কবির চেতনাপ্রবাহে থাকে কবির কাল, কবির মানস ও ভূ-বাস্তবতা। থাকে জন্ম, মৃত্যু, সৃষ্টি আর স্রষ্টা-ধারণা সম্পৃক্ত বিষ্ময়। সেখানে চলে পরম সত্তাকে চেনা ও জানার, আশা ও নিরাশার ভ্রমণ, যুগপৎ শান্তি ও রক্তপাতের চাঁদমারি। কিন্তু সবকিছুর পরে কবির উপলক্ষ ভাষা মানে কবিতার ভাষা। সেই ভাষা ধরে, কবিতার গ্রাউন্ড তৈরি হয়। সেই জায়গাতে দাঁড়িয়ে কবি আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ আর এক নতুন চেতনা প্রবাহের সন্ধান পেলেন। বদলে গেল ভাষা। নামহীন ছদ্ম-আধ্যাত্মিকতা থেকে মুক্ত হয়ে ওবায়দুল্লাহ নামলেন ইসলামিক মা’বুদ আর ইসরার মায়াবী জগতে। কিন্তু মন দিয়ে খেয়াল করলে টের যাওয়া যায় এগুলো নিছক ধর্মীয় আবহাওয়ায় সিক্ত কোনো ভাববিলাস নয়, নয় কোনো সিরিয়াস ভক্তের ভক্তিনামা। এটি বরং সৃষ্টিকর্তা আর মানুষের মধ্যকার মালিক, দাস সম্পর্ক ছাড়িয়ে তার মধ্যে আনছে নানাবিধ জিজ্ঞাসা, আত্ম-আবিষ্কারের দ্বিধা ও ধন্ধ। কখনও ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের অহং-এ আবার কখনও খোদায় ফানা হতে চেয়ে ওবায়দুল্লাহ’র স্বকীয়, এক যাদুকরি ভাষায় তা হয়ে উঠল থরো থারো কবিতার খনি, কবিতার ইসরা। পাঠক তুমি সাক্ষী।
সৈয়দ তারিক, কবি
_________________________________________________________________________
মা’বুদ
পলায়নপর আয়তক্ষেত্র থেকে
পিছু পিছু আসছি
বুকে জ্ঞানফল, বুকে নক্ষত্র গ্যালারির চাঁদমারি।
যারা মুগ্ধ ধ্যানে দাঁড়িয়ে আছে কোণাকোণি
তাদের পাজামার সাদায় টগবগে দুলদুল।
নিখিলের সব ধু-ধু পেরিয়ে পাগড়িগুলি
পথে পথে উড়ছে।
যেভাবে তারা ডাকছে
যেভাবে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে গলা থেকে
যেভাবে মিশে যাচ্ছে সীমানা ও সাকিন
সেরকম ডাক আমি কখনো ডাকিনি!
সেই দুঃখে
আমি যাবো কি যাবো না, নাকি তাদের ফেলে
এই নীল জাম্পারের নিচে থাকা
কৃষ্ণ আয়না ধরে বসে থাকবো- এ কথা ভাবছি।
সেই ভাবনা দেখে শিষ দিল সিজদারত পাখি
তার ডানা থেকে তাসবিহ
তার ঠোঁট থেকে ইয়া আল্লাহ।
ক্বাবা
যে সব শহরে ক্বাবা নাই
সেখানে সোনালি ঘণ্টা বাজে
আরবি ওয়াল পেইন্টিং থেকে উড়ে কালো সমুদ্রপাহাড়,
স্কুলে যেতে যেতে মেয়েরা গমের পাউরুটি ছুঁড়ে
আর কবতুরগুলি পাশের পাহাড়ে হাড্ডি হয়ে যায়।
আমি যেখানে থাকি তার একটিও নাই
না ক্বাবা, না কালো আরবি ওয়াল পেইন্টিং
কোনো কবুতরও মেঘে মেঘে ঘুর্ণি মারে না সহজে।
শুধু আ্যাশ কালারের গাড়িগুলি মুরগির বাচ্চাদের মতো
রাউন্ডঅ্যাবাউটে ঘুরে।
সে জন্য আমার মনে শত দুঃখ জাগে
আমি মধ্য রাতে মায়ের ঘুমানো মুখটার দিকে চাই
আর একটা জায়নামাজ খুঁজি।
কিন’ মা তো অনেক আগেই মরে গেছে
তাহলে কেন যে তার কবরের দিকে বিছানা বাড়াই!
আর রাগবি খেলার মাঠে নবী ইব্রাহিমকে খুঁজি।
গুম
গুম হয়ে বসে আমি আঙুর ফলের কথা ভুলে যাবো
দেখব হাতের মৌরিগন্ধ পেয়ে বসে আছে
নিজেকে হারানো এক নীল মানাকিন পাখি।
তার নরম ডানার নিচে সিংহাসন আর
স্বর্ণ তরবারি লুপ্ত হয়ে যাওয়ার চিঠি।
ঘন এই জামরুল ঘেঁষে
আজ শুধু ইলাহি ইলাহি মরশুম।
গায়েবে গায়েব যে লুকিয়ে থাকে আমার কফিনে
তার মিরাকল ধরে গলে যাবে আজ
পৃথিবীর সব বন্ধ দরজার আলপিন ।
এতো স্তব্ধ আজ দেয়ালের ঘড়ি
সময় কেমন শুয়ে আছে বোকা হরিণের মতো!
শরীরের সব সাপ কেটে দেবে আজ
জিন্দা জিন্দা আয়াতের হারাকিরি।
আর মসজিদ শেষে নামাজিরা যে রাস্তায় হেঁটে গেল
তার চাঁদ ধরে মিউ করে ওঠে
এক নাস্তিক বিড়াল।
পর্বত
দাঁড়ানো পর্বত আবহাওয়ায় শুয়ে থাকি
পাশে পিপাসার পাখি, আলেয়া ও ঘরবাড়ি
স্ফটিক আব্রু বিছায় আকাশের কানারি নীল।
কী সব শব্দ আসে হরিণ শাবকের মতো
কী সব ভাষার গোলাপ উল্টিয়ে ধরে
রক্তচিতাবাঘ ।
এক পাতা দুই পাতা
বাও মেরে ঢুকে যায় ঝুম মকর ও মাছি।
পৃথিবীতে রাজা জাগে, তাম্রলিপির পথ ধরে
নেমে আসে দুর্বার হাতির পাল।
কে জানে অতিশয় ক্ষুদ্র পাখি ঠোঁটে ধরে
রাখবে বিষ মাখানো কংকর!
আর হুংকারের সৈন্য মরবে পিপীলিকার মতো।
দিকে দিকে পাঠ আর পঠনের মিনার,
সূর্য ফোটে অন্ধ অন্ধকারের কলিজায়।
এক জিন্দাভাষা গড়িয়ে পড়ে ঘুমন্ত সিনায়!
আর মোহাম্মদ মোহাম্মদ বলে
ডেকে উঠে চক্ষুস্মান পর্বত।
সিজদা ও অন্যান্য ইসরা প্রথম প্রকাশঃ বইমেলা ২০১৬ প্রচ্ছদঃ বিধান সাহা প্রকাশকঃ রাজীব চৌধুরী ,চৈতন্য প্রাপ্তিস্থানঃ চৈতন্য
