আমি যেমন আমার নই, সে অর্থে কবিতা আমার ভাষার কিছু নয়

paintingকবিতা রচনা যে একটা হাতের কাজ নয় তা সত্য হয় যদি আমরা ভাষার বাইরে গিয়ে দাঁড়াই। হাতের কাজ একটা টুল, একটা শারীরিক সঞ্চালন মাত্র। কবিতা নব্বই ভাগই মনোজাগতিক, দশ ভাগ হাতকারুপণ্যগিরি। এখানে হাতের কাজ ততটুকু যতটুকু শুধু একটা কাঠামো দাঁড় করার জন্য প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু একটা বিজলি চমকানোর মত যদি আকস্মিক হাজির/নাজিল না থাকে বা নিদেনপক্ষে একটা আত্ম হরণের অনুপ্রেরণা না আসে, কাঠামোটি শুরু হবে কি করে? আর হাতের কাজ সবসময়ই জৈবপ্রধান, অতএব সীমাবদ্ধ। কবিতায় যখন হাতের কাজের কথা বলা হয় তখন একথাই জানানো হয় যে এখানে কৌশল জানতে হয়, শব্দ ও ভাষার যা হয়ে আছে তার গোলামি করতে হয়। এ কথার সূত্র ধরে বলা যায়- শিল্পকলা, রচনা কৌশল, কারুপণ্যগিরি এসব জানলেই যদি কবিতা লেখা যেত তাহলে এসবের লেখকেরাই কবি হয়ে উঠত! অলিতে গলিতে কবিতার স্কুল দেখা যেত। তাহলে একটি কবিতার জন্ম হয় কীভাবে? উত্তরে হয়ত অনেকেই বলবেন- এটি ব্যক্তিনিরপেক্ষ বিষয়, কবিবিশেষে এটির এক এক জন্ম। কিন্তু সবাই যে কথাটি এক বাক্য স্বীকার করবেন তাহলো কবিতা আসে, কবিতা হয় না। তার মানে যে এটি একটি ’পাওয়া’ বিশেষ। আমাদের চারপাশে কবিতা সৃষ্টি হয়ে আছে। সবাই তো আর এ জিনিসটি ধরতে পারেন না। যারা এই শক্তি পায়, তারাই টের পান- একটা কিছু মাঝে মধ্যে তাদের মধ্যে হাজির হয়।

প্রশ্ন হলো কী আসে? কীভাবে আসে?। বিষয়টি জটিল কারণ আমরা কোনো কিছুই দেখতে পাই না। তাই এর কোনো একরৈখিক উত্তর নাই। যেমন গাছকে আপনি যদি প্রশ্ন করেন তুমি পাতা দাও কীভাবে? ফলমূল দাও কীভাবে? গাছ তো আর কথা বলতে পারবে না। এ তার পাতা আসা বা ফলমূল আসার কাথাটি বলতে পারবে না। কারণ গাছ আর একটি মহাশক্তির বার্তাবাহক, পরিবাহক শুধু। বিষয়টি মায়ের পেটে বাচ্চা আসার মতো। আমি আপনি চাইলেই তো কোনো নারীর পেটে বাচ্চা দিতে পারবো না বা নারীটি চাইলেই তো বাচ্চা আসবে না। এমনকি বিবাহিত নারী হলেও। এটি আসতে হবে! কোথাও না কোথাও এটি হয়ে আছে। সেখান থেকে এটিকে আসতে হবে। তাহলেই তো গর্ভজাত হবে, সন্তান প্রসব হবে। কবিতার সৃষ্টি প্রক্রিয়াটি এভাবে চিন্তা করা যায়। কারণ শব্দ দিয়ে কবিতা হয় না, বাক্য দিয়ে কবিতা হয় না, গল্প, নাটক, রাজা বাদশা, উজির নাজির, প্রেম ভালোবাসা বা নারীর সৌন্দর্য ইত্যাদি দিয়ে কবিতা হয় না। এগুলো কেবলই সলিড, জৈব পৃথিবী। এর আরো একটি জিনিসের প্রয়োজন পড়ে যার নাম সারেণ্ডার বা নিষ্কৃতি। আমার ’আমি’র নিষ্কৃতি। নিজের বদ্ধ চিন্তাভাবনা থেকে বের হয়ে আর একটি সদা স্বয়ং প্রকাশের কাছে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া। তাতেই ভাষা নামক এই শরীরী পূজা থেকে আমাদের চিন্তার মুক্তি ঘটে আর কবিতা হাজির হয়। আমাদের বুঝতে হবে যে ভাষা একটি জড় সংঘঠন মাত্র যা মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ ছাড়া এক পাও চলেনা। কিন্তু এটিতে মানুষের টোটাল অহং এর নিষ্কৃতি না মিললে এটি আমাদের একটি পুজায় পরিণত হয়- কলাকৌশলের পুজা। তখন আমাদের ভাবনার ’আমি’র মুক্তি মিলবে না, কবিতারও দেখা মিলবে না।

আজকের কবিতা যতক্ষণ এই ভাষাপূজার বলয় থেকে বের হয়ে এই সদা স্বয়ংপ্রকাশ ফেমেননের পোশাক পড়বে না, ততক্ষণ পর্যন্ত কবিতা আসবে না। যে কবি যত বেশি এই ভাষাপূজাকে ধাক্কা দিতে পারেন সে ততই জীবন্ত কবিতার সন্ধান পান। পৃথিবীর বড় বড় কবিদে্র কথা ভেবে দেখেন। তারা প্রতিষ্ঠিত কাব্যভাষা তথা ভাষাপূজার বলয়টিকে ভেঙ্গে দিয়ে তাদের নিষ্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এই নিষ্কৃতিকে সবারই আসে না। এই জন্যই যুগে যুগে বড় কবির জন্মও হয় না। নতুন কবি তার এই ভাষার পূজনীয়তাকে, এই সৃষ্টিহীনতার লোভনীয় পরিধিকে অতিক্রম করেন। সে তার চারদিকের স্বয়ং -প্রকাশকে তার জ্ঞান অভিজ্ঞান তার চেতনা অবচেতনা, তার রক্তের সাথে মিলিয়ে নেন। ভাষা তখনই আর গোলাম পায় না, পায় কানেকটেড কাউকে, যে কিনা সেই স্বয়ং -প্রকাশকেই প্রকাশ করেন। তার ইচ্ছার সাথে নিজের হওয়াকে মিলিয়ে নেন। আর এটি তখনই সম্ভব হয় যখন কবিতা-লেখক তার ভাষা অহংকে ছেড়ে তার চারিদেকে ছড়ানো চূড়ান্তকে টের পান। এই পাওয়া হয়ত সহজ নয়। আমাদের চারদিকে হাজার বছর ধরে ভাষার মূর্তি ঘিরে যে এক সিস্টেমের সৃষ্টি হয়েছে তাতে শুধু অনেক অনেক প্রতিধ্বনিই(ইকো) সৃষ্টি হয়েছে। কবিতা-লেখক আসল সত্তার স্বরূপরটি না বোঝেই নকল ইকোর মধ্যে নিজের কবিতা-সাধনকে বিলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্য হলো কবিতা লেখক যতক্ষণ না পর্যন্ত এর বাইরে না বেরুতে পারেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সে কবিতা-লেখকই থাকেন, কবি আর হন না। এই অক্ষমতার কারণেই সব সময় ভুরি ভুরি ইকো-কবি থাকে। তারা একটি ভাষাকে ঘিরেই তার সংগ্রহকে দীর্ঘ করেন। তার এই ঘূর্ণনটা যেন স্বেচ্ছায় আগুনে ঝাঁপ দেয়ার জন্য তৈরি মাছি। দিন শেষে এটি শূন্যই থেকে যায়, কারণ এটি আর কিছু যোগ করে না। এখানে আর কিছুর জন্ম হয় না বা কিছু আসে না। আমার যখন এক পরম ভাষার কাছে নিজেকে সমর্পিত করতে পারবো তখন সেখানে আমাদের দেখার আর বোঝার আত্মাটির মুক্তি ঘটবে। আর তখনই সবকছিুৃ সম্ভব বলে মনে হবে। কারণ সেই জায়গায় সব কিছুই কানেকটেড, সব কিছুই একটি থেকে আর একটিতে হওয়া।

যারা এইভাবে চিন্তা করেন তারা যে নিজের অহংকে হত্যা করে সেই চূড়ান্ত এককের কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, তার নানান প্রকাশে নিজেকে সাক্ষী করেছেন- এটি নিশ্চিত। তাদের এই অবস্থা বুঝতে হলে আামাদের শতভাগ নৈয়ায়িক হলে চলবে না। কারণ নৈয়ায়িকতা শুধুমাত্র একটি হয়ে থাকা অভিজ্ঞতাকে ব্যাখ্যা করে যার কোনো কালভিত্তিক, প্রামাণিক সত্য নাই। তাই সারেণ্ডারের মাধ্যেমে যখন কবিতা-লেখকের আর একটি বিশেষ চোখের সন্ধান মেলে তখন সেই হয়ে থাকার একটি অংশ হয়ে যান। তখন সে স্বয়ং-প্রকাশের নানা রূপ, বণ গন্ধে আকুল হন আর ঠিক তখনই কবিতা আসে। তখন কবিতাকে শুদ্ধ অ্যালগরিথম দিয়ে প্রমাণ করা যায় না। একটি বস্তুর থাকা না থাকার অভিজ্ঞতাকে প্রমাণের মধ্যে সেই বস্তুটির থাকার যৌক্তিকতাকে বোঝানো যায় না। বস্তুর থাকা না থাকার আগে আরো একটি থাকা থাকে, যার মাধ্যমে কবির চারদিকে একটা ক্যালিবেরিক যোগাযোগ সৃষ্টি হয়, সে তখন তৃতীয় একটা চোখ পেয়ে যান। সেই চোখ তার নয় ঠিক। এই চোখ আর এক জায়গায় আগেই সৃষ্টি হয়ে আছে। সেই অর্থে আমি যেমন আমার নই, সে অর্থে কবিতা আমার ভাষার নয়। কবিতা ভাষার বাইরে থাকা সদা উপস্থিত ’স্বয়ং-ভাষার একটা প্রবাহমান অংশ।

১১/০৬/২০১৫

One thought on “আমি যেমন আমার নই, সে অর্থে কবিতা আমার ভাষার কিছু নয়

Leave a Reply