‘নো ম্যানস জোন পেরিয়ে’ থেকে কয়েকটি কবিতা

nomans_cover0001

চিঠিভূমি

চিঠি লেখার পাতাভরে পুতুলঘর গরুগাড়ি ধুলিপথ নাম না জানা ছায়াপ্রাচীনের ইচ্ছা

লালনীল রোলটানা জলরাস্তা- ডাকঘরের জানালা ফাঁক করে নিয়ে যায় মেয়েদের স্কুলে

পিটিমাঠে হাত বদল- জ্বলছে শরীর লুকানোর বাসনা! দেখছি কামিজের নিচেও শহীদ হয় ঘরেফেরা রাত্রিতস্কর

বেহালা বাজানো হরিণের ভাষা – রাতভর অবসর জন্মদান,চিকিৎসা ব্যবস্থা এইসব লীলাখেলা শান্ত হয় চিঠিতে

শৈশবের হারিয়ে যাওয়া বলের নামে মাঠে মাঠে শীতনিবাস চাইছি আর লিখছি নিদ্রাকাতর কুয়াশাকবিতা

হলুদ খড়ের দেশে প্রাণগর্ভে বেজে ওঠে আগুনের বেহালা। 

জলকাতরতা এই গাছের বাকল প্যাপিরাসেতাই ভিজে যাচ্ছে সকালের বিছানা শাদাকালো বর্ষায়

আর নুয়ে পড়া বালিহাঁস পুকুরঘাটে গ্রামে ফেরার কথা ভাবছে

শিশুকোলে বাতাসে দাঁড়ানো তুমি – শরীর খুলে পথ দেখাও এই চিঠিভূমিতে

 

আয়না

বহুব্যবহৃত কাচখণ্ডে মুখ দেখছিবিবর্তনবাদীদের কথা

সত্য হয়ে ঝুলে পড়ছে চিড়িয়াখানায় বানরের লেজে

চোখে মুখে হারানো নগর জনপথ আগুনের চিহ্ন 

গলে পড়ছে হিমশৈল লাখো শিকারির ধনুবর্গ

নো-ম্যানস-জোন পেরিয়ে তুমি আমি হাঁটছি

পেছনে শিশুদের লাইন,শূন্য থালার বিউগল

পৃথিবীর এই আশ্চর্য সময়খেলা ইতিহাসের ঈর্ষা

সবকিছু পাহাড়িপথে সাপ হয়ে নামছে

 

অন্ধ হলে না হয় পয়সা ব্যবসা,দাঁড়িয়ে পড়া সূর্যের কাছে

আলোইশারা – সাপের ভাষা চাইতাম

কিন্তু এখন দুচোখ ভরে নেমে পড়েছে বিবর্তনের রক্ত

পথে পথে ভূমিযুদ্ধ দখলকাতরতা

জনমাথায় বাজপাখি পিঞ্জর হয়ে নামছে

সন্ধ্যার আলোয় ধুলোপড়া এই একখণ্ড কাচে

মৃত্যুদণ্ড নিয়ে হেসে ওঠে তোমার আমার ভবিষ্যৎ

 

আলিঙ্গন

নিরপরাধ আলিঙ্গনের কাছে পরিত্রাণ চাইছি

পিঠভরে নেমে এসেছে রাত্রিভাষা নিশাচর ছায়া

পাথরচাপা হৃদপিণ্ডে জলসত্র ঘুলঘুলির কবুতর

ভুলে যাওয়া মনোবদল আজ কতো সহজ

দেহের পালঙ্ক ধরে উঠছে শীতকালীন সংসার

উম নির্ভরতা

 

এই প্রথম খোলামাঠ থেকে উড়ে এলো ছেলেদের ঘুড়ি

আর দৌড়ে গেলো মহিষেরা সবুজের সন্ধানে মাটির প্রদীপে

ভাবি -ফুলে ওঠা বুকের নিচে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড কত ভাষা দেয়

নাম না জানা উপত্যকা আবিষ্কার আর শিরিষের ডাল ধরে

আসছে সকালের পাখি- তার ঠোঁটে সূর্য ধরার প্রথম স্পর্শ

 

রাতভোরে ইস্পাতের খাটে-

সংঘ পরিসীমায় আলিঙ্গনের মায়া বাঁশি হয়ে বাজে

লুটিয়ে পড়া এই সঙ্গীত আজ কোন দেশ অতিক্রম-

সাঁকো পার হওয়া ক্রলিং-অভিযান শেখাবে

যে বুক ধরে ভরসা চাইছি সেও একদিন

সিংহাসনের খেলা,তরবারির নিচে শিশুদের

শুয়ে পড়া দেখছেদেখছে আলিঙ্গনের নাম করে

কেউ শহীদ হয়ে পড়ছে!

 

টাওয়ার

ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে এসেছি

লিফটবোররাক ধরে শূন্যের দখলে! 

সাই সাই আকাশদালানে পারত্রিক রঁদেভু

মাছচলন শেখে সেয়ানা মন

হাতের নিচে জন্মায় কানকো

শিকারীজঙ্গল!

নিচে ছায়াখেলা বিসতৃত গোলামধারা

ছোটগোল ব্যক্তিবসতি পাতাঝরা

ক্রমশ বালিকণা দুধগুঁড়োর শাদা

ফুটছে নিয়ন্ত্রণহীন ক্যালাইডোস্কোপ

একটি বাঘের জামা ঢুকে পড়ছে

একলা বনসুড়ঙ্গে

মনযাদুকর এই ভোরবেলা

 

ডানা প্রসারিত হাওয়াসমুদ্রে

সীমানার বাইরে বাঘের চেয়েও বড় কলিজা!

উড়ছে মাথা আর হাড়ের বরফ

পকেটের ডানপাশে হিম বল্কলে

তুমিহীনতা শূন্যস্থান…

উড়ে উড়ে যাই সাধক

আকাশে বানাই শূন্যের মাজার

 

না-জন্মানো সন্তানকে

 আছিস কি গ্যাসযান মায়ার বোতলে

নাকি ফাইবার গ্লাসে কোনো স্পেস স্টেশনে

ঘুমিয়ে আছিস তুই ইস্পাতের কোলাহলে

নাকি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে

মাতৃমঙ্গলে কাঠের সাম্পানে ইচ্ছামৃত্যু তোর!

 

বনভোজনের বাতাসে

পার্কের ময়দানে তোকে খুব পড়ছে মনে

পুড়ছে ভেড়ার মাংস পুড়ছে মহিষের হাড়

মৃদু যবনিকা দুধের কারুকাজ

অপেক্ষা করছিস কখন আসে বাবা

অথবা কখন আসে শাদা ফারিস্তা

 

ডেকে তুলবো নাকি হয়নি সময়

নাকি সময় ধারণা নেই তোর কোনো

না দেখার ভার

তোর না জন্মানোর সাধ কীভাবে সমাধা হয়

অথবা কীভাবে ইতি টানি এই রক্তটান!

 

স্নোয়ী মাউন্টেইন

তুষার প্রপাত দেখে দেখে শুধু কবিতাই করবো,তোমাকে বলি

শাদা পাহাড়ের নিম্নদেশে সীতাহার, দুলদুল ঘোড়া যাই উড়ে আসুক

তোমাকে বলি

 লাল এপ্রোনের গার্ড আপনার হাতেও বিদেশি সভ্যতার ছলাকলা তাড়াহুড়া

যাই যাই করছে উটপাখি, বিড়ালবাস থেকে নেমে পড়া মেয়েটার শরীরে

সোনালি কবুতরআমি গমদানা খুঁজে খুঁজে হয়রানএই জাতীয় হরেক রকমের

 মিলনমেলাতেস্তন ধরে বাঘ হওয়ার বাসনা থাকে মানুষের!

 

নীল ঘাসে অতিথীরা বসে থাকেএমন সকালবেলা নাস্তার টেবিলে যেন

পৃথিবীর দেহে কোনোদিন মানুষই ওঠেনি! তার আমপড়া জামপড়া স্মৃতি

তরল মদের সাথে তুল্য

 আমাদের সব আলোচনা শেষে হয় দলহারা এই বুনো হরিণের পথজ্ঞান দেখে

তুমি যেই পথে থাকো তাকে তুষার প্রপাতের সাথে মেশানো যায় না

হাত ধরে অতিদূরে গাড়ি করে যাবে কালোমহিষের পালকেরা

 

মাছধরা

 মাছের মৃত্যুবরণ যারা দেখতে আসে তাদের ছদ্মবেশ

তাদের লালসবুজ জামা তাদের মায়াভরা নিশাচর ভঙ্গি

গাছগাছালি বাতাসের দেশপ্রদেশে ঘাতকের আবরণ

সন্ধ্যার আগুনে প্রীতমুখ তাদের মাছের ভবিষ্যৎ হরণ

 

আধার ফেলে জলকেলি ভালোবেসে মাছডাকাডাকি

আশেপাশে বউবাচ্চা ছেলেমেয়েদের দোলনা সি-সো স্লাইডিং

বাড়িঘর শপিংমল সবকিছু একাকার এই মাছ অভিযান

বিছানাবালিশ স্ত্রী আর সন্তানের পাশে দুলে সুইমিংপুল

কতো আবেশ দেশ মহাদেশ তার মনোরম মাছদেখা

আর অপেক্ষা অপেক্ষা শিকারি ঋষিবেশ

 

মাছের মৃত্যুবরণ যারা দেখতে আসে তাদের ছদ্মবেশ

জলপাখিদের সাঁতারহরণ তারা জানে গ্যাসচুল্লীর গেরিলা আক্রমণ

আগুনের ভাঁজে ভাঁজে প্রিয় হাসি প্রিয় চুল আহা মাছের মরণ

এরকম স্টিলের হারপুন ব্যবহারে

মাংস কলিজা গেঁথে গেঁথে সূর্যাস্ত সন্ধ্যায়

লং হলিডের মোড়কে যারা মাছ ধরে ধরতে আসে তাদের দৌড়ঝাপ

তাদের শিশুপ্রীতি,দুধ পরিবেশন আশা ভালোবাসা সাধনা

তাদের পথচারিবেশ মাছ আহারের পাশে সংগমলীলা ছদ্মবেশ

 

দা রুম গেম

রুমে যে দাঁড়িয়ে আছে অপেক্ষা করে দেখছে রক্তের ওঠানামা

দেখছে গলে পড়ছে দেয়ালঘড়ি আগমনকারীর শরীর গলা বক্ষদেশ ঘৌড়দৌড়ের প্রান্তর

তার শিকারভঙ্গি তার শরীরে সাপ সাপের ছোবল চিরকুমার অভিশপ্ত কাল তার অপেক্ষার মরণ

 রুমে যে ঢুকে যাচ্ছে যে দেখছে দরোজায় ঝুলে পড়া চাঁদ ঘোড়ার আগমন

বাতাসে যোনিনেশা নুয়ে পড়া বেড়ালের স্তর মাছকাটা মানুষের ঘর

তার বুকের কাছে জঙ্গলের বাঁশি ছিটকে পড়া হৃদয়ের আওয়াজ তার রূপসীবাঘিনী অনুভব

 রুমে যারা শুয়ে আছে যারা এর ওর স্মৃতিনিষ্ঠ জাতিস্মর

যারা দেখছে আগুনের  লালা শুষে নিচ্ছে এর ওর ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে

উঠছে নামছে যাদের সুখদুখ বেদনা নিয়তির খেলাঘর তাদের আক্রমণ

ভূমিকা শিরশির নির্যাতন তাদের ফিরে পাওয়া জীবন সন্তানের মৃত্যু ভবিষ্যৎ

                                                                                            

শিমার

ছড়িয়ে পড়ছে গোষ্ঠীহিংসা,সিপাহীদের ঘোড়াদুলছে কারো মন লুণ্ঠনের আশায়

মাঠে মাঠে দখলের খেলা,ভাতৃবধের রক্তকলিজা চূর্ণ করার সম্মোহন শক্তি বধির ইস্পাতে

পাশে ছেলেমেয়েদের খেলনা পুতুল- রেহেলে গোলাপ পাতার গন্ধ

আছে যে লোমশূন্য,স্মিত হেসে খঞ্জর চালায় ইমামের গলায়

ক্লান্ত জিহ্বার স্তর কান্ত পিতামহের প্রিয় দৌহিত্র

জোরে চালাও জোরেসহাস্যে অনুমোদন করে নিয়তির নির্দেশ – মনুষ্য জবাই

 অপেক্ষা করে যে দূরে,সর্বকালে সমস্ত সময়ে- তার চোখে ঝুলে সিংহাসনের মায়া

জান বাজি ধরে দৌড়ায় ভাড়াটে কাতেল

পূর্বে বা পশ্চিমে,বাড়ির পাশে ঝোপজঙ্গলে লুকিয়ে থাকে বন্ধুবেশে বিছানার পাশে,বঙ্গদেশে

 

কে যায় মস্তক হাতে,অন্ধকারে ঘোড়া করে দূরেচেনা জানা,কাছে থাকা অ্যাসাসীন,শিমার

 

বল

 চীনা ছেলেমেয়েদের সাথে বল খেলছে আমার ছেলে

ময়দানের খোলা হাওয়ায় সাদাকালো ছেলেমেয়েরাও এগিয়ে আসছে

পাসিং  ড্রিবলিং হেডিং দৌড় ঝাপ বল উড়ছে আকাশে বাতাসে

গোলকিপারের কান ঘেঁষে লাল বল শাদা হাঁস প্রজাপতি প্রশিক্ষণরত

বোমারু বিমান ছুটে যাচ্ছে দৌড়াচ্ছে চীনা ছেলে বাঙ্গাল ছেলে সবুজ ঘাসে

দ্রুতগামী চিতার পায়ে

বাঙ্গাল ছেলে বল মারছে –  বল উড়তে উড়তে আকাশে আকাশে

ভূমণ্ডল ত্রিসীমানা ভেঙ্গে হাটুজল লাঙ্গল জোয়াল

রোগা পাতলা গাভীদল ছাড়িয়ে ধুলিবালি খড়কুটো কাকতাড়ুয়া

ফসলের সমতলে যেখানে মাটি ভেঙ্গে দিচ্ছে মহিষের দল

রোদে কাঁথা ছড়াচ্ছে মায়েদের দল সেখানে গোত্তা মেরে

খড়ের মাচানে সো সো  করে নামছে

উঠোনের মাঝখানটায় দাঁড়ানো এক বাঙ্গাল বাবা

ম্রিয়মাণ বলদের খুরশক্তি পরীক্ষা করে দেখছিল-

হঠাৎ করে আকাশ থেকে নেমে আসা ভালোবাসা লাল বল

লুফে নিলো অনায়াসে-  ঘপ্পাস

 

তুমি আর কাঁপছ না, হে শব

 দলবেঁধে চলে গেছে ক্লান্ত হাটুরে গাভীদের দল

উত্থিত ধর্মনেশা শেষ হয় সীমানা দখলে

মাঠের পাশে ফেলে যাওয়া আমের খোসা,রাংতা

ডুবে আছে মেয়েদের বাহুবন্ধন

বাঁশপাতার ভালোবাসা সকালের গাঙে

তুমি আর কাঁপছ না,হে শব!

 চুল উড়ছে বাতাসে

ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা কেমন স্থিরতা লাগায় বানরের সভ্যতায়

দূরে দেহসঙ্গীতের রাত বিছানাভরে ধরে রাখে কার স্নেহপ্রবণতা!

ভাবি এই অপেক্ষাও একদিন শেষ হবে-

জলদেশে মাঝির বিশ্বাসে

তোমাকে শেষ করে জলবাতাসে লাগাই কচুপাতার লাবণ্যবিষ্ময়!

আর এই শেষ কাপড়ে বানাই রান্নাবান্নার আগুন

দেখি এই মাটিউর্বরতা- মেয়েদের জামা ধরে ঢুকে

পড়ে সন্তানের মায়ায়

 

তুমি আর কাঁপছ না, হে শব!

 

নো ম্যানস জোন পেরিয়ে। আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ। প্রকাশক: শুদ্ধস্বর  বইমেলা ২০১২

 

Leave a Reply