জীবনানন্দ দাশের ‘বোধ’ কবিতাটির কথা সবার মনে থাকে। আধুনিকতার ‘কবি-শহীদ’ যতই কবিতার আড়ালে তার ক্লান্তিহীন মরবিডিটি, অনিকেতের সাধনা, মানুষের আস্তানা মানুষের সংঘ থেকে স্বেচ্ছা নিবার্সনের অবস্থানটির কথাটি বলতে চান না কেন, শেষ পর্যন্ত এটি মানুষের হারিয়ে যাওয়া সংঘবদ্ধতাকে ফিরে পাওয়ার বেদনাভারাক্রান্ত অস্তিত্বকেই যেন প্রকাশ করে। ‘মানুষের মুখ দেখে কোনোদিন/ মানুষীর মুখ দেখে কোনোদিন/শিশুদের মুখ দেখে কোনোদিন!’ এ তো মানুষের কাছে ফিরে যাবারই আশা, স্বপ্ন। তিনি তার লেখায় কবিতার সামাজিক মূল্যকে কবিতার শিল্পমূল্যর বিনিময়ে হীন মনে করতে চান না কেন- তার কবিতায় ঘুরে ঘুরে এক হারানো মানব-মানবীর কথাই শোনা যায়। মনে পড়ে সেই বিনাশি লাইন– ‘আলো- অন্ধকারে যাই– মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়,– কোন এক বোধ কাছ করে!/স্বপ্ন নয়–শান্তি নয়– ভালোবাসা নয়/ হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়!’ এরূপ সুপার আমিত্ব-তাড়িত আধুনিক মানুষের ‘বিং অ্যান্ড নাথিংনেস’ জনিত শূন্যতা, অন্ধ বিবমিষা, আত্মহত্যা-কাতরতা থাকলেও কবিতাটি শেষ পর্যন্ত মানুষের ছিটকে পড়া কৌম-স্বভাবের দিকেই আমাদেরকে ইশারা দেয়। এই সাময়িক মৃত্যুবোধ রোমান্টিকের অভিমান মাত্র। এতে লুকানো লজ্জা হলো মানুষের সাময়িক পরাজয়। বিশ্বযুদ্ধজাত কু-রাজনীতি ও অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাবের কারণে মানুষের মহান ট্রাজিডি, হেমলেটিয়ো সন্তাপ, দ্বিধার নিচে চাপাপড়া মানুষ আর এই মানবতাড়িত সভ্যতার কাছে চলে যাবার চোরা আকুলতা যেন এই কবিতাটির আসল লক্ষ্য।
তার ‘বনলতা সেন’ কবিতায় হাজার বছর ধরে যে পথিক হেঁটে যায়- সে আসলে কে? সে যেন কোনো ভ্রমণপাগল দরবেশ! তার পরম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে– পরমের সান্নিধ্য খোঁজার জন্য পথে পথে ঘুরছে । মানুষের সাথে সেই পরমের বন্ধন প্রতিষ্ঠাকল্পে একটি শান্তিপথ সন্ধানের যাত্রী হচ্ছে সে। যেখানে যেতে পারলে এই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আত্মা তার প্রার্থীত পরমের উপস্থিতি খুঁজে পাবে। বনলতা সেন কী? বনলতা সেন একটি আইডিয়া, একটি আশা, মানুষের হারানো আর্থ-প্যারাডাইস- যা একটি নারীময় সত্তায় পৃথিবীর সবুজ কল্যাণঘর, ক্লান্ত ট্রাভেলারের জন্য ভেতরে শান্তিজল ধরে রেখেছে। হাজার বছর ধরে মানুষ তাকে খুঁজছে, পাগলের মতো। তাই আড়ালের আড়াল- কবিতার আসলে একান্ত নেগিটিভ বৈনাশিক কোনো আড়াল নাই, কবিতা সব সময় ভাব আর ভাষার হাতধরে, ভাষান্তরে ঘুরে ঘুরে তার কৌমের কাছে ফিরে আসে। ফিরে আসে সোনালি কাবিন নামে, আসাদের সার্ট হয়ে, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছকে পিছনে ফেলে চক্ষুষ্মান সমাজবাদি মানুষের কাছে।(কবিতার দায়দব্ধতা- আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ)
কবিতা
জীবনানন্দ দাশ স্মরণে
পাথরও রক্ত চায় যেন মহাভারতের মুনি
যাহা চায়- তাহাই জীবন্ত মাঠে।
ঐ আসছে ভেসে শুদ্ধতম ঘিলুর সুঘ্রাণ
নাসারন্ধ্রে হাত রেখে দেখা যাবে
জল কীভাবে আলোর ভূমিকায় ঘুরে ঘুরে
ট্রামের ভাষায় কথা বলে।
অধিকন্তু ট্রাম– বনলতা সেন
দেখে– মাথার টানেলে হরিতকি গাছের প্রতিভা
দুটো চড়ুই অনন্ত ভ্রমণের কথা বলে গেছে কতোদিন।
হাজার বছর ধরে বিকেলের গৃহমুখি রাস্তা–
অপেক্ষায় এমন অপার্থিব পথিকের
যার আছে তৃণ ইতিহাস গভীর কলসে।
বরিশালের শিশির মাখা পথের ঘটনা শেষ
জেগে আছে কলকাতার শিকারি হীনম্মন্য রাস্তা।
দেখে নির্বিবাদি এক মানুষের ক্রোমোজমে
ধানসিঁড়ি জলের কফোঁটা
অযোনিসম্ভূত মহিলার প্রতিলিপি
আর বাঙলা কবিতার ভবিষ্যৎ।
তখন আমরা- আমাদের বাণিজ্যপ্রবণ চলাফেরা
শুকনো পাতায় জল ঢেলে অনেক সময় ধরে
রেলপথ অতিক্রম করে আসি।
জানি মূঢ় ভারতবর্ষের কয়েকটি আর্যগাথা:
একদিকে চিরজীবী অশোকের ভ্রাতৃবধ আর একদিন
বাঙলা কবিতা লেখেন জীবনানন্দ দাশ।
কবিতা রচনাকাল: ১৯৯৭
