্রতিঘাতে, বিরতি আর চলা নিয়ে ধাপে ধাপে একটা দোলার সৃষ্টি হচ্ছে। কবিতা যেভাবেই লিখা হোক না কেন, যে ভাষাই ব্যবহার করা হোক না কেন ছন্দ থাকবেই। তবে কেউ কেউ ছন্দ নিয়ে এত ছন্দবাজি করেন যে মনে হয় তারা ছন্দের ইজারা নিয়ে রেখেছেন।‘ছন্দহীনতা’ একটি অপপ্রচার মাত্র, যারা প্রথাবদ্ধ ছন্দ ব্যবহার করতে চাইছেন না তাদের ঘায়েল করার কায়দা এটি। আদিতে কবিতা লেখা হত একটা শব্দে শব্দে দোলা বা ছন্দ গাঁথুনি দিয়ে, যাতে করে এটিকে সবাই মনে রাখতে পারে। কারণ তখন কোনো ছাপাখানা ছিল না। মানুষের মুখে মুখে ধরে রাখার জন্য কবিতার লাইন ভেঙ্গে ভেঙ্গে, তাল, লয় মিলিয়ে একটা সাংগীতিক পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজন ছিল। তাই পৃথিবীর আদি ধর্মগ্রন্থ, আদি কাব্যগুলো ছন্দে ছন্দে বলা। তো আধুনিক যুগ আসার পর, প্রিণ্ট ব্যবস্থা আবিষ্কারের পর মানুষের কবিতা আর মনে রাখার প্রয়োজন নাই। বই আকারে এইসব লেখাগুলো মানুষ এখন ইচ্ছা করলেই যখন তখন পড়ে নিতে পারে। কবি আজ আর প্রথাবদ্ধ ছন্দে লেখার জন্য বাধ্য নয় এবং তা জরুরিও নয়। প্রথাবিদ্ধ ছন্দ একটা বদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ধারণা দেয় যা সামন্ততান্ত্রিকতা ও দাসত্বকেই মনে করিয়ে দেয়। কবিতা এমন একটি শিল্প যে এটি আপনা আপনিই, শরীরে ছন্দ ধরে রেখে লেখা হয়। কান সজাগ রাখলেই বেশি টের পাওয়া যায়। তাকে আলাদা করে কোনো প্রথাবদ্ধ ছন্দে ধারণ করার কোনো মানে হয় না। তাই প্রথাবদ্ধ ছন্দ জানার মধ্যে একটা কৌশল জানা থাকতে পারে, কিন্তু তাতে কোনো বাহাদুরি নাই। জীবনানন্দ যদি ঢিলা ঢালা অক্ষরবৃত্ত ছন্দ প্রয়োগ ছাড়াও তার কবিতাগুলো লিখত তাহলেও কবিতার কোনো হেরফের হতো না বলে মনে করি। কারণ এগুলি এমন একটি ভাষায় লিখা যে যেখানে ছন্দ সেকেণ্ডারি, তার থট প্রসেস প্রিলিমিনারি। তাই ছন্দ একটি কৌশল মাত্র, প্রয়োজনীয়তা নয়।
১৫। ঘুমঘোর: প্রথম ও দ্বিতীয় দশকের কবিদের কবিতা সম্ভবত আপনি পড়ে থাকেন অন্তর্জালে। এখনকার কবিতার নতুন প্রবণতাগুলো কী কী বলে আপনার মনে হয়?
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: ঠিক যে আমি নতুন কবিদের কবিতা পড়ি। জীবন্ত কবিতা খুঁজি, তার থেকে অনুপ্রেরণা পাই। হাতের কাছে থাকলে ভালো করেই পড়ি। অনেকের কবিতা বেশ ভালো লাগে। দেখি নতুন ভাষা পাওয়ার চেষ্টা হচ্ছে, নতুন কবিতার জন্ম নিচ্ছে। কয়েকজন তরুণ তো বেশ পরিশ্রম করছে, নতুন স্বাদ আর গন্ধের কবিতা লিখছে। এটা ভালো। কারণ কবিতার ভাষা একদিনে সৃষ্টি হয় না, তার পেছনে লেগে থাকতে হয়। নীরবে, নিভৃতে চর্চা করতে হয়। অনেকেই আছেন একটা গ্রুপ বা এরকম নির্ভশীল ছায়ায় থেকে অথবা সোস্যাল মিডিয়ায় সরব থেকে সময় নষ্ট করছেন। এটি সোস্যাল মিডিয়ার একটি খারাপ দিক। কবিদের এতো সরব, এতো প্রচারমুখো, প্রগলভ হলে হবে না। আবার এও দেখি কেউ কেউ রবীন্দ্র-সত্যেন্দ্র ছন্দে বা গানে গানে কবিতা ভাবে, কবিতা লিখতে চায়। আশ্চর্য লাগে। অনেককেই দেখছি পূর্বের প্রতিষ্ঠানের কাছে মাথা নত করে তাদেরই মতো লিখতে চেষ্টা করে। এটির মানে হলো চিন্তা ও কবিতার দৈন্যতা। যাই হোক, প্রথম ও দ্বিতীয় দশকের কবিতা পড়ে আমার মূলত দুটো ধারার কথা মনে হয়- একটি হলো কবিতাধারার কবিতা মানে পুরনো ধারার কবিতা আর একটি হলো নতুন ধারার কবিতা। এখনো মোটা দাগের কোনো প্রবণতা চোখে পড়েনি। আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আবার দেখি নব্বইয়ের দশকের কবিতায় যে চিহ্নগুলো ছিল, ঐগুলোই তো ঘুরে ফিরে আসছে। তবে একটা জিনিস বেশ ভালো যে প্রায় সবাই প্রথাবদ্ধ ছন্দে আর কবিতা লিখছে না। আরো ভালো লাগে যখন দেখি মেয়ে-কবিরাও সমান তালে ছেলে-কবিদের সাথে এগিয়ে আসছে, কবিতা, গদ্য লিখছে, পত্রিকা/পেজ সম্পাদনা করছে। এটি খুবই আশার কথা।
১৬। ঘুমঘোর: প্রতিটি নতুন উচ্চারণের মধ্য দিয়েই হাজার বছরের ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস কথা বলে। কোনো কবিই নন প্রভাবমুক্ত—সচেতনভাবে বা অচেতনে কবি তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছে ঋণী। যদি জিজ্ঞেস করা হয় কারা আপনাকে প্রভাবিত করেছেন, আপনি কাদের নাম বলবেন?
তা তো ঠিকই। আমি ব্যক্তিগতভাবে, পৃথিবী নামক পাঠশালাতে থাকা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষায় লেখা কবিতার উত্তরাধিকারকে সম্মান জানাই। কোনো কিছুই এমনিতেই গড়ে ওঠে না। কবিতার সাথে দীর্ঘদিনের পরিচয়, পাঠ বা থাকা একটা বিরাট প্রাপ্তি হিসাবে কাজ করে। আমার বেলায় তো ব্যতিক্রম নয়। কতো কবির কবিতার স্বাদ গ্রহণ করেছি। কেউ নিদির্ষ্ট করে প্রভাবিত করে নাই। একটা সাম্রগিক পাঠঅভ্যাসের ফলাফল প্রস্তুতি পর্বের কবিতাগুলো। বাংলাদেশের জীবনানন্দ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান, পশ্চিমের এমিলি ডিকিনসন, পাউল সেলান, টেড হিউজ, হার্ট ক্রেন, নেরুদা, টমাস ট্রান্সট্রোমার, আরবিভাষী কবি আ্যাডোনিস এর প্রথাবিরোধী
স্টাইল, মাহমুদ দারবিশের স্বদেশ হারানোর শূন্যতাবোধ, ফার্সি ভাষার কবি জালাল উদ্দিন রুমির সুফি ভাব ধারার কবিতা আর সর্বশেষ জেন কবিতার সাত্ত্বিকতা, ছোট ছোট অনুভূতির সহজ কিন্তু গভীর এক্সপ্রেশন আমাকে বিস্ময়ে ভরে দিয়েছে। পুরনো কবি হোক, নতুন কবি হোক একটা জীবন্ত কবিতা আরো কতো কবিতার জন্ম দিতে পারে তা ভেবে বেশ আনন্দিত হই, শিহরিত হই।
২৫/১১/২০১৪
