কবিতাগুচ্ছ- আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

kobita

 

নিউজপেপার     

(সাভার ট্রাজেডি স্মরণে)


লজ্জাস্থানে বসে পড়ো

খুনি মাছিরা দূর থেকে এগুলো দেখছে-

তারপিন মাখানো মুখ, হাড়ের ক্যালসিয়াম

                         আকস্মিক জিন-দুর্ঘটনা

তার সাস্থ্যবান অতীত- সন্ধ্যার বাদামি রেস্তোরাঁর দিল

দিলরুবার ওড়নার ফাঁক দিয়ে

এসব আসামিছায়া!

 

কায়দা করে

লাল এই গ্রাফাইট ফ্লোরে কোনো এক বাঘ এসে

জঙ্গল জ্যু জ্যু খেলছেযারা শুয়ে আছে

তাদের ঝিম মুখের ম্যাপ ধরে শ্রেণীপ্রপাতের অ্যানাটমি

অন্ধ হলে না হয় এই মমিপড়া নিহতব্যবস্থা

থেকে দূরে থাকতাম আর

আস্তে আস্তে চোখের উইঢিবি

আর বুকের জলবীচ ঘোড়ার রেস, এসব শূন্যমায়া নিয়ে

সরে পড়তামআজ ভুলে যাওয়া সরাইখানা থেকে উঠে এসেছি

কত দালান ধ্বসে পড়লে আমার ভাষায় শেকল পরবে?

 

জুয়াড়ি

থোকা থোকা আঙুরবাক্সে চোখ রাখছি

একটি চতুর কয়েন একটি চূর্ণ ঘোড়ার রেস-

ঢুকে পড়ছে—ফেরাউনের কফিনে

পাশে সেয়ানা মেয়েদের মায়াভেলকি

চুমুকে চুমুকে বাঘ করছে ছেলেদের ঘোড়া

 

মুখোশমুখি মেলাক্লাউন হাসছে ছোট্ট শিশুদের

রেস্তোরাঁয়তাদের ডাকাত নাচবে শেষ

লুটেরার সিংহাসনেএমন মুর্হূতে কে

পূর্ব জন্মের ভাষা শেখায়কে ভবিষ্যদ্বাণী করছে

                           আগুন আর আগ্নেয়াস্রে?

চারিদিকে তুষারের ঢেউ, নদীর রোজনামচা

আমার আয়ুলেখা লুপ্ত ভীড়ের দানবাক্সে

উৎসবের কবি

উত্তরীয় পরিয়ে দিচ্ছে

ঠাণ্ডা রাইফেল যে ফুটছে না তাকে

যে লিখছে না তার কাঠ কাঠ তার মমি

যে ভাবছে না তার গ্রামের পর গ্রাম

কাক আর কোকিলে

ক্রমশ ফানা হয়ে উঠছে

ক্রমশ বাক বাকুম বন্ধু বন্ধুর কফিনে

                তার পীর তার মুর্শিদ।

 

পরগাছা গাছ আঙুরফলের বাকলে

সেনানি রঙীন বিষকালো ধীরে

খালি চেয়ার আর টেবিল যারা মাপছে

যারা কলরব শেষে ঘুমিয়ে পড়ছে

যারা প্রত্ন ও প্রস্তর শীততাঁবু তিরপল

তাদের কপিলাবস্তু ছাপিয়ে জাগছে কোথাও

                               গৌতম ও বুদ্ধ।

 

 আর্দশলিপি

ঝোপ জঙ্গলের পাশে স্কুলএখানে কোনো এডমিশন লাগে না

শুধু গায়ের গন্ধ দেখে ভর্তি করানো হয়তুমি মাটির তৈরি-

তুমি আদমের পাঁজরআজ ছড়িয়ে ধরো গন্ধরানিদের হামাম

ধীরে ধীরে তোমার শরীরে গাছ ওঠেনিচে পাতা আর পাতাবরণের

এক জন্মমেশিনের কুজকাওয়াজআমি প্রত্ন-বাকল খুলি-

দেখি শিরা উপশিরায় আক্রমণকারীদের লাল হেমিস্ফিয়ার

সেখানে কত জন্ম আর রক্ত পড়ার সাটোরি!

রাত হলে মাছের কানকোয় রোলকল করি

তুমি ডিম ছাড়ো তুমি হা করে খাও

এই ডুমুরফলের বাদামি সন্যাস

বেভুল এক সূর্য- সদা হাজিরের কথা ভুলে যায়

আর ভরা পূর্ণিমার গান লেখে

তুমি বিছানা পাতো আর ঝরনাস্থান থেকে নিয়ে আসো

মৎস্যনারীদের দীর্ঘরতির আর্য়ুবেদ

আজ আমার স্কুলে চন্দ্রতারাদের আর্দশলিপি

 

স্কুলমাঠ

চিঠি পেয়ে বন্দুক নামিয়ে রেখছ

হত্যা শেষে

ঘরে ফিরে আসে লম্বা দাঁতের সৈনিক

তাদের হাতে চম্পা- হাতে সেনাপতির ফুল

সেই দানের গান জমল আগুয়ান টমাহকে

 

কি বৃষ্টি কি ছাই পরদেশ দখল লুণ্ঠন

মাতৃসদনে পড়ে থাকল কবর দেখার 

                                বাইনোকুলার

লাইনে দাঁড়ানোর সময়

কামানের চোখ হয়ে

গোলা ছুঁড়ল স্কুলমাঠের প্রাথমিকেরা

 

গানের আসরে

ঘুর্ণ্যমান বায়ুপৃষ্ঠে তোমার কথা পাচ্ছি

এতো সুর তারান্নুম- এতো জলবিছানো

সিম্ফনি সোনাটা

গ্রহ অণু-গ্রহ সমুদ্র করে তুলছে

উড়ন্ত শরীর আমার- কোনো মাধ্যাকর্ষণই পাচ্ছি না

হালকা পালকের স্মৃতিগুচ্ছ জাগছে মাথার গুগোলে

 

ভীড়ের মধ্যে তোমার ঠোঁট নড়ে

পুতুলখেলার মাইম ঝি টিকা ঝি … ডিজে …রিডু

উড়ে আসছে পুচ্ছে লুকানো কার হারানো চাবি

একটু একটু করে আলগা হচ্ছে বন্ধুর মুখ

বদ্ধ ভীড়ের হামলাআরো কিছু ছায়া আরো কিছু

উড়ে চলা গাছপা ছড়িয়ে দিচ্ছে ম্যামথ ভূপৃষ্ঠের উপর

আমি তাদের কী নামে ডাকি- কী নাম দিই

এই বিহ্বল মায়া-স্রোতার!

 

স্পর্শ

পানশালার পাশে বাড়ি

স্মৃতিরা চোর হয়ে ঢুকে পড়ছে নেশাখোরদের মগজে

              যেমন কোনো তরুণ কবি তৈরি কারো ভাষায়

তাদের হাতে মোম -এই ঘন শীতের বারুদখানা

ঝাপটে আসছে সেনা আর বুট জুতার বায়স্কোপ

 

তাই দেখে কার্তুজ লাগছে আমার হিম রাইফেলে

নিশানা স্থির- জিরো হয়ে বসে আছি বন্ধুর কফিনে

দূরে তাঁবুগুচ্ছখোলা পিপুলভাষায় পাখি হয়ে আছে

                                 সন্ধ্যার এই হিংসা-গ্রেনেড

 

ধর্মহীন হলে পালাই পালাই করতাম

আজ ব্রেইন ধরে ঢুকে পড়ছি নেশাখোরদের গ্রামে।

আর অবস্থান চাইছিশেকল খুলতে খুলতে

গোলাপ আর চামেলিতে ধুয়ে দিচ্ছি মানুষের রক্তখানা। 

 

পিকনিক ২০১৩

নিহত সব পাইন থেকে দুধ গড়িয়ে পড়ছে

জলঘাসে মিশে যাওয়া এই ফল এই উত্তরাধিকার

কার সন্তান বয়ে আনছে ছিন্ন গ্যালাক্সিতে

কোথাও উঁচু ঠোঁট কোথাও বাজিকর ওরাংউটান

শীতের ঋণ জাগে দূর দেশের- পোশাকখনিতে

চারিদিকে হরিণের পালক মৃদুস্বরগুনগুনানি

সোনার শৈশব এসে মাঠ লেখে গাছের বাকলে

 

সারারাতের হত্যালীলা দেখে ফেলে এক বীর বাজপাখি

তার মুখে শিষ তার পায়ে উপুর করা মায়া ম্যানগ্রোভ

হাওয়া ফাটিয়ে উড়িয়ে আনছে- রৌদ্রবীজের পুলিশ

আমরা এখানে না এলে এইসব গুপ্তহত্যা এইসব

চিনামাটির গভীরে খুনিদের ব্রেকফাস্ট দেখতেই

পারতাম নাজানতাম না ম্রিয়ম্রান পাইনগাছ থেকে

কীভাবে গজিয়ে উঠছে আগামী দিনের রেললাইন

 

হানাদার

ফুল থেকে ঝরে পড়ছে শীত

শীতের সবুজ সরিয়ে

ব্রিজ পেরিয়ে কুয়াশালেখায় ঘাসের ঘুম

                              জলকাকলি

আস্তে আস্তে সংসার হচ্ছে

চাদর আর আদরে পাখা উঠছে

             লুপ্ত শিকারীর ছায়া

আর ফেলে যাওয়া কোহিনূর দেখে

মেঘশিশু হয়ে ফিরছে

               হারিয়ে যাওয়া পায়রা

 

চোখ থেকে চোখে বোঁটা জাগানোর গন্ধে

পাখি আর পাহাড়ের ঘুম আসে না

সেই অবহেলায়-

পাপড়ি আর পাজামার মধ্যস্তর দিয়ে

       তরবারী হয়ে ঢুকল হানাদারের আঙুল

One thought on “কবিতাগুচ্ছ- আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ

Leave a Reply