আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ
[১৯৯৬ সালে আমার আপন বড় এক ভাই হঠাৎ করে মারা যায়। অকাল মৃত্যু।আমাদের পরিবারে সেই ছিল প্রথম মৃত্যু। সেই সময় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। অনেকদিন বুকের ভেতর চিনচিন করে ব্যথা করত। তাকে নিয়ে একটি ছোটগল্পও লিখেছিলাম, ১৯৯৭ সালে। আজ পাঠকের সাথে তা শেয়ার করলাম।]
মাহতাব আমার ভাই। আমার অনেক ভাই। কিন্তু মাহতাব আমার খুব প্রিয়। মাহতাব গোধূলিসন্ধ্যা কালে মাছ ধরতে যায়। বাজার থেকে তরকারি কিনে আনে। আমরা মা ছেলেরা মিলেমিশে খাই। মাহতাব রাতে আট বছর আগে একদিন পাঠ করে, আবার চে গুয়েভারার গল্প বলে। আমরা বলি তোমার মনটা ভালো তো ভাই। একদিন জানালা ফাঁক করে দেখি ঝাউ গাছের মাথায় চাঁদ ওঠে। মাহতাব বলে ‘তোমরা ঘুমাও আমি একটু চাঁদ দেখে আসি।’ টিনের চালে ঝুপ করে বৃষ্টি পড়ে। মাহতাব বলে ‘আমি একটু গোসল করে আসি।’ আমরা অনেক ভাই বোন। আমাদের টাকা পয়সা নাই। মাহতাব পড়াশোনা ছেড়ে অল্প বয়সে একট চাকরি নিলো। আমরা অনেক ভাই, বললাম মাহতাব তুমি কতো ভালো। এতে মাহতাবের কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। আমরা বললাম ‘তোমাকে একটা সুন্দর বউ এনে দেবো।’ কিন্তু মাহতাব বলে ‘আমার একটা পাখি পোষার খুব শখ, তোমরা তাই করো।’ মাহতাব আমার ভাই। আমার অনেক ভাই কিন্তু মাহতাব আমার খুব প্রিয়। আমি একদিন বনের ভেতরে যাই কিন্তু কোনো পাখি পাই না। মাহতাব এতে রাগ করে না। বলে ‘বোকা পাখি তো শুধু বনে থাকে না।’
মাহতাব চাকরি করে, মাছ ধরতে যায়, বাজার থেকে তরকারি কিনে আনে। আমরা মা ছেলেরা মিলেমিশে খাই। মাহতাব আমার ভাই। আমার অনেক ভাই কিন্তু মাহতাব আমার খুব প্রিয়। কিন্তু আশ্চর্য মাহতাব একদিন হঠাৎ করে, এক গভীর রাতে এই ইহলোকের বন্ধন ত্যাগ করলো। মাহতাব আমার খুব প্রিয়। আমার বিশ্বাস করতে অনেক অসুবিধা দেখা দিলো। আমি লক্ষ্য করলাম কোনো রকম শারীরিক বিঘ্নতার কারণ ছাড়াই আমার বুকের বাম পাশে চিনচিনে ব্যথা। একদিন আকাশে বড় একটা চাঁদ ওঠে। আমি ভাবলাম মাহতাব এতো চট জলদি পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলো কেন। তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কি এতোই প্রয়োজন ছিলো। কোনো কূল কিনারা না পেয়ে অবশেষে আমি তিন চারটি মানুষের দিকে নজর দিলাম। আমি জানি যে মৃত্যুর উপর মানুষের কোনো হাত নাই। কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিই যে এই তিন চারটি চরিত্র মাহতাবের সহজ সরল মানবিক জীবনে একটি নেতিবাচক প্রভাব রাখতে পেরেছিলো এবং এটি তার মৃত্যু নামক অদৃশ্যযাপনের সাথে জড়িত। এই চরিত্রগুলো মাহতাবের দৈনন্দিন জীবন যাপনের সাথে খুব শক্ত ভাবে সম্পৃক্ত ছিলো। আমি ভাবলাম চরিত্রগুলোকে উন্মোচন করা দরকার। যেই বলা সেই কাজ। একদিন গোধূলিসন্ধ্যাকালে উপরোক্ত চরিত্রগুলো এক এক করে কথা বলতে শুরু করলো।
কমরউদ্দিন মোল্লা
আমি যেদিন জেলা শহরের এই অফিসের দায়িত্বভার গ্রহণ করি সেদিন মাহতাবকে প্রথমে দেখি। সে অফিস সহকারি। ফর্সা গোলগাল। রঙ বেরঙের জামা কাপড় পরে। এতে আমার সন্দেহ হয়। সহকারির পজিশন। এতো বাহারি পোশাক পরিচ্ছদ পায় কোথায়! তারপর চেহারায় অতিরিক্ত জেল্লা। অফিসের অন্যান্য কর্মচারিরা আমাকে যেমন অধিক মান্যগণ্য করে মাহতাব অমন একটা করে না। এতে আমার ওর প্রতি রাগ হয়। একিদন রুমে ডেকে বলি -তুমি একটি গাধা। মাহতাব বিচলিত হয় না। বলে- কেন গাধা? আমি বলি ফাইলে অফিসের গোপন কথা এভাবে বলতে নাই। আপনি এসব বিষয়ে মুখে জানাবেন। এতে মাহতাব সরকারের মুখটি লাল হয়ে যায়। সে একটু জোরে বলে – বার বার আপনার রুমে আমার আসতে ভালো লাগে না। এ কথা বলে সে অপক্ষা করেনা, চেয়ার থেকে ওঠে চলে যায়। আমার খুব রাগ ওঠে। বেটা বেয়াদব। মনে মনে ভাবি ওর পেছনে লোক লাগিয়ে দেবো। এতো শক্তি পায় কোথায়। অফিসের দু একজন মাহতাবের বিরুদ্ধে ছিলো। ওরা আমাকে এসে বলে স্যারমাহতাবের বাসায় প্রতিদিনই ঈদের দিন। আমি বলি কেন। ওরা বললো আমরা ঈদের দিনে যা খাই ও রোজ তাই খায়। বাসায় কি নেই স্যার, রঙিন টিভি ভি সি আর ফ্রিজ আর কতো কি। আমি বলি বেটাকে ধরার ব্যবস্থা করো। একটা চার্জসীট করে চাকরির বরোটা বাজাই। কদিনের মধ্যে মাহতাব ধরার জন্য কিছু ক্লু পেয়ে যাই। ওর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তৈরী হই। কিন্ত আল্লাহ আলেমুল গায়েব দুদিন পর মাহতাব সরকার মারা গেলো।
জেসমিন
লোকে বলে আমি নায়িকাদের মতো। মডেল। ঠিকই তো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে রোজ রোজ দেখি। চোখ ফেরানো যায় না। বিয়ের আগে মাহতাব আমাকে খুব একটা আকর্ষণ করতে পারিনি। মাহতাবরা থাকতো আমাদের বাসার উল্টো দিকে। আমাকে দেখলে ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকতো। আমি বলতাম আমি নায়িকা, মডেল। এতো সোজা না। কিন্তু একদিন আমার সামান্য আয়ের বাবাকে পটিয়ে মাহতাব আমাকে বিয়ে করে ফেললো। বিয়ের পর দেখলাম লোকটা খারাপ না। তবে অযথা গোয়ার্তুমি করার বাতিক আছে। শুনেছি এটি নাকি ওদের বংশগত। যেদিন মন ভালো থাকে সেদিন হাসবে খেলবে নাচবে। আর যেদিন মন খারাপ সেদিন সব কিছু খারাপ। কাছেই যাওয়া যায় না। নাক চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। অবশ্য এতে আমার কোনো যায় আসে না। আমি যথারীতি দামি শাড়ি গয়নাগাটি পাই। ভালো ভালো খাবার খাই। যেদিন কোনো জিনিস চেয়ে পাই না সেদিন খুব রাগ ওঠে, কষ্ট পাই। অন্য ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকি। দিনের পর দিন কোনো কথা বলি না। ওকে কেয়ার করি না। বুঝুক বেটা, শাস্তি পাক। আমার আর একটা দু:খের কথা বলি। আমার একটা শাশুড়ি আছে। বয়স অনেক হয়েছে কিন্তু বুড়ির খায়েস কমে না। মাহতাব আমার জন্য কোনো কিছু আনলে সেও বায়না ধরে। ‘বাবা আমাকে একটা শাড়ি কিইনা দে, বউয়ের জন্য যেমন স্যান্ডেল কিনছস আমাকে এমন একটা কিইনা দে।’ মাহতাব আবার খুব মা ভক্ত। ভক্তি না ভয় জানি না। বুড়ি আমার জীবনটা কয়লা করে দিয়েছে। মা ছেলে সন্ধ্যার পর ফুসুর ফুসুর করে নানা কিসিমের আলাপ করে। তবে মাহতাবের মৃত্যুটা আমার কখনও কাম্য ছিলো না। তাকে বেশি সময় ভালো লাগতো না এটি ঠিক, কিন্তু মৃত্যু কামনা করিনি। হায় এখন আমার কী হবে আমার মাসুম বাচ্ছা, ছেলেমেয়েদের কী হবে!
জননী
মাহতাবের বয়স যখন চল্লিশদিন তখন সে এক রাতে মরে যেতে চেয়েছিলো। আল্লাহ হেফাজতকারি, পরিমল বাবু ডাক্তারি বিদ্যা ফলিয়ে সে যাত্রায় তাকে বাঁচিয়ে তুললো। আমার সোনার চান। ছোটবেলা থেকে আয় রোজকারের দিকে নজর। বলে ‘মা আমার দু:খ কইরো না। বাবা নাই তো কী অইছে আমি তো আছি।’ যেই বলা সেই কাজ। মাহতাব চাকরি নেয়। ছোট চাকরি হলেও টাকাপয়সা আছে ভালোই। একদিন একটা বড় রুই মাছ কিনে আমাকে বলে ‘মা তোমরা খাও।’ আমরা তো খুশিতে আটখানা। কতোদিন হলো এতো বড় রুই মাছ খাই না। আমি বলি বাবা আমার সোনা আমার অনেকদিন বেঁচে থাকো। মাহতাব বউকে অনেক কিছু কিনে দেয়। শাড়ি গয়না, টিভি ফ্রিজ কতো কিছু। আমার কষ্ট লাগে। পোলা আমারে কিছু দেয় না কেন? নিশ্চয় বউ তারে তাবিজ করছে। আমি বলি বাবা আমারে একখান শাড়ি দাও। সোনার একখান বালা বানাইয়া দাও। প্রথমে মাহতাব গড়রাজি থাকে। কিন্তু আমি জানি মায়ের প্রতি তার একটা বিশেষ টান আছে। আমি তাই আবার বলি আমার কথা শুনছস বাপ। যেই বলা সেই কাজ। মাহতাব ঢাকায় এসে শাড়ি সোনা বালা সব কিছু আমাকে কিনে দেয়। এতে বউয়ের মুখটা কালো হয়ে যায়। মাহতাবের সাথে কথা বন্ধ করে দেয়। আমি রেগেমেগে বলি ‘জেসমিন তুমি সাবধান হও। পরের মেয়ে তুমি। তুমি কী বোঝ? ছেলে তার মাকে জিনিসপত্র দেবেনা।’ আল্লাহর রহমত আমার মাহতাব টাকা পয়সা তো কম কামায় না। আমি দোয়া করি মাহতাবের আয় রোজকার আরো বারুক। কিন্তু মাহতাব যে একদিন হঠাৎ করে মরে যাবে আমি সপ্নেও ভাবিনি। এমন নাদুস নুদুস সুন্দর পোলা আমার। আমার সহ্য করতে না পেরে আকবর পীরের কাছে যাই। কান্নাকাটি করি। মাহতাব মাহতাব বলে ডাকি। পীর সাহেব বলে আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়া গেছে। কান্নাকাটি করা গুনাহর কাজ মা জননী। এতে আত্মার অশান্তি আসে। আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন বাজানরে বেহেস্ত নসীব করেন। ও আমার জন্য কমতো আর করলো না।
টিয়ানা
লোকজন মনে করে আমি কিছু বলতে পারিনা। বুঝি না। খাঁচার মধ্যে বন্দী অবুজ পাখি। কিন্তু আসলে আমি সব বুঝি। কথাও বলতে পারি। আমার কথা শুধু মাহি মানে মাহতাব বুঝতে পারে। মাহি যেদিন আমাকে প্রথম হেমায়েতপুর থেকে নগদ পাঁচশো টাকা দিয়ে কিনে আনলো সেদিন তার দুই বছরের পুত্র অর্ক আমাকে মারলো। মাহি বললো ‘পাখিটারে মাইরো না বাপ। ও ব্যাথা পাবে। খাবার দাও।’ আমি এতে খুব শান্তি পেয়েছিলাম। কারণ আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম। রোজ সকালে অফিসে যাওয়ার আগে মাহি আমাকে ডাকতো টিয়ানা টিয়ানা। আমি হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতাম। কিন্ত ওর মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকেই লক্ষ্য করছিলাম মাহি আর আমাকে খুব একটা ডাকাডাকি করে না। ওর দিকে তাকালে খুব খারাপ লাগতো। মুখটা কেমন জানি কালো হয়ে উঠছিলো। একদিনের ঘটনার কথা আপনাদেরকে বলি। সেদিন ছিলো অমাবষ্যার রাত। গভীর রাত। আমি দেখলাম মাহি শোবার ঘরের দরোজা পেরিয়ে বাইরে উঠোনের মতো জায়গাটায় বসলো। আমি প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কারো কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমি অবাক হলাম একি এ দেখি মাহতাব! মাহি ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। আমি বলি -মাহি ও মাহি কাদছো কেন? তোমার কি হয়েছে তুমি কাদছো কেন? মাহি বললো ‘আমাকে মেরেছে।’ আমি বললাম- কে মেরেছে। মাহি বলে ‘আমার অফিস কর্তাগো।’ আমি বলি তোমার অফিস কর্তা তোমাকে মেরেছে কেনো গো। সে বলে ‘আমি যে তার ভাগ নিয়েছিগো।’ তাতে কি তাতে কান্নার কি হলো গো। মাহি বলে ‘আমাকে কেটেছে নারী সাপ গো।‘ নারী সাপ তোমার কি হয় গো। ‘নারী সাপ আমার বউ আর মা হয় গো।’ আমি বলি অন্ধকারে তুমি কি করো গো ও মাহি গো। মাহি ‘বলে আমি আমার জায়গা খুঁজি গো।’ তারপর আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলাম না। মাহি সারারাত ওখানেই বসে থাকলো। এক সময় সকাল হলো। মাহি আমাকে খাঁচা থেকে দ্বিতীয়বারের মতো মুক্ত করে দিলো।
ফলাফল
মাহতাব সরকার মাহি যে একদিন মরে যাবে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো একটি ঘটনা। তবে সে যদি প্রাকৃতিক কোনো ব্যবস্থায় বেঁচে থাকতো তাহলে আমরা আরো কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করতে পারতাম হয়ত। ওর কথা ভেবে ভেবে আর সময় নষ্ট করা যায় না। কারণ এখনই পাহাড় থেকে একটি পাথর খণ্ড সমুদ্র গড়াবে,একাব্বর মাঝি কোঁচ দিয়ে গেঁথে নেবে একটি মাগুর মাছ, শহরের মাঝখান দিয়ে একটি দীর্ঘ বাস দ্রুত গতিতে কেন্দ্রের দিকে গমন করবে। আর আমাদের আহার সন্ধানের ঘণ্টা বাজবে। বরং আমরা মাহতাবের ছোট ভাইয়ের বউয়ের দিকে নজর দিতে পারি। এই শান্ত কর্মঠ নারী আবার গর্ভবতী। আগামী শীতে তার দ্বিতীয় সন্তান পৃথিবীতে আসবে। আমরা ভাবতে পারি এইগর্ভধারণ আর জন্মগ্রহণের সাথে মাহতাবের মৃত্যুর একটা গোপন কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত যোগসূত্র আছে!
প্রথম প্রকাশ: বাংলাবাজার পত্রিকা, ঢাকা,২৪.০২.৯৭
