প্লেটো- কবিতার ভিলেন!

Plato


এটি একটি আজব প্যারাডক্স যে প্লেটো নিজে একজন খাস কবি হয়েও তার আদর্শ রাষ্ট্র থেকে কবিতাকে বিদায় করেছেন।
 তার ডায়ালগস তো কাব্যিক মাল মসলায় ভরপুর!  কিন্তু প্লেটোর সত্যের প্রতি প্রায় মৌলবাদি দৃষ্টি আর আদর্শ রাষ্ট্রের উপর তার অন্ধ বিশ্বাসের কারণে কবিতা হয়ে গেছে একটি অকেজো শিল্প। তিনি মূলত বিশ্বাস করেন যে, শিল্প সময় সময় অনুকরণের উপর দাড়িঁয়ে থাকে। তাই এটি আসলে বাস্তবতা,  বস্তুর বস্তুসার থেকে আমাদেরকে দূরে সরিয়ে নেয়। তিনি মনে করতেন মানুষের চিন্তা হল একটি চূড়ান্ত বাস্তবতা। আমরা বস্তু পাই চিন্তার মাধ্যেম। যেমন আমার এই লেখার টেবিলটা কারিগর আগে চিন্তা করেছে, পরে সে কাঠ দিয়ে তৈরি করেছে। এখানে আমরা চূড়ান্ত বাস্তবতা মানে- চিন্তা থেকে দূরে সরে এসে অনুকরণে হাত রেখেছি।  তেমনিভাবে কবিতা, পেইন্টিং, সংগীত এরকম শিল্প চূড়ান্ত বাস্তবতা(চিন্তা) থেকে অনেক দূরে। কারণ কবিতায় যা বলা হয় তা চিন্তা বা রিয়েলিটির তৃতীয় ধারা (প্রথমে চিন্তা, চিন্তা থেকে বস্তু,  বস্তুর প্রতিরূপ কবিতা)। তাই কবিতা অসত্য, একটি ইল্যুশন।

 

প্লেটো কেন কবিতাকে আর দশটা পাঁচটা অর্থময়, রাষ্ট্র সেবাকারী কাজের ভূমিকায় না পেয়ে- দেখেছেন অপচয় হিসাবে? তার অনেকগুলি কথার মধ্যে একটি কথা ছিল কবিরা ইমোশনকে উগড়ে দেয়  যা মানুষের যুক্তিকে অন্ধ করে দেয়। সে মোতাবেক কবিতা মিথ্যা, আজগুবি আচার আচরণের জন্ম দেয়। তাই আর্দশ সমাজে কবিতা থাকলে তা হবে একটি উপদ্রবএই বিষয়ে তিনি বিশেষ করে বাচ্চা ছেলেমেয়েদেরকে কবিতা থেকে দূরে রাখার জন্য অভিভাবকের আহ্বান জানানপ্লেটো অবশ্য ধর্মীয় কবিতার লেখার বিষয়ে কোনো আপত্তি করেন নাইতার আপত্তি শুধু এমন বিষয় নিয়ে কবিতা লেখা যা পাঠকের মনকে বিচার বিশ্লষণে বিভ্রান্ত করবেপ্লেটোর এটির করার কারণ তার দর্শনের উপর অগাধ ভালোবাসা। আর তার দর্শন নিশ্চয়তামূলক, কঠিন যুক্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে যেখানে সব কিছুই সত্য খোঁজে।  সত্যটা কী বস্তু? যা প্রমাণযোগ্য তাই সত্য।কবিতার কথা প্রমাণ করা যায় না, তাই কাব্যকলা সত্য কথা বলে না। কবিতা যেহেতু আবেগেকে গুরত্ব দেয় তাই এখানে যুক্তিকে মূল্য দেওয়া হয় নাএখানে তিনি প্রাচীন গ্রীক মহাকাব্য ওডিসির কবি হোমারকেও মিথ্যা বলা, বানিয়ে কথা বলার জন্য দায়ী করেছেন তিনি হোমারারের বীরদেরকে দেখেছেন যুদ্ধবাজ, অসভ্য, ধূর্ত হিসাবে। তাই তিনি মনে করেন কবিতা সমাজে নিয়ে আসবে মিথ্যা আর পাপ। তিনি আরো বলেছেন কবিরা কামচোরাউদাহরণ কবি হোমার কোনো সমাজের কোনো বৃত্তিমূলক কাজে জড়িত ছিলেন নাযা হোক প্লেটোর পর তার ছাত্র এরিস্টটল কিন্ত তার বিপরীত পথ ধরেই হেঁটেছেন। তিনি অনুকরণ তথা সত্য বস্তুর ধারণাকে আনন্দযোগ্য উপকারী শিল্প বলে মনে করেন। এরিস্টটলের মতে কবিতা আগত কালের ইশারা দিতে পারে, ইতিহাস পারে না। কারণ ইতিহাস যা ঘঠে গেছে শুধু  তাই বলে। তাই কবিতা উচ্চ মার্গের দর্শন। যা হোক প্লেটোর এ রকম আক্রমণাত্মক কথার পর হাজার হাজার বছর কেটে গেছেকবিতা লেখা থেকে কবিদেরকে কেউ বিরত রাখতে পারেনিবরং কবিরা পৃথিবীর বিভিন্ন কালে রাজ দরবার, পরিষদবর্গে স্থান করে নিয়েছেএমন কি আজ এই পুরো কনজ্যুমার শাসিত দুটি দেশ-  ইংল্যাণ্ড আমেরিকাতে কবিরা পোয়েট লোরিয়েট হিসাবে স্বসম্মানে দিনানিপাত করেন। কবিতা আজ মানব সভ্যতার গৌরবান্বিত অবিচ্ছেদ্য অংশ। দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার দর্শনের ভাষার উপর বিরক্ত হয়ে মনে করেছেন– কবিতার ভাষার উপর দর্শনের ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।

তাহলে প্রশ্ন জাগে–কবিতার বিজয় কেন? পৃথিবীর এমন নাম না জানা অনেক শিল্পকলাই তো ধ্বংস হয়ে গেছে বা হারিয়ে গেছে শুধু এই আবেগধন্য, বিশেষ ভাষাধনটি কেন আজো পত পত করে বিজয় নিশান উড়াচ্ছে? আশ্চর্য লাগে মানুষ কেন আজো কবিতা পড়ে? হোক না সে কবি বা কবি-প্রায় কবি বা  কবিতা-পাঠকঅনেক কারণের মধ্য একটি অন্যতম কারণ হয়ত আমাদের ভেতরে এমন একটি সত্তা আছে যে কিনা এক অনির্বচনীয় অনুভব বোধে আক্রান্ত হয়, আলো আঁধারীতে যায়, আর কি যেন কিছু একটা তাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মারে!

এই যে পৃথিবীর ধর্মগ্রন্থগুলি, এগুলি কি অসম্ভব এক মায়াবী ভাষা দিয়ে লেখা নয়? যা সুর আর বাক-বিভূতিতে ভরাএটি প্রমাণ করে যিনি এইসব বাণীবদ্ধ গ্রন্থের স্রষ্টা, তাঁর হৃদয়টাই তো দেখি বড়ই কাব্যময়। সেই একজন বড় কবি! দেখুন কোরান, বাইবেল বা উপনিষদের ভাষা! এখন কথা হলো তাহলে কীভাবে মানবের মাঝে এসে এই কাব্যজ্ঞান দানা বাঁধলধর্মীয় দিকটা আমলে না নিলেও (যেখানে বলা আছে যে মানুষ সৃস্টিকর্তার ইমেজেই সৃস্ট, তাই সেও এক ধরণের সৃষ্টি করে!) তার এই হিউম্যান ব্রেইনেই  হয়ত এক ধরণের সেল আছে যা এমন একটি ভাষা খুঁজে যা ভাবকে প্রতিদিনের ভাষায় ব্যক্ত না করে, করে বিশেষ ভাষায় যে ভাষায় পাঠকের মনে সৌন্দর্যধারণা উপস্থিত হয়, আনন্দের জন্ম লাভ করেতার প্রতিদিনের সমাজ সংসার চালনায় ব্যবহৃত ভাষায় কবিতা নাই, আছে ঐ বিশেষভাবে বলা- সাজানো ভাষায়আদিম মানুষের গুহাতে চিত্র আঁকা হয়ত সেই কবিদের মনের কথাই ছিলসেগুলি তো প্রাথমিক কবিতা লেখার কথাই বলেসেই ডিপ ইমেজ ধারণা হয়ত সেখানেই ছিলএকদম প্রকৃতির ভেতর থেকে রক্ত মাংস শরীরের গন্ধ নিয়ে যেন সেই আদিম চিত্রকথা। ভাষাশূন্য মনে এক আদি কবি কবিতা-চিত্র দিয়ে বাঁধলেন তার প্রথম বোধ আর ভাবের কথকতা।  

১৪/০৪/২০১৩

One thought on “প্লেটো- কবিতার ভিলেন!

  1. ‘কাব্যকলা সত্য কথা বলে না।’ সত্য না বলতে পারলে কাব্যকলা সত্যকারের কাব্য হয়না।

Leave a Reply