‘জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি’ থেকে কয়েকটি কবিতা

jollad_coverএকটা কবিতা থেকে আর একটা কবিতার জন্ম না নিলে বুঝতে হবে এইটা একটা মৃত কবিতা, ভবিষ্যৎ-বিমুখ কবিতা। আর একটা কবিতা জীবিত হয় তার শেকড়ের রস পান করে অর্থাৎ তার নিজস্ব ভূমি, পরিবার, স্মৃতিচিহ্ন, ইতিহাস, ঐতিহ্যের পানি পান করে। আমার কবিতা উন্মূল নয় কখনো, তার ক্যানভাস জুড়ে আছে আমার স্বদেশ, আমার ‘ ছায়াপরিবার’ তার রক্তকথা, জন্মরেখা।  ‘জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি’ ও ব্যতিক্রম নয়। এইটা আমার ষষ্ঠ কবিতার বই, বার হইছিল ২০১২ সনে। পাঠক লক্ষ্য করে থাকবেন আমি এই কবিতা বইয়ে আমার চেতন, অবচেতন মনে কাজ করা স্বদেশ-স্মৃতি, বাল্য কৈশোরের ঘটনা তথা ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি-অভিজ্ঞতার সংশ্লেষণে গড়ে ওঠা একটা প্রবাহমান থীম কবিতার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসাবে ব্যবহার করেছি। কবিতায় সব সময় একটা অদৃশ্য ব্রিজ থাকে- বর্তমান এবং গত হয়ে যাওয়া জীবনকে জোড়া দেওয়ার সাথে সাথে এই ব্রিজ কবিতাকে করে তোলে ভবিষ্যতবিস্তারি, চিরকালীন। আর একটা বিষয় পাঠক খেয়াল করে দেখবেন আমার কবিতা কখনো এক রৈখিক নয়, তা বহুরৈখিক মানে- মাল্টি-লেয়ার্ড। আর টেকনিক হিসাবে আমার কবিতায় প্রায়ই বাস্তব-পরাবাস্তব, মূর্ত-বিমুর্ত, ভাষা-নিঃভাষা ইত্যাদির একটা মিশেল থাকে। এমন যে এইটা ইচ্ছা করে হয়- তা নয়, এইটা প্রায় স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। এতে করে কবিতার ‘মিনিং’ সব সময়, এবং স্বাভাবিকভাবে অসম্পূর্ণ থাকে হয়ত, কিন্তু এর অন্তর্গত ভাষাকাজের জন্য কমিউনিকেট করতে কোনো অসুবিধা হয় না।

সালাম

আ সা ও

_______________________________________________

মেলার মুখ

 ভিড়ের মধ্যে এক লাল ষাঁড় গুঁতো দিচ্ছে

তার শিং থেকে পিতলের ঘণ্টি বনাঞ্চলের মাটি

গুর গুর করে ছড়িয়ে দিচ্ছে

বাসকলতা পোড়ো জমির বনসাই

দূরে সরে যাচ্ছে না মানুষনরম কাধের মাংস ধরে

গলাতে মালা পড়িয়ে দিচ্ছে ছোটো ছেলেমেয়েদের দল

তাকে শহরের গরুর হাটে আনতেই শেষ বারের মতো

জমি ছেড়ে চলে যায় এক মায়াবী ফিঙ্গেল

হাতে হারমোনিয়াম হারিয়ে যাওয়া মানুষের কাগজ

ঘোড়াগুলো ছুটছে আরবি ভাষার তালে

কৃষকপুতুল প্লাস্টিকের বাঁশি একটা বাচ্চাকে দিতেই

হাম্বা রবে ছুটে আসলো গাভীমাতা

 

দুঃখী হাড়

বলাকা সিনেমাহলের টগর ভেদ করে নতুন বানানো সেতু

যারা নামছে চাঁদ ধরে তাদের বাড়ির জলচৌকি দেখা যায়

জল পানি জল কলস আসর করে বসছে রাস্তার হোটেলে

ওপার তেকে রঙ বদল করে মেঘনা যমুনা

গ্লাসে তরল আপেল কমলা পড়ছে

পাশে শিক কাবাব নানরুটি

জনে জনে বনভেড়ালের পশম মনোলিথ

বাস ছেড়ে বইয়ের দোকানে মাংস শোকার আনন্দে

ছেলেদের শিশ্মস্পঞ্জ ধরে বিজলিপ্রবাহ

জামা পাজামা ঘাম বেয়ে আজ কার বিবাহ!

এতক্ষণে ক্যানভাসারের তপোধ্বনি বয়ে আনছে

মোরগ লড়াইয়ের সন্ধ্যা- কুহু চিৎকার

জল পাতা জল আড়িয়াল খার ভিটাপানি

আগুন পুড়ে সবুজ হলে নানরুটি ভেদ করে

জেগে থাকে এক দুঃখী হাড়

 

নজরুলের কবরের সামনে

নজরুলের কবরের সামনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হচ্ছি

তোমার হলুদ কামিজে জলপ্রাচীর সাস্থ্যমাছ

মাঝ বরাবর সাক্ষী লাল তিলক হাস্নাহেনা

উড়ছে যে কবুতর তার ডানাতেও তোমার নাম লেখা

কি স্বয়ংক্রীয় মিশে আছ মেঘ জলপাইয়ে!

আঙুল থেকে কাগুজেলেবু প্রজাপতির পাখা

জামা ভেঙ্গে আস্তে আস্তে রেইনট্রি বাঁশপাতার সবুজ

এই নাম না জানা মুহূর্তে

নজরুলের কবর খোলার বাসনা নাইবা বললাম

কারণ ঠোঁটগুলো মিশে যাচ্ছে কৃষিকাজ জলখামারে

চোখ মেলাতে মেলাতে যেদিকে তাকাও সেদিকেই

ছিন্ন গোলাপ মিছিল করে আসছে

আলিঙ্গন শেষে এক ঝুলন্ত ট্রাম্পোলিন থেকে লাফিয়ে উঠলো

সার্কাসমেয়েদের নেমে যাওয়া স্তনবেড়াল

 

 লং হলিডের দিনে

রাস্তায় সবটুকু গাছই হলো

শেকড়বাকড়সহ আমি ইকেবানা বানাই

ঘুমিয়ে থাকা মেয়ের দিকে তাকালাম

মেয়ের রেডিও থেকে লম্বা এক রাইফেল

গুলি ছড়িয়ে দিল তাবুতে

যারা রান্না করছে কাপড় বদল করছে

তাদের আঙুল ভরে উঠলো পিপাসাছুরি রক্তজ্যামে

যে যেভাবে খবরগুলো শুনছিল

প্রথমে বুকে পরে গোপনাঙ্গে শেকলগুলো পড়লো

সৈন্যগুলো ট্রাওজারে রাখছিল মৃত আঙুলের আংটি

আর নীল তাবু কাপড় সবকিছু ছাই হল-

এক সিপাহির  হিংসাপ্লাটুনে

আর দূরে এই আমাদের জলদালানের ভেতর

একটা একটা ঘুম রাতের গাছ হল

রাত্রি গড়িয়ে ঘুমের এই গাছ গাছের শেকড়

ছড়িয়ে পড়লো সেনাছাউনিতে

 

 

গোলাপ ফুলের গেট

 বিয়ে বাড়িতে ঢোকার জন্য লাইন ধরে আছি

গোলাপ ফুলের গেটে ঢুকে গেল পিতলের মাছি

সাথে আমার হাত ঘড়িটাও মিশছে পাপড়ি সিপালে

পালকি চড়ে নতুন বউ আসছে-

মাথার পাগড়ি গলে যায় তার ঘুমন্ত চাউনিতে

অবিবাহিত মেয়েদের মায়েরা তাকিয়ে আছে জামাইয়ের দিকে

তার ঘোড়া থেকে দিকবিজয়ের শ্বাস পড়ছে সাজানো খাবারে

শীত এলো সূর্যপোড়া পৌর পাড়ায়

শীতের এই বুনোব্যবহার জামাই জানে!

সবাই যখন খাবার খেতে খেতে ফিরে যাবার কথা ভাবছে

নতুন বউয়ের শরীর থেকে পড়ে গেল ভিনদেশি নেকলেস

 

সময়শূন্য ঘড়ি

 স্বপ্নের রেল করে দৌড়ে আসছে এক ট্রেন

হাওয়ামিনারে কাঠের দরোজা পাতার জানালা

আর কম্পার্টমেন্টে রাখা কলাগাছের মাদুর

শুয়ে আছে যারা তাদের গা জুড়ে আমফল

গন্ধ কাতর পাড়াদের মৌমাছি

ট্রেনটি যেখানে গিয়ে থামলো তার স্টেশন শেষ হল

একটি পারাগাঁয়ের উঠোনেউঠোনে জোৎস্নার ডাকঘর

চিঠি পাঠিয়ে খবর দিলো মেয়েরা

অক্ষরে অক্ষরে বয়ে যাওয়া লালনীল মাছ

গাছ থেকে পাখির শীত সবুকিছু থামলো

নীল মাফলারটাও উড়ে বসল বান্ধবীর গলায়

গাড়ি বরফদিনের চাকা ভরে উঠলো ঘুমকাতর আলোমেশিনে

দু চোখ লাগতে লাগতে জানালার কাচ

হাতের মখমলে বসে গেল এক সময়শূন্য ঘড়ি

 

 মানুষ ও কবি

 মানুষে মেশিনে কথা চলছেতৈরী গোলাপ

সর্ম্পকের সিপ্রং লম্বা হচ্ছে কাবাবের টেবিলে

মুখ নড়ছে হিংসা হিংসা করে বদলে যাচ্ছে মায়ের ভাষা

স্লেটে আঁকা বাড়িটার চোখমুখ

পা থেকে আরো পাথর আরো জাহাজ বানিয়ে

ঘরে তুলবে মানুষের উৎসব

ছাদের এই সীমানা বল খেলার দাক্ষিণ্যে ভরে ওঠে

জলপাই মাঠেফুকোর পাগল

দারিদার ভাঙ্গাগড়া গল্পের জঙ্গল ধরে আনবে

ভবিষৎতের বানর ও পিঞ্জর

সেও থাকে মানুষের ভেতর মানুষ থেকে ছুটে

আস্তে আস্তে গুলিয়ে যায় অন্ধকারের পাপড়িতে

 

 চড়ুই পাখি

 বুকের ভেতর গাছ খুলে এক চড়ুই পাখি বাসা বাঁধছে

আকাশের মেঘফুল নীল বোরকা পড়িয়ে দিচ্ছে বৃর্ষ্টিপ্যাটেল

ঝড়ের মনিষা

চড়ুই নিদ্রাকাতর এমন ওড়ে তো ওড়েনা

শুধু খড়কুটো খোলামকুচি লাগিয়ে রাখে হাড়ের ঘুপচিতে

তার পায়ের লাল ঠোঁটের কিনার ধরে জেগে উঠছে এক

বস্তিবনভূমিলেজ থেকে সবুজলেজ পাতাবাহিনী

খুলে দিচ্ছে ভিজে যাওয়া এক মায়ের শাদা কাপড়

তার নিচে গাঢ় এক সকালবেলা ধান ফুটাচ্ছে

কয়েদীদের কারখানায়কালো গ্রীল দালানপাথর ছেনে

চড়ুই আনছে পালকের নরম শীতজাগা আগুন

পতাকা উড়ছে স্কুল ঘরের ছাদ থেকে উড়ে আসছে সেনাদের গুলি

তাকে যেই ধরল কাউন্সিলের পুলিশ

পথে নিভে গেল মুদি দোকানের শেষ মোমবাতি

 

 শিশু মাছ

 গোসলখানা থেকে মাছ ভাজার গন্ধ পাচ্ছি

আস্তে আস্তে বুকের গাছ লতাপাতা সাবানের ফেনা বেয়ে

উঠছে মাছের চোখ কানকো লেজের রেশমিজাল

সামনে প্লাস্টিকের হাঁস কাঠের কুকুর

বাথটাবের পাথর ধরে ধরে শীতনিবাস খুঁজছে

যে আগুনে পুড়ছে এইসব নরম নরম আমিষ

সে আগুনের সুড়ঙ্গপথে ফুলে উঠছে ফেলে যাওয়া

জেলেদের শেষ কোঁচআর নৌকার পাশে

ঝরে পড়া রক্ত ঠোঁটের টুকরো দেখে দেখে

বাথরুমের সিঙ্ক দিয়ে ছুটে আসছে এক শিুশু মাছ

 

 শেষ বাসা

 আজিমপুর কবরস্থানের কাছে বাসা

ছাদের হাওয়ায় উড়ে আসে বিডিআরদের খাকী

সেনাদের প্যারেড দিয়ে দূর পরিখার চালচিত্র:

মানুষের শেষ বাগান তলিয়ে যাবে রাইফেলের বাটে

নিউমার্কেটে গিয়ে বাজার করি

সবজি সোয়াবিন এইসব মৌসুমি ফল সবজির গোলাপ

নিয়ে আসি এক চাঁদকলের রিক্সায়

বউ রান্না করে কাচামরিচের লালসবুজে

পানি জুরে বিছানা রাত্রিতাড়নার ঝিলিক

বাচ্চারা সাপলুডু খেলছে টেলিভিশনে ম্যাকগাইভার

সব কটি জানালার ছাপচিত্র ভেসে আসছে পড়ার টেবিলে

রাত্রি ঘন হলে এই জুঁই বিছানায় শুতে যাই

বালিশ ঘেঁষে বৃষ্টিদিনের শালিখ ওড়েআর

ভাইবোনদের হাড় এসে মিশে যায় কুয়াশাচাদরে

জল্লাদ ও মুখোশ বিষয়ক প্ররোচনাগুলি। আবু সাঈদ ওবায়দুল্লাহ।  প্রকাশক: নিসর্গ, বইমেলা ২০১২

 

Leave a Reply