অপ্রকাশিত গল্প: বিবাহগীতি

modern art

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

লাইলি এবং লীলা একই যেমন মতিন এবং যতিনকিন্তু তাদের বিবাহ হয় নাপাশাপাশি থেকে ওরা বোঝে যে ওরা বিবাহিত নয়এ বিষয়টি তাদের পীড়া দেয়আমাকে বলে তুমি ব্যাখ্যা করো তুমি শহরে থাকোতোমার যোগাযোগ সম্পর্কিত জ্ঞান ভালোএতে আমার ক্ষণিক পিপাসা জাগেছেলেবেলার একটি পুকুরের কথা মনে পড়ে যেখানে একটিমাত্র পদ্মফুলের বাসস্বপ্নে আসে যায়, বাতাসের দোলা খায়স্বপ্ন চলে গেলে তখন এটি কোনো পুকুর নয়- একটি সরল রাস্তা যেখানে একদিন ন্যাংটা একটা পাগল গান ধরেআমি ভান করি বলি ‘বিবাহ সম্পর্কিত সকল তথ্যই এখন অর্ধলুপ্ত।’ আমি কিছু বৃদ্ধ জ্ঞানদানকারি লোকের নাম বলিওরা প্রাণীদের যৌথজীবন সম্পর্কে বইপত্র লিখেছে ওখানে বিবাহের গল্প আছেআমার কথায় ওদের মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া হয় নাআমরা তখন গঙ্গাসাগর রেল জংশন থেকে একটি খোলা মাঠের দিকে যাত্রা করিমাঠে গরু চড়ে নারাখালও নাইমতিন বলে এটি কোনো মাঠ হলোএতে লাইলি ক্ষুদ্ধ হয়মাঠ না বলে একে তুমি নদী, ভূমি আকাশ যে কোনো নামে ডাকোবিষয়টি আসলে সবসময় একই রকম থাকেগোল গতিময় এবং সন্দেহযুক্ত।’ একদিন বিবাহ সম্পর্কিত জটিল কিছু পুস্তক অথবা পুস্তকসম কিছু কাগজপত্রাদি থেকে ওরা বিষয়টি সর্ম্পকে কিছু তথ্য পায়ওরা গোল হয়ে একে অপরের তিকে তাকায়তারপর ধন্ধে ভোগে। ধন্ধে থেকে কোনো রাস্তা পায় নাতারপর একসময় লীলা খুব কাছে আসেকী সুন্দর সক্ষাৎ দেবী! আমি বলি ‘বিবাহ হয় লীলাকারণ সৌন্দর্যই লীলা আর সে সকল বাধাঁ দূর করে আর আমাদের সংযুক্ত করে।’ কেউ শুনতে পায় না আমার কথাযতিন প্রাথমিকভাবে যে নিস্ক্রিয়, কথা বলে ওঠেবলে ‘চলো আমরা বিষয়টি ত্যাগ করি।’ কিন্তু প্রকৃতভাবে বিষয়টি ত্যাগ করা যায় নারাত গেলে দিন গেলে এটি আরো ঘনীভূত হয়জমাট বাঁধেআমরা মাঠের পাশে ত্রিভুজ আকৃতির একটি টিলাবাড়ির শীর্ষে উঠিবিবাহ সম্পর্কিত নানাবিধ কৌতুহল বজায় রাখিকিন্তু লীলা খুব শার্পতার ঠোঁটের মতো একটি ঝিনুক নদীতে নামে, জল মাংস খায়আকাশ পাতাল দিন রাত্রি বৃক্ষমাটি ইত্যাদির মধ্যে সে বিবাহ সম্পর্ক খুঁজে বেড়ায়বলে ‘বিবাহ হল- চুক্তিহীনতায় লিখনছাড়া নির্দেশনার অতীত একটি ধারাবাহিক সম্পর্ক যা ভূজগতে স্বাধীনভাবে চলেকারো কথা সে শোনে নাপৃথিবীর এই ধারা, মায়াশেকড় ছায়ামূর্তির মতো দীর্ঘদিন ধরে এক সাথে আছেএটিই বিবাহ।’  মতিন লীলাকে সাপোর্ট করেঘাস থেকে হাত ওঠায়বলে ‘বিষয়টি আয়োজনের অতীতঅনুষ্ঠানের অতীত ওরা পরস্পর বিপরীতমুখি এমন কিছু এমন কেউকিন্ত স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য এক সাথে বসবাসযুগ্ম বৈপরীত্যের মধ্যে একাত্মতার থিওরির মতোযেমন শূন্যতা-পরিপূর্ণতা সুখ-দু:খ আবার ধর্ম-অধর্ম ইত্যাদিএ গুলো বিবাহকারণ এতে মিলন আছে, চক্র আছেআমি শুনে অবাক! মফস্বলে থেকেও মতিনের ভেতর দার্শনিকতা জায়গা দখল করে আছেলীলাও তাইওরা পালাক্রমে এরকম আরো কথা বলে যাচ্ছেআমার ভান করে লাভ নেইআমি ওদের মতো শার্প নইকিছুক্ষণ আগে দিন ছিলোএখন রাতআমার দাড়ি বড় হচ্ছেলীলার পাজামার কোণা থেকে প্রাচীন বাড়ির ভেজা মাটির স্যাঁত স্যাঁতে গন্ধ আসছেভোঁ ভোঁ করে মাছির মতো নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে মাথায় থাবা মারছেআমি বলি ‘আমি ভেজা মাটি খাবোভেজা মাটির সাথে আমার মিলন হবেএটি বিবাহ।’  মতিন লাইলি যতিন আমার দিকে তাকিয়ে হাসেলাইলি বলে ‘হতে পারে।’ আমার পিপাসা একটু বাড়েসেই পুকুরটির কথা মনে পড়েএকটিমাত্র লাল পদ্মসেটি কি আমার লীলাবলি চলো বাড়ি যাইএতে লীলা অবাক হয়সে বলে ‘আমরা বিবাহ সর্ম্পকে আরো ভাববোকারণ এটি জীবনের অন্যতম একটি দিক।’ ভাবনার প্রকাশ কীভাবে?  প্রবন্ধের মতো ভারি নাকি কবিতার মতো রহস্যময়মতিন বলে ‘প্রবন্ধও নয় কবিতাও নয়এটি আসলে লেখা যায় নাদেখাও যায় নাএকজন বলে আর একজন শুনেতারপর পালন করেবৃদ্ধ পুরুষেরা যখন দেখল তারা আর দৌড়াতে পারছে নাগাছে ওঠে ফল আনতে পারছে নাশাদা বরফের মতো, আপেলের মতো সবুজ মেয়েগুলো আর কাছে আসছে না তখন তারা ঠিক করলো যারা দৌড়াতে পারে তাদের সহঅবস্থানটা জটিল করা দরকারযাতে ওরা সহজেই ফল আহরণ না করতে পারেওরা বললো তোমরা সামাজিক সূত্র পালন করোস্বীকৃতি নাও আমাদেরযেই নিদের্শনামা সেই কাজনৌকা স্রোত কেটে কেটে অনেক গভীরে চলে গেলবাতাসের প্রয়োজন আর হল নাআমরা দেখলাম একটি পুরুষ একটি রমণীর পাশে বসে আছে অথবা দাঁড়িয়ে শুইয়ে আছেবাতাসে ভেসে উঠলো শব্দ.. উলা উলাদ্রি দ্রি উলা… এটিই বিবাহআমার এখনো যেহেতু অভিনয় পালা শুরু করিনি তাই আমরা অবিবাহিতগাছের মতোদূরে দাঁড়িয়ে ভাবি মিলনের শ্বাসরোধি কথা।’ মতিনের কথা শুনে লীলা উচ্চস্বরে হাসেওর হাসির সাথে শরীরের প্রকাশ হলো পাতা নড়ে ওঠার মতআমি বললাম ‘কি সুন্দর সরল বৃক্ষ, ফলমূলে ভরাঅথচ আমি পাখি হতে পারলাম না।’  সাথে সাথে আমার একটা গল্পের কথা মনে পড়লোআমার স্কুলের বন্ধু মিনহাজ এই গল্পটা বলেছিলকিন্তু গল্পটার ঘটনা না বলে আমি এর শেষ কথা বলিসেটি হলো একটি দোয়াত আর একটি কলমবিবাহ বিষয়টা হল দোয়াত কলমকারণ দুটোই শুধু উৎসাহিত হয়মূল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়কাছে আসেদোয়াতের মূখ খোলা থাকলে কলম অস্থির হয়আর দৌড় দেওয়ার ইচ্ছা জাগেদোয়াতের মুখ চিরদিন খোলাইযদিও আমরা এটিকে বন্ধ অবস্থায় দেখিকলম জাগরিত হয়রাত্রি বা দিবসের কোনো প্রহর জ্ঞান নাইকিন্তু একদিন ঐ বৃদ্ধগুলো ছিপি খোলার আগে পুরুষ আর রমণীকে সূত্রের ভিতরে এসে শব্দ উচ্চারণ করতে বললশব্দ তখন খুবই ছোটো হলেও ধারালো ছুরির মতো কঠোরআর তা করতে হবে অনেকের সামনে

absmm

আমি লীলাকে দেখিলীলা ঠিক লাইলি বলা যাবে নাকিন্তু আমার মনে হয় লীলা অধিক গতিময়যেমন ঘ্রাণসবাই আমরা এমন ভাবে আছি যেন আমরা মাটি ধরে জলস্থলরূপে কাছাকাছি আছিকিন্তু আমাদের কোনো বিবাহ হয় নাকোথাও উলা উলা ধ্বনি শোনা যায় নাকিন্তু বিষয়টি এইসব ধ্বনিপুঞ্জের অতীতআগুনে পুড়ে যাবার অতীতআমরা যদি এই মাঠে থেকে গাছে উঠি জল ঢালি তাহলে শিশুরা আসবেশিশুরা বৃদ্ধদের বাণীর অপেক্ষায় থাকে নাশিশুরা হিন্দু না মুসলমান বৌদ্ধ না খ্রীস্টান এইসব কিছু বোঝে নাপেটের ভেতর সুপ্ত থাকা শিশু কোনো ধর্ম পালন করে? আমরা এরকম ভাবনা মতিন ধরতে পারেসে এক সময় বলে ‘তুমি মনোচিকিৎসকের সাথে কথা বলতোমার ভাবনাটা একটা রোগ।’ আমি ‘বলি ডাক্তারগণ আরো উদারওদের অবসেশন আরো গূঢ় আর পীড়াদায়কনার্সদের ভেতরে পাকাডালিমের বাসালাইট চলে গেলে হাসপাতালে কেন এতো পাখি ঠোকর মারে।’

এসব বলতে বলতে এবং বিবাহ সর্ম্পকিত নানাবিধ বিষয় ভাবতে ভাবতে একদিন মোরগের বাচ্চার মতো শীতকাল উপস্থিতআমরা দেখলাম আমাদের গরম জামা কাপড় নাই। ভীষণ  ঠাণ্ডা করতে লাগললাইলি বলে ‘চলো আমরা সামনের দিকে যাই।’ আমরা তখন জামা কাপড়ের সবগুলো বোতাম লাগিয়ে হাঁটতে শুরু করিসূর্য অস্ত যাবার কাছাকাছিশীত ক্রমশ লম্বা হচ্ছেহঠাৎ করে যতিন বলে ‘নুশা নুশা দেখো সামনে একটা জঙ্গল।’ আমি বলি ‘জঙ্গল না এটি বন’লীলা বলে ‘সত্যি তো।’ এগুলোতো আমরা বইতে পড়েছিলামআমি বলি ‘দেখো বনের ভেতর ছোট ছোট পাহাড়পাহাড়গুলো এমনভাবে কাটা যেন ভেতরে রাস্তা আছে।’ মতিন বলে ‘ঐতো মানুষের মতো কিছু।’ লাইলি বলে ‘থামসামনে যেওনাদেখছ না মানুষটা কাচা মাংস খাচ্ছেতাজা মাংসরক্ত গড়িয়ে পড়ছে।’ যতিন বলে ‘চলো আমরা অন্যদিক দিয়ে আরো ভিতরে যাই।’ পাহাড় ছেড়ে আরো ভিতরে যেতে যেতে রাত হয়ে গেলকিন্তু আকাশে চাঁদ ঝুলে থাকার কারণে পুরো বনটাকে পরিস্কার আয়নার মতো লাগছিলআমরা একটু সামনে এগিয়ে যেতেই একটা শব্দ শুনতে পাইশব্দটা ধীরে ধীরে গর গর ররর… সো সো এবং সবশেষে হিস হিস এইসব ধ্বনিতে পরিণত হলআমরা দেখলাম চাঁদের আলোয় একটি গাছ নড়ছেগাছ থেকে আপেল পেড়ে আনল একটি যুবকসে অন্য একটি গাছের দিকে তাকিয়ে কি জানি বলে যাচ্ছিলআমরা কিছই বুঝলাম নাতবে একটা শব্দ বারবার বলার কারণে ওটা ধরতে পারলামশব্দটা হলইভানাএর মানেটা কিলাইলি বলে ‘ঐযে গাছের নিচে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছেতার পিঠে একটি বাচ্চালম্বা চুলঐ যুবতীর নাম হয়ত ইভানা।’ যুবক দৌড় দিয়ে যুবতীর কাছে যায়লম্বা চুলের বাচ্চা আপেল হাতে ঝোপের ভেতর হারিয়ে গেলযুবক ইভানাকে ঝাপটে ধরে বনের খোলা উপত্যকায় শুয়ে পড়লোলীলা বলে দেখ কোনো লজ্জা নেইমতিন বলে এটি একটি বিবাহবিবাহ বিষয়টা আসলে এরকমইখোলামেলো সরল আর অনাবৃতএই দৃশ্যের মতলীলা কেমন যেনো লাল রঙ ধারণ করেসে একসময় আমার একটা আঙুল ধরে ফেলেআমি নিশ্চুপ থাকিলীলার এইমনোহর স্পর্শ কি বিবাহ? আমাদের কি একদিন বাচ্চা হবে মানে এই রকম ঘন স্পর্শ থেকে

হাঁটতে হাঁটতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়িযতিন বলে একটু ঘুমিয়ে নিলে ভালো হয়তিনদিন ধরে আমরা ঘুমাই নাআমরা এক সময় সবুজ জামা রঙের ঘাসে শরীর ছেড়ে দিইদূরে হরিণ অথবা এমন কিছুর ডাকে আমাদের ঘুম ভাঙ্গেলাইলি বলে আমি তৃষ্ণার্তআমি ইশারা দিয়ে বনের পাশ দিয়ে বহে চলা নদীকে দেখাইনা আসলে নদী নয় একটি সরোবরপরিস্কার জল টলটল করছেপাশে একটা বিরাট পুরনো বটগাছগায়ে লেখা কমলা সাগরযতিন বলে ‘রাজার মেয়েকমলা অশোক মালিকে দেখে উন্মাদ হলরাজার অবাধ্য হলঅশোক জন্ম পরিচয়হীনরাজা প্রকৃতভাবে কমলাকে কাছছাড়া করতে চায় নাকমলার সুঠাম দেহ, দুধে আলতা রঙ মুখে জড়ানো মিষ্টি কথা রাজার ভালো লাগেচোখ প্রশান্তিতে ভরে যায়রাজা ভাবে তার মৃত রানির দ্বিতীয়বার জন্ম হয়েছেঅন্য নামেঅন্য গর্ভেকমলা অশোককে নিয়ে এই সরোবর ঘাটে একসাথে সাতদিন সাতরাত পার করে দিলরাজা জ্বলে পুড়ে পাগল প্রায়নিদ্রাহীন সুখছাড়াএকদিন অমাবশ্যা রাতে দুজনকে পুড়িয়ে মারলোলাইলি বলে এটা কি বিবাহলীলা বলে যে নামেই ডাকো এতে কোনো যায় আসে নাএটি একটি ইচ্ছাপুরণঈশ্বরের ইচ্ছাতাই এটি পবিত্র বিবাহ।’

একদিন অগ্নিবর্ণ শাড়িতে লীলাকে কাছে পাওয়া গেলমনে হল সে আগুনে পুড়ে যাচ্ছেচারদিকে পোড়া ঘ্রাণআমি দেখলাম ওর হাত আর মুখের চামড়া কেমন কালচে হয়ে পড়েছেকুচকে গেছেলীলা ধীরে ধীরে একজন বয়স্ক মহিলা হয়ে গেলঅনেকদিন আগে দেখা পবিত্রতা বা লাবণ্য কোনটাই খুঁজে পেলাম নাএকদিন সন্ধ্যাকালে একটি ফ্লাটে আমাদেরকে কিছু লোক বন্দি করে ফেলেআমরা দেখলাম ওরা খুব সিরিয়াস এবং উন্নাসিকওদের মধ্যে লম্বা মতো কালো চশমা পড়া লোকটা আমাদের কাছে এসে কিছু একটা বলল। ‘তোমরা মুক্ত তোমরা মুক্ত’ এরকম কিছু বাক্যআমি বল্লাম ‘কীভাবে?’সে প্রথমে হাসলোতারপর আরো কিছু কথা বললসারা বাড়িতে অনেক শব্দ হওয়ায় আমি কিছু বুঝিনি কিছুক্ষণ পর সে একটা পুরনো বই আমাদের সামনে খুলে ধরেবইটা কালো কাপড়ে ঢাকাআমার একটু ভয় লাগেআমার হঠাৎ করে মনে পড়ে একদিন একটা মাঠ পেরিয়ে টিলাশীর্ষে বসে আমি মতিন যতিন লাইলি আর লীলা অনেক শব্দ ব্যবহার করে ছিলামতখন শীতকাললীলার পাজামার কোণায় এমন একটি গন্ধ ছিল সেটিকে আমি বিবাহ বলে মনে করতামভাবতাম ভেসে আসা বায়ুশ্রী, ইচ্ছার মিলনপ্রভালীলা তখন ছোট বেলার সেই পুকুরে ফোটা পদ্মআমি ডুব দিই আর স্পর্শ করি অসীম কুমারীজন্মএসব দায়িত্বহীন পবিত্র অনুভূতি জাগতো আমার ভেতরএখন লীলা আমার সাথে একটি সূত্রমতে সংযুক্তঅর্থাৎ শেষ পর্যন্ত আমরা বিবাহিতআমরা দেখলাম দুটি লোক আমাদের ঘরে এসে ব্যাঙের বাচ্চার মত লাফাচ্ছেবললাম ‘কী হয়েছে?’ ওরা কিছু বলে নাএক সময় ভাষা বিনিময় করেআমি কিছু বুঝি নাএই ভাষা আমার ভাষা কিনা সন্দেহ হলমুখে দাড়ি, একটি বেটে মতো লোক দেয়ালের দিকে ইশারা দেয়দেয়ালে একটি ওয়েল পেইন্টিংদৃশ্যটা এমন যে একটি মাকড়সা একটি পাখিকে খেয়ে ফেলছেনিচে আপেল আর ছুরিআমি বল্লাম আপনারা চলে যানওরা আমার বিষয়ে চিন্তা প্রকাশ করল নানাচল গাইল আর অন্য ভাষায় কথা বললএক সময় সবা ইক্লান্ত হয়ে পড়েদিন যায় রাত যায়আমি কাজ করিলীলা গোসল করেবিকাল হলে চা তৈরী করেএকদিন একজন বলে পিচ্ছি টিচ্ছি কবে আইবোএতে লীলা লজ্জা পায়আয়নার সামনে দাঁড়ায়কোথায় বাজে – হাট টিমা টিম তারা মাঠে পাড়ে ডিমএভাবে কিছুদিন কাটল

একদিন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়া শুরু হলে লীলা কেমন অস্থির আর অচেনা হয়ে যায়আমিও কাজে না গিয়ে ঘরের মেঝেতে শুয়ে পড়লামসিগারেটে টান দিলামলীলা রান্নাঘরে মাছ কুটছিলহঠাৎ দৌড়ে আমার কাছে আসে। ‘নুশা নুশা আমি কে? আমি কে?’ আমি বলি ‘তুমি লীলাআমার স্ত্রী।’ এতে লীলার চক্ষু রক্তবর্ণহাতে যে মাছটা ছিল সে ওটাকে বাইরে ছুঁড়ে দিলএরকম আচরণ গভীর রাত পর্যন্ত চলতে থাকেপরদিন ভোরে লীলা বলে ‘নুশা নুশা চলো আমরা যাই।’ আমি কিছু না বোঝার আগেই লীলার সাথে হাঁটতে শুরু করলামআমাদেরকে কেউ দেখেনিকারণ সবাই তখন ঘুমেআমরা হাঁটতে হাঁটতে একটি অচেনা জায়গাতে চলে এলামজায়গাটা  চেনা চেনা মনে হলকোথাও যেন দেখেছি কিন্তু সঠিকভাবে মনে করতে পারলাম নাপাশাপাশি দুটো পাহাড়মাঝখানে দস্যু ঝরনাজল পড়ছে, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকলীলা দৌড়ে যায় ঝরনার নিচেআমি কিছু বলতে চাইছিকিন্তু মুখ থেকে কোন কথা বের হল নালীলা বলে ‘নুশা নুশা আমি কে আমি কে?’ আমি ভাবি লীলা কে? লীলা কি কোনো সংযুক্তি কোনো স্ত্রী? আমি কোনো উত্তর খুঁজে পাই নাঝরনা জলে শাদা পায়ের নিচে পাথর খণ্ডনৃত্য হচ্ছে তা থা তা থাদিন তা দিন তা…. কোথাও সময় শুরু হয়েছে নতুন ভাবেলীলা একসময় আমার দেখা সেই ইভানাএকদিন হাজার বছর আগে জঙ্গলের গাছের নিচে বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে ছিলআমি বলি ‘ইভানাতুমি এইমাত্র শুরু হয়েছ।’ এতে যুবতীর আনন্দ হয়পোশাকের সভ্যতা শেষ হয়, দেহবাতাস হয়সে গান ধরে

আমি মাছ কাটি নারে..
আমি ঘরে থাকি নারে..
আমার বাবু মাঠে মাঠে যায়
আমার মানুষ জলে নামে রে..

আমি যুবতীর গানে উৎস থেকে যাত্রা করিওর মত করে গাই:

আমি রক্ত কিনি নারে..
আমি ঘরে থাকি নারে..
আমার বাবু মাঠে মাঠে যায়
আমার হাতে কালো পাখি উড়ে..

এক সময় যুবতী লীলা হয়আমি তার রূপ চিনতে পারিএতকাল যে রূপ অচেনা ছিলঅন্ধকার নামে ঝরনার নিচেজঙ্গলেলীলা ক্রমশ রূপ থেকে রূপান্তরিতশামুকহারিয়ে যায় ভেদবুদ্ধি, লোকাচার সভ্যতাআমরা বিবাহিত

একদিন আমাদের চার জনের খুব কান্তি আসেশহর ছেড়ে এই বন বাদাড়ে আমরা অনেকদিন ধরে থাকছিযতিন সে স্বভাবত নিষ্ক্রিয়, বলে ‘চলো আমরা বাড়িতে যাই।’ লীলা আরো কিছুদিন থাকতে চাইলেও অন্য দুজন চায় নাআমিও নাসুতরাং আমরা হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গাসাগর রেল জংশনের কাছে চলে আসিরেল লাইনের উপরে সবুজ রঙ এর একটা ট্রেন গাড়িসামনে তিনটি রাস্তাকোন দিকে ট্রেন যাবে আমরা কিছুই বলতে পারলাম নামতিন বলে আমরা এখন কী করবো? লাইলি শার্পবলে ‘প্রকৃতিকে অনুসরণ করো।’ যতিন আমি লীলা এতেই তৃপ্ত থাকিএই প্রক্রিয়াটি আমাদের ভালো লাগেআমার মনে হল লীলা এতে আনন্দিত হয়েছে বেশিকারণ সে কোথাও অদেখা জায়গায় আবার হারিয়ে যেতে চায়আর এইভাবে আমি তার হাটুর কাছে জামার নিচে অনেকবার বৃষ্টিভেঁজা মাটির গন্ধ পাইসে আমাকে কাছে ডাকলেই আমরা বিবাহিত হবো বলে আমি ভাবিকিন্তু প্রকৃতভাবে আমরা কোনো সূত্রধরে বিবাহিত হই নাএকটা ঘরও থাকে নাতবে আমরা একদিন গঙ্গাসাগর রেল জংশন ধরে একটি মাঠ পেরিয়ে যে দৃশ্যগুলোর দেখা পাই- তাতে একটু গূঢ় ধারণা জন্মেসময়পালিত বাক্য বর্ষনের মাধ্যমে আমাদের যে বিবাহগীতি তা প্রকৃতভাবে কোনো মিলনের সূত্র তৈরী করে না তাই কাছে থাকা বান্ধবীর নাম যাই হোক তার দেহ থেকে ইভানা নামক প্রথম পৃথিবীর একটি গন্ধ থাকে আর তাতে শৈশবে ফুটে থাকা একটি লাল পদ্ম বুকের গাছে ডালিম হয়ে জন্মায়তাতে আমাদের বিবাহ বিষয়ে ধারণা পূর্ণ হয় আর একদিন হঠাৎ করে দুই পায়ের মাঝখানে আর একটি জন্ম এসে ভর করেএটিই বিবাহ

রচনাকাল: ২৫/০৯/১৯৯৭
ঈষৎপরিমার্জিত: ১৪/০৪/২০১০

Leave a Reply