বাংলাদেশে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চাঃ একটা বোঝাপড়া

নব্বইয়ের দশকে কবিতা লেখার সময়ে আমরা উত্তর আধুনিকতাবাদ(Postmodernism) আন্দোলনের সাক্ষী হই। তখন এই আন্দোলন ইউরোপ থেইকা(১৯৬০), ভারত বর্ষ (১৯৭০-৮০) হয়ে বাংলাদেশে(১৯৯০), বিশেষ করে কবিতায় তার মৃদু প্রবাহ জারি রাখতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন যেমন- একবিংশ, লিরিক, নিসর্গ, সকাল ইত্যাদিতে এই আন্দোলন নিয়া লেখা কিছু গদ্য, ইন্টারভিউ, মতামত এবং কবিতা পড়ার সুযোগ হইছে। নবীন কবি হিসাবে এই আন্দোলনের ভ্যানগার্ডে উঠে পড়ি এবং এর সারমর্ম ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে কবিতায় আনতে কোশেশ করি। তখন আমি কবি খোন্দকার আশরাফ হোসেন সম্পাদিত ‘একবিংশ’ লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখতাম। ৯০-৯৮ সাল পর্যন্ত  আমার প্রচুর কবিতা এবং গদ্য একবিংশে ছাপা হইছে। বলতে গেলে আমার প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কবিতার বই যথাক্রমে শীতমত্যু ও জলতরঙ্গ, পলাশী ও পানিপথ এবং বাল্মীকির মৌনকথন-এর অনেক কবিতা একবিংশ-এ ছাপা হইছে। নব্বইয়ের দশকের অন্যান্য কবি- তুষার গায়েন, খলিল মজিদ, বায়তুল্লাহ কাদেরী, টোকন ঠাকুর, শাহীন শওকত, শামসুল আরেফিনসহ প্রমুখ কবিদের কবিতাও প্রায় প্রতি সংখ্যাতেই থাকত। তারাও কোনো না কোনো ভাবে এই আন্দোলনের ছায়াতলে আসেন এবং কবিতায় এর ছাপ রাখেন। পশ্চিমবঙ্গ হয়ে যে উত্তর আধুনিকতাবাদি তত্ত্ব বাংলাদেশে হাজির হইছিল- তা ছিল ইউরোপের উত্তর আধুনিকতাবাদের বিভিন্ন ফিল্ডের একটা ফিল্ড- খন্ডিত রূপ। যতোটা না এর ভাষা তাত্ত্বিক রূপ, তার চেয়ে বেশি ছিল এর সামাজিক রূপ।  বলা যায় উত্তর উপনিবেশবাদের দাবীর প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে কবিদের মানসিকতা গড়ে ওঠে। মানে প্রাক-উপনিবেশী অতীতের গৌরবোজ্জ্বল সামাজিক-সাংস্কৃতিক-জ্ঞানতাত্ত্বিক অর্জনগুলির  পুনর্মূল্যায়ন এবং তার ভিত্তিতে জাতির সাহিত্যের বিকাশের গতিপথ চালু রাখার প্রতি যেন কবি সাহিত্যিকদের নজর ছিল।

আধুনিকতাবাদ ইউরোপে যেভাবে আধুনিকতাবাদের বিপরীতে একটা দার্শনিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন হিসাবে দাঁড়াইছিল, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে তা তেমনভাবে আসে নাই। উত্তর আধুনিকতাবাদ মূলত এনলাইটেন্টমেন্ট ধারার রিজন বেইজড এপিস্টেমোলজি (জ্ঞানের স্বরূপ এবং দার্শনিক বিশ্লেষণ) এবং তার থেকে পাওয়া সব ধরণের ইডিওলজির এক চেটিয়া ক্ষমতা ও প্রভাবের বিরোধী। এইটা ছিল লেফট উইং ঘরানার, তাই আধুনিকতাবাদিদের নিয়ন্ত্রণ এবং শাসনের বিপরীতে ভাষার ফ্রিডম, প্লুরালিটি, চয়েস এবং বিনির্মানবাদ নিয়া কথা বলছে বেশি। তার মানে আলোকায়নের যুগে যেভাবে ভাষাকে ক্ষমতার জায়গা থেকে নির্মাণ এবং ব্যবহার করা হইছিল, পোস্টমর্ডানিস্টরা সে জায়গাটুকু সন্দেহ করলো। তারা ভাষাকে ডিকন্সট্রাক্ট করে এর সাথে ভাষার নৃতাত্ত্বিক, সামাজিক ঐতিহাসিক যোগাযোগের ভিত্তিটুকু আবিষ্কার করে-মর্ডানিস্টদের ক্ষমতার বেড়াজালটিকে দেখাতে চাইলেন। সতের এবং  আঠারো শতকের ইউরোপীয় দার্শনিক বিশেষ করে রেনে দেকার্ত,  ইমানুয়েল কান্ট, জন লক, থমাস বেকন ইত্যাদির তথাকথিত এনলাইটেন্ড চিন্তাধারা যেভাবে আধুনিকতার বীজ বপন করছিল এবং যার মাধ্যমে ইউরোপে জ্ঞান, বিজ্ঞান, যুক্তি প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছিল এবং পরে ইউরোপ তা পুরা বিশ্বের  ওপর জোরপুর্বক চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা করে- উত্তর আধুনিকতাবাদি দার্শনিক ও সামাজিক আন্দোলনকারীরা তার ক্রিটিক এবং বিরোধীতা করে। এনলাইটেন্টমেন্ট স্নাত যে আধুনিকতা, তা ছিল ইউরোপকেন্দ্রিক। এইটাকে ইউরোপীয়রা নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য জ্ঞান চর্চা, রাষ্ট্র এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলির পরিবর্তনে কাজে লাগায়। মধ্যযুগের চার্চ-কেন্দ্রিক আর্চ বিশপদের ক্রমাগত নিপীড়ন, নিবর্তনমূলক আইনকানুন থেইকা বার হওয়ার শক্তি হিসাবে ব্যবহার করে। সাথে সাথে তাদের গড়া এইসব জ্ঞানবোধকে- বস্তুনিষ্ঠ প্রাকৃতিক বাস্তবতা(objective natural reality) সাব্যস্ত করে এবং এর  ইউনিভার্সেল ব্যবহারবিধি রচনা করে- পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলিতে ট্রান্সফার করতে আগ্রহী হয়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় এশিয়া এবং আফ্রিকায় উপনিবেশিক রাজত্ব বিস্তার। কিন্তু ১৯৬০ দশকের দিকে উওর আধুনিকবাদী দার্শনিক, লেখক, কবি সাহিত্যিকেরা এই ইউরোকেন্দ্রিক চিন্তাধারা যা নিপীড়নমূলক, সভ্যতা বিনাশি ছিল- তার গোলামি থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য এই উত্তর আধুনিকতাবাদি তত্ত্ব হাজির করেন। এই বর্গের বুদ্ধিজীবিরা এনলাইটেন্টমেন্ট স্নাত ভাষা-ক্ষমতায়নকেই মূলত চ্যালেঞ্জ এবং আক্রমণ করেই উত্তর আধুনিকাবাদি ডিস্কোর্সগুলি রচনা করেন।

নব্বইয়ের দশকে আমরা যে খন্ড উত্তর আধুনিকতাবাদ পাই, তা কবিতার এলাকা এবং বিষয়াবলীর ইঙ্গিত করছিল ঠিকই। কিন্তু এর ভাষা, প্রকাশভঙ্গি, গঠন এবং রচনা কলাকৌশল কী হবে- তা পুরাপুরি হাজির করতে পারে নাই। উত্তর আধুনিকতাবাদি আন্দোলনের ইউরোকেন্দ্রিক জ্ঞানকাঠামো, একক ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে বার হয়ে উপনিবেশিত দেশের- নিজস্ব ইতিহাস,ঐতিহ্য, লোকজ, গ্রামীন  এবং ধর্মীয় উপাদান কবিতায় আসতে লাগল ঠিকই। কিন্তু এইগুলিকে আমরা কোন ভাষায় প্রকাশ করব? আমরা কি ভাষার ট্রাডিশনাল কার্যকারীতায় ফিরে যাবো নাকি ভাষার বিনির্মাণযোগ্য ভূমিকাটুকু কবিতায় ব্যবহার করবো- তার কোনো নির্দেশনা ছিল না। ইউরোপীয় উত্তর আধুনিকতাবাদিদের ভরসা – ফার্দিনান্দ দ্য সোস্যুরের ভাষার লেক্সিকাল সিমানটিক বিশ্লেষণ -ভাষার খণ্ড খণ্ড উপাদান নিয়া একটা অখণ্ড রূপের সৃষ্টি, সেই অখণ্ড রূপেই ভাষার সামগ্রিক তাৎপর্য হাজির করে। বিচ্ছিন্নভাবে শব্দ নিয়া গড়ে ওঠা ভাষা অর্থহীন- তার ভিত্তিতে উত্তর আধুনিকতাবাদিরা মনে করে যে ভাষা সামাজিক, নট মাইন্ড বেইজড রিয়েলিটি, শব্দের কোনো মানে নাই(কারণ সিগ্নিফাইয়ার এবং সিগ্নিফাইডের সম্পর্ক স্বেচ্ছাচারি)। এইসব বোঝার পর কবিতার কলা-কৌশল ভেতর থেকে কিছুটা বদলে গেছে। আশির দশকের কবিরা কবিতায় যেখানে বহু বছরের পুরনো, প্রচলিত টেকনিক- ফর্ম, ছন্দ, ভাষা কবিতায় বজায় রাখছিল, সেখানে নব্বইয়ের কবিরা আনলো – ফর্ম নয় এন্টি ফর্ম,  রোমান্টিসিজমের পরিবর্তে- ডাডাইজম-ইচ্ছাকৃত যুক্তিহীনতা। কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পূরণের বদলে প্লেফুলনেস-  যুক্তির শাসনের পরিবর্তে অযৌক্তিকতা, দূরত্বের বদলে অংশগ্রহণ, নির্মাণের বদলে বিনির্মাণ – সমন্বয়ের বদলে বিরোধাভাস, উপস্থিতির পরিবর্তে অনুপস্থিতি, প্রকরণ/সীমার বদলে বয়ান/আন্তর্বয়ান  এবং ব্যাখ্যার বদলে ভুল পাঠ- যা পাঠকের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং মনে হইছিল! সেই সময়ের লিটল ম্যাগগুলি পাঠ করলেই আমার এই রকম পর্যবেক্ষণের প্রমাণ মিলবে।

আজকাল একটা প্রশ্ন জাগে- কবিতায় উত্তর আধুনিকতাবাদিতার প্রয়োজন আছে কিনা? বা এত দিন পর এইটা নিয়া আমরা কী করব? বা যারা উত্তর আধুনিকতার চর্চা করে তারা উত্তর আধুনিকতাবাদিতার ওপরে উল্লেখিত সিমানটিক এক্সপ্রেশনগুলি ব্যবহারের কথা চিন্তা করে কিনা? করলে কবিতায় ব্যবহার করে কিনা? কারণ উপাদান, উপকরণ কবিতার কন্টেণ্টের জন্য জরুরি কিন্তু তার চেয়ে বেশি জরুরি হইল কবিতার ভাষাকে উত্তর আধুনিকতাবাদি ভাষা হিসাবে  নির্মাণ করা। এইটা না হইলে কবিতায় কোনো ডাইমেনশন, প্লেফুলনেস এবং সর্বপোরি উৎকর্ষতা আসবে না। উত্তর আধুনিকতার নাম করে উত্তর উপনিবেশবাদ চর্চা করা- উত্তর আধুনিকতাবাদি কবিতার মূল লক্ষ্য নয়।

তত্ত্ব দিয়া কবিতা লেখা হয় না। কিন্তু তত্ত্ব কবির মন ও মননে রক্তধারার মত হাজির থাকে। কারণ কবিও সমাজ এবং সভ্যতাবাহিত ডিস্কার্সিভ চালচলনের মধ্যে বড় হয়। অন্যান্য ইজমের মতো উত্তর আধুনিকতাবাদও সমাজ এবং সভ্যতায় এখনো বহমান। বিশেষ করে সামাজিক আন্দোলন হিসাবে এর ইনক্লুসিভনেস নীতি আমাদের খুব দরকার। এনলাইটেন্টমেন্ট ভিত্তিক আধুনিকতা যেভাবে আবহমান দেশজ, লোকজ বিশেষ করে ধর্মীয় ঐতিহ্য ভিত্তিক কালচারকে দূরে সরাইয়া রাখতে চায় – উত্তর আধুনিকতাবাদ সেখানে আমাদের অন্ততপক্ষে তত্ত্বীয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস যোগাইতে পারে। যার ফলে আমরা কবিতায় নিজের ইতিহাস ঐতিহ্য, বিশ্বাসের জীবন্ত ভাব, ভাষা এবং আচার-নিষ্ঠাকে কবিতায় উত্তর আধুনিক ভাষায় ধরতে সাহস পাবো।

তাহাদের উত্তর আধুনিকতাবাদ

আমি এই লেখার ভুমিকাতে বলছিলাম যে  পশ্চিমা উত্তর আধুনিকতা আসলে কান্ট এবং অন্যান্য দাশর্নিকদের এনলাইটেন্টমেন্ট বাহিত রিজন এবং কনক্রিট প্রমাণভিত্তিক জ্ঞানকাঠামোর বিরুদ্ধে একটা দার্শনিক, তাত্ত্বিক এবং সামাজিক আন্দোলন। এই আন্দোলন মূলত ভাষার শক্তির ওপর জোর দেয় কারণ চিন্তা ও অভিজ্ঞতা গঠনে ভাষাই আমাদের প্রধান টুল । তবে এই আন্দোলন ভাষা, জ্ঞান, স্বাধীনতা, চয়েস, রেলেটিভিজম ইত্যাদি অনেক কিছু ধরে আগাইছে বইলা এইটা অনেক জ্ঞান-তাও্বিক এবং সামাজিক আন্দোলনকে নির্দেশ করে। তাই উত্তর আধুনিক আন্দোলন অনেক কিছু আবার কিছুই না- মানে যদি ব্যাখ্যা না করা হয়।  কারণ এইটা একইভাবে জটিলতা, দ্বন্দ্ব, অস্পষ্টতা এবং বৈচিত্র্যকে লালন করে। এই জটিলতা আসছে  কারণ এইটা বিশ শতকের অন্যান্য ভাষা-তাত্ত্বিক আন্দোলন যেমন পোস্টস্ট্রাকচারালিজম এবং ডিকনস্ট্রাকশনকে তার দেহে অন্তর্ভুক্ত করছে। তাই তো ভাষাবিদ এবং দার্শনিক নোয়াম চমস্কি একবার বলছিলেন যে উত্তর আধুনিকতা অর্থহীন কারণ এইটা বিশ্লেষণাত্মক বা অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞানে কিছুই যোগ করে না।

এখন চলেন এই উত্তর আধুনিক তত্ত্বটা একটু বোঝার কোশেশ করি। উত্তর আধুনিকতা বিশ শতকের শেষের দিকের একটি দার্শনিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন যা মোটাদাগে বিষয়বাদ(subjectivism) সংশয়বাদ (scepticism এবং আপেক্ষিকতা (relativism) নিয়া গড়ে উঠছে। এই আন্দোলন যুক্তিকে সন্দেহ করে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা জাহির  এবং বজায় রাখার ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের এপিস্টোমলজি এবং ইডিওলজির প্রতি তীব্র স্পর্শকাতর। আরও বলা যায়- উত্তর আধুনিকতা মূলত পশ্চিমা দর্শনের ইতিহাসে ১৭ থেকে ১৯ শতকের এনলাইটেন্টমেন্ট তথা আধুনিক যুগের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন এবং মূল্যবোধের বিরুদ্ধে একটি সার্বিক প্রতিক্রিয়া। পোস্টমডার্নিজমের সাথে বৈশিষ্ট্যযুক্ত অনেক বৈশিষ্টকে সাধারণ দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সরাসরি অস্বীকার হিসাবে হিসাবে ধরা যাইতে পারে- যা ১৮ শতকের এনলাইটেন্টমেন্টের সময় গ্রহণ করা হইছিল। নিচে উত্তর আধুনিকতার কিছু সাধারণ চরিত্র তুলে ধরা হইল।

আমরা ইউরোপ কেন্দ্রিক আধুনিক শিক্ষাক্রম অনুসারে শিখছি যে আমাদের সামনে একটা বস্তুনিষ্ঠ প্রাকৃতিক বাস্তবতা(objective natural reality) আছে। এমন একটি বাস্তবতা যার অস্তিত্ব এবং বৈশিষ্ট্যগুলি যুক্তিগতভাবে মানুষের থেইকা স্বাধীন – তাদের মন, তাদের সমাজ, তাদের সামাজিক চর্চা থেইকা স্বাধীন । উত্তর আধুনিকতাবাদীরা এই ধারণাটিকে এক ধরণের শিশুসুলভ বাস্তববাদ বইলা উড়াইয়া দেয়। পোস্টমডার্নিস্টদের মতে এই ধরণের বাস্তবতা একটা ধারণাগত গঠন- বৈজ্ঞানিক চর্চা এবং ভাষার একটা নিদর্শন। এই ধারণাটি ইতিহাসবিদদের মাধ্যমে অতীত ঘটনাবলী খোঁড়া এবং সামাজিক বিজ্ঞানীদের চিন্তাধারা বর্ণনার ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো হয়। আবার বিজ্ঞানী এবং ইতিহাসবিদদের বক্তব্য সত্য বা মিথ্যা হইতে পারে- এই দৃষ্টিভঙ্গি উত্তর আধুনিকবাদিরা অস্বীকার করে। এইটা আসলে তাদের বস্তুনিষ্ঠ প্রাকৃতিক বাস্তবতার ধারণা(objective natural reality) প্রত্যাখ্যান থেইকা আসছে। তারা কখনও কখনও এই বইলা মত প্রকাশ করে যে সত্য বইলা আসলে কিছু নাই। এই ধরণের কথাবার্তা আমাদের সামনে জটিল সমস্যার সষ্টি করে। কারণ সত্য বইলা যদি কিছু না থাকে তাইলে তো আমাদের ভেতর নৈতিকতা বইলা কিছুই থাকবে না। আমরা ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাবো।

এনলাইটেন্টড দার্শনিকদের হাত ধরে আধুনিক মানুষেরা মনে  করছে- যুক্তি, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির মাধ্যমে  মানুষ নিজেদের এবং তাদের সমাজকে আরও ভালভাবে পরিবর্তন করতে পারে। তাই এইটা আশা করা যায়েজ যে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সমাজগুলি এখনকার তুলনায় আরও মানবিক, আরও ন্যায়পরায়ণ, আরও আলোকিত এবং আরও সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু উত্তর আধুনিকতাবাদীরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এই আলোকিত বিশ্বাসকে মানব অগ্রগতির উপকরণ হিসাবে অস্বীকার করে। প্রকৃতপক্ষে অনেক উত্তর আধুনিকতাবাদী বুদ্ধিজীবিরা মনে করেন যে- এই বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত জ্ঞানের বিপথগামী এবং অনির্দেশিত চর্চাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ  মানুষের বিনাশ করার কারণ হইছিল। প্রযুক্তির বিকাশ আসলে ব্যাপক হারে মানুষ হত্যার দিকে কিছু বিপদগামী আধুনিকদের পরিচালিত করছিল। কেউ কেউ এতদূর পর্যন্ত বলে যে বিজ্ঞান, যুক্তি এবং প্রযুক্তি সহজাতভাবে ধ্বংসাত্মক এবং নিপীড়ক, কারণ এইগুলি অন্যদের ধ্বংস ও নিপীড়ন করার জন্য মন্দ লোকেরা ব্যবহার করে।

এরিস্টটলের সাথে গলা মিলাইয়া মর্ডানিস্টরা আরো মনে করে যুক্তি(reason/logic) সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ তাদের এই আইন যে কোন চিন্তাবিদ এবং জ্ঞানের যে কোন ডোমেইনের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। কিন্তু উত্তর আধুনিকতাবাদীদের বলে – যুক্তি হইল নিছক একটা ধারণাগত গঠন এবং এই্টা শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মধ্যেই ব্যাবহার করা হয়। এনলাইটেন্টমেন্টের মানুষেরা মনে করে মানুষের প্রকৃতি, যোগ্যতা বা স্বভাব কিছু পরিমানে মানুষের মধ্যে জন্মের সময় হাজির থাকে। এইগুলি সামাজিক শক্তির মাধ্যমে শেখা যায় না। উত্তর আধুনিকতাবাদীরা জোর দিয়া বলে- যে মানব-বিজ্ঞানের সমস্ত বা প্রায় সমস্ত দিক সম্পূর্ণ সামাজিকভাবে নির্ধারিত। আমরা এইখানে প্লেটো এবং হেগেলের ভাববাদি দর্শনের বিপরীতে দাড়াইয়া কার্ল মাক্স যে কথা বলছিল তার প্রতিধ্বনি পাই। মার্ক্স বলছিল যে আমরা ভাব দিয়া সমাজ সভ্যতা পাল্টাইতে পারবো না, হাত পা চালাইয়া অর্থাৎ দৈহিক শ্রম দিয়া সমাজ সভ্যতা পাল্টাইতে হবে। তিনি আরো বলছিলেন আমাদের সকল কাজ কাম, আমাদের ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি সবকিছু আমাদের সামাজিক অবস্থানের সাথে জড়িত।  

আগেই বলছিলাম উত্তর আধুনিক দার্শনিকদের বিবেচনার প্রধান বিবেচনার জায়গা হইল ভাষা। ট্রাডিশনাল ভাবে আমরা জানি যে ভাষা নিজের বাইরের একটি বাস্তবতাকে বোঝায় এবং সেইভাবে সে আমাদের সামনে বিষয়গুলি হাজির করে। উত্তর আধুনিকতাবাদীদের মতে ভাষা এমন একটি প্রকৃতির আয়না নয় যেমনটি আমেরিকান বাস্তববাদী দার্শনিক রিচার্ড রটি এনলাইটেন্টড দৃষ্টিভঙ্গিকে বর্ণনা করছিল। উল্টাদিকে উত্তর আধুনিকতাবাদীরা সুইস ভাষাবিদ ফার্দিনান্দ দ্য সসুরের কাজের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে দাবি করে যে- ভাষা শব্দার্থগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্ব-উল্লেখযোগ্য। একটা শব্দের অর্থ বিশ্বের একটি স্থির জিনিস নয়, এমনকি এইটা মনের মধ্যে একটি ধারণাও নয়। বরং তা অন্যান্য শব্দের অর্থের সাথে বৈপরীত্য এবং পার্থক্যের মাধ্যমে তৈরি হয়। যেমন কালা/ধলা, মহিলা/পুরুষ বা সুখ/দুখ ইত্যাদি। অনেক সময় অর্থগুলি অন্যান্য শব্দার্থের ভূমিকার সাথে জড়িত, তাই তারা কখনই বক্তা বা শ্রোতার কাছে সম্পূর্ণরূপে উপস্থিত হয় না, খালি দূরে সইরা যায়। শব্দের স্ব-রেফারেন্স শুধুমাত্র প্রাকৃতিক ভাষাকে বিশেষ করে তুলে না,  তা বিশেষ সম্প্রদায় বা ঐতিহ্যের আরও বিশেষায়িত আখ্যানকেও চিহ্নিত করে।  এই ধরনের ব্যাখা/আখ্যান পিছিয়ে পড়া বিশ্বের সামাজিক সাংস্কতিক চর্চার মধ্যে পাওয়া যায় যা সম্প্রদায় বা ঐতিহ্যের নৈতিক ও বৌদ্ধিক মূল্যবোধকে প্রতিফলিত করে । ভাষা এবং ডিস্কোর্সের এই উত্তর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি মূলত ফরাসি দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক জ্যাক দেরিদা প্রতিষ্ঠিত করছেন যিনি দুনিয়ায় ডিকনস্ট্রাকশনের প্রবর্তক হিসাবে বিবেচিত।

ভাষার উত্তর-আধুনিক তত্ত্বগুলি এই বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে যে ভাষা বিশ্বকে বোঝার একটি স্থিতিশীল উপায় বইলা দেয়। আপনি যখন ভাষা ব্যবহার করেন, আপনি একটা বিশেষ ধারণার মাধ্যমে বিশ্বের জিনিসগুলিকে উপস্থাপন করেন। যখন আপনি ভাবছেন বা কেবল একটি বস্তুকে চিহ্নিত করছেন আপনি ভাষার মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করছেন। উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি একটি লাল আপেলের দিকে তাকান, তাইলে আপনার মনে হবে- এইটা একটি লাল আপেল, যা লাল সম্পর্কে আপনার আগের অভিজ্ঞতাকে ফোকাস করে এবং আপনাকে এটি বুঝতে দেয়। উত্তর আধুনিক ভাষা তত্ত্বগুলি যুক্তি দেয় যে বিশ্বের ভাষা এবং বস্তুর মধ্যে এই ধরণের একরৈখিক সংযোগ ভুল এবং প্রকৃতপক্ষে ভাষা এবং বস্তুর সম্পর্ক অস্থির। ভাষা বাস্তবতা বোঝার একটি মাধ্যম হওয়ার পরিবর্তে এটি সংস্কৃতি এবং সামাজিক পরিস্থিতির ফলাফল।

পশিচমা দর্শনের মূলে দাঁড়াইয়া আছে লোগোসেন্ট্রিজম(শব্দ, ভাষা, যুক্তি)। এইটা পশ্চিমা দর্শনের ঐতিহ্যকে বোঝায় যা শব্দ এবং ভাষাকে বাইরের বাস্তবতার একমাত্র অভিব্যক্তি হিসাবে বিবেচনা করে। এই তত্ত্ব লোগোগুলিকে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে মহান হিসাবে ধরে রাখে এবং লোগোগুলি যেসব বস্তুকে প্রতিনিধিত্ব করে তা অপরিবর্তনীয়। লোগোসেন্ট্রিজমের মতে, লোগো হইল প্লেটোনিক আদর্শের  সহি উপস্থাপনা। কিন্তু উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকদের মতে শব্দের কোনো মিনিং নাই কারণ শব্দ এবং চিহ্নগুলি কখনই তাদের অর্থ কী- তা সম্পূর্ণরূপে হাজির করতে পারে না।  তা কেবলমাত্র অতিরিক্ত শব্দগুলি, যেগুলি আলাদা বা বিপরীত তার ব্যবহারের মাধ্যমে বোঝা যাইতে পারে। এইভাবে, অর্থ চিরকালের জন্য বিলম্বিত হয় এক অন্তহীন চেইনের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, বাড়ি শব্দটি যে কোনো বাড়িই বোঝায় যেমন- দালানকোঠা, আপার্টমেন্ট, একতালা বা দোতালা বাড়ি বা বাংলো বাড়ি, ম্যানশন বা হোটেল ইত্যাদি। এর কোনো কনক্রিট মিনিং নাই। তাই শব্দের সম্পূর্ণ অর্থ ভাষাতে পাওয়া যায় না এবং অর্থ সম্পূর্ণ হয় না। একটি শব্দের অর্থের জন্য অভিধানে সন্ধান করা, তারপর সেই শব্দের সংজ্ঞায় পাওয়া অন্য শব্দগুলি সন্ধান করা, এক সময় পুরানো অভিধানগুলির সাথে তুলনা করা- এই জাতীয় প্রক্রিয়া কখনই শেষ হবে না।

সসুরের কাঠামোবাদি ভাষাতত্ত্ব অনুযায়ি- ভাষা আমাদের বিশ্ব গঠন করে, এইটা কেবল কোনোকিছুকে রেকর্ড বা লেবেল করে না। মানুষের মন বস্তু বা ধারণাকে একটা অর্থ দেয়, এবং পরে সেইটারে ভাষা দিয়া নির্মাণ(construction) করে এবং প্রকাশ করে, এটি আগ থাইকা জিনিসের মধ্যে থাকে না।

নির্মাণের(construction) বাইরে কোনো পরম সত্য নাই। দেরিদা এবং উত্তর আধুনিক অন্যান্য সমমনা দার্শনিকেরা লোগোসেন্ট্রিজমের বিরোধিতা করেছেন। তারা লোগোকেন্দ্রিকতার সীমাবদ্ধতার বাইরে টেক্সটের ফ্রি প্লে, বিবিধ মিনিং, এর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, নৃতাত্ত্বিক ব্যাকগ্রাউন্ডের খোঁজ করছেন।

এনলাইটেন্টমেন্ট সময়ের চিন্তা ছিল যে মানুষ প্রাকৃতিক বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং এই জ্ঞানটি প্রমাণের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে ন্যায় সঙ্গত হইতে পারে। উত্তর আধুনিকতাবাদীরা এই দার্শনিক ভিত্তিবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। এইটা ১৭ শতকের ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তের- ডিকটাম কোগিটো এরগো সাম (আমি চিন্তা করি তাই আমি আছি)- এমত পাগলকরা, অভিজ্ঞতামূলক সিদ্ধান্তের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এইটা দিয়া অনেক সাধারণ তত্ত্ব  তৈরি করা সম্ভব, অন্তত নীতিগতভাবে যা প্রাকৃতিক বা সামাজিক জগতের অনেক কিছুকে জ্ঞানের একটি নির্দিষ্ট ডোমেইনের মধ্যে ব্যাখ্যা করতে পারে। যেমন- মানব ইতিহাসের সাধারণ তত্ত্ব (theory of human history) এবং দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ। আধুনিকেরা মনে করে এই ধরনের তত্ত্বগুলি নির্মাণ করা বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক গবেষণার লক্ষ্য হওয়া উচিত। এমনকি যদি সেইগুলি বাস্তবে পুরোপুরি অর্জনযোগ্যও না হয়। কিন্তু উত্তর আধুনিকতাবাদীরা এই ধারণাটিকে এনলাইটেনমেন্ট ডিস্কোর্সের মধ্যে একটি অস্বাস্থ্যকর প্রবণতা বইলা খারিজ করে দেয়।  কেননা এইগুলি হইল চিন্তার সমগ্রকরণ(totalizing) বা মানুষের জৈবিক ঐতিহাসিক এবং সামাজিক উন্নতির তথাকথিত মেটানারেটিভস(একটি বিস্তৃত বিবরণ বা ঘটনা এবং পরিস্থিতির ব্যাখ্যা যা মানুষের বিশ্বাসের জন্য একটি প্যাটার্ন বা কাঠামো তৈরি কইরা দেয়, এবং যার মাধ্যমে মানুষ তাদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, জীবন যাপন ইত্যাদিরে মিনিংফুল ভাবে) । এই তত্ত্বগুলি ক্ষতিকারক শুধুমাত্র এই কারণে নয় যে তারা মিথ্যা বলে বরং কারণ তারা অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গি এবং ডিস্কোর্সের ওপর ভিজেদের জবরদস্তিমূলক গ্রহণযোগ্যতা আরোপ করে। যার ফলে এনলাইটেন্টড ইউরোপের বাইরে অন্যান্য চিন্তাধারা নিপীড়িত, প্রান্তিক বা  কখনো ধ্বংস হয়ে পড়ে। দেরিদা নিজেও এই সার্বিকতার তাত্ত্বিক প্রবণতাকে সর্বগ্রাসীবাদের সাথে তুলনা করছেন।

১৭ এবং ১৮ শতকের রিজন ভিত্তিক ডিস্কোর্স অনুযায়ী – বাস্তবতার এমন কিছু দিক আছে যা বস্তুনিষ্ঠ, সত্য বা যা নিশ্চিতভাবে চূড়ান্ত এবং নৈতিক। এইগুলি উত্তর আধুনিকতাবাদীরা অস্বীকার করে। কারণ বাস্তবতা, জ্ঞান এবং মূল্যবোধ সাব্জেক্টিভ, মানুষের নিজস্ব ডিস্কোর্স দিয়া তৈরি। তাই এইগুলি এক এক জায়গায় এক এক রকম।  উত্তর আধুনিকবাদিরা মনে করে কোনও সমাজে প্রচলিত ডিস্কোর্সগুলি প্রভাবশালী বা অভিজাত গোষ্ঠীগুলির স্বার্থ এবং মূল্যবোধকেই শুধু জাহির এবং প্রতিষ্ঠা করে। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ঐতিহাসিক গবেষণার(Madness and Civilization: 1960) দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে উত্তর আধুনিকতাবাদীরা মনে করে যে- একটি নির্দিষ্ট যুগে যা জ্ঞান হিসাবে গণ্য হয়-  তা সব সময়ই সূক্ষ্ম উপায়ে ক্ষমতাবানদের দ্বারা বানানো এবং প্রভাবিত। তাই উত্তর আধুনিকবাদিরা মনে করে- এনলাইটেন্টমেন্ট যুগের জ্ঞানার্জনের প্রতিষ্ঠিত ডিস্কোর্সগুলি কমবেশি স্বেচ্ছাচারী এবং অযৌক্তিক। তাই সেগুলিকে পরিবর্তন করা যাইতে পারে। তারা কমবেশি শক্তিশালীদের স্বার্থ এবং মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করে তাই সেগুলিকে পরিবর্তন করা দরকার। এইভাবে উত্তর আধুনিকতাবাদীরা তাদের তাত্ত্বিক অবস্থানকে স্বতন্ত্রভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive) এবং গণতান্ত্রিক হিসাবে বিবেচনা করে। কারণ এইটা পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীর উপর এনলাইটেন্টমেন্ট যুগের জ্ঞানার্জনের প্রতিষ্ঠিত ডিস্কোর্সগুলির আগ্রাসী আধিপত্যকে জুলুম বইলা সায় দেয়। তাই ৮০ এবং ৯০ এর দশকে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, জাতিগত এবং ধর্মীয় গোষ্ঠীর পক্ষে একাডেমিক স্কলারেরা উত্তর আধুনিক তত্ত্ব গ্রহণ করছিল এবং এই থেইকাই  আইডেন্টিটি পলিটিক্স (পরিচয়ের রাজনীতি) আন্দোলন শুরু হইছিল। ভারতবর্ষ এবং আমাদের বাংলাদেশ এই থেইকা বাদ পড়ে নাই। তারই হাত ধরে সাহিত্য ভাবনায় ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকজ উপাদান, অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনাচরণ, ধর্মীয় আচার বিশ্বাস ইত্যাদিকে ব্যবহার এবং সেলিব্রেট করতে বলা হইছে। 

আমাদের উত্তর আধুনিকতাবাদ

তাইলে ওপরের আলোচনা থেইকা বোঝা গেল- আমাদের দেশে যে উত্তর আধুনিকতার আমদানি হইছে সেইটা আসল উত্তর আধুনিকতা না, এইটা আসলে ছায়া-উত্তর-আধুনিকতা বা বিচ্যুত-উত্তর আধুনিকতা। কারণ আমাদের দেশে আগে আধুনিক কোনো আন্দোলন হয় নাই। সে পরিবেশও ছিল না। আমাদের ছিটাফোটা আধুনিকতা যা এখানে হইছে তা ধার করা বা ইউরোপ থেইকা আসছে। আধুনিকতা যেহেতু নাই সেহেতু ঠিক উত্তর আধুনিকতাও নাই। কারণ পশ্চিমে উত্তর আধুনিকতারই জন্মই হইছে আধুনিকতার মেটান্যারেটিভিটিকে মূল্যহীন এবং অর্থহীন করে তোলার জন্য। আমাদের দেশে উত্তর আধুনিকতাবাদি আন্দোলন হওয়ার শর্তগুলি অনুপস্থিত। আসল উত্তর আধুনিকতা যদি আমরা চালু করতাম তাইলে আমরা আমাদের ‘সত্য’ মানে উপনিবেশ হিসাবে পাওয়া জ্ঞান-সভ্যতা ভিত্তিক চাপিয়ে দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলিরে আগে চ্যালেঞ্জ করতাম। অন্ততপক্ষে ভাষাতাত্ত্বিক এবং সামাজিক বিভিন্ন এক্টিভিটিস দিয়া। কিন্তু এইগুলা কিছুই হয় নাই। কারণ এই কাজগুলি করতে যে রকম পঠন পাঠন শিক্ষা দীক্ষা দরকার তা মধ্যে এখনো গড়ে উঠে নাই।  হওয়ার মত যেইটা হইছে সেইটা হইল উত্তর আধুনিকতাবাদি ধারণা এবং জ্ঞানের বিলম্বিত ছায়া- আমদানিকরণ এবং তার সরল, তরল আত্মীকরণ। মানে বিশেষ কইরা দারিদা এবং ফুকোর ভাষাভিত্তিক ক্ষমতার কেন্দ্রকে আঘাত করার কারণে যে সামাজিক আন্দোলন পথিবীতে ছড়াইয়া গেছে তার হাত ধইরা- প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম বিশ্বাস এতদিন যা অবহেলিত এবং লুক্কায়িত ছিল সেইটারে ধরে রাখার জন্য কিছু সাহিত্যিক চাল চলনের চর্চা হইছে। এইগুলির পুনঃআবিষ্কার, পুনর্মূল্যায়ন হইছে, বিশেষ কিছু না। এই ক্ষেত্রে, মানে এই জায়গায় এইটাকে আমরা উত্তর উপনিবেশিক আন্দোলনের সাথেও এক কইরা দেখতে পারি।

তাইলে লোকেরা এইগুলিরে ব্যাপকহারে ‘আমাদের’ উত্তর আধুনিক আন্দোলন বইলা ডাকে কেন- বোঝা মুশকিল। পশ্চিম বঙ্গের অঞ্জন সেন, তপোধীর ভট্টাচার্য এবং বাংলাদেশের কবি ইশারফ হোসেন সহ অন্যান্য কবি সাহিত্যিকেরা- যারা উত্তর আধুনিক আন্দোলনের কথা বইলা থাকেন, সেইটা পোস্ট কলোনিয়াজম আন্দোলন চর্চার অংশ নাকি ঠিক উত্তর আধুনিকতা চর্চা তা- ভেবে দেখার বিষয়। খালি লোকজ উপাদান, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বিশ্বাসের কথা বললেই একটা লেখা ঠিক উত্তর আধুনিক হয়ে যায় না। উত্তর আধুনিক আন্দোলনটাই দাঁড়াইয়া আছে ‘লোগোসেন্ট্রিক’ জ্ঞান-ক্ষমতাকাঠামোর ভিত্তিটাকে প্রশ্ন করার মধ্যে। ভাষাকে রক সলিড অর্থের বাইরে প্রক্ষেপ কইরা একে তার বিবিধ ইঙ্গিত এবং অর্থের দিকে নিয়া যাওয়া, একে নতুন অর্থ দেওয়া ইত্যাদি। উত্তর আধুনিকবাদি পাঠক/লেখকগণ একটিমাত্র উদ্দেশ্য বা একটি মাত্র অর্থ দিয়া সাহিত্য পাঠের প্রক্রিয়া বাতিল কইরা দেয়। পরিবর্তে, প্রতিটি পাঠক টেক্সটের একটা নতুন এবং স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য এবং অর্থ তৈরি কইরা সামনে আগায়। আমাদের দেশীয় উত্তর আধুনিকতাবাদি আন্দোলনকারিরা পশ্চিমের উত্তর আধুনিক টেকনিক বিশেষত ইন্টারটেক্সচ্যুয়ালিটি(অন্তর্বয়ন) এর কথা বইলা ইতিহাসের পাতা থেইকা আগেকার হারানো, প্রান্তিক কবি সাহিত্যিকদের লেখা কবিতা/গানের রেফারেন্স দেখাইছেন বটে কিন্তু উত্তর আধুনিকতার অন্যান্য মূল টেকনিকগুলি যেমন- ফ্রাগমেন্টেশন, কোলাজ, আইরনি, প্লেফুলনেস, মেজিক রেয়েলিজম, টেকনোকালচার এবং হাইপার রিয়েলিটির কথা এড়াইয়া যান। কিন্তু এইগুলি ছাড়া উত্তর আধ্নুনিক কবিতা চর্চার কোনো যথার্থতা নাই। যদি আমরা কবিতায় দেশ, কাল, ইতিহাস ঐতিহ্যের অন্তঃপ্রবাহ এবং তার সাথে বিশ্বব্যাপি সময় এবং সভ্যতার অস্থির চরিত্র এবং সর্বোপরি এর কবিতা হয়ে ওঠার উত্তর আধুনিকতাবাদি ভাষিক গুণগুলিকে যদি না এপ্লাই করি, কবিতা তার  নতুনত্ব এবং উৎকর্ষতা দুইটাই হারাবে। মনে রাখা দরকার যে- উত্তর আধুনিক ভাষিক পদ্ধতিতে, টেক্সট বিশ্লেষণে একজন পাঠক প্রাথমিক বিষয় হিসাবে লেখককে পাশ কাটাইয়া নিজের ব্যাখ্যাকে দাঁড় করান। এই পাশ কাটানো অবস্থাটিকে লেখকের ভূমিকারোধ বা বিকেন্দ্রিকতা বলা যায়। লেখকের ওপর কোনো কেন্দ্রীয় ধারণা ছাড়াই, উত্তর আধুনিকতাবাদিরা অর্থের জন্য অন্যান্য উৎস পরীক্ষা করে- যেমন-ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অন্যান্য সাহিত্যের সাথে এর সম্পর্ক ইত্যাদি। তাই একটা উত্তর আধুনিক টেক্সট সরল কিছু না,  এইটা একটামাত্র থীম এবং মোটিফ ধইরা নির্মিত হয় না এবং এইটাকে এক জায়গায় রাইখা বিচার বিশ্লেষণ করার উপায় নাই। যারা এই আন্দোলন মজবুত করতে ইচ্ছুক তাদেরকে এই বিষয়গুলি খেয়াল করা জরুরি। তা না হইলে ভালো সাহিত্য উৎসাহিত হবে না, ঊন কবি, সাহিত্যিক এবং নিম্ন মানের সৃষ্টি দিয়া বইপত্র, সাহিত্য-পাতা/আড্ডা এবং সোসাল মিডিয়া ভরে যাবে।   

শেষ কথা (বলতে কিছু নাই)

বাংলাদেশে আশির দশকে আমদানি হওয়া এবং নব্বইয়ের দশকে সবেগে চলা উত্তর আধুনিক কবিতা-চর্চা পরবর্তী দশকগুলিতে কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এর কারণ- বাংলাদেশে  কোনো কোনো কবি, সাহিত্যিক/বুদ্ধিজীবিকে, আবারো সেই প্রতিষ্ঠিত, তৈরি, পাঠক-পছন্দ গঠনরীতি, কাব্যকলা কৌশলের দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য আহবান করতে দেখা যায়। এর ফলে কেউ কেউ সেই প্রাচীন যুগের চর্চাপদ, মধ্য যুগের বৈষ্ণব পদাবলী, আধুনিক যুগের মধুসূদন, রবীন্দ্র কাব্য কলা ছন্দ রীতিতে লিখতে আগ্রহী হোন। বিশেষত তরুণ কবি সাহিত্যিকরা, পিয়ার প্রেসার বা গোষ্ঠীবদ্ধতার কারণে, ‘আলাদা’ হওয়ার ঝুঁকি না নেওয়ার কারণে এবং উত্তর আধুনিকতাবাদি কবিতার ভাষা নিয়া পড়াশুনা করার অভাবে, উত্তর আধুনিক কবিতা-চর্চায় ভাটা পরে। অবশ্য আশার কথা এই যে- সম্প্রতি কবি ইশারফ হোসেনের একান্ত চেষ্টায় এবং উদ্যেগে এই বিষয়ে কিছু কাজ হচ্ছে।

শেষ কথা (বলতে কিছু নাই)।  প্রিয় পাঠক, আপনারা খেয়াল কইরা দেখবেন যে ইউরোপ যেইটা শুরু করে, ভারত এবং বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি, লেখক, চিন্তাবিদরা পরে সেইটা নিয়া নাড়াচাড়া করে এবং একটু ভিন্নভাবে নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য অনুযায়ী ব্যবহার করে। উত্তর আধুনিকতার নামেও তাই হইছে। ভবিষ্যতে আর একটা নতুন সাহিত্য মতবাদ আসলে মনে করবেন এইটা অলরেডি ইউরোপ বা অন্য কোথাও চর্চা হইয়া আসছে। এইটা ঠিক যে মানুষের চিন্তার কোনো মৌলিকতা নাই। আপনে যদি আধুনিক জ্ঞান-চর্চার ইতিহাসের দিকে তাকান তাইলে দেখবেন প্রায় সবকিছু সেই হেলেনিক যুগ থেইকা শুরু হইছে, এবং তারপরে এইটা দেকার্ত, কান্ট, হেগেল, নিৎশে, মার্কস, হাইডেগার ইত্যাদি হইয়া পানির মত নিচের দিকে নাইমা আসছে মানে পৃথিবীর একাডেমিক প্রতিষ্টানগুলিতে ছড়াইয়া গেছে। যদিও মাঝখানে ডারউইন এবং ফ্রয়েড এই প্রতিষ্ঠিত জ্ঞান-কাঠামোকে প্রচন্ড রকমের ধাক্কা দিছে, তবুও মানুষ হেলেনিক বিশেষত সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল বিধৃত এবং এনলাইটেন্টমেন্ট যুগের জ্ঞান-চর্চার ক্ষমতার স্পাইডারনেট থেইকা আজও বার হইতে পারে নাই।   

৩০/০৯/২০২২

সহায়ক পাঠসূত্রঃ

Of Grammatology by Jacques Derrida, Publisher-‎ Johns Hopkins University Press; Fortieth Anniversary edition (January 29, 2016).

Writing and Difference, by Jacques Derrida, Publisher Routledge Classics, Great Britain (1978).

একবিংশ, কবিতা ও নন্দনভাবনার কাগজ, সম্পাদকঃ খোন্দকার আশরাফ হোসেন,  বিভিন্ন সংখ্যা

One thought on “বাংলাদেশে উত্তর আধুনিকতাবাদ চর্চাঃ একটা বোঝাপড়া

Leave a Reply