আলতাফ হোসেন
যুদ্ধ
নাদিয়া কি পার বসে আছ
যুদ্ধটা থামবে
গাছের ছায়ার ল্যাপটপ বসে
পা ছড়িয়ে
লিখছে পড়ছে
যুদ্ধ থামবে না
বুদ্ধ ইচ্ছা করেনি
পোলানস্কি?
লেনিন?
সে যদি না করে তবে অক্সফোর্ডে তোমাদের পাড়ার পলিন?
সে-ই কীসে কম!
তার ইচ্ছা হয়েছিল?
যুদ্ধ দাউ দাউ
যুদ্ধ ধিকিধিকি
আবদুর রব
উপসংহার
স্বাভাবিক। একদা
অন্ধকারে দেখতে পেতাম
তরল দূরত্ব,
সূচিমুখ, কাল আলো।
রেডিয়ামের মতো জ্বলে উঠত নক্ষত্র;
– দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায়
সে ক্ষমতা লুপ্ত আজ।
সাহচর্য, প্রেমাবেগে
ঝরনার ধারে মিলিত হয়ে ভাবতাম:
এমনই বয়ে যাব চিরকাল–
জলের অর্কেস্ট্রা,
কিন্তু, বারবার
কালবৈশাখীর সাথে
বদল করতে হল স্থান…
জুয়েল মাজহার
ইতিহাসের বই
এক হাতে ফুল ও মরিচা
অন্য হাতে মৃত কৃকলাস
তোমার দুয়ারে রোজ ছায়া হয়ে, উবু হ’য়ে আসি।
নদীর খাঁড়ির কাছে দলছুট বসে
কয়েকটি শিশু মেঘ, পরিশ্রান্ত-ক্ষীণতনু মেঘ
নিজেদের নাট-বল্টু খোলে আর জোড়া দিয়ে চলে।
হাই তোলে। ঘড়ি দ্যাখে। হোসপাইপে হালকা মরিচা।
—ঘষে ঘষে তুলে ফেলে তারা;
আর একটু দূরে বসে
একটি কিশোরী-মেঘ ভাইটির জামা
ধীরে ধীরে রিফু করে ভাসমান সেলাই মেশিনে।
অপলক চোখ মেলে
শান্ত হয়ে দ্যাখে গোল চাঁদ!
ধীরগামী, স্বচ্ছতোয়া এইসব নদীর কিনারে
কোলে নিয়ে মৃত কৃকলাশ
সপ্তপর্ণ গাছ বেয়ে একা আমি,
দমে দমে উঠবো শিখরে। তবু যদি
রেখে আসা যায় ওকে– চুপে
শূন্যে শয্যা পেতে কোনো হাওয়ার রোদনে।
খাঁড়ির আড়ালে বসে এভাবেই
ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলের মদ তুমি পেয়ে যাবে
ইতিহাস-বইয়ের পাতায়।
কাজল সেন
শীতের সঙ্গে বসবাস
শীত আসবে ভেবে শীতের একটা চাদর
পাতা হয়েছিল দালানের বিছানায়
যতটা লম্বা হলে চাদরটা মানায়
অথবা যতটা চওড়া হলে
লম্বালম্বি টানাটানি ক’রে
যতটা তার সৌজন্যের সীমারেখা
যেমন একটা জলের খেলা খেলতে খেলতে
একসময় সেইসব জলের খেলা
যেমন একদিন একটা পাল্কীর ভেতর বাইরে বসে
কত কত বউয়ের সজ্ঞানে রাতদুপুরে চলে যাওয়া
ভেজা হাতের হাতছানিতে তখনও কেউ হয়তো মেপেছিল
খোলা দরোজার যাবতীয় উত্থান
দীর্ঘ বর্ষাকালের কথা এবার ভাবা যাক
কিছুটা শরৎ ও বাকিটা হেমন্তেরও কথা
আমাদের টুকটুকি চাবির গোছায় বেঁধে নিয়েছিল
তার ঝুমঝুমি আর ভুঁইফোঁড় যৌবন
বোতাম হারানোর দু:খে কেঁদে কেঁদে সারাটা রাত
পাড়াপড়শির ঘুমের ব্যাঘাত হেসেছিল চন্দনা
আর কেই কেই সুঠাম উন্মুক্ত শরীর নিয়ে ভেবেছিল
শীতের সঙ্গে সহবাসে এবার জন্ম দেবে এক নষ্ট ভগবান
ইমরুল হাসান
বইসা আছি, তাই মনে হইলো –
হয় না মন, হেঁটে যাওয়া
রইলো অনেক পথের বাকি
যে গেলো পথে, তার বেঁকে যাওয়াও
দেখি
আমার পথ
একটুখানি পথের মতোন
যাওয়া-ই হয় না
যদি যাইতাম
বলতাম, ‘পথ – পথের মতোন’
নাই আর অন্য কোন ঘুরাফিরা।
খলিল মজিদ
ফলশ্রুতি
যখন অনেক দূরবর্তী কোন জন্ম তার
রৌদ্র ও সন্তাপ নিয়ে মনে পড়ে যাচ্ছিল
যখন প্লাবনের পুরাকীর্তি নিয়ে
স্মরণীয় কোনো নদী ঢুকে পড়ছিলো কাব্যভাবনায়
যখন প্রকৃতি খুলে দিচ্ছিল তার
একান্নবর্তী যৌথতার সবুজ চড়াই
যখন সময় ঝরে পড়ছিল অন্তহীন সময়প্রপাতে
আর জল সঞ্চয় করছিলো কিছু চুম্বন আর জিজ্ঞাসার বিদ্যুত
একটি গলিত সূর্যাস্ত ঢাকা পড়ছিলো ভোরের হুল্লোরে;
যখনো নদীরা কোনো স্ত্রীবাচক নামে খন্ডিত হয়ে যায়নি
সর্বোপরি মানুষের মাঠ ছিলো মৌমাছির প্রজাতন্ত্র ;
যখনো গোত্রের সকল পুরুষ ছিলো
আমাদের বাবা আর সকল যুবতী মা
যখনো চুম্বনই ছিলো মানুষের সবচেয়ে গভীর স্বীকৃতি
যখনো পাঁজরের হাড় ভেঙে মানুষেরা গড়ে নিত প্রাজ্ঞ প্রতিমা
পানির প্রহারে-নাচা রমনীর শিৎকারে লাল হয়ে যেতো রাতের বাতাস
বৃষ্টির পীড়নে চিরে যেতো জুঁইফুলের মধ্যরাত্রি;
যখনো মাঠে মাঠে সবুজ বিপ্লবের মতো ছিলো
ঘাসেদের গল্প বলার তাড়না
মেয়েদের উড়ন্ত যৌবনে ছিলো লতার কল্পনারীতি
আর পাতার উড়ে থাকার সবুজ অভিলাসলেগে থাকতো তাদের
গোল গোল দুধে
হরিণপ্রহরে তারা কুড়িয়ে নিত বাতাসের হাতখরচ;
যখনো কবিতা হয়ে ওঠেনি কোকিলের কানকথা
শব্দেরা কাকের কালো রঙই কেবল গায়ে পরতো না
ধারণ করতো তার কড়া সত্যবাদিতা;
তখন আমার ধমনীর লাল অন্ধকারে বেজে ওঠে পাঠশালার ঘন্টা
আর যৌথতার সফেদ চুক্তির মতো লেখা হয় চিরবর্ষার গীতিকা
এ কোনো উদবোধন নয়
নয় নতুন কোনো পরিচয়।
দোলনচাঁপা চক্রবর্তী
দৃষ্টিবিভ্রম – ১৭
আগুন জ্বালিয়ে সারারাত
গান গাইবার রীতি আছে কোথাও কোথাও
সমস্ত সময়ই যদি অসময় হয়
তবে কখন আসব,
ভেবে উঠতে পারিনি বলে আজও আসা হলনা
মরুভূমিতে জল পাওয়া সহজ
আগুনকে ঘিরে বসলেই কেউ না কেউ জল দেবে
ঘুঙুর বাঁধবে কেউ, পায়ে ছন্দ তুলে নেবে
যতক্ষণ না ঝড়ের আদলে শূন্যতা ধেয়ে আসে
ফেরদৌস নাহার
কবিতার শুরু এবং শেষে
আমার কবিতাগুচ্ছের শুরুতে একটি ছবি দেয়া হয়েছিল
নির্জন স্টেশন, নীলরঙ ট্রেন, অন্ত্বসত্তা নারী আর তার পেছনে পুরুষ
কী বুঝে দিয়েছিলেন সম্পাদক জানি না, কিন্তু আমার পছন্দ হয়েছিল।
কুয়াশা কুয়াশা ওই লালমাটির স্টেশনে বৃক্ষকে কেন্দ্র করে
নীল সাদা রঙে বাঁধানো বেদী ছিল, সবুজ ডালপালায়জড়াজড়ি
ঘন-সঘন পাতাদের মাখামাখি রৌদ্রকে আড়াল করে
দোল খাচ্ছিল প্লাটফর্মের দুইপাশে
স্টেশন মাস্টারের ঘর থেকে দেখা যায় দূরের রাস্তা, রেলক্রসিং
তারপর থেমে পড়া ট্রেন, মানুষের ওঠা-নামা
তারপর ট্রেনের দুলে উঠা, চলে যাওয়া, ঝিম ঝিম নির্জনতা …।
অন্ত্বসত্তা হেঁটে চলে একা, তার পিছে হেঁটে চলে কেউ
সময়টা কখন হতে পারে ঠিক ঠাহর করতে পারি না
ভর-দুপুরও হতে পারে অথবা কোনো সময়ই ছিল না।
নারী হেঁটে যায়, পেটের সন্তান নড়ে ওঠে- তাকায়
তার আশেপাশে বিড়াল ডেকে ওঠে- মিঁয়াও…
স্টেশন বাচ্চাটাকে ঘুমাতে বলে, বাচ্চাটা নারীকে বলে-
মা থামিস না, পা চালা!
কচি রেজা
ওড়া
পাখি, তুমি শেখালে না, মাঞ্জার কাঁচউড়ে যাচ্ছি তবু, হাত হয়ে উড়ে যাচ্ছি, কিশোর
প্লাবনের পর কিশতি পাহাড়ে ঠেকলে জংশনে ফিরে আসি, তুমি দৌড় শেখাও নি, দুর্গা
কিছু কলা-কৌশল, ভেসে থাকতে শিখেছি শুধু
সেই সব দিঘি, সমুদ্রের ঝড়, শেখালে না, সাঁতার
কবে পৌঁছব শানের সিঁড়ি?
সড়সড়ি খেলে ছেঁড়া শৈশবের প্যান্ট, কবে শুনব মায়ের বকা
ভালোবাসতে শেখালে না, ঘৃণা
হিজল জোবায়ের
অপরিসর লবঙ্গের বনে …
আলেয়া অদূরবর্তী আমাদের দেহ নিরীক্ষার দিন – গারদভাঙ্গা বেত্রাহত ছায়া এ কথা রটিয়ে দাও বালুহীন সমুদ্রের তীরে – তবু হে ত্রাতা, উটের মালিক, মলাধার ঘিরে রাখা মেথর লোকের দল পৃথিবীর সমস্ত পশুর অধীশ্বর – তোতা পাখির ডিমে তারা রক্ত মাখিয়ে নেয় –বৃত্তকে বিন্দু ছায়া দিয়ে রাখে এতই অধিক জল – লবঙ্গফুলের বনে নিষিদ্ধ কুঠার – সেইখানে পিলরির কাঠে লেপটে আছে কাঁচা রক্তের দাগ – আর সরীসৃপ তলপেট ঘষেঘষে এইখানে উঠে আস তুমি – মৌচাকে মধু পূর্ণ হল আজ অপরিসর লবঙ্গের বনে …
তানভীর মাহমুদ
নেকড়ে
স্তম্ভ-আকাশ বাহু ছড়ানোর মাংস-আঁধারে
নেকড়ে চোখ- প্রতিভা কেন্দ্রী, আবর্তের প্রাকার-ধ্বংসী. বিক্ষেপের শেকড়-গন্ধী।
মাতৃ-কাম–বর্শা বেঁধা
নখ-ভাষায় সম্রাটের শিরোপা মুখি
অরণ্যের শ্রীযান লুকানো বাঁকা পথের ধাবন মাতাল ঊল্কা-নীড়-
ঝর্ণাঘাতের মর্ম থেকে সংকল্পের বিবশ ডাকে পতনের গহীনে
মশালস্মৃতির উৎকেন্দ্রী তীব্র দহন
তারা হয়ে জাগা রাত্রির দিকে
দ্যুতির লীলায় রোম-নেকড়ের ত্রাস জন্ম
সৈয়দ আফসার
লালসা
অবসর সে-ও কি হবে কোমল কাতরধ্বনি?
পূর্ণকরা আর্শীবিষে প্রিয়তমার মন-মতিফুল
হৃদয়থলি স্নেহাতিবশে এতটা পৃথক যে
শঙ্কা নিরলে বিবশ-করা
আমার নিঃসঙ্গ দেহমিনার টেনে পক্ষপাত!
দুর্বলতা শূন্য-বিশ্রামাগার…
প্রেরণা আমাকে তাড়া দিচ্ছে ধূম্রজালে বোনা
জলশামুকসহ বর্ষাযাপনের দিনকাল
আমাকে তাড়া করছে ঝরাপাতা; কৃষ্ণচূড়া
আমার অবসর পূর্ণমাঘমাস, আর
যা পেলাম লুকিয়ে রাখছি সংশয়াকুল নিঃশ্বাস
সম্ভাব্যতালিকায় চোখ-বুক-চুল পাশাপাশি বসা
ইচ্ছে জলে ভিজে আমার ভাগে পোড়া লালসা
রওশন আরা মুক্তা
তলোয়ার মাছের পিতা
মোটা মোটা গ্লাসের চশমার নিচের নাকগুলো ফুলে গিয়েছিল তোমার প্রতি, তোমার অক্ষর তারা যদিও তোমার বেদিতে, তোমার ছায়াতে খোদাই করেছে। অথচ তুমিই চোর! সেই অক্ষর দিয়ে তারা শুধু নিজের নামখানি লেখাতে চেয়েছিল শ্বেত পাথরের এপিটাফে। আর চাঁদ জন্মগতভাবেই যাদের, তারা ভাবল, তুমি অহেতুক অনৈতিকভাবে অসহ্য করে ফেলছ তাদের— সাপ আর বেজীর বিয়ের বাদ্য বাজিয়ে। কারন ওরা ভাবে, বিয়ে তো না, বস্তি হবে, খেউর হবে— এর চেয়ে পরকীয়া ভাল। ‘অ’ উপসর্গে জুড়ে দিলো তোমার নামের আগে, অর্ধ-অমর খেতাব পেলে, আমার কী দোষ? ক্রন্দনরত আমাকে কোলে না তুলে, কেন তুমি জানালায় বসে ছিলে? জাহাজের কয়লা পোড়াতে যে সব শ্রমিক তামাটে, সেই সব দার্শনিক তোমাকে কবি ভাবল, জাহাজের পেটে, ঠিক মাঝখানে থাকে কিছু পানি-ভীতু নাবিক— সেই সব কবি তোমাকে দার্শনিক ভাবল। তোমাকে তারা ঘরেরও রাখলো না, ঘাটেরও রাখলো না— তারা জানে নাই, তুমি ধোপাবাড়ির কেউ নও। তুমি জানো নাই তুমি সেই জাহাজের কেউ নও। — এই জাহাজ আমি ডুবিয়ে দেব!
সৌভিকদা‘
অন্ততঃ এইটুকু থাক…
সরু হয়ে যাচ্ছে দীর্ঘ নদী, সম্ভাবনা বেঁচে থাক –
দূরে সরে যাচ্ছে চাঁদ, তবু সম্ভাবনা বেঁচে থাক –
তীক্ষ্ণতা হারাবে প্রিয়তমস্মৃতি,
মরচে পড়া তলোয়ার, ধারালো আঘাত
তাও বেঁচে থাক বুকে সম্ভাবনার এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস :
বেঁচে থাক, অন্ততঃ এইটুকু থাক…
বোমারু বিমানের মত রমনীরা একে একে
বেরিয়ে পড়ছে জেটি থেকে, প্রথাগত বোধ;
ফিরে আসবে একদিন, সেই সম্ভাবনা থাক –
তুর্কি তরুনীরা সীসা লাউঞ্জ ছেড়ে
আবার ধরবে একদিন প্রেমিকের হাত নদীর কিনারে,
বুকের বুলেটগুলো পারস্য গোলাপের গন্ধ ছড়াবে
সেইসম্ভাবনা বেঁচে থাক –
আর সব ঝরে যাক, পাখির পালকের মত হরিৎ হৃদয়
বাস্তু-ভিটা, মানবিকসম্পর্ক, দেশলাইকাঠি :
শুধু একটুখানি সম্ভাবনা থাক –
ফিরে আসার…
আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ
আফ্রিকি মেয়ে
গ্রাফাইটলতা থেকে ঠিকরে পড়ছে উজ্জ্বল
হাতে বাঁধা এই নীল বোতাম– ঘরছাড়াদের
কুলে দেয় রুস্তম।
চুলে চুলে হেটে যাওয়া জেব্রা– এইকালো চিতার সূর্য
জু করে আনছে শহরের রাস্তা।
ছড়ানো বাহু ধরে চিকন নদীর ঘাম
দীর্ঘ বাচ্চাদানী দেখে
ফুলে উঠছে নেতিয়ে পড়া পিস্তল
তার সাথে লাল হচ্ছে এই ঘুমিয়ে থাকা ক্লাসরুম।
ছেলেমেয়েদের তৃষ্ণা গড়ালো কোন ঝুঁকে পড়া বনে
সোমবারের বেদনা গললো কালোঘাড়া ক্ষুরধ্বনিতে!
চোখমুখ কলতান– বুকেভরা এইভারি সবুজের স্তন খাবে
স্বাস্থ্যহীন বাচ্চারা।
মাঠ থেকে ডিনারে লাগবে মা বানানো রুটি
ক্লাসজুড়ে আফ্রিকি মেয়ে কালো চোখের সিংহী।
প্রথম প্রকাশ: দূরের বাড়ি ডট কম, ৩১ আগস্ট ২০১২
