সৈয়দ তারিক-এর কবিতা-শিকার ও একগুচ্ছ কবিতা

 tarikভাবনাকে মোর ধাওয়ায়

অধরাকে ধরবার জন্যই সমস্ত আয়োজনদৃষ্টি পায় না যার দেখা, শ্রবণ শোনে না যা, স্বাদ-ঘ্রাণ-গতি-তাপ কিছুই যায় না বোঝা যার, সেই নিখিল না-কে অস্তিত্বের সমগ্রতা দিয়ে অনুভব করাই শুধু নয়, এই প্রক্রিয়ার সাথে ভাষার দ্বন্দ্ব-মিলনে জন্ম নেয় কবিতা
তবে কি যা আছে, যা দেখি-শুনি-ছুঁই তা দিয়ে হয় না কবিতা?
হয়, হয়, হয়
যাআছে, যা দেখি-শুনি-ছুঁই তার নিতান্ত সামান্যই আছে নাগালে, বাকি সবটুকুই ঢেকে আছে বিপুল অজানার নিবিড় আঁচলেসে-আঁচল সামান্য নড়ে উঠলেই রহস্যময়তার যে-কল্লোল নৈঃশব্দের মন্ত্র জপ করে তারই নাম কবিতা
সে-কবিতা লেখা হয়ে ওঠে না কখনো; কেবল তার প্রস্তুতি চলতে থাকে অনুক্ষণ

 ২.
চারুকলা অনুষদে শারদোৎসবভগবান শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় হলুদ রঙের পোশাক পরা একদলতরুণ-তরুণী খোল-মন্দিরা বাজিয়ে নাচতে নাচতে গাইছে আর সমস্ত প্রাঙ্গন প্রদক্ষিণ করছে :
মানুষ বানাইছে খোদা প্রেমের কারণে,
প্রেমের ডুরি বান্ধো রে মন মুরশিদের সনে

 এটাই ছিলো অনুষ্ঠানের থিমএই রকম আনুষ্ঠানিক ভাবময়তা আমাদের মধ্যশ্রেণির একটা বিলাস এমনতর রূঢ় মন্তব্য করা বোধ হয় উচিত নয়কারণ, এই ভাবধারার সাথে বিপুল মধ্যশ্রেণির জীবন যাপনের প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ যদি না-ও থাকে, তবু তো এঅনুপ্রেরণা দেয় দৈনন্দিন জাগতিকতা ও সীমাবদ্ধতার বাইরে অপর এক প্রেম-ও প্রজ্ঞার জগতের অভিপ্রায়ের দিকেসাম্প্রতিক  বছরগুলোতে আমার চর্যার ও আমার কবিতার কেন্দ্রীয় প্রণোদনা এই গুরুমুখী-প্রেমবাদী দর্শন

 ৩.
সত্যের উপলব্ধি ব্যক্তিকেন্দ্রিক; কিন্তু সত্যের সত্যতা এখানেই যে তা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে যায়কবিতা কেবলই শব্দের খেলা নয়সত্যের উপলব্ধি ছাড়া কবিতা মহৎ হয় নাতা বলে কেবল ভারি ভারি কথা বলতে হবে কবিতায় এমন নিশ্চয়ইনয়যে-কোনো আকস্মিক বা নৈমিত্তিক অনুভূতি-আবেগ-উপলব্ধির শিল্পময় প্রকাশ হতেই পারেতবে কবির যদি কোনো বিশেষ দার্শনিক বীক্ষা থাকে তবে কবিতায় তার বিশিষ্ট প্রকাশ ঘটেই থাকে

 ৪.
বহির্বাস্তবতার তথ্যের সাথে কবিতায় ব্যবহৃত তথ্যের গরমিল থাকতেও পারে, কিন্তু কবিতার সত্যতা নির্ভরকরে সেই তথ্যের প্রয়োগ-কুশলতায়, ব্যঞ্জনার নিবিড় দ্যোতনায়

 ৫.
আমার অনুজাপ্রতিম কবিবন্ধু নভেরা হোসেন মাঝে মাঝে বলে, “আপনার কবিতার ভেতর একরকম প্রশান্তি আছে।” আবার কখনো-বা এর সাথে যোগ করে, “তবে ওটা আপনার ভানও হতে পারে।”
এই ভানশব্দটি আমাকে আরও দু-একবার শুনতে হয়েছে (হয়তো আরও হবে এর বিশেষণ-রূপসহ) আমার অপরাপর কোনো কোনো কবি-বন্ধুর কাছ থেকেআমার প্রকাশ ও যাপন সম্পর্কে তাদের এ বঙ্কিম উক্তিআমরা অশান্তি আর অসত্যের সাথে এমনই জড়িয়ে আছি নিত্য যে অন্য রকম কিছু দেখলে সংশয় জাগে, সেটাকেই অসত্য বলে মনে হয়সেই মহান অসত্যকে, সেই খাঁটি ভানকে ধারণ করাই আমার চর্যার ও আমার কবিতার অভিমুখ সবিনয়ে এটুকু বলা যায়

 ৬.
একজন অগ্রজ কবি আক্ষেপ করেছেন যে আমাদের কবিতা হতে গান হারিয়ে যাচ্ছেসেই নিরিখে আমার কবিতা হয়তো একটু বেশি গীতল অনুজ এক কবিতানুরাগীর মন্তব্যেসে-রকমই মত শুনতে পেলামকবিতায় ধ্বনিপ্রতিমার কল্লোল আমার ভালো লাগে

 ৭.
মাত্রাবৃত্ত ছন্দ আমার খুব প্রিয়এটি বিপ্লবীকি না তা নিশ্চিতভাবে বলতে পারবো নাতবে এই ছন্দের আঁটোসাটো নিয়মিত চলন আছে যা স্বরবৃত্তের (অনেক সময়েই অক্ষরবৃত্তেরও) আলুথালু ভাব থেকে মুক্তফলে এতে একটা মুক্ত আবহ পাওয়া যায়তদুপরি এ ছন্দ খুবই গতিশীলছয় মাত্রা ছাড়াও, পাঁচ, সাত কিংবা চার মাত্রায়নানা রকম বৈচিত্র্য আসে ( আমার কবিতায় এই বৈচিত্র্য অবশ্য কমই স্বীকার করে নিচ্ছি)তা ছাড়া পংক্তি-দৈর্ঘ্যের বৈবিধ্য, উপপর্ব, মুক্তকতা এবংঅনুপ্রাস প্রয়োগে এতে আরও নানা রকম বৈশিষ্ট্য আনা যায় (আমার কবিতায় সে-সবহয়তো তেমন বেশি নয়)উপরন্তু, শব্দের কুশলী প্রয়োগের অবকাশ তো রয়েছেইএ-ছন্দে উচ্চারণের একপ্রকার ঋজুতা ও স্পষ্টতা আছেএ-ছন্দের সাবলীল ধ্বনিময় নৃত্য পরায়ণতা আমার ভালো লাগে

 ৮.
কোনো শব্দই অচ্ছুৎ নয়কেবল, কবিতার ভাব আর অন্যান্য শব্দের অনুষঙ্গে সুমিতি বোধই জরুরিতৎসম শব্দের পাশাপাশি আরবি-ফারসি শব্দ, দেশি শব্দের সাথে কখনো কখনো ইংরেজি বাঅন্য যে-কোনো ভাষার শব্দ আবহের, ভাবধারার ও শৈলীর প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্যমাঝে মাঝে চলতি ভাষার বাগবিধির ব্যবহার কবিতাকে বোধ হয় একটু সরস করে তোলে

 ৯.
আমারকবিতা হয়তো একটু ভাবনাতাড়িতকখনো কখনো একটু বেশি নিরাভরণশিল্পের মাপকাঠিতে সবই তুল্যমূল্য নয়, জানি কিন্তু, বিশেষ একটি ভাবধারায় তথাসুফিবাদী বীক্ষায় আমি প্রাণিত, তাই আমার লেখায় অনেক সময়েই তার প্রকাশ থাকাটাই স্বাভাবিকআর, কখনো কখনো, সেই ভাবধারার সাথে আপাতঃ-অসঙ্গত ভাবনাও আমার রচনায় হয়তো দুষ্প্রাপ্য নয়

 ১০.
আমার দীক্ষা পূর্বকালের কবিতাবলিকে আমি অস্বীকার করি না
(
২০০৯)

কয়েকটি কবিতা

পথের সাথে প্রেম

 লক্ষ্যটাই নিরিখে রাখি পরম বিন্দুতে :
উপায় আমার ভেলা

 তরঙ্গিত ব্যাপ্ত বিপুল সাগর
পেরোতে পারাবার
আলম্বনের ভরসা খুঁজে পাই

 হঠাৎ কৌতূহলে
দেখতে পাই, উপায় নিজে লক্ষ্য হয়ে গেছে
উপায়ে আজ লক্ষ্য গেছে মিলে

 তাহলে কি এ পথের নেশা?
পথের সঙ্গে প্রেম?
পথ যেখানে যাচ্ছে নিয়ে,
যে আনন্দলোকে
পথই সে হেরেম
(
২০০৪)

 পাথর

পাথরে তোমার প্রেমের অনুষ্ঠান
পুষ্পে, শঙ্খে, জলে ও অগ্নিশিখায়
হৃদয়ের গাঢ় আকুলতা চমকায় :
মৌন থাকেন নিরাকার ভগবান

 পাথরে আমার ঘৃণার অনুষ্ঠান
আবেশমগ্ন কঙ্করাঘাত যাকে,
কৌতুকে দ্যাখে আমার ব্যর্থতাকে :
চেতনলোকের নিরাকার শয়তান
(
২০০৪)

 প্রেমিকা

ক্ষুদ্র নই আমি, বড়ও না
মাপতে চাও কেন আত্মাকে?
বাঁধতে চেয়ো না আমাকে বন্ধনে,
ফিরিয়ে দাও আমি যার তাঁকে

 ঘুরিয়ে নিয়ো না তা বলে মুখ,
আমি তো থেকে যাই তবু তোমার;
আমার কেউ নেইকিচ্ছু নয় :
সকলই আর তুমি শুধু আমার
(
২০০৪)

 অর্ধনারীশ্বর

রূপালি বিভায় ভেসেছে ধরিত্রী
মেরাজের সেই রাতে,
পড়েছি নামাজ দিব্য জায়নামাজে
তুমি-আমি একসাথে

 দারুসসালামে তোমার নূপুর বাজে,
জমিনে আমার ঘর
লোকায়তনের সুপ্তিজড়িত
অর্ধনারীশ্বর
(
২০০৪)

 প্রেমবাদ

 না কোনো ঈশ্বর নয়, ঝলমল দেবদূত নয়,
না কোনো বেহেশতের মোহন কাহিনি;
প্রেম আর প্রেম শুধু অবিকল প্রেমের আবেগে
মুগ্ধ চেয়ে থাকি, আর কিছুই চাহি নি

 না কোনো ক্রুসেড নয়, জেহাদের কুরুক্ষেত্র নয়,
ময়দানে নয় কোনো বিতর্ক-বাহাস;
কেবল তাকিয়ে দেখি, অতল নিবিড় জলাশয়ে
ভেসে যায় সাবলীল শাদা রাজহাঁস
(
২০০৫)

 অনন্য

তুমিই আশেক, তুমিই মাশুক :
প্রজাপতি নাড়ে দুই ডানা;
লাইলি তোমারই জন্য ব্যাকুল,
কায়েসও তোমার জন্য ফানা

 তুমিই কৃষ্ণ, তুমি সে-রাধিকা,
যমুনায় তুমি অতল ঢেউ;
তুমিই পুষ্প, তুমি মৌমাছি
নাই কিছু আর, অন্য কেউ
(
২০০৫)

 মৃত্যুঞ্জয়

জানি, জানি, হবে দারুণ ফতোয়া জারি :
কাফের কতল করো;
শুনেছে আদেশ নবিজির অনুসারী :
মরার আগেই মরো

 আমি তো কবেই কাফন পরেছি শরীরে,
আমি তো কবেই হয়ে গেছি পুড়ে ছাই,
আমি তো কবেই জেনে গেছি অন্তরে
আমার মৃত্যু নাই
(
২০০৫)

One thought on “সৈয়দ তারিক-এর কবিতা-শিকার ও একগুচ্ছ কবিতা

  1. আমার দীক্ষা পূর্বকালের কবিতাবলিকে আমি অস্বীকার করি না।(২০০৯)… I am made of my experience and they never hurt me!!!

Leave a Reply