সাম্প্রতিক লেখা কিছু কবিতা

মায়ের মুখ

কোথাও একটা রৌদ্র পড়ে আছে

মায়ের মুখের মতো।

ব্রিজ ভেঙ্গে পাখি তো উড়ল,

হাত থেকে সরে গেল গলিপথের বাবলা।

হাতি চলে, হাতি চলে

সমস্ত পাড়া গাঁ সিরাজ হয়ে যাওয়ার গান।

দেখি কোলাকুলি করছে কলকাতার ঝাউগুলো।

নিচে নেমে যায় হালকা চালের গীতিময় সন্ধ্যা।

বাড়িতে এলেই- বাবা তুই ভাত খাবি?

অপেক্ষার ছায়াগুলো গোলাপ গাছের চারা।

ভাত বাড়া, কাপড় ধোয়া- এরকম স্নেহগুলো

কবরের ধারে শিউলি ফুলের ঘ্রাণ।

দূরে যাওয়া তো দূরে যাওয়াই

মাশরুম ফোটে মেরুন শীতের গ্রামে।

সাদা শান্তি- সন্ধ্যাতারার শাড়িটা!

আমি তো লম্বা একটা ক্লাইভ ছাড়িয়ে

আমক্ষেতের রক্ত নিয়ে নিদ্রায় উঠে পড়েছি।

তোমরা দ্বিতীয় কোনো পলাশী করো!

রহস্যদুপুর

মেরিমবুলা নামের সমুদ্র উপকূলে এসে ডলফিন আর তিমি মাছের লাফালাফি দেখি। এই রৌদ্র এই বৃষ্টি, এমন রহস্যদুপুরে, জাহাজের পাশ দিয়ে চলে গেছে লম্বা এক পাহাড়ি জল-পাইন। দূরে সীগালের উড়াল, পালকের নিচে ঢুকে পড়ছে রুপালি সারডিনের মুখ।

আমি ভাবি এমন জলবাংলায়, রাতারগুল হলে ভালো হতো।  অথবা ঘুমের মাঝে মেরিমবুলাকে আজ রাতারগুল বলে ডেকে তুলছি। সাগর লাফানোর আর কোনো বিকাল নেই কোনোখানে। দরোজা খোলা হলে শীতের সন্ধ্যায় মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে

যুদ্ধ থামানোর গল্প করি। দেখছি সীমান্তে কাঁটাতারে- পাখির মত ঝুলে আছে কন্যা ফেলানি!  ভুমিযুদ্ধ শেষ, পিতৃহত্যার স্মৃতি নিয়ে রিফিউজি ক্যাম্পে  উঠে গেছে ফিলিস্তিনের এক ইয়াতিম বালিকা। মেরিমবুলায় সেই রক্ত নেই। শধু তিমি মাছের শরীর ধরে উঠে গেছে হা হা করা শাদা যুবতীদের নীল চোখ।

১৯/০১/২০২১

কিছু জন্ম

রৌদ্র ও ভাষার কলি। দিকে দিকে ছু চম্পা, ঝরাপাতা, হাওয়া, করতালি। দেখি আলোর বাজনা, রুহ মাতম, শান্ত মৌ কেরেদানি।

রুবাহুত ডেকেছো কি অপরূপ গুচ্ছ জামরুল, বাদামে?। আমার আজ উড়াল হলো দ্বীপদেশ, দরগাখানায়।

ফুল ঝরছে, পাখি নাচছে, দল ছল পিপড়ার বাজিখানা আগুনের উড়ালে।

দেখছি আপেলফুল বরফি কলমে,

দেখছি মাছ সেনাদের সাঁতার সমুদ্রতাবুতে । পা পড়ছে, গ্রীবা দুলছে, নাভী কাঁপছে বালিসোনা স্বর্ণ দেয়ালে। 

মির‍্যাজ তুমি বলো, কোলাজ তুমি বলো

বলো স্বপ্ন, তন্দুর, লাল জন্ম আগুনের। আমি শান্ত কিয়ামখনি, ফুটছি রোদ্র ছায়া, করবী, গোলাপে।

সান্তাহার

কোথাও গান পড়ে থাকলে রেললাইনে- কানপেতে শোনো।

শোনো- কেউ ‘সান্তাহার’ বললেই মায়ের মুখটাই মনে আসে।

সাদা আর সবুজ শাড়ির পাশে- দুটি শালিক গলাগলি করে।

স্কুলের দফতরি কি বাজালো শীতঘন্টা স্টেশনের শহরে?

ঘন কুয়াশায় সকাল বেলার ট্রেন- ছাড়লো কি ছাড়লো না

এসব ভাবতে ভাবতে বুকের ভেতর-

হা হা- আকাশ করে ওঠে।

নীল আর নীল, যেন তাহমিনা বেগম।

ফর্সা গোল আঙুল নিয়ে

সুনামগঞ্জ বেড়াতে গেছে।

রৌদ্র হলে বৃষ্টির কথা ভেবে ঘুমিয়ে পড়ি।

দেখি- থোকা থোকা ট্রেন চলে যায় অন্ধদের দেশে।

যার রঙ ধরে তার সবটাই সান্তাহার অথবা

যার কোনো রঙ নাই সেই হুইসেলের ভায়োলিন!

অপেরা হাউস থেকে ঘুম ঘুম পাখি আসে

তারও ডানা জামরুল ফলের ঠিকানা!

যেন বাড়িগুলি রাতের মিনারে তূর্ণা নিশিথা।

তাকে বাসা দাও, ভালোবাসা দাও।

খাবার দিয়ে ঘুম পাড়াও সেয়ানাদের বিছানায়।

আমি পথ ভুলে কত দূর চলে এসেছি।

চলে তো এসেছি বিদেশী গন্ধের টানে!

যা থাকে দূরে- সান্তাহার, ঝিক ঝিক,

শাল, তমাল- জলের খেয়ালে!

২০/০৬/২০২১

ভাষার বাগানে

ভাষার বাগানে মরে যাই,

যেন গোপন শহীদ আমি যুদ্ধ সীমানায়।

কুটিল কার্তুজ ফুটে কবিতার কাঁটাতারে

ঘেরাও করেছে কুম্ভজল- কৃত্তিবাস।

দৌড়ে আসে আর্যরাজ, পাল, সেন-সেনাবাজ।

যেন আমি জন্ম-অন্ধ, প্রসবিত হয়েছি গোয়ালে।

চৈতন্য কুটিলে- কাঁদে মানুষের জাতপাত।  

আমার নিখোঁজ পাখি খুঁজে ফেরে- ডানার ম্যাজিক।

জান তড়পায়। যা পাই তা নাই, শব্দ- লুপ্তকারাগার।

নিজেকে হারিয়ে মিথ্যা মায়ার উড়াল!

এসেছে কী দূত-খলিফা? লণ্ঠন কি জ্বলে সারারাত?

আমাকে কি দেবে পথ- অশ্বারোহী, কামিল সহিস?

জানি আলো-অন্ধকার, করাত কলের

বাজু নড়ে দিনরাত।

ভাষার সন্তান মরে গেছে- রক্ততাম্রলিপি,

নতুন অতিথি জাগে- গন্ধ-হিজাজের দান।

জ্বালিয়ে রেখেছি গুপ্ত পতাকা কামিন

যেন ফুল ফোটে- পাথরের বুকে

মন সদা ফানা ফিল্লা, নাচে- মধুর আয়াত।

সীমানা পেরিয়ে যাই – নীল নদ কেটে।

শুনেছি ফেরার ডাক কান পেতে- হৃদয় গহীনে,

দূরে পড়ে থাকে অভিশপ্ত ফেরাউন- রামেসাস!

০২/০৭/২০২১

আপেল বাগানে

প্রথম ফলের গন্ধে আকুল

আমার শরীর আমার মাফুজ,

আমার ক্বলবে বহে লিথি নদী

              মেঘনা যমুনা।

চারদিকে ঘুরে কাবিলের ছায়া

রক্ত মজনু- রূপ কারিশমা।

বাবা মা-  মাসুম

পড়ে গেল নিচে কিসের মায়ায়?

এসব আমরা মায়ের গর্ভে

একা একা ভাবি মগ্ন হৃদয়ে।

নাই দিশা, নাই আলোর আলেয়া

ফল থেকে ফলে চলছে- ইশারা।

তুমি দুশমন, তুমি কাটো হিয়া

আমি জ্বলি, যেন নবী ইয়াকুব,

চাই ইউসুফ, চাই তার কায়া।

সহজ মিলন চাই- যার মূলে কাটা

রক্ত বিভোর- হায়েনা হায়েনা।

বুকে করে ধরি নাজাতের দোয়া

কে আসে কে করে সমুদ্র পার?

চেনা ইবলিশ? নাকি ফারিস্তা?

০৫/০৬/২০২০

হাশর

আমিও হঠাৎ উড়ে পড়ব সীমান্তে -তপ্ত বালিসৌধে।

গুলিবিদ্ধ ডানা আর রক্তচক্ষু উজাড় করে দেখবো

গুটি পোকার মতোন মানুষের ঢল, খা খা বায়ুস্বর

আত্মভোলা ছায়াসেবীদের ঘুর্ণিনৃত্য- অগ্নিঘর । 

দেখবো আকাশ চূর্ণ হয়ে পড়ছে অবাক লোকালয়ে!

যেন কার্পাসের ফুল, মাথায় রোদের ছুরি- জল,পানি দূর।

তখন একাকী নিরিবিলি তোমার পাগল দুটি চোখ,

হে পারস্য থেকে ডানা ঝাপটিয়ে আসা-

বিস্ময় সুন্দর!  আমাকে কি চোখ তুলে দেখবে না?

যখন সন্তান চিনবে না তার মাতা ও পিতাকে,

বোন চিনবে না ভাইকে- যখন সারি সারি

আগুনের ড্রাগনকলাম-  দাউ দাউ

গলা পর্যন্ত উঠবে।

বালকেরা বুড়ো হয়ে যাবে ক্রমাগত,

চারদিকে মানুষের কলরব- বাঁচাও বাঁচাও।

সূর্য গিলে খাবে মস্তকের টাটকা গোলাপ।

তুমি কি তাকাবে না আমার দিকে?

ভাবিয়ে দেবে না এক বৃষ্টি পড়া রাতের করবীগান?

একটা ডালিম গাছ বেয়ে নেমে আসা ত্রস্ত গিরগিটি।

জাগিয়ে দেবে না- পদ্মনাভ পাতালের ঘুম ভেঙে

গলাগলি করে থাকা দুটি হতভম্ব মাছরাঙা পাখি!

বৃষ্টি

কোথাও বৃষ্টি পড়ছে, মাশাল্লাহ!

নগ্নতার দিনে শুচিকাজ করছে জল।

 আমার কি উড়াল হলো- বন্ধ পারাবতের জামানায়?

আহা! দাও আকাশ,  শেখাও শীতপাখির ছল।

আয়না করছে সকালের ছায়াছবি- জামরুলের বন!

যেন লুটিয়ে পড়ছে হাতি আর বন-হুরেরর দল।

 সবকিছু কথা বলছে -ভাষাহীনতায়

 মাশাল্লাহ! না-শব্দের জবানে

  খিলখিল ভরাফল!

আজ জানালায় চোখ রাখবো- শিশু করে

 যেন শিষ দিয়ে ডেকে উঠবে মা-গোলাপ,

রক্তদাগ হয়ে আসে গোলাপের গন্ধ, গন্ধফল।

 মাশাল্লাহ, তোমাকে সাজিয়ে তুলছি পুনঃ

বৃষ্টিদিনের বিবাহবাসর!

 যেন গড়িয়ে পড়ছে জুলেখার বরফিকল

আমাকে ভিজিয়ে দেখছে-

ভারি বুকের দুই অঞ্চল।

বাংলা ভাষার প্রতি

তোমাকে আক্রোশে নিয়ে গেছে ভাষাডাকাতেরা,

ব্যাকরণ-প্রেমিক অধ্যাপক আর ছন্দপাগল কবিরা।

যেন তাদের শরীরে তুমি রোয়া ওঠা কর্কটের ফুল।

গন্ধ দাও পচা মাছ, আঁশটের। তোমার কপালে ফোটে

জাতি হারানোর কালো তিল, আত্মগরিমার পলেস্তারা।

আমি ভয়ে কুল রক্ষা করে- দূরে চলে আসি।

আমার পরম জান তুমি, প্রিয় আমার আম্মা।

আমি তো তোমার দিকে মুগ্ধ দষ্টিতে তাকিয়ে থাকি!

যেন ফজরের আয়াতের স্নিগ্ধ ফুল তুমি,

আমার বাগানে চিরদিন আপনা আপনি ফোটো।

হাওয়া তোমাকে

তোমাকে লুকিয়ে রাখবো তামার পোশাকে

তিমির রাত্রি, নিবিড় যতনে, আউশফিৎজ ক্যাম্পে।

গোপন কওমে, নিষিদ্ধ ভাষা- ভাষার বাবেলে।

তোমার শরীরে যেন কেউ ভুলে চক্ষু না দেয়

কেউ যেন হাত না দেয় তোমার নরম পালকে

অতি মনোরম স্পর্শকাতর- যাদুর আপেলে।

যেন সারা দেহে গাছ ওঠে ঘন, গহীন গভীর

আমাজন- অ্যানাকোন্ডা চড়িয়ে গার্ড দেব।

তোমাকে যে ছুঁবে তাকে যেন দাঁত

দিয়ে ছিঁড়ে ফেলে- আমার হিংস্র পালাসাপ।

আগুন গাছের কামিজ বানিয়ে রাখবো সকালে

যেন ছুঁতে গেলে হায়েনারা পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

তোমাকে আড়াল করবো হাবিলি কুঞ্জে

পাথর মর্মে, মাছের কফিনে, আবলুশ সিন্দুকে

লোহার পেরেক রাখবো সকল দরোজায়।

সায়ানাইডের প্রলেপ রাখবো হাতলে

যৌনডাকাতের হাত পচে যায় যেন

জননলাঠিতে তার পোকা খাবলিয়ে ধরে।

কালাশনিকভ নিয়ে আমি বসে থাকবো তোমার

বিছানার পাশে। শীত ও  গ্রীস্মে দাঁড়িয়ে থাকবো

ধারালো মাসেটি- সামুরাই হাতে।

আমাকে পাগল বলো আর যাই বলো

আমি তো তোমাকে জান দিয়ে ভালোবাসি প্রিয়।

প্রেমিক আদম আমি- আদমের সন্তান

তোমাকে অমর করে গাই স্বাধীনতা, শান্তির গান।

১৪/১০/২০২০

আমি ও ২২শে শ্রাবণ

বাইশে শ্রাবণ আসলে পরে

একটা রবীন্দ্রনাথ আমার পাশে বইসা থাকে।

আমার গরুর মাংস খাওয়া দেখলে তিনি চইলা যান না

বা আমি ‘আল্লাহু আকবর’ বইলা আজান দিলেও

রাগ করেন না। তিনি আমার মুখের দিকে তাকাইয়া থাকেন।

আমি- সোনার তরী, গীতাঞ্জলি, নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ-

এইসব কবিতা আবৃত্তি কইরা শোনাই।

রবীন্দ্রনাথের পিপাসা লাগে। আমি পানি আইনা দেই।

এক সময় তিনি চায়ের কথা বললে, আমি চা বানাইয়া দেই।

আমি বলি দেখেন আপনে মুসলমানদের নিয়া লেখেন নাই

বইলা আমার কোন দুঃখ নাই। এইটা হইতেই পারে।

কিন্তু আপনে আমাগোরে ‘বহিরাগত’ বলছেন,

‘ভিনদেশি’ বলছেন- এতে আমি কষ্ট পাইছি।

আমি বলি ‘শুনেন কবি, আপনেও তো বাইরের লোকই’।

এইটা শুইনা রবীন্দ্রনাথ লজ্জা পায়। মুখ ঘুরাইয়া

জানালার দিকে তাকাইয়া থাকে।

তখন আমার নবিজীর কথা মনে পড়ে।

তিনি কীভাবে একজন আবিসিনিও আর কালো বর্ণের-

হযরত বেলালকে বুকে জড়াইয়া নিছেন।

এইসবই ইসলামের শিক্ষা। এইখানে

জাতপাতের কোনো ভেদাভেদ নাই।

তাই ৮০০ বছরের রাজত্বের পরও মুসলমানরা

ভারতবর্ষ থাইকা কাউরে চইলা যাইতে বলে নাই।

তারপরও  বাইশে শ্রাবণ আসলে পরে

একটা রবীন্দ্রনাথ আমার পাশে বইসা থাকে।

সবকথা শোনার পরও তিনি কোথাও চইলা যান না।

আমার ভাষার মধ্যে চুপি চুপি নৌকা চালাইয়া যান!

০৮/০৮/২০২০

Leave a Reply