আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহর সাথে হোসেন মোফাজ্জলের কথাবার্তা

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ : অনেকদিন হইলো আমাদের দেখা হয় না। একবার আমরা সিদ্ধান্ত  নিছিলাম যে আমরা এক সাথে বসবো, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করবো। সময় আর সুযোগ হয়ে উঠে না তাই পারি না। ঈদ উপলক্ষ্যে আজ একটু এক সাথে হইতে পারছি। তাই আশা করি কিছু কথাবার্তা বলা যাবে। কেমন  আছেন?  

হোসেন মোফাজ্জল : ভালো আছি। ঠিক বলছেন- কয়েকবার এটেম্পট নিয়া পারি নাই। আপনার একটা সাক্ষাৎকার নেয়ার ইচ্ছা ছিল। কবিতা, সাহিত্য তারপর এখানকার জীবন যাপন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলার ইচ্ছা ছিল। একই শহরে থাকি কিন্তু খুব একটা দেখা হয় না, জীবনটা কেমন জানি ফেসবুকময় হয়ে গেছে। মানে ফেসবুক ছাড়া দেখা হয় না, পড়া হয় না।  যা হোক আজ ভালো একটা সময় পাইলাম। আসেন আমরা খাইতে খাইতে কথা বলি।  

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমরা ক্যাজুয়াল আলোচনা করতে পারি, কোনো চাপ নাই।  মনে যা আসবে তাই বলবো। আজ টুলু খুব মজার রান্না করছে মনে হয়। আমাদের সবারই ক্ষুধা লাগছে, আসেন কিছু খাই আর কথা বলি। আমরা কবিতা দিয়ে শুরু করি মানে বাংলা কবিতা। আমার মনে হইতেছে বাংলা কবিতা একটা খাদে আটকা মানে গর্তে পইড়া গেছে। পশ্চিম বঙ্গ, আমাদের বাংলাদেশ যাই বলেন না কেন, আপনি খেয়াল কইরা দেখবেন কবিতা আর আগাইতেছে না। কেমন জানি একই  বলয়ে, একই লাইনে শুধু ঘুরতেছে। কেউ  ফর্ম নিয়ে কাজ করতেছে, কেউ কন্টেন্ট নিয়া কাজ করতেছে। কিন্তু যা করতেছে সেইটা একই জিনিস। কবিতার একটা চেইন থাকে- এইটা সত্য। কিন্তু এর মধ্যেই আপনার একটা নবিলিটি থাকতে হবে। কবিতার যে ব্লাড লাগে, মানে কবিতা যে রক্ত মাংসের একটা ক্রিয়েশন- এইটা ব্যাপারটার অভাব বোধ হইতেছে। কবিতা আছে কিন্তু সবই মরা কবিতা। 

হোসেন মোফাজ্জল: আমার তো তাই মনে হয় শুধু বাংলা কবিতা না। আপনি  খেয়াল কইরা দেখবেন পুরা বিশ্বেই তাই হইতেছে। আর্ট কালচারে, বিশেষ করে কবিতার একটা মন্দা কাল চলতেছে। এইটার কারণ কী বইলা মনে করেন?

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ:  অনেকগুলা কারণ হইতে পারে। দেখেন পুরা বিশ্ব সোস্যাল মিডিয়া দিয়া আক্রান্ত। মানুষ এখন কষ্ট কইরা, আমরা যেটা ‘কবিতা’ বলি সেটা আর পড়ে না। আমার কবিতা আর এক গৃহ বধুর কবিতাও এক সাথে পোস্ট হয়। আমি তাকে ছোট করছি না। মানে স্বাধীনতা আর কি। তার মানে সোস্যাল মিডিয়াতে যা পাওয়া যায় যেমন গ্রাফিক্স, ভিডিও, কৌতুক, ভ্রমণ, সামজিক গেট টুগেদার সংবাদ এইসব সিলি জিনিস আর্ট কালচারের বিশেষ করে কবিতার স্থান দখল কইরা ফালাইছে। আপনি চারদিকে চোখ মেইলা তাকান। উন্নত বিশ্বে জুড়ে খালি ফান টাইম, পার্টি টাইম আর অন্যদিকে পৃথিবীর অন্যখানে চলছে  রক্তারক্তি- প্যালেস্টাইন, সিরিয়া, ইরাক, কাশ্মীরের দিকে তাকান।  এইখানে কবিতা কেমনে হবে? এতে মানুষের রিডিং টেস্ট ও ল্যাঙ্গুয়েজ ভ্যাল্যুজ কমে গেছে। কবিতা হইল একটা কম্প্যক্ট ক্রিয়েশন, এখানে সব কিছু বলা হয় না, বেশি ভাগই লুকায়া থাকে। তো আপনাকে একটা প্রিকালেক্টেড কনশাসনেস এর ভেতর দিয়া আসতে হবে।   

হোসেন মোফাজ্জল: সস্তা আনন্দে গা ভাসার সময় আগেও তো ছিল, তখনও নিউজপেপার, পপ কালচার ছিল। তবুও তো ভালো কবিতা, সাহিত্য তৈরী হইছে। মানুষ সাহিত্য পড়ছে, মুখস্ত করছে। আমার মনে হয় মানুষের আগের মতো আর সময় নাই এইসব গুরু গম্ভীর লেখা পড়তে।

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: হ আগেও ছিল তবে এত ব্যাপক ছিলো না। মানুষের হাতের মুঠোয় ছিলো না। মিডিয়া আপনার কাছে এখন চাইল্ডস প্লে। আপনি যখন চাইবেন তখনই পাইবেন। নতুন নতুন গেজেট আর  উন্মত্ত আত্মপ্রকাশের সময়ে মানুষের মন বিক্ষিপ্ত হয়া গেছে। মানুষের মন এখন সদা ঘূর্ণিরত। তার কোনো সেন্টার নাই, লক্ষ্য নাই। সে জানে না সে কি চায়, সে আসলে কী? কীবা তার পরিচয়। এসব মানুষের মনে একটা বিরাট হোল বানাইয়া তুলছে। তাই সে ক্ষণিকের সুখের জন্য সোস্যাল মিডিয়া বা সস্তা আলাপ আলোচনায় দিন রাত কাটায়। কবিতা পড়ার তার আর সময় নাই। তাই কবিতার অনেকটা মন্দা কাল চলতেছে।  আপনি ফর্ম, কন্টেন্ট নিয়ে ভালো একটা লেখা লিখবেন, বাট এইটারে পড়বে কে? হাতে গোনা কিছু পাঠক তো সব সময়ই থাকে। এখন কবিরা ছাড়া কবিতা আর কেউ পড়ে না।  

হোসেন মোফাজ্জল: বুঝছি আপনি মানুষের টেস্টের ওপর গুরুত্ব দিতাছেন। ফ্যান টাইম, পার্টি টাইম এবং সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার মানুষের পঠন ক্ষমতা কে নষ্ট কইরা দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু এর একটা ভালো দিকও আছে। লেখক এখন বেশি স্বাধীন, তাকে আর সেই ঝানু সম্পাদকের কাছে যাইতে হয় না, সে যখন ইচ্ছা তখনি কবিতা প্রকাশ করতে পারে। আচ্ছা এখন পয়েন্টে আসি। বাংলা কবিতার কি হইল? আপনি লিখতেছেন, অন্যরাও লিখতেছে, অনেকেই ভালো লিখতেছে। কোয়ান্টিটি দিয়া কি হবে কোয়ালিটি দরকার, তাই না?

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আপনি লিখতেছেন, ওরা লিখতেছ। ঠিকই বলছেন।  কিন্তু কথা হইল কী লিখতেছে? আপনি লেখার দিকে তাকান- ফর্ম, কন্টেন্ট ও স্টাইলের দিকে তাকান, সবই একটা চেনা জানা আবহেই লিখতেছে, একটা খাদে আটক পইড়া গেছে আর কি।  আপনি খেয়াল কইরা দেখবেন বাংলাদেশের কবিতা  এবং পশ্চিম বঙ্গের কবিতা অধিকাংশই, কখনো সর্ব ভারতীয় আর্ট কালচারে, কখনো পলাতক রুগ্ন  আধুনিকতাবাদিতে আটক পইড়া গেছ। তাই তার ল্যাঙ্গুয়েজটাও তাই। সেই মধ্য যুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণব পদাবলি থেকে শুরু করে একটা  হিন্দু পুরানের আবহে কবিতাকে দেখার চোখ, বোঝার মন ও পরিশেষে লেখার হাত তৈরি করা হইছে। এমন একটা কনশাসনেস যাকে বাঙলা বা বাঙালি জাতীয়তা এবং সহিহ কবিতা-তরিকা বইলা চালানোর চেষ্টা চলছে। এর বাইরে আপনার যাওয়া মোটামুটি নিষেধ আছে। মানে একটা কালচারাল হেজেমনি, কালচারাল পলিটিকাল পাওয়ার তৈরি করা হইছে যাকে আপনি বাংলা কবিতা মাপার জন্য লিটমাস টেস্ট ধইরা নেবেন। এইটা একটা সাংস্কতিক জুলুম বা অবিচার। আপনি দেখবেন অন্যান্য জাতি যারা এই ভারতবর্ষ এবং বাংলাদেশে আসছে, যারা প্রায় হাজার বছর ধইরা এদেশে বাস করতেছে তাদেরও কিন্তু একটা জীবনযাত্রা কেন্দ্রিক, ভাষাগত প্রভাব আমরা সমাজে দেখাতে পাই। আমি বলতে চাই আপনাকে ভিন্নতা গ্রহণ করতে হবে। বহুদিন ধরে যা আমার হয়া গেছে তাকে কবিতার উপাদান হিসাবে নিতে হবে। নীলু ভাই আপনাকে মনে রাখতে হবে এই বাংলায় কোনো জাতিরই উৎপত্তি হয় নাই। সবাই বহিরাগত, বাঙ্গালি একটা শংকর জাতি।

হোসেন মোফাজ্জলঃ আপনি আসলে কী বলতে চাইছেন? বাঙালি কালচারের ওপর আপনি কি ইসলামিক/ মুসলিম সভ্যতার প্রভাবের কথা বলতে চাইছেন? আপনার অবশ্য দরদ আছে এইসবে। আমি কিন্তু একমত না। 

 আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আপনি একমত না হইতে পারেন। কিন্তু এইটা একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক এস্টাব্লিস্টমেন্ট ও ঐতিহাসিক সত্য। আমাদের এইটা মানতে হবে। এই যা কিছু বাংলা কালচার তা কিন্তু খাঁটী বাংলা না, একটা মিশ্র সভ্যতা। আবার আলাদা কইরা বাঙলা সাহিত্য হইতেছে উনিশ শতকের কলকাতার উচ্চ বর্ণের হিন্দু বুদ্ধিজীবী,বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদীদের হাতে গড়া একটা কালচার। এইটা ইংরেজ, ফরাসি বিপ্লব এবং  সতের  শতকের দুই ইংরেজ ফ্রান্সিস বেকন, জন লকের বুদ্ধির মুক্তি এবং লিবারেলিজমের হাত ধইরা আমাদের ভারতে পাচার হইছে। সেই ধারায়- মুসলমান সভ্যতা মানে বিজাতীয় সভ্যতা আর ইউরোপীয় সভ্যতা মানে আদরের সভ্যতা- এইটা একটা বিরাট কপটতা।  এই হিন্দু বাঙ্গালিত্ব ও তার থেকে উৎসারিত জ্ঞান ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক ভাষা ব্যবহার বিধিই হইল আজ বাংলা সাহিত্যের সংবিধান, সনদ। কিন্তু আমাদেরকে সদা জায়মান, জাতি, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে যে সত্য বাংলা আমাদের কাছে সদা চালু, রক্ত মাংস নিয়ে দাঁড়াইয়া আছে, তাকে কবিতায় আনতে হবে। শুধু একটামাত্র প্যারাডাইমিক আবহে ও মানসে আমাদের কবিতা হবে কেন? দেখেন এই বাংলায় আর ওই বাংলায় যারা কবিতা চর্চা করছে, যে সব সাহিত্য পত্র পত্রিকা আছে, অনলাইন ব্লগ আছে, সবই এই তৈরি করা একক ও একমাত্র প্যারাডাইমে কবিতা চালাইতেছ।  বাংলা কবিতা শুধুই সর্ব ভারতীয় রামায়ণ ও মহাভারত কেন্দ্রিক কনশাসনেস ও তার থেকে পাওয়া ভাষাভিত্তিক হবে কেন? বাংলাদেশ একটা স্বাধীন দেশ, এইটার একটা নিজস্ব পালস আছে, সাইকি আছে, আছে ইতিহাস ঐতিহ্য, ভাষা ও ভাষা কেন্দ্রিক ব্লাড সেল। ভারত ভাগের আগে পর্যন্ত বড়ু চণ্ডীদাস, ভারতচন্দ্র, মধুসূদন, বকিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও পরবর্তী আধুনিক কবিরা যে বাঙ্গালি জাতিভিত্তিক কনশাসনেস তৈরী করছিল, এবং তারপর যেটি আশি দশকের কলকাতার জয় গোস্বামী ও তার সমসাময়িক কবিদের হাত ধইরা বাংলাদেশি কবি সাহিত্যিকদের মধ্যে বাংলাদেশে আসছে, সেই পোয়েটিক ডোমেইনে আমরা আজো গভীর ভাবে রয়ে গেছি। কিন্তু আপনি খেয়াল কইরা দেখেন সেই কাব্য ভাষার সাথে আমাদের অনেক দূরত্ব তৈরি  হয়ে গেছে। এই খাদ থেকে থেকে আমাদেরকে বার হইতে হবে, আমাদেরকে আমাদের আসল আইডেন্টিটি আবহে কবিতা লিখতে হব।   

হোসেন মোফাজ্জলঃ এইটা অবশ্য গবেষণার বিষয়। কারণ একটা ধারা বদল হইতে অনেক টাইম লাগে। এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার উপায় কী? অতীত ধইরা তো আগামীতে যাইতে হবে। 

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহঃ আমাদেরকে আসল বাংলাদেশি সাইকিতে ধ্যান করতে হবে, আমদের নিজস্ব নাড়ির দিকে তাকাইতে হবে। আমাদের যে ডিকশন, লিখনশৈলী তৈরি হইছে সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে যুগ যুগ ধইরা যে সমাজ সভ্যতা গইড়া উঠছে এইটা কলকাতা কেন্দ্রিক জন্মানো বা বানানো কোনো সাহিত্য-ঘটনা না। কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্য উনিশ শতকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ধারায় বিকশিত সাহিত্য। এটি একটা জাতির পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য নয়। দেখেন এর ফলে এইটাকে মূল ধারার সাহিত্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। খুবই দুঃখ জনক যে আজকে যারা বাংলাদেশে  লিখছে, অতীত ও বর্তমানের লেখকেরা , তারা এই জিনিসটারে বুঝে উঠতে পারতেছে না।  তারা এখনো ভারতীয় পুরান, দর্শন, গল্প কাহিনি, ধর্ম বিধি বিধান ধইরা কবিতা সাহিত্য করেন। আশ্চর্য্য!

হোসেন মোফাজ্জল: দোষটা কোথায়?  আমি সবই বাংলা সাহিত্য মনের করি।  একজন বাঙালি হিসাবে আমি গর্ববোধ করি যে আমি এগুলোর পাঠক। আপনি যে লেখকগুলার নাম নিলেন আমি এদেরকে মান্য করি।   

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: না দোষের কিছু না তবে আমাদের জাতীয় চরিত্র ও তার অর্জন হারানোর ভয় আছে। একটা বিরাট জনগোষ্ঠীর  জীবন যাপন, তার বিশ্বাস কেন্দ্রিক আচার ব্যবহার পাশ কাটিয়ে- একটা কৃত্তিম, যা সম্পূর্ণ ভাবে আমাদের নয় তাকে যদি আমদের কবিতায় বা সাহিত্যে নিয়ে আসি তাইলে আমার কবিতা খুবই প্রাণহীন হবে, রক্তমাংসহীন হবে। না আমিও এসব লেখকদের অসম্মান করতেছি না, এক সময় আমিও তাদের পাঠ করছি, কিন্তু কথা হইল এখন রিডার হিসাবে আপনাকেও আপনার আত্মপরিচয়কে, আপনার বিলংগিং কে আবিস্কার ও পরিচর্যা করতে হবে।

হোসেন মোফাজ্জল:  (খাইতে খাইতে)  আপনার কথাটা পরিষ্কার না।  আমি যদি বুইঝা থাকি আপনি কইতে চান যে ইন্ডিয়াঘেঁষা সাহিত্য চর্চা থেইকা আমাদেরকে বার হইতে হবে, কিন্তু কিভাবে? আপনার মতো তো সবুজ কবিতা বা আপনি যাকে ইসলামি ধারার কবিতা বললেন- তা কি সবাই লিখবে?

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: এই যে দেখেন আপনিও কেমন, সেই একটা বৃত্ত ধইরা রাখছেন, অবশ্য এইটা আপনার দোষ না, জেনারেশন টু জেনারেশন এইভাবে মেমোরি শূন্য হইয়া পড়ছে, আত্মবিস্মৃত গরীমাহীন জাতি হইয়া পড়ছে।  বিষয়টা খুব সাংঘাতিক। ইসলাম এই উপমহাদেশে সেই কবে থেইকা আছে,  সাতশ আটশো বছর ধইরা এদেশে আছ।  আচ্ছা আমাকে আপনি বলেন এই যে বৃহৎ মুসলমান জনগোষ্ঠী তাকে আপনি ইগনোর কইরা কিভাবে সাহিত্য করবেন? আমাদের ইতিহাস প্রায় সবটাই বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস। তাই আমাদের ঐতিহ্য জানতে হবে পড়তে হবে। আমি লিখতেছি বাংলাদেশের কবিতা কইতেছেন আরবের কবিতা!  আরবের সাহিত্য বা ভাবধারা এই ট্যাবু দেয়া, ট্যাগ দেয়ার অপকৌশল ও নেতিবাচকতা থেইকা বার হইতে হবে। সত্য সাহিত্য একটা ভূখণ্ডের সমাজ, সভ্যতা, চিন্তাধারা, ইতিহাস নির্মাণ বিনির্মাণ ইত্যাদি ছাড়া হয় না। যারা এইগুলা বলে যে ‘সন্দেহযুক্ত’ বা ‘আরবের সাহিত্য’ তারা হীনম্মন্যতায় ও অজ্ঞতায় ভুগতেছে। যদি আমাদের সত্যিকারের ইতিহাস ঐতিহ্য বুঝি ও বিশ্বাস করি তাইলে দেখবেন সাহিত্যে সবুজ বিপ্লব ঘটবে। নতুন ডিকশন, লেঙ্গুয়েজ ক্যারেক্টার বিকশিত হবে।

(খাবার খাওয়া  প্রায় শেষ।  আমরা সোফায় হেলান দিয়া বসছি)

হোসেন মোফাজ্জলঃ  একবার বলছিলাম আমরা চলেন এক  জায়গায় বসি আমি, আপনি ও সুব্রত এক সাথে আড্ডা দেই।

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ: আমার কোনো সমস্যা নাই। যদিও দেখেন আমার সবুজ কবিতা(ইসলামি ধারার সবুজ কবিতা) সুব্রত সহ্য করতে পারে না, খালি গাইল্লায়। মুখে না, লিইখা আর কি।

হোসেন মোফাজ্জলঃ বন্ধুরা তো গাইল্লাইবো, আবার কাছে ডাকবে, ভালোবাসবে।

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহঃ  তাতো ঠিক, যতক্ষণ পর্যন্ত তা সীমানা অতিক্রম না করে।  কিন্তু সুব্রত খুব সিরিয়াস, সে কথায় ও কাজে প্রচণ্ড ইসলাম বিদ্বেষী। মুখে মুক্তচিন্তা, চিন্তার স্বাধীনতা, ফেমিনিজম ইত্যাদি সো-কল্ড প্রগতিশীলতার কথা বলে কিন্তু কাজ করে উল্টা। আমাদের বাংলা সাহিত্যে অনেক আবু জেহেল আছে, যারা আল্লাহ, ইসলাম, মোহাম্মদ ইত্যাদি শব্দ শুনলেই মুখ খারাপ করে। তখন তাদের আসল রূপ বার হয়ে আসে।  পারলে ছুরি মারে। আগে আমার সাথে এমন করে নাই। যেদিন থেকে আমি সবুজ কবিতা লিখতে শুরু করছি তখন থেকেই সে এবং তার অনুসারীরা এরকম আচরণ শুরু করছে। ওরা মুখে বলে ওরা লিবারেল, মুক্তমনা। কিন্তু আসলে এরা ক্লোজড মাইন্ডেড, সাম্প্রদায়িক। ওদের পুরাটাই একটা প্রতারণা।

হোসেন মোফাজ্জলঃ আপনার অন্য কবি বন্ধুরা কি তার মতো করে?

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহঃ দেখেন দুইটা ঘটনার কথা বলি। একবার সুব্রত আমার একটা কবিতা লেখা নিয়া কি রকম মিন আর দুশমনি কাণ্ডকারখানা করল।  একটা মেয়ে আত্মহত্যা করছে, আমি তাকে দোয়া দিয়া একটা কবিতা লিখলাম। সুব্রত আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ করলো। সবাইকে ডাক দিল আমাকে বয়কট করার জন্য। অনেকেই তাই করলো। তার ভাবধারার অনুসারী কবি সাহিত্যিকেরা, লিটল, বিগ প্রায় সবাই ঘোষণা দিয়া আমার সাথে সম্পর্ক কাট করল। কবি আয়শা ঝর্না আমাকে  দুই দুইবার ফ্রেন্ড বানাইয়া দুই দুইবার আনফ্রেন্ড করছে। আপনি হিন্দু পুরান, নারী স্বধীনতা নিয়া কবিতা লেখেন, নুডিটি বা সেক্স নিয়া কবিতা লেখেন, এরা আপনাকে ফুলের মালা দিয়া বরণ করব। ইসলামিক আবহে বা আপনার কবিতায় যদি আরাবিক শব্দ বা ফ্রেজেস থাকে, তারা আপনাকে মাটিতে ফালাইয়া দেবে। এই হইল এদের চরিত্র।  আর একটা ঘটনা বলি। ২০১৯ সালে বাংলা একাডেমির বইমেলায় আমার ‘কবিতাসংগ্রহ’  প্রকাশ করে মেঘ প্রকাশনা। সেই প্রকাশককে গিয়া দুই একজন ‘মুক্তমনা’ ‘প্রগতিশীল’ কবিরা ধমকের সুরে বলছে- এই মিয়া আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহর কবিতা বার করেন কেন? আমার প্রকাশক থো হয়ে গেছে। বলছে- কেন কী হইছে? ওরা বলছে ওবায়দুল্লাহ তো মুসলমানি কবিতা লেখে! চিন্তা করেন এদের মানসিক ইমমেচুরিটির অবস্থা।

হোসেন মোফাজ্জলঃ খাইছে! এইটা তো অন্যায়, জোর যার মুল্লুক তার, একটা সিন্ডিকেটের মতো অবস্থা।

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহঃ  ঠিক তাই, দলবদ্ধ হওয়া ভালো কিন্তু এভাবে তাদের ইজমের কারণে আমাকে হেয় করার মানসিকতা আমাকে পীড়া দেয়।

হোসেন মোফাজ্জলঃ আপনি এক সময় অনেক জায়গায় লেখা দিতেন, মানে ছাপাইতেন। এখন আর তেমন ভাবে সক্রিয় না।  জানি আপনি লিখতেছেন কিন্তু আমার মতে সব জায়গায় আপনার কবিতা পাই না। কেন?

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহঃ দেখেন তাদের মতে- আমরা যাকে বাংলা সাহিত্য বলি, তার ডেফিনিশন মনে হয় আমার সাথে আর যায় না। মানে বাংলা সাহিত্য মানেই বাঙালিত্ব, মানে হিন্দু বাঙালি সাহিত্য, এখানে মুসলমানি কিছু লেখা যাবে না- এই রকম দুষ্ট ব্যাখ্যায়নের মধ্যে আমি হয়ত পইড়া গেছি। যারাই পত্র পত্রিকা বার করতেছে তারা তাদের সম্প্রদায়ের সাহিত্য করতেছে। তাদের সেই মহাভারতীয়, রামায়নীয় সাবসস্টেন্স, ইসেন্স যদি আপনার লেখায় না থাকে তাহলে ওরা আপনাকে নেবে না।  এই হলো বিরাট সাম্প্রদায়িকতা, বাংলা সাহিত্য শুরু থেকেই এরকম সাম্প্রদায়িক, বাংলা সাহিত্য প্রায় পুরাটাই ইসলাম বিদ্বেষী মোটা দাগ নিয়া অনেক দিন হইল আমাদের মধ্যে দাঁড়াইয়া আছে। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে মুসলমান আবহের কবিতা লিখছে কিন্তু তা বেশিদিন আর আগাইতে পারে নাই। এর মধ্যে হয়ত ধর্ম নিয়া দেশ ভাগ এবং পরবর্তিতে পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বাংলাদেশকে শোষণ এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইন্ডাইরেক্ট প্রভাব আছে। 

হোসেন মোফাজ্জলঃ কেমন জানি সিন্ডিকেটের মতো সবকিছু।  তারপরেও আপনার পাঠক সৃষ্টি হইছে, আপনার কবিতা, গল্প, গদ্য মানুষে পড়ে, বই কেনে।

আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহঃ সিন্ডিকেট, নেটওয়ার্ক, দলবাজি যাই বলেন না কেন- তা সর্ব যুগেই ছিল। সিন্ডিকেট কথাটা কিন্তু খারাপ না, ব্যবসায়ী অর্থে। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে এইটা খারাপ অর্থেই ব্যবহার করা হয়, মানে যখন একদল সাহিত্যিক কৌশলে শুধু  নিজেদের লেখালেখি, নিজেদের গ্রূপের লেখকদের লেখা ছাপায়, প্রশংসা করে, প্রচার প্রসার করে, অন্যদেরকে দমিয়ে রাখেন সেইটা সিন্ডিকেটবাজি। আমি বলবো না আমি এর শিকার, কিন্তু আমার আরও রেট বাড়তে পারত যদি সিন্ডিকেটে হাতে থাকত (হা হা হাসি)! আসলে এগুলি সাময়িক ব্যাপার। আপনার লেখা আমার লেখা কালের কলসে সবকিছু জমা হয়ে যায়। ভালো কিছু থাকলে আজ হোক কাল হোক গড় গড় কইরা বার হয়ে আসবে। কেউ দাবাইয়া রাখতে পারবে না ইনশাল্লাহ।       

২৩/০৫/২০২১

Leave a Reply