বন্ধুর মৃত স্ত্রী

woman2

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

স্ত্রী মারা গেলে সে কি আর স্ত্রী থাকে বা তার সাথে কিরকম সম্পর্ক হয় যখন সে শুধু মাটির সম্পত্তিবেঁচে থাকা সময়ে যে কাছাকাছি ডাকাডাকি আলোঅন্ধকারে দেখাদেখি  দিনেরাতে হয় এখন এমন তো কিছু আর হয় নামানে শরীরী থাকা ছাড়া সম্পর্কটা  কেমন হয় কোনো যোগাযোগ কি ঘটে যা উপস্থিতির সাথে সম্পর্কযুক্তঅথবা বন্ধুর মৃত স্ত্রীকে কী নামে ডাকা যায় যাকে আমি বারান্দায় বা স্কুলের মাঠে কোনোদিন দেখিনি বা যার স্বামী যে আমার বন্ধু আবার দীর্ঘদিন একা একা থেকে হঠাৎ একদিন মনে করে মানুষের আর একটি স্ত্রী লাগেস্ত্রীর মৃত্যুর পর সে কীভাবে আর একটি মেয়েকে স্ত্রী নামে নিতে চায় যেখানে উপস্থিতি স্ত্রী হওয়ার একটা প্রধান শর্ততখন ঐ যে মৃত স্ত্রী মানে গতকালও যে মোমবাতির নিচে চিরসঙ্গী ছিল তার ফেলে যাওয়া খোলস কী করে? সেকি আবার নতুন স্ত্রীর হাড় মাংস রক্ত চুল আঙুল মিহি স্কিনের উপর জায়গা নেয়চলতে চলতে এসব ভাবতে ভাবতে একদিন মতি ভাইযে আমার বন্ধু, তার বাসায় চলে আসিআবার বন্ধুর মৃত স্ত্রী এত আর কাছাকাছি হয়না যখন দেখি বন্ধু আবার একটা লাল রঙের টি সার্ট পড়ে দরোজা খুলে দাঁড়ায়পরে যে আবার এক সময় খোলা ছাদে এসে সিগারেট ধরায় যখন একটু একটু রাত, বৃষ্টি পড়ে,দোলনাটা একটু ভিজে যায়তাতে বন্ধু তেমন কিছু করে না শুধু রান্নাঘরের চুলোর আগুনটা বন্ধ করে দিয়ে আমাদের সাথে বসে থাকে

দরোজার সামনেই নাকেমুখে সর্বগন্ধ হানা দেয়সুতরাং বুঝে ফেলি বন্ধু প্রথমে বেশ মনোযোগ দিয়ে পাকশাক করেছেঘরে ঢুকতেই সালাম দিয়ে প্রথমে একটা নতুন পরিচিতির পালা চলে, হাত ধরা, হাসি দেয়া বাড়িটার গল্প এসব চলেআমরা রান্নার কথা বলি তখন আবার হাসতে হাসতে মতি ভাই খাবারের কথা বলেআমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে একসময় টেবিলে খাবার দেয়টেবিলে পরিবেশনটা এমন যে গ্লাস, প্লেট আর লবণদানিটা কী সুন্দর একটা ছবি! এমনভাবে সাজানো যে আরো ক্ষুধা লাগে বেশি মানে পরিবেশন যেমন সরাসরি আহ্বান করেআমি বলি মতি ভাই এগুলি আসলে কে করছে? এমন সাংঘাতিক প্রীতিমূলক আপনি তো!এতে তিনি কোনো কথা না বলে টেবিলটার দিকে ইশারা করেতো প্রথমে দেখি অনেক কিছু রান্না করা ছোট মাছের সাথে পুঁইশাক, ডাল, মুরগীর মাংসের ঝোল বেশ কায়দা করে ছন্দপতন নাইপ্রশংসা করতে করতে সময় যায় যদিও আমরা লজ্জা পাই তলে তলেতো খাবার চলে কারণ সবুজের প্রতি সাধারণ একটা চাপ থাকে তাই হঠাৎ একটা কাঁচা মরিচ খাওয়ার ইচ্ছা মনে জাগেবলি মতি ভাই একটা কাঁচা মরিচ দেনমতি ভাই টেবিলের পাশে স্লাইড ডোরটার দিকে চোখ মারেস্লাইড ডোরটা এত বড় একটা গ্লাস বাহ কোনোদিন দেখিনি! তারপর দেখি পাশে খোলা ছোট বারান্দা একটাসাথে সাথে নিচের দিকে দু একটা ফুলের টবপ্রথমে ফুল বলে মনেহয় কিন্তু পাতাগুলো দেখে বিশ্বাস হয় একটা কাঁচা মরিচের গাছএখনো বেঁচে আছে, শ্বাস নিচ্ছে, রোদেমেঘে একটু একটু করেতখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যা তাইআলোআঁধারিতে গাছের পাতাগুলোকে ঠিক আর সবুজ মনে হয় নাপাতায় পাতায় আবার পাখির বিষ্ঠা শুকিয়ে যাওয়া শাদা চুনমতি ভাই হাসে আকাশের দিকে তাকায় আবার বলে শিরিন মারা যাওয়ার পর আর হাত দেই নাই তেমনএইখানে আসতেও ভুইলা গেছিমাঝে মধ্যে সিগারেটে টান দিতে বার হই আর কি ঐ যে দেখতেছেন না একটা ডাব গাছঐটা আমাদের প্রিয় একটা গাছ ছিলআমি আর শিরিন এখানে বইসা বইসা ডাব গুনতাম,এক দুই তিন মজা লাগতএসব বলতে বলতে মতি ভাই আমার হাত ধরেলক্ষ করি বেশ বাতাস লাগে এখানে কারণ কোনো দেয়াল রাখা হয়নি কোনদিকেসবদিকেই খোলাআর একটা লুকনো দড়ি এমনভাবে যে কেউ দেখবে না মানে খুব যত্ন করে দড়িটা লাগানো হয়েছেশাড়ি কাপড়ের ছায়া শরীরের ভার দড়ির উপর পড়ছে

বাইরে থেকে আবার আমরা ভেতরে আসিতো আবার আমাদের খাওয়া চলে গন্ধ নাকে লাগেমাছগুলো এমন ভাবে ভাজা যে একটা হাত এসে লাল ঝোলের মধ্যে দোল মারেপোড়া পেঁয়াজেরপাতা পানিতে কার মুখ হয়, স্লাইড ডোর দিয়ে আবার কাঁচা মরিচের সবুজ আসেএরমধ্যে একটা টিলিফোন আসলে মতি ভাই ওঠে যায়তখন টেবিলের উপরে আমি আর রানিযে আমার বউ অপেক্ষা করি আর ভাত খাইআমি টেবিলটার গায়ে হাত দিই কারণ এখানে এইরকম টেবিল খুব একটা দেখা যায় নাখুব ভারি এই চার তলায় উঠাতে গেলে কতজন লোক লাগবে হায় হায় ছোট কিন্তু মোস্ট সফিসটিকেটেডমতি ভাই প্রবেশ করে বলেখান খান, জানি না কেমন লাগতাছে, সরি আমার একটা ফোন আসছিলসবার মাথা খারাপ হইয়া গেছেখালি প্রশ্ন আর প্রশ্নতাতে আমরা বলি বেশ ভালো হইছে রান্নাআহা পুঁইশাকের তরকারি কতদিন ধরে খাই না ভাইএ কথা শুনে মতি ভাই আমাদের সাথে খেতে বসেএত সুন্দর টেবিলটার দিকে তাকিয়ে আমি কিন্তু টেবিলটার কথাভুলে যাই না বলি মতি ভাই এই টেবিলটার কাহিনী বলেনএতে মতি ভাইয়ের মুখেএকটা পরিবর্তন দেখতে পাইমানে মুখের রঙ কেমন যেন লালচে হয়ে গেল যেমন সুন্দর মানুষের প্রায়ই হয়বলে শিরিন একদিন বিশেষ অর্ডার দিয়া টেবিলটা জাপান থাইকা আনছিল জাপান থেকে একটি লোক আইসা লাগাইয়া দিয়া গেছে বুঝলেনএতে আমি অবাক হই মানুষের এত শখ!বেশ বেশ তো আমার মাত্র কাঠের একটা টেবিল তাও আবার সেকেণ্ডহেন্ড দোকান থেকে কেনাআস্তে আস্তে খাওয়া শেষ করে উঠে পড়িহাত ধোয়ার জন্য বাথরুমের দিকে যাই কিন্তু ঢুকেই আহা বন্ধুর মৃত স্ত্রীর বাথরুমদেখি বেশ বড় আর নীট এণ্ড ক্লিন বাথরুমটাআমার এরকম একটা থাকলেমাঝে মাঝে ঘুমোতে পারতামকিরকম একটা গন্ধও আছে চেনা জানা সাবানের সাথে পুরনো শাড়ি কাপড়ের গন্ধপুরানা পল্টনের আমার বোনের বাসায় এরকম একটা গন্ধপাই মাঝে মাঝেএকসময় হাত যখন বাড়ালাম টেপের পানির দিকে তখন শীতকাল আর নয়সজোরে গ্রীষ্মকাল এসে পড়েছে বিছানার উপরেটেপ থেকে যে ঠাণ্ডা পানিটা গড়িয়েপড়ল তাতেও একটা গন্ধ পেলাম কেমন কাঁচা বাঁশের ভেতরের সুঘ্রাণ বা এই যেএকটু আগে ভাতের সাথে কাঁচামরিচ খেতে চেয়েছি তার গন্ধপানি মুখে ঢেলে ঢেলেআমাকে দেখি সামনের আয়নায় আমার ছবিআমিই তোপানিতে হাত ধুই পানি কেন এত হিম প্রতিবেশী যা আবার বোনের মতো লাগে ডাক দেয় জাগিয়ে দেয়হঠাৎ আয়নার দিকে আবার চোখ যায় শব্দ পেয়ে তাকাইনা কেউনা শুধু আমিই তোবের হওয়ার জন্য তৈরী হই কিন্তু একটা সবুজ মতো গাছের ছায়া চোখের মধ্যে পড়েঠিক দাঁড়িয়ে ছিল বাথটাবের কাছ ঘেঁষেনিচে একটা নীল চুড়ি- একদম চোখ বের করে তাকিয়ে

এদিকে রানি মানে আমার বউ মতি ভাইয়ের সাথে আলাপ করছেযে মেয়েটার কথা ওরা বলছে ও আবার আমার বউয়ের কাছের বান্ধবীকেয়া নামের এই মেয়েটি মালিবাগে একটা ছোটবাচ্চা নিয়ে বাপের বাড়িতে থাকে আর একটি এন জিওতে কাস্টমার সার্ভিসের চাকরি করেআমি একটু একটু চিনি একবার বিয়ে হয়েছিলকিন্তু স্বামী দিনেরাতে অফিসেরএকটা মেয়ের সাথে বিয়ের মতো একটা সম্পর্ক করে বলে কেয়ার সাথে থাকা হয়নিকিন্তু মতি ভাই মিয়েটার ছবি আগেই দেখে নেয় যা সে ই-মেইল থেকে পায়বলে আমার পছন্দ হইছে মাশাল্লাহ ভদ্রমহিলা মনে হইলতবে জানি না উনার আমাকে কেমন লাগবেঅনেক কথা বলার আছে বুঝলেনএকজায়গায় দুজনে বইসা একটু আলাপ কইরা নিতে হইবরানি কেয়ার আর একটা ছবি বের করে বলে মতি ভাই দেখেন দেখেন আর একটা সুন্দর ছবি আছেমতি ভাই এক চোখে মনোযোগ দিয়ে ছবিটা দেখেকেয়া একদম নায়িকার মতো দেখতে চোখ ফেরানো যায় নাশরীরে ইচ্ছে মতো হালকা নীল একটা শাড়ি পড়াস্টুডিওতে ফ্যান ছেড়ে বাতাসে চুল উড়ছে যেন মেঘ ধরছে এমনরানি বলে দেখেন দেখেন একদম নাটকের অপি করিমআমি টেলিভিশনের দিকে চোখ দিয়ে রেখেছি যদিও টিভি অফশাদা ফুল তোলা একটা পর্দা যা আবার অনেক ময়লাপাশে একটা ছোট টুল উপরে ফুলদানিমরাগাছ পাতা ঝরছেউপরে একটা গ্লাস অনেকটা পুকুরের মতোসাঁতার কাটছে কেউএখন শীতকাল তো আর পাশে এত সুন্দর গোসলখানা থাকতে যেখানে এইমাত্র নীল চুড়িটা দেখলাম হা করে তাকিয়েপুকুরে আবার চোখ যায় তাকিয়ে আছে কেউ আমদেরকে দেখছেকিন্তু না আমারই মুখ ওখানেআমার পিপাসা লাগে মনে করি আবার পানি কেন এত প্রতিবেশী!

তো কিছু দিনের মধ্যে সব কিছুপাকাপাকি হয়ে গেলে মতি ভাই রানির বান্ধবী কেয়ার সাথে কথামত একদিন একান্ত গোপনে দেখা করে ফেলেকেয়া দূর থেকে আমার বউয়ের সাথে টেলিফোনে আলাপ করেমতি ভাইয়ের গল্পবলে আমরা প্রথমে কথা বলি পরে মতি আমার হাত ধরে আমাকে চায়,  বলে আমি তোমারে সুখী করবতারপর আমরা বড় হোটেলে ভাত খাই, পার্কে চানাচুর খাইমতি ভাই আমার আঙুল টিপে দেয় বলে কেয়া তুমি বেশ ভাল মেয়েআমার মন ধরছেআমি বুঝতে পারি ওদের মধ্যে একটা প্রেমের মতো সম্পর্ক হয়েছে যা বেশ জমে উঠেছেওপাশ থেকে রানির হাসির শব্দ শোনা যায় কেয়ার সাথে যা ঘটেকিন্তু আমার হঠাৎ মতি ভাইয়ের বাসাটার কথা মনে আসেআর সেই টেবিলটা জাপান থেকে আনাসাথে সাথে শাদা ভারি গ্লাস সামনে স্লাইড ডোর খুললেই কাঁচা মরিচের গাছটা আর বাথরুমটা তার শাড়ি কাপড়ের গুমোট গন্ধ তো আছেইএকটা ঝিম মারা পুকুর-আয়না যেখানে আমার ছবিটাও ভেসে উঠেছেসাথে সাথে কেয়ার ঘোমটা পড়া ছবিটাও নীল রঙের শাড়ি পড়া কেয়া সেই জাপানি ডাইনিং টেবিলে এসে বসেছেএকদিন রানির বান্ধবীর সাথে মানে কেয়ার সাথে মতি ভাইয়ের সত্যি সত্যি বিয়ে হয়তখন মৃতস্ত্রী আর স্ত্রী হয় না বা মৃত স্ত্রী মরার পরে কী হয়?কী নামে তাকে ডাকা যায়?কুড়ি বছরের ঘর সংসার যার তাকে কি ভূমিকা দেয়া যায় যে শখ করে জাপান থেকে ভারি ডাইনিং টেবিল সংগ্রহ করেছিল তাকে কোথায় রাখা যায়যেদিন কেয়া মতি ভাইয়ের বউ বা স্ত্রী হিসাবে ঘরে আসবে বলে ঠিক হয় আমি তখন সেই কাঁচা মরিচের গাছ বাথরুম টিভি শাদা বিছানাটার ভবিষৎ বিষয়ে কোনো কূল কিনারা পাই নাচিন্তা করি যদি যাই আবার কি সেই ভারি টেবিলটা দেখতে পাবো যা বন্ধুর মৃত স্ত্রী সবসময়ই জাপান ধেকে কেনে আনেআর সেই সবুজ রঙের তরকারি কি কেয়া রাঁধতে পারবে সেদিন যেভাবে রান্না করা হয়েছিল বা মতি ভাই বা কেউ রান্না করেছিলআর ঠিক বাথরুমের যে আয়না টিভির পাশে যে আয়না যা আবার ছোট পুকুর প্রতি সন্ধ্যায় যেখানে গোসল করে সে কী নীল চুড়িটার জন্য আবার বাথরুমটায় ফিরে আসবে? সেখানে আমি নিজেকেও দেখছিলাম কিনা সঠিকভাবে বলতে পারছি না আর ঐ কাঠের শক্ত ভারি টেবিলটা তার উপরও কারো তো একটা চোখ থাকে

১৭/০১/২০১০

Leave a Reply