আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ’ প্রকাশ করার পেছনে ছোট একটি ঘটনা আছে। আমি ১৯৯৪ সালের দিকে জামালপুর প্রধান ডাকঘর থেকে বদলি হয়ে ঢাকা সদর পোস্ট অফিস, বাংলাবাজার-এ আসি। পুরনো ঢাকায় বড় হয়েছি। বাংলাবাজার আমার চেনা জায়গা। কিন্তু এখানে এসে মনে হল- এমন করে কাছ থেকে এমন ব্যস্ত বইবাজার আগে দেখা হয়নি। প্রধান ডাকঘরের সামনে, ডানে, বায়ে সারি সারি বইয়ের দোকান। লাল নীল সাদা কালো ব্যানার, ফেস্টুনে ভরা চারদিক। বিকেলে অফিস শেষে ঘুরে বেড়াতাম এইসব দোকানে। বিশেষ করে কবিতার বই দেখলে উল্টে পাল্টে দেখতাম, কিনতাম। সেই সময়ই আমি কবি আবদুল মান্নান সৈয়দের জীবনানন্দ কবিতাসমগ্র কিনি(অবসর, ঢাকা)।
ঢাকা সদর পোস্ট অফিসের সামনেই ছিল জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বই প্রকাশনাঘর। বিশাল, কাচঘেরা আধুনিক বইঘরটি যে কারোই দৃষ্টি কাড়বে। একদিন অফিসে বসে আছি। এমন সময় দেখলাম একজন সুদর্শন ভদ্রলোক আমার চেম্বারে ঢুকছে। আমাকে সালাম দিয়ে বলল ‘আমি মুনীর। জুয়েলইন্টারন্যাশনাল।’ (মালিক বা সত্বাধিকারি এরকম কিছুই বললো না!) আমি প্রায় অবাকই হলাম। কেমন জানি মনে হল খাপছাড়া। এত অমায়িক লোক আবার এত বড় বইঘরের মালিক হয় কীভাবে! যখনই আসত আমাকে ‘স্যার’ বলে সম্বোধন করত। এতে আমার খুব লজ্জা লাগত। একদিন বললাম ‘মুনীর ভাই আমি আপানার বয়সে অনেক ছোট, আমাকে আপনি স্যার বলে লজ্জা দেবেন না প্লিজ।’ আমার কথা শুনে তিনি মুচকি হাসলেন। বল্লেন ‘ আমার অফিসে আসুন। চা খাবেন।‘ পরদিন কাজ শেষে সোজা হাটা দিয়ে তার অফিসে ঢুকলাম। এতো বড় বিল্ডিং কিন্তু তার বসার জায়গাটা বেশ সিম্পল। দোকানের লোকেরা বই সামলাচ্ছেন। মাঝে মাঝে তার কাছে এসে খবরাখবর জানাচ্ছেন। তিনি একটুও বিরক্ত হচ্ছেন না। আমি এক সময় আমার লেখলেখির কথা জানালাম। সাথে সাথে একজন নবীন লেখকের স্বপ্ন প্রথম বই প্রকাশের কথাটাও বল্লাম। এটাও বল্লাম যে আমি সামান্য বেতনের চাকরি করি। বই বার করার মতো এতো টাকা পয়সা আমার নাই। এতে তিনি হাসলেন। বললেন ‘আপনার পাণ্ডুলিপি তৈরি করুন।‘ আমি তো মহা অবাক। বিনা পয়সায় কেউ কি আবার বই বার করে দেয়! বাসায় এসে বউকে ঘটনাটা খুলে বলি। এক সময় পাণ্ডুলিপির তৈরির কাজে লেগে যাই। দুই একদিনের মধ্যেই ধ্রুব এষের সাথে দেখা করে প্রচ্ছদ করে ফেলি। এক সপ্তাহের মধ্যেই পাণ্ডুলিপি তৈরি করে মুনীর ভাইয়ের কাছে দিয়ে আসি। তারপর মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আমার স্বপ্নের সেই প্রথম কবিতার বই বার হয়। একিদন বিকালে আমার চেম্বারে মুনীর ভাই এক প্যাকেট মিস্টি আর এক প্যাকেট বই নিয়ে হাজির(স্বপ্নের মতো!)।
২
দেড় দুই বছরের মধ্যে আবারো বদলি হয়ে গেলাম। ঢাকাতেই, ডাক অধিদপ্তরে। একদিন টেবিলে বসে বসে কাজ করছি। এমন সময় আমাদের এক জুনিয়র ছোট ভাই ফারুক আমাকে বলল ‘স্যার জানেন নাকি?’ আমি বল্লাম ‘ কী।‘ সে বলল ‘জুয়েল ইন্টারন্যাশনালের মালিক মুনীর ভাই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন।‘ আমি তো নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ঘটনা কী? কী করে এমন তরতাজা মানুষটি মারা গেল। ফারুক বলল ‘তার মেয়ে পাড়ার একটি ছেলের সাথে পালিয়ে বিয়ে করে ফেলে। এতে মুনীর ভাই সহ্য করতে না পেরে হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান।‘ আমি নিথর হয়ে চেয়ারে বসে থাকলাম। ড্রয়ার থেকে আমার বই ‘শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ’ বার করে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। কী আজব দুনিয়া! পাতা উল্টাতে উল্টাতে দেখলাম বইয়ের ভেতরে লেখা: প্রকাশিকা: সায়মা মুনীর। মুদ্রণ: মনিকা মুদ্রণ। এই সেই মনিকা, আহা মুনীর ভাইয়ের মেয়ে! বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
নদী অভিজ্ঞতা
নুড়ি থেকে দৌড়ে ধরলে ধবধবে শাদা মাছ
নিবিড় পাতাল রক্তে তোমাকে ছোঁবার সাধ
মাছ হয়ে জাগে।
প্রসংগ ত্যাগ করে আয়নার ভিতরে গিয়ে বসলে
নগ্ন কাঁচ নিলাজ মোহে নিজের কুহক খুলে দেখালো-
ভাবলে মৃত্যু খুব ঝুলন্ত থাকে- শাদা মাছে।
আবার নদীকে একটি লাল সুতোয় পেঁচিয়ে রাখলে চোখে।
দূরে পালিয়ে বেড়ালো কোনো কোনো জন্ম
যার সম্পর্ক হৃত– মাতৃ বিভাজনে।
আর গলা থেকে বের হলো মৃত স্বপ্নডাল
তখন বাহবা বললো প্রত্ন ধীবর
তার মাছমৃত্যু তোমার জিবে।
কুমারীস্নান
ভেতরে প্রবেশ করে ভ্রুণ হতে চাই
আমি সুপ্ত আপেলের বীজে
তাকে ভোগ করে স্বত:জননী আমার
স্ফীত করো গর্ভস্থিত প্রত্নজলভাগ।
আজ যে পথের শ্রম ঢেলেছি বোতল বিভাজনে
আমি তাতে সংকুচিত
তাই ধর্মান্তরিত তোমার স্নানে!
বিম্বিত জলীয় মুখ অনাগত লোভে
শতো স্নান রপ্ত করি গূঢ় সন্তরণে
খুব নিচু হয়ে কি দেখি উন্মুক্ত দরোজায়-
নাকি ঢুকে যাবো জলগুঁড়ি সেজে অনন্ত মাতৃত্বে!
পুরুষ বিচ্ছিন্ন তুমি নিপাতিত জল বিছানায়।
আমি হবো প্রথম প্রার্থনাকারি হাড় ধ্বংস দিনে
যেদিন তোমার মৃত্যু, কুমারিত্ব নি:শেষ সন্ত্রাসে
সমুদ্র সন্তান পাত্র ভরে রাখে শতো মৎসপ্রাণে।
তাই আর একবার স্নানে নেমে
সংরক্ষণ করো চাপা জননরেখায়
মাঝখানে থাকে– ভ্রুণ সম্ভাবনা।
শীতে প্রথম মৃত্যুবোধ
আমার মৃত্যুর পর সাত দিগম্বর
বংশডালে নৃত্য করে মৌনব্রত।
গোপন অঙ্গের বিষ পাখি ছড়ালে স্থির
মাথার মোহে ভিক্ষুকের গাই
আমরা অষ্ট ভাই
বীজ কুড়াতে যাই।
বীজের ভেতর গুহাশঙ্খ তারাকান্দির বাঁশি
ভাইয়েরা নাচে
এলোকেশী পড়শী হলো – জল তৃষ্ণার কিনার
এই হলো মাছকান্তি ঝোপ
মহিষগন্ধের রাত
গুপ্ত থাকে রুটি ভোজের শাদা মৌলভির পাঠ।
আরো আছে তৃতীয় মুখ পুত্র এবং কন্যা
নথ বাজে বারো মাস
আমরা ভিড়ালাম নৌকা- আমাদের ছেঁড়া দড়ি।
ধীরে ধীরে লভ্য বস্তু
ঘুম বেহালার দাঁত।
আরো নগ্ন হলো ঘুম। শীত গীতের হাট।
ঘুমোতে ঘুমোতে পায়ের ঠান্ডা উড়ে
আমরা যেদিন ভুক্ত হলাম তামাক সংঘের স্তরে
আট অশ্ব ঘুরে
মৃদুমন্দ কাঠে।
এই হলো পাথর কাটার ছাই
যদিও তুমি দংশিত ভোর-কলের তেজে
আমরা কিন্তু রাস্তা বানাই সপ্তম এজ্রাসে।
ঘুমের অতীত
অসবর্ণ শিশুরা সেই ছড়া
আর অধরা;
যেহেতু মৃত্যু থেকে ছেকে আনে ছয় অগ্নির ঋতু।
দূরত্বের একটি নতুন সংজ্ঞা
আপেল
তোমার আমার মধ্যে দূরত্ব একটি অতি প্রাচীন আপেল।
রাতের চাকুতে বিদ্ধ সম্ভবত আপেলই।
বীজ দ্বিখন্ডিত তাকে যদি কেউ মুক্ত করো মাঠে
ছায়াগুলো মোরগের বাচ্চাদের মতো বের হয়ে পড়ে
তাতে তুমি তাতে আমি
গোল ফলের আশ্রয়ে যৌথ অন্ধকার।
আয়না
তোমার আমার মধ্যে দূরত্ব একটি অতি সামান্য আয়না
জল ফেলে দিয়ে তুলে নেবো হাতে
টলটলে এমন আয়না।
একমাত্র এই কাঁচাবয়সী আয়না
পতনের রাত্রে ফুটে উঠেছে যুগ্ম নাসারন্ধ্রে
তাই আয়না মাত্রই পাশাপাশি রাস্তা।
ঘুম
তোমার আমার মধ্যে দূরত্ব এখন এক বাটি ঘুম।
স্থির পৃথিবীর কেন্দ্রে দেহ গুপ্ত করে যদি কেউ
বিন্দু বিন্দু সবুজের আয়ু গ্লাস ভরে নাচে।
একবার যদি ঘুমাই জীবনে
রুটির আগুনে দাঁড়াবার কথা মনে পড়ে না
শুধু ঘুমের দরোজা ফাঁক করে
বিছানায় কারো কারো আত্মা।
হৃদয় পুরাণ
গন্ধহীন রাস্তা। ঝুলে আছো অপ্রাপ্তির আয়নায়।
ছড়ানো বল্কলে অর্ধভেজা রাত
ফোঁটা পড়ে খ্রিস্টের রুধির।
পয়সা ভাঙ্গিয়ে খাঁচা ভরে নিলো শতো অধর্ম কাছিম
আমরা যতোই মাথা কুটে মরি দর্জির দোকানে
বাটি ভরে আসে নগ্নতার প্রেত
তাই স্নান পরিক্রমা শেষে পোশাক অধরা।
শামুক বিম্বিত বিছানায়। আমরা মুদ্রার ভোগ
আমাদের সময়ের রূপ।
যে জন লুন্ঠিত জোসনায় তার আছে গার্হপত্য দ্যুতি
পুঁইফুলে লভ্য বস্তু ভীতি
কুমড়োর গীত ঘেঁষে শিশুদের বিদ্যালয়।
এমন অ্যামিবা গুনে ক্লান্ত রাজবংশ বাঁশি
কুমারী যেদিন মূর্ত হলো প্রত্ন জলাশয়ে
ভূতের শৈশব নামে পর্দার খোলসে।
অথচ মেথিকান্দায় এতো রাস্তা পার হতে হবে না তোমাকে
মাংসের পসরা শূন্য করে দেখা যাবে
ঘূর্ণ্যমান নিদ্রা।
আমাদের সেই জায়গাতে শুরু
দণ্ডিত অশ্বথ যুগ
কন্যা ভোগে সারি সারি হাত
প্রকাশিত ঝরনা-ব্যথায় ঈশ্বর একদিন মুক্ত।
স্তনাভা
কাদা ও জলের ফল
প্রথামত গন্ধবন্ধ হয় মাংসখন্ড নামে
হাতে, মগজে, স্মৃতিতে
গুহাচিত্র এবং কচি ঘাসে।
আমরাও তাকে চিনি। পতনের রাতে
আমরা এমন ফল ভাসতে দেখেছি
জলপাই বন, বাতাসের কোষে।
পুথিবীর মেয়েরা বিবাহকালে
এই ফল খুঁজে গুহামুখে
ডেটলের শিশি আর গোলাপ বাগানে।
কিন্তু ঈশ্বর এমন বুদ্ধিমান যে ওটাকে
দেয়ালের পাশে রেখে নিজেকেই
সত্য করে রেখেছে জলের ঋণে।
সেই থেকে ফ্রক পড়া মেয়েদের বাড়ি
যখন কোথাও জল গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে
এই ফলের সঙ্গীতে শিশুদের ঘুম আসে না।
এক বাটি দুগ্ধস্রোত
এই ফল জোছনার মস্তিস্কে চন্দ্রগর্ভে
মিশে যায় তৃণগন্ধ নামে।
ভিক্ষুকের প্রেম
গ্রহণ করে ফেলে দাও উর্বরতার নামে
আর যতটুকু থাকি সেও বেদনার দাঁতে হ্রস্ব
ধীরে ধীরে ধুলোর তন্তুতে ঘূর্ণ্যমান- শব্দ এবং কাঁচ।
তুমি বোতলের জল -পরিস্কার, তাও যথারীতি
উবে গেছো আমাদের খাদ্য গ্রহণের কালে।
পাশাপাশি জাতিভক্ত দিগম্বর সবাইকে বলেছি
আমার নিম্নগামী কন্ঠস্বর আর মৃত ঘোড়াটির কথা।
সঙ্গীদের কলাপাতায় জীবন
শুধু গোল রুটি চাই হাতে হাতে
ঘোড়াও জানতো আমি কোনোদিন তাকে আর
মাঠে নিয়ে যেতে পারবো না।
আমাদের জাতিভক্তি মিশে যায় ক্ষৃদ্র টিনে,
চালের গুঁড়ায়।
আমার নাইবা হলো
অনার্য শিশুরা অন্ধ গাছে গাছে
গুহাসভ্যতার দিনে জামা নেবে বলে -ওরা আমাকে ধরেছে রাতে।
সময় এমন ঘড়ি, দুটো হাত শুধু ঈশ্বরের প্রার্থনার কথা মানে
তাই তাদেরও মনোইতিহাস কিছুটা আমার মতো
কাঁচা, ভেজা উদ্ভিদের সমবয়সী।
হায় ডোরাকাটা সেফটিফিনের মেয়ে
কে তোমাকে নীল জামা থেকে উঠিয়ে রেখেছে
প্রাত্যহিক টুথব্রাশ আর শাদা ভাতে।
কবির পকেট -চতুর্থ ভ্রমণে
কবির পকেট ঘিরে ঢুকে পড়েছে অনাঘ্রাত ট্রেন।
বামপার্শ্ব কুলপ্লাবী
মাঝি এসে থামলো দরোজায়।
জামা জুড়ে যতটুকু জল সেইখানে প্রত্নধ্বনি
যুক্ততুলো ঘেঁষে আপেলের নিদ্রা।
আমরা তখন কলহের লাশ
আমরা তখন পর্যাপ্ত অন্ধ
ব্যক্তিচ্যুত বক্ষপুত্র এখানেও নীল। আমার সর্ম্পকেরা খাটো-
তাই গিঁটমুক্ত কমোরের দড়ি।
এখন মৃত্যু অব্দি দুই রক্তে বিভাজিত জ্ঞান।
বয়স যতোই বাড়ে এই কুমড়োর ভেতর
প্রান্ত ঝুড়ি থেকে বের হয় সারি সারি কাঠ
আমাদের শেষ জন্ম ছিলো শীলপেটে
আমাদের শেষ ফুঁ ছিলো সমাধিতাপে
কেন্দ্র মুক্ত করে যখন পত্রালি পাথরে
এই রূপ দিলো চিকিৎসার ধ্বনি
হে কলস পরিতৃপ্ত হও
কাঁধ ভেঙ্গে নেমেছে যত দণ্ডবাঁশি।
এই পকেট হলো সমস্ত সময়
যেমনগর্ত একটি প্রথম উপায় শাখা বিযুক্তিকালে।
প্রত্যেক শীতে থাকে তার পদধ্বনি এবং আমার
পিতামহী সেই চিহ্ন জানে
তিনি যখন ভাসালেন ত্রিমাত্রিক থালা -আমাদের গাভী সেদিন মুক্ত
আমরা হাটি আর সমাহিত হই
সেলাইয়ের কলে ফোটে ভূতপূর্ব ঋতু।
কবির পকেট থেকে শুরু ডানাঅলা রাস্তা
নিদ্রাভেজা মাথা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে কোথায় লুকালো।
___________________________________________
শীতমৃত্যু ও জলতরঙ্গ
প্রথম প্রকাশ: ১৯৯৫
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
প্রকাশক: সায়মা মুনীর, জুয়েল ইন্টারন্যাশনাল
৩৪/এ বাংলাবাজার, ঢাকা
মূল্য: ৪০.০০