সারওয়ার চৌধুরী
দেশ আছে ভিতরে, দেশ আছে বাইরে। ভিতরের দেশেও দেশসমূহ, বাইরের দেশেও দেশসমূহ। কবির চিন্তা প্রক্রিয়ার দেশে, চোখে পড়ে, শুধু কবি কর্তৃক প্রজেকশন করা দেশসমূহ থাকছে না। পাঠকেরও অ্যালেথিক নেটওয়ার্ক এসে অর্থসমূহের মহাদেশ নির্মাণ করে। শব্দেরা নিয়ে আসে অনুভূতির প্রিয়তর উত্সব। ভাষার দৌলতে বিস্ময়কর দৃশ্যসমূহের উন্মোচনও করেন কবি। অন্য প্রকার উদ্বোধন তো থাকছেই।আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ’র কবিতার দেশে আছে অভিনব দেশ আর দেশ। ছোট বড় দেশ। আছে যাদু বাস্তবতার ম্যাগনেটিজম। আছে নতুন ভাষাবলয়ের ইঙ্গিত। কিছু সুন্দর এই রকম দেখা যায় সেখানে, মানে, তার কবিতার বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন কাব্যগন্থের কবিতায়—
‘ঝিলবিলের কাহরাবা’ হয় ফণীমনসা, ‘ঠোঁটে করে নিয়ে যাবে ঘূর্ণি আর আষাঢ়ের নৌকা’ কবিতা হারায় ‘সোনালী চুলের ড্রাগনে’, ‘মাথার উপর দিয়ে ভেসে আসে হাঙর’, ‘পরিহারপ্রবণতা মুদ্রা হয়ে আসে’, ‘কলহপ্রবনতা শেষ জলদালানের কাছে’, ‘অপহৃত মেঘরাত রৌদ্র ভূমিকায়’ ‘নৌকাগুলি বসে থাকে এতিম’।
কবি আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ ধরতে পারেন, মেঘ কেবল মেঘাচ্ছন্নতা দেয় না, মেঘ শুধু বৃষ্টির পূর্বাভাস দেয় না; ‘অপহৃত মেঘরাত’ রোদের পরিচয় নিয়ে আবির্ভূত হ’তে পারে। মেঘের দ্বারা প্রক্ষেপিত রোদ অনিন্দ্য ভালোবাসা উস্কে দিতে পারে। সে-রোদ সূর্যালোকের কল্যাণে প্রাপ্ত রোদের চাইতে কম রওশন ছড়ায় না। আমরা জানলাম মেঘনিঃসৃত রোদের আলো। মেঘ সিগনিফায়ার হিসাবে খুব পোক্ত, শিল্পে মেঘের প্রভাব বহুমাত্রিক, নানা প্রসঙ্গের দুয়ার খোলে। বাইবেলে মেঘ মেটাফর signifies ডিভাইন revelation. মেঘ স্বপ্নকেও ডিনৌট করে; মেঘ তন-মনে দোলা দেয়। মেঘ বৃষ্টি হ’য়ে নে’মে আসলে দৃশ্যে উন্মোচন ঘটে নতুন দৃশ্যের। বৃষ্টির পানিতে ভরা হাওড় নদীতে নৌকাগুলি বসে থাকে না এতিম হ’য়ে। মেঘের কল্যাণে আসা বৃষ্টি কর্তৃক ধোয়া প্রকৃতির কোনো তুলনা হয় না। বৃষ্টির কল্যাণে দেখা যায় ‘যারা মুগ্ধ ধ্যানে দাঁড়িয়ে আছে’। মননের মেঘনিঃসৃত রোদে যেন আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ ইশারা করেন একটি বিশেষ ভাবনা— ‘সেই ভাবনা দেখে শিস দিল সিজদারত পাখি’ আর দেখিয়ে দেন— ‘কবতুরগুলি পাশের পাহাড়ে হাড্ডি হয়ে যায়’। মুগ্ধতা বিকিরণের সুন্দর সন্দেহ নেই।
কবি আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ’র কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম—
‘আপনার কবিতাসমূহের স্টাইলিস্টিক ক্রাইটেরিয়াতে জাদুবাস্তবতার প্রকাশ একটি অন্যতম প্রধান উল্লেখযোগ্য দিক। এই যাদু সুন্দর কি ‘সেন্স অব মিস্ট্রি’ পছন্দ করেন ব’লে নাকি অন্য কোনো কারণে?
’তিনি জানিয়েছেন—
‘আমি ব্যক্তিগতভাবে কবিতায় হার্ড লজিক বা নৈয়াকিক চিন্তা ধারায় বিশ্বাস করি না। তাই আমার কবিতায় মাঝে মাঝে যাদু বাস্তবতা বা পরাবাস্তবতার একটা রেশ থাকে বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যাবে যে এগুলি ফরাসি পরাবাস্তবতা নয়, পুরোপুরি অবচেতনার কবিতা নয়। ফরাসি পরাবাস্তবতার পুরো স্প্রিটই নেতিবাচক, যার উত্থান অনেকটাই বিশ্বযুদ্ধপরবর্তী গলিত, পঁচা, মৃত বুজোর্য়া মানসিকতা থেকে। তাই স্বভাবতই এইসব কবির কবিতা অন্ধকারাচ্ছন্ন, বিষাদগ্রস্ত এবং যথারীতি আশাহীন। আর একটা ট্রেণ্ড আছে যেখানে কবি তার extra consciousness নিয়ে আমাদের চারপাশটাকে দেখতে পারেন। আমাদের সাদা চোখে দেখা এই বাস্তবতার বাইরেও তো আর এক বাস্তবতা আছে, বস্তু অবস্তু তথা ইউনিভার্সের আমরা যা কিছু দেখছি বা অনুভব করছি, তার থিন লাইনের বাইরে। তাকে ধরার জন্য এমন একটা ভাষার প্রয়োজন যেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক যুক্তিবোধের ভাষাকে ছাড়িয়ে আমার অ-দেখাকে অ-জানাকে আমি আর একটি নতুন ভাষায় মূর্তিমান করে তুলতে পারি। দেখুন, আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহার করা শব্দ, এই সামাজিক ভাষা, কার্যকর ভাষা, তারও একটা সীমাবদ্ধতা আছে। একজন কবির এই জিনিসটাকে মাথায় রেখে নতুন ভাষার সন্ধান করতে হয়। রবীন্দ্রনাথও করেছেন। জীবনানন্দও করেছেন। তাঁরা নতুন ভাষাবলয় সৃষ্টি করেছেন। তাই বলে এখন তো আর তাদের ভাষায় কবিতা লিখে লাভ নাই। অথচ দেখুন, চারদিকে এখনো সেই সোনার তরী আর বনলতা সেনের ভাষা। সরাসরি কমিউনিকেটিভ মজাদার, লিরিক্যাল ভাষা। পুরাতন বা প্রতিষ্ঠিত স্টার কবিরাই লিখছেন। আর তাকে অনুসরণ করতে তরুণ কবিদের মধ্যে কি ভীষণ প্রতিযোগিতা! কবিতার উত্তরাধিকার তো এইটা না। কারণ এইগুলি কিছু আর যুক্ত করবে না। তাই দরকার নতুন জন্ম, নতুন কবিজন্ম নিয়ে পৃথিবীকে দেখা, কল্পনা করা, চিন্তা করা। তখনই হয়তো নতুন একটা Eden of Language তৈরি হতে পারে, যেখানে কবিতার ভাষা, চিত্রকল্প তথা সাংগঠনিক পরিবেশন কোনো মৃত জ্ঞান, ইতিহাস বা মিথোলজির প্রি-কণ্ডিশনড হবে না।’
কবি আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ’র কবিতাদেশ, মানে কাব্যগন্থগুলো—
‘পলাশী ও পানিপথ’ ‘নো ম্যানস জোন পেরিয়ে’ ‘শাদা সন্ত মেঘদল’ ‘জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি’।
এগুলো ছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে নতুন কবিতা। চলতে চলতে দেশের পর দেশ, কবিতার ভাঁজে কবিতা, কবিতার কোলে কবিতা, কবিতা ধরে কবিতা, আর আনন্দ বেদনার যৌক্তিক কারুকাজ।
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ’র কবিতাদেশগুলিতে পাই আরো—‘নিরপরাধ আলিঙ্গনের কাছে পরিত্রাণ’ ‘গৃহহীনতার আড়াল নিয়ে মহাকাশ দেখছি’ ‘নিদ্রাঘোড়া’ ‘মেহগনি মহিলার বিছানা’ ‘ভাষাগাছ’ ‘দৌড়ে আসছে কথাকাহিনী’ ‘মধুদেশ শিকারসাধনা ঘন’ ‘শরীরে জমে জলপাখি মেঘের পিঞ্জর’ ‘আলোসিল্কের ডুব সাঁতার’ ‘আগুনের ভাঁজে ভাঁজে’ ‘ময়ুরছলনা’ ‘মাথায় নিয়ে জিভে চাখি এই হাওয়া’।
পরিত্রাণ মানুষ চায়, অজস্র পরিত্রাণের পরিপ্রেক্ষিত জীবনের চারদিকে। অগণন আলিঙ্গনও। কবি নিরপরাধ আলিঙ্গনের কাছে পরিত্রাণ দেখছেন, দেখাতে আনন্দ পেয়েছেন। অন্যদিকে মুখ ফেরাইতেই অভিনব দৃশ্য- গৃহহীনতা একটি আড়াল, সে-আড়ালের ওপাশ থে’কে মহাকাশ দেখা। মহাকাশ মিলিয়ন অর্থবোধক এক অনন্য আধার। কথা ও কাহিনী দৌড়ে এসে কবিকে দেখায় ‘ভাষাগাছ’ আর ‘নিদ্রাঘোড়া’। ভাষার বৃক্ষ সুন্দর; ভাষার বৃক্ষে প্রচুর শাখা প্রশাখা আর পাতাদের দোলা। ওদিকে ‘মেহগনি মহিলার বিছানা’ সামনে এসে খুলে দ্যায় অভিনব রোমান্টিক বোধ। কিছুদূর গিয়ে জলপাখি দেখতে দেখতে, মেঘের পিঞ্জর ছুঁয়ে দেখতে আগ্রহী উঠতে উঠতে, আগুনের ভাঁজের সামনে দাঁড়িয়ে সুন্দর ময়ুরছলনার সাক্ষাত পাই। বিশেষ বিস্ময়ভরা হাওয়াতে হারিয়ে যাই।
উল্লেখ করা যায়, দশকওয়ারি ধরলে, আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ ৯০ দশকের অন্যতম কবি। তিনি তীব্র ইতিহাস সচেতন, সন্দেহ নেই। এবং মা মাটি স্বদেশ আশ্রিত একজন কবি। আবার তার কবিতায় হঠাৎ পাওয়া ভাব, স্বপ্নভ্রমণ, ইম্প্রেশনিস্ট চোখে দেখা দৃশ্যের বিম্বচূর্ণ মিশেলে তৈরি আর একটি পরা-পৃথিবীর উপস্থিতি পাওয়া যায়। সমকালীন কাব্য-দুনিয়ার গড্ডালিকা ধারার বাইরে তার কবিতার দেশসমূহ। তাই হয়তো তার ভাষা একরৈখিক নয়, তার ভাষা বহু চিহ্ন, রঙ, রেখা, স্বপ্ন-বাস্তবতার ভেতর ও বাইরে জমে থাকা বহুবিধ কণ্ঠস্বরের একটি প্রিজম যেন। তার কবিতায় কোনো নিদির্ষ্ট ঘটনা থাকে না; থাকে বোধ আর ভাবের অন্তহীন যাত্রার অধ্যায় পরম্পরা। তাই কখনো তার ভাষাকে দূরূহ মনে হতে পারে, কিন্তু দুবোর্ধ্য নয় একেবারে এটুক বলা যায়।
আমরা টের পাই—সব ধরণের শিল্পকলা মূলত নানাভাবে ‘নিউরোপারসেপচুয়েল মিরর’। এতে শিল্পীর মনস্তত্ত্ব প্রকাশ পায়। আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহর কাব্যকলাতে তাঁর পৃথক পরিচয় স্ফুট। তিনি কবিতাদের দ্বারা নির্মিত জানালাগুলো বহুরূপে প্রকাশ করেছেন। কবির দীর্ঘ জীবন এবং নিরন্তর কাব্যসাধনার প্রার্থনা করতে পারি আমরা।
#
রচনাটি ২০ মে ২০১৩ বাংলানিউজ২৪ডটকম’র শিল্প ও সাহিত্য পাতায় প্রকাশ হয়েছে।