কবিতা যে কষ্ট কল্পিত সৃষ্টি নয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কষ্ট কল্পিত কবিতা প্রাণহীন, বিরক্তিকর। আর যে কবিতা- স্থান, কাল, পাত্র, স্মৃতি, ঘটনা, অভিজ্ঞতা, অনুভূতির সংশ্লেষণে গড়ে ওঠে তা হয়ে ওঠে জীবন্ত। তবে সত্যিকারের কবিতা যে কীভাবে আসে তা বলা মুশকিল! কারণ একটি কবিতা জন্মের ইতিহাস এক এক কবির কাছে এক এক রকম। অনেক কবিতা আছে কবির ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা, স্মৃতি আর ভাষার কারবারে গড়ে ওঠে। তখন এমন হয় যে কবি হয়ে যায় ব্লাংক প্যাজের মতো, কে যেন তার শূন্য পাতায় লিখে চলে যায়, তার করার কিছুই থাকে না। আমার একবার এরকম একটা অনুভূতি হয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগে। ২০১০ সালের দিকে আমরা ক্যানবেরার কাছে স্নোয়ী মাউন্টেনে বেড়াতে গিয়েছিলাম তুষার পড়া দেখতে। সিডনি থেকে ক্যানবেরা তিন ঘন্টার পথ, সেখান থেকে আবার থ্রেডবো, মানে স্নোয়ী মাউন্টেনের জায়গাটা প্রায় দের দুই ঘন্টার পথ। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে সেখানে গিয়ে দেখি প্রচণ্ড ঠান্ডা, হাড় কাঁপানো শীত।
পাহাড় বেয়ে তুষার পড়ছে, শাদা শাদা তুষার কণা আমার চোখে মুখে, পুরা শরীরে, শত শত মানুষ তুষারের ভেতর দিয়ে হাঁটছে, বাচ্চারা এদিক সেদিক লাফালাফি করছে। এ যেন স্বপ্ন, যেন এক অলৌকিক ঘটনা! আমার মন এই দৃশ্যের আবেশে পাগল হয়ে যাবার মতো অবস্থা। তখন অনুভব করলাম আমার ভেতরে কবিতার একটা স্পন্দন, কবিতার সুর বয়ে যাচ্ছে, কে যেন কবিতা করে যাচ্ছে। পরে বাসায় এসে নিচের কবিতাটি লিখেছিলাম, যা আমার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘নো ম্যানস জোন পেরিয়ে’ তে অন্তর্ভুক্ত।
#
স্নোয়ী মাউন্টেনের কাছে
তুষার প্রপাত দেখে দেখে শুধু কবিতাই করবো, তোমাকে বলি।
শাদা বাতাসের নিম্নদেশে সীতাহার, দুলদুল ঘোড়া, যা-ই উড়ে আসুক
তোমাকে বলি।
লাল পোশাকের গার্ড, আপনার হাতেও বিদেশী সভ্যতার ছলাকলা, তাড়াহুড়া।
যাই যাই করছে উটপাখি, বিড়াল। বাস থেকে নেমে পড়া মেয়েটার শরীরে
সোনালি কবুতর। আমি গমদানা খুঁজে খুঁজে হয়রান। এই জাতীয় হরেক রকমের
মিলনমেলাতে- স্তন ধরে বাঘ হওয়ার বাসনা থাকে মানুষের!
শাদা ঘাসে অতিথীরা বসে থাকে । এমন সকালবেলা নাস্তার টেবিলে, যেন পৃথিবীর
দেহে কোনোদিন মানুষই উঠেনি! তার আমপড়া জামপড়া স্মৃতি- তরল রোদের সাথে তুল্য।
আমাদের সব আলোচনা শেষ হয়- দলহারা এই বুনো হরিণের পথজ্ঞান দেখে।
তুমি যে পথেই থাকো – তাকে তুষার প্রপাত বলে মেশানো যায় না।
হাত ধরে অতিদূরে, গাড়ি করে যাবে কালোমহিষের পালকেরা।
২২/০৮/১৯