সাহিত্যে নবেল বিজয়ী এলিস মানরোর সাথে ডিসেম্বর ২০০১ সালে কারা ফিনবার্গের একটি ফোনালাপ হয়। তার থেকে কিছু অংশ নিচে অনুবাদ করা হলো।
গল্পে ‘সময়’ একটি বিষয় হিসাবে:
এলিস মানরো: আসলে স্মৃতি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে, কারণ আমি মনে করি আমরা নিজেদেরকে আমাদের আর অন্যের গল্প বলি। নারীরা অবশ্য এটি বেশি করে। পুরুষেরা যখন বয়স বাড়তে থাকে তখন এটি করে, হয়ত একটু ভিন্ন ভাবে। আমি অনেক পুরেষের সাথে বথা বলে দেখেছি। ওরা আমাকে তাদের জীবনের খারাপ সময়, যুদ্ধ অভিজ্ঞতা, শিকার কাহিনি ইত্যাদি সম্পর্কে বলেছে যেমন করে ওরা বলত পুলিশের কাছে গেলে। আর নারীরা তাদের অসুস্থতা, সন্তানজন্ম, বাচ্চাদের সাথে তাদের জীবন এসব সম্পর্কে বেশি বলে। আমি সম্ভবত আমার বয়সের নারীদের কথা বলি। তাদের জন্য এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার সাথে সাথে ওরা কখনো কখনো বড় ইমোশনাল বিষয়ের দিকে যায়।তারা তাদের আগের বিয়ে, প্রেম ইত্যাদি সম্পর্কে ভাবে যেমন করে পুরুষেরা তাদের শিকার কাহিনিকে একটি গল্পে পরিণত করে। আমার কাছে এই বিশেষ কৌতহল উদ্দীপক যে
এই গল্পগুলো কীভাবে তৈরী হয়, যেমন- আমাদের জীবনের বিভিন্ন সময়ে কী কী জোড়া লাগে আর কী কী বাদ পড়ে যায়, এবং তুমি কীভাবে এই গল্পগুলো বলো তোমাকে আবিষ্কার করার জন্য– জীবনকে আর একটু সহ্যনীয় করার তোলার জন্য।
‘নারীবাদী লেখিকা’ সম্পর্কে:
এলিস মানরো: আমি একজন নারী। তাই স্বাভাবিক কারণেই আমার লেখাগুলো নারীদের নিয়েই। আমি জানি না একজন পুরুষ লেখককে কী নামে ডাকা হবে, যে পুরুষদেরকে নিয়ে লিখছে। আমি বুঝনি না যে এই ‘নারীবাদী লেখিকা’ বলতে আসলে কী বোঝায়। শুরুতে আমি অবশ্যই আমাকে নারীবাদী বলতাম।কিন্তু এটি যদি কেবলি কোনো রকমের নারীবাদী তত্ত্বকথা, বা এরকমের কিছু বোঝায় তাহলে আমি তা নই। আমি নারীবাদী সেই অর্থে, যখন চিন্তা করি– নারীদের অভিজ্ঞতা আমাদের জীবনে জরুরি। সেটি হলো নারীবাদীতার আসল ভিত্তি।
অন্য লেখকদের প্রভাব বিষয়ে:
এলিস মানরো: আমি যখন আমার কুড়িতে ছিলাম, তখন আমাকে কারসন মেককালারস, ফ্লান্যারি ও কোনর, ইউডোরা ওয়েল্টি প্রভাবিত করত। বিশেষ করে ইউডোরা ওয়েল্টি। আমি এখন আবার ‘ব্রাদার্স কারামাজভ’ পড়ছি। পড়ছি আর ভাবছি আমি কতোকিছু মিস করেছি- আমার যখন কম বয়স ছিল। আমি আবশ্য টাকা-পয়সা নিয়ে লিখিত অংশগুলো পড়ি না, বরং আমি পড়ি ইমোশনাল অংশগুলো।
আমি এখানে বশ্যই চেখভ এর কথা উল্লেখ করব। সকল ছোট গল্পের লেখক তার কথা বলে, কিন্তু ও আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ গল্পকার। তেমনিভাবে উইলিয়াম ম্যাক্সওয়েল, মেভ ব্রেনান, মেরী লেভিনও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কত নামের লেখক আছে আমি সবার নাম উল্লেখ করতে পারছি না। আমি সব সময় পড়ি, আর আটকা পড়ে যাই বিশেষ কারো লেখায়।
নিজের গল্পের কাঠামো, স্টাইল সম্পর্কে:
এলিস মানরো: আমি ‘বালিকা আর নরীদের জীবন’ নামের একটি উপন্যাস লিখেছিলাম। এটির কিছু কিছু পর্ব ছোট গল্পের মতো। বলো, আমি ছোট গল্প লিখতে ভালোবাসি কেন? আসলে আমি আশা করিনি যে আমি ছোট গল্প লিখব। আমি কিন্তু উপন্যাস লিখার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। এখনো!। আমি এখনো উপন্যাস লেখার জন্য ধারণা পাই। এখনো শুরুও করি। কিন্তু কি যেন হয়ে যায়। তারা ভেঙ্গে পড়ে। আমি খেয়াল রাখি- আমার মাল মসলা দিয়ে আমি কী করতে চাই। কিন্তু এগুলো কখনো উপন্যাস হিসাবে গড়ে ওঠে না। আমি যখন অল্প বয়সের ছিলাম তখন ওগুলো ছিল সময় আর সুযোগের ব্যাপার মাত্র। আমার বাচ্চারা তখন ছোট, আমার জন্য কোনো সাহায্য ছিল না। তখন কিন্তু বাজারে অটোমেটিক ওয়াশিং মেশিনও আসেনি। আমার কোনো সময়ও ছিল না। আমি ভবিষ্যত সম্পর্কে ভাবতে পারতাম না, বলতে পারতাম না যে এ লেখাটির এক বছর লাগবে। কারণ আমি মনে করতাম প্রতিটি মুহূর্তই এমন কিছু ঘটতে পারে যা আমার সময় কেড়ে নেবে। তাই এই সীমাবদ্ধ সময়ের কথা চিন্তা করেই ছোট গল্প লিখতাম।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ
১২/১০/২০১৩
