পলাশী ও পানিপথ– কবিতার আলো নাকি থোকা থোকা রক্তজবা

palashi o panipath2

আমার তৃতীয় কবিতার বই ‘পলাশী পানিপথ (২০০৯)’

আমার তৃতীয় কবিতার বই ‘পলাশী ও পানিপথ’ প্রকাশিত হয় ২০০৯ সালে, বইমেলায়। বোদ্ধা কবিতা-পাঠক এবং সু-সমালোচকদের মতে- এই কাব্যগ্রন্থ ২০০৯ সালে প্রকাশিত কবিতার বইয়ের মধ্যে একটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা। নিসর্গ ২৬ সংখ্যা, এপ্রিল ২০১১১-এ ছাপা নব্বইয়ের দশকের কবিতার ওপর সামগ্রিক আলোচনা করতে গিয়ে অধ্যাপক তপোধীর ভট্টাচার্য, তার ‘অন্ধ সময়ের দহনলিপি’ প্রবন্ধে আমার এই বইয়ের কবিতাগুলি সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত  কিন্তু যথাযথ মূল্যায়ন তুলে ধরেন। বিশেষ করে এই বইয়ের কবিতা ‘পলাশী’ কবিতাটিতে বিনির্মাণ ও ইতিহাস ঐতিহ্যের আন্তর্বয়নের যে চিহ্ন ও ইশারা আবিষ্কার করেছেন তা স্মরণীয়। তিনি আরো বলেন ‘আসলে সার্থক কবিতা আপন শরীরে ও আত্মায় জাতির সাংস্কৃতিক চিহ্নায়কগুলিকে বহুমাত্রিক পরম্পরা ছেঁকে তুলে আনে। যেখানে কবি  এইসব চিহ্নায়ককে বহুস্বরিক করে তুলতে পারেন, সেইসব ক্ষেত্রে কবিতা বেশি লক্ষ্যভেদী হয়। এই সূত্রেই প্রতিষ্ঠিত হয় অন্তর্বয়নের মহিমাও। যখন এরই মধ্যে ঝলসে ওঠে কিছু অনন্য পংক্তি। যেমন- যৌথ চোখের অঞ্চলে পোড়ে একই স্বপ্ন(আদিসূত্র), ‘পরিহার প্রবণতা মুদ্রা হয়ে আসে, তবু ভালো লাগে/ তবু মানুষের ভালোবাসা চাই’(সরলতা)। এই সংখ্যাতেই ছাপা আর একটি প্রবন্ধে(নব্বইয়ের কবিতা) সনামধন্য প্রাবন্ধিক শোয়েব শাহরিয়ার এই বইয়ের কবিতাগুলি সম্পর্কে তার মূল্যায়ন করেছেন এই বলে’ সম্প্রতি ওবায়দুল্লাহ-র পলাশী ও পানিপথ’ নামক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।স্বদেশ, এবং মৃত্তিকা-লালিত আম-জনতার বিস্তীর্ণ জনজীবন, জীবন সংগ্রাম, উত্থান পতন, শোষণ বঞ্চনা সব কিছুই মানবিকতার বিচারবোধ থেকে ভেতরে ধারণ করেছেন এবং নন্দন-সকুমার্য দিয়ে মানব-বিবেকের কাছে উপস্থাপন করেছেন কবি।… আপন জাতি অর্থাৎ বাঙালি জাতির শিকড় অনুসন্ধান-ব্যাপৃত কবি আবুসাঈদ ওবায়দুল্লাহ।‘ আর একটি প্রবন্ধে  কবি কামরুল হাসান বলেছেন ‘তিনি প্রচলিত ছন্দ মেনে লেখেন না, মনে হয় তিনি এক ঘোরের ভিতর কেবলি লিখেছেন। তবে এসবের মধ্য দিয়েই তিনি একটি আলাদা মাত্রা নিয়ে আসেন কবিতায়, এবং একটি রীতির জন্ম দেন, যা প্রভাবিত করেছে শূন্য দশকের কোন কোন কবিকে।… অস্তিত্ববাদী এ কবির কবিতায় ইতিহাসচেতনা বেশ জোরালোভাবে কাজ করে, তবে তা অবশ্যই উত্তরাধুনিক চোখে দেখা ইতিহাস অর্থাৎ ইতিহাসের পুনর্নিমাণ।(নব্বই দশকঃ শতাব্দীর শেষ বিস্ফোরণ)। অন্য আরো একটি প্রবন্ধে(নব্বইয়ের কবিতা-পাঠ) মাহবুবুল হক বলেন’ ‘দেহে ধর্মের পোশাক তবু গন্ধ পাই পচা মাটি ও জলের’ এভাবেই ঐতিহ্যের শেকড়ে পা রাখেন আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ। বর্তমানের দর্পনে ইতিহাসকে দেখা আবার ইতিহাসের প্রক্ষেপে সময়ের প্রতিবিম্ব নির্মাণ আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ-র কবিতার অন্তঃশক্তি। ইতিহাসের নানা ঘটনা ও চরিত্রে, অনুষঙ্গে ও আয়োজনে তার কবিতায় নির্মিত হয় এক কল্পচিত্র যেখানে দাঁড়িয়ে কবি ঘোষণা করেন-‘ আমাদের পলশী বলতে আমার একটি বোন/ আদিঅন্তে ভাতের থালা হাতে পথে পথে ঘুরছে। তার অনাগত সন্তানের নাম     সিরাজদৌল্লাহ’(পলাশী)।

পলাশী ও পানিপথ নিয়ে আমার কথা

সেই কবিতাগুলো কীভাবে রচিত হল!  কীভাবে মোমের মত গলে পড়ল আমার কলমের নিব থেকে। কবিতার আলো নাকি থোকা থোকা রক্তজবা! আজো ভাবি। আমার ভাবনায়- কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে, কোনো এক ভূতগ্রস্ত তূর্ণানিশিথা পাতালপথে চলে যায় কাগজের সাদা দিয়ে। আজিমপুর খেলার মাঠে এক পাগলা ঘোড়া দৌড় দিয়ে তার সহিসকে খুঁজে বেড়ায়। পেছনে পড়ে থাকে কোন সৈনিকের লাশ! মুখ তুলে দিখি সেতো আমার হারানো ভাই- সেহরান। ডাকি ভাই, ভাই। কোনো সারা শব্দ নাই। রক্তাক্ত জামা আর পাগড়ি। লিখলাম:

অশ্রু নিঃশ্ব করে

অবশিষ্ট আলো জেগে ওঠে

দূরবর্তী পথে। যেন ইতিহাসের মাঠ,ঘাসে রক্তচিহ্ন

ঘোড়া ছুটে গেছে জঙ্গল পার হয়ে

নদীজলে মৃতের ব্যথা, জানে একদিন কোনোদিন

ভূমির মুক্তি।

চারদিকে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, ভাবে– অশ্রু আমাদের

কবে আলোপথে নিয়ে যায়।

এতোদিন চোখে মুখে অন্ধকার- রাস্তায় ভ্রমণের চিহ্ন,

ভ্রমণ এমন করে যে বিশ্রামের দিন নেই

আহার প্রার্থনা সবকিছু পরবর্তী কালের

স্বপ্নঅসম্ভব শুধু কর্ম আর অভিলাষ

বিনাশের ভাষা।

(অবশিষ্ট আলো)

এমন একটা সময় হয়ত যায় সবার জীবনে- যেখানে এক রক্তপিপাসু সৃষ্টিডাকাত বর্শা ছুঁড়ে কবিতা লেখায়। কোনোভাবে ফেরানো যায় না তাকে। ১৯৯৭/৯৮ সালের দিকের কথা। তখন একটা ঘোরের মধ্যে সময় কাটছে আমার। ডাক বিভাগে চাকরি করি। মনে যা আসে তা অফিসের টেবিলে প্রথমে লিখে রাখি তারপর দৌড় দিয়ে পাশেররুমে কম্পিউটারে বসে টাইপ করি। কেউ জানে না সেসব কথা। পাশের রুমের আমার বন্ধু-কলিগ আবদুস সাত্তার কিছুটা জানত। করুণ সুরে কখনো হয়ত তাকে পড়ে শুনিয়েছি নতুন লেখা সেইসব কবিতা। তখন কবিতার আগুনে পুড়ছি আমি, আমার প্রতি পদক্ষেপে প্রতি শ্বাসে এক একটি কবিতা-  বাতাস হয়ে উড়ছে, পাখি হয়ে বসছে আমার হাতে। আমি  লিখলাম:

কবিতার জন্য চির জাগরণ, নিদ্রা। আমার অপেক্ষা ভগ্নিপ্রতিম

সন্ধ্যায় নৃত্যপর মাছ। পথিক বাতাস জানে প্রতিভার খোঁজ।

অলক্ষ্যে তাড়িত ব্যথা একদিন তন্দ্রা আর আলোকে জাগায়

আলো ঢেউ খেলে খেলে আমার মাথার গান-  প্রথম পালকে।

(চতুরাশ্রম- বাতাস)

অথবা

জলে ঢেউ উঠছে, আর আমি কবিতা কবিতা করছি

দেখছি-  ভেসে উঠা সরীসৃপের দেহে বাল্মীকির চিহ্ন।

জলে দাগ পড়ছে আমি অমৃত অমৃত করছি

দেখছি-  সড়ক শেষে জললাইনে শাদা শাদা শিশু।

(বন্যাত্রয়ী)

আর একটি বিশেষ চিন্তা-কাঠামো আমাকে দখল করে রাখছে সারাক্ষণ। আমি যেন ঘর ছাড়া, আমার যেন কেউ নাই। আমি আমার এই পোড়া দেশ, মা মাটি, বাঙালি- তাদের ইতিহাস, তাদের সংগ্রাম, তাদের মুক্তি এসব ভাব ভাবনা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি। মানুষের রাজনীতি দেখছি, দেখছি তার ভেতরে লুকানো হাজারো শিকারীর মুখ। ইতিহাসের দিকে বার বার চোখ চলে যায়- দেখি ক্ষমতা-বাণিজ্য, সিংহাসন বদলের পাশাখেলা। জানলাম কিছুই বদলায় না। যে আসে সে তো নতুন নামে পুরনোকে নিয়ে আসে। লিখলাম-

জিজ্ঞেস করো। ঘোড়া হে উড়ন্ত অশ্ব, তোমার পিঠে কে ভাসমান।

জিজ্ঞেস করো। প্রর্বতক, পথিক অথবা গোপন রাজদূত কিনা।

জিজ্ঞেস করো। জিজ্ঞেস করো। কারণ সম্মুখে আমাদের গণজমায়েত।

কারণ এটি জানা দরকার আরোহীর আগুন আমাদের ভিটেমাটি

কতোটুকু পোড়াবে।

জিজ্ঞেস করো। হাতি, হে উজ্জ্বল ঐরাবত কতোদূর যাবে।

অথবা কাকে নিয়ে যাবে। জিজ্ঞেস করো।

জিজ্ঞেস করো। কারণ সম্মুখে আমাদের ভোজসভা।

কারণ এটি জানা দরকার কী সংবাদ ছিন্ন করে দেবে

ক্ষুদিরামের কণ্ঠ।

ঘোড়া আসছে ঘোড়া যাচ্ছে। আমাদের গ্রাম্য চুল্লি ভরা

বিরামহীন বরফের স্তর।

ইংরেজ আসছে নবাব নামছে। আমাদের পিতা প্রপিতামহের

সমাধি, কঙ্কাল।

আমাদের পলাশী বলতে আমার একটি বোন

আদিঅন্তে ভাতের থালা হাতে পথে পথে ঘুরছে

তার অনাগত সন্তানের নাম সিরাজদৌল্লাহ।

(পলাশী)

এসব কীভাবে আমার কবিতাভাবনাকে আক্রান্ত করল। কীভাবে লিখলাম– পানিপথ, সতীদাহ, বাঙলা ও বাঙালি, অবশিষ্ট আলো, চতুরাশ্রম, মহামায়া বা সমর্পণের কবিতা।  তখন বাসা ছিল খিলগাঁও, মতিঝিল, শেষে আজিমপুর কবরস্থানের পাশে। একটু দূরে নিউমাকের্ট, নীল ক্ষেত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ। তার পাশ দিয়ে আমি সিগারেট জ্বালিয়ে আসি, একা একা। কে আমাকে তাড়া করে, কার ডানা ঝাপটানোর শব্দ শুনি। রিক্সা চলে, লাফিয়ে লাফিয়ে আসে সেইসব লাইন:

দেহাবশেষ নিয়ে ফিরেছি ঘাটে। বংশচিহ্ন অপহৃত।

পরিচয় বলতে শুধু আধপোড়া নাভিখণ্ড

তার স্মরণে একলা মানুষ।

দূরে লালরশ্মি, আগুন। উত্থিত ঘোড়ার ফণা

মনে করিয়ে দিচ্ছে প্রয়োজনে সেও অজগর।

নদী নদী শূন্য প্রবজ্যা। ঘূর্ণিজলে কানাইয়ের নাও

পাতালমুখো।

একদিন নিদ্রাশেষে ঘুটে কুড়োনির মেয়ে

ঘেমে ওঠা ভাতের হাড়ি স্পর্শ করে দেখে

মাঠে মাঠে শস্যের যুবক ভস্ম হয়ে গেছে।

(পানিপথ)

কেন লিখলাম সেইসব কবিতা। আমার ভেতরের কাউকে কি লিখলাম? নাকি এই যে আমার আমি, উদ্বাস্তু, হতভাগ্য দেশ আমার সহজ সরল মানুষের দল- তাদের স্বপ্ন স্বপ্ন বিচ্যুতি, তাদের হাহাকার, আকুতি আমার কবিতায় অক্ষমের ক্রোধ হয়ে ভাষা পেয়ে গেল। আমি তাদের হয়ে-  এভাবে রক্তাক্ত হলাম!  কেন? সে কি আমার নিয়তি সে কি আমার সিসিফাস শাস্তি! জানি না। এক মহা জনগোষ্ঠীর সঙ্গী হয়ে, ইতিহাসের গাড়িতে সওয়ার হয়ে  লিখলাম:

জল হয়েছে আগুন

প্রথাপূর্ণ এই যমুনায় আজ হাড়পোড়ানোর গান।

নৌকা নেই। বুকে হেঁটে আগুনে করি আয়োজন।

আমার পথের ভগবান শেষ

সে অর্ধেক স্মৃতি হয়ে যেমন উড়ছে হাওয়ায়

তাও মৃত্যুগন্ধে বেগবান।

মহা জাগরণে যাত্রীগণ করে গান

হায় আগুন আগুন হলো যমুনার জল

পুড়ে যায় মৎস্যভাত ঘরে ঘরে সোনার পুতুল।

তুমি গৌতম বুদ্ধের দেশে থাকো

তোমার সংসার ভরা ছাই।

(দেশাত্মবোধক কবিতা)

কবিতায় গানের বদলে এক স্বয়ংপ্রভ বাক্য আসল, ধ্বনি আসল আসল ঘন গভীর ইমেজারি। মনোজগতের অবিরাম ম্যাজিক মিনার মাটি ঠেলা দিয়ে উঠে দাঁড়াল যেন। এসব ঘটতে থাকল খুব মিহি সুরে। চিৎকার করছি কিন্তু কেউ শুনতে পারছে না। ভাষাটা হল লক্ষ জলের মিলনের পর, একটি শান্ত বুদবুদ।

ওরা চলে গিয়েছিল। উড়ে উড়ে আবার ফুলকির মত,ঘাড়ে

প্রাত্যহিক নিমপূর্ণা- আমাদের বেদনা।

আবার শক্তি বদল করে শীতের মহিমায় নদীর মত

চলে এলো। তখন উঠোনে শব্দ করে নীলাঞ্জন পাখি।

আমি কি তাকে পুনরায় চাই। যদি চাই, তাহলে সে আসে না কেন!

তাই সকলে দিগম্বরঅভিভূত তারস্বরে ডেকে ডেকে ক্লান্ত

ডাকি ভাইকে, বলি– পুড়েছো ভাই, তুমি ঘৃতভস্ম ছাই?

দেখি চারদিকে পড়ন্ত আলোর ফসল- জীবাশ্ম ফসিল

বলি, ভাই তুমি কি আবার নির্মিত হবে?

(চতুরাশ্রম- আগুন)

——————————————————————-

পলাশী ও পানিপথ

রচনাকাল-১৯৯৭-১৯৯৮,

প্রকাশকাল- মে ২০০৯

প্রকাশক- সরকার আশরাফ, সম্পাদক, নিসর্গ

কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার,বিএসএমএমইউ,শাহবাগ, ঢাকা-১০০০।

মূল্য- আশি টাকা।

Leave a Reply